rotateআপনার মুঠোফোনটি ল্যান্ডস্কেপে রাখুন।
পাঠ্যপুস্তক ৪র্থ পত্র - তিন
বাংলা ভাষা ডিপ্লোমা পাঠক্রম
পাঠ্যপুস্তক
(চতুর্থ পত্র : অধ্যায়-তিন : গদ্য)
দ্বিতীয় ষাণ্মাসিক - চতুর্থ পত্র
বাংলা সাহিত্যের পাঠকৃতি :
গদ্য ও পদ্য সংকলন
বাংলা সাহিত্যের পাঠকৃতি :
গদ্য ও পদ্য সংকলন
চতুর্থ পত্র   ❐   অধ্যায় -  তিন
গদ্য: প্রবন্ধ, নিবন্ধ, স্মৃতিচারণ
গদ্য: প্রবন্ধ, নিবন্ধ, স্মৃতিচারণ
প্রস্তাবনা ও উদ্দেশ্য

এখানে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রবন্ধিক এস ওয়াজেদ আলী এবং ঐতিহাসিক সুজিৎ চৌধুরীর তিনটি রচনা সন্নিবেশিত হয়েছে। এতে আপনি –

  • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মননশীল প্রবন্ধের একটি বিশেষ ধারার সঙ্গে পরিচিত হবেন যেখানে দেখবেন কবির মননশীলতার সঙ্গে সৃজনশীলতার অপূর্ব সংমিশ্রণ ঘটেছে।
  • প্রাক্-স্বাধীনতার কাল থেকে সাম্প্রতিক কাল অবধি যে সাম্প্রদায়িক ভাবনার চোরাস্রোত আমাদের সমাজকে পীড়িত করে আসছে এস ওয়াজেদ আলীর প্রবন্ধ পাঠে করে এ বিষয়টি নতুন আলোকে উপলব্ধি করবেন।
  • ঐতিহাসিক ও সমাজ বিজ্ঞানী সুজিৎ চৌধুরীর বাল্য ও কৈশোরে পাঠাভ্যাস গড়ে ওঠার আত্মজীবনীমূলক এ রচনায় যে এক শিশুর পরিণত বয়সে একজন সমাজ সচেতন, সংবেদনশীল গবেষক হয়ে ওঠার সংকেত রয়েছে তা আবিষ্কার করতে সক্ষম হবেন।
 (ক)   কেকাধ্বনি :
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
 ৩.১   লেখক পরিচিতি
 ৩.২   মূলপাঠ
 ৩.৩   পাঠসূত্র
 ৩.৪   বিশেষ পাঠ
       অনুশীলন
 (খ)   মুক্তির পথ :
    এস ওয়াজেদ আলী
 ৩.১   লেখক পরিচিতি
 ৩.২   মূলপাঠ
 ৩.৩   পাঠসূত্র
 ৩.৪   বিশেষ পাঠ
       অনুশীলন
 (গ)   বাল্য ও কৈশোর বই পড়ার স্মৃতি :
    সুজিৎ চৌধুরী
 ৩.১   লেখক পরিচিতি
 ৩.২   মূলপাঠ
 ৩.৩   পাঠসূত্র
 ৩.৪   বিশেষ পাঠ
       অনুশীলন
(ক)কেকাধ্বনি :
 রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
 ৩.১   লেখক পরিচিতি
 ৩.২২   মূলপাঠ
 ৩.৩   পাঠসূত্র
 ৩.৪   বিশেষ পাঠ
       অনুশীলন
(খ)মুক্তির পথ :
 এস. ওয়াজেদ আলী, বি-এ (কেল্টাব), বার-এট-ল
 ৩.১   লেখক পরিচিতি
 ৩.২   মূলপাঠ
 ৩.৩   পাঠসূত্র
 ৩.৪   বিশেষ পাঠ
       অনুশীলন
(গ)
বাল্য ও কৈশোর
বই পড়ার স্মৃতি :
 সুজিৎ চৌধুরী
 ৩.১   লেখক পরিচিতি
 ৩.২২   মূলপাঠ
 ৩.৩   পাঠসূত্র
 ৩.৪   বিশেষ পাঠ
       অনুশীলন
প্রস্তাবনা ও উদ্দেশ্য

এখানে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রবন্ধিক এস ওয়াজেদ আলী এবং ঐতিহাসিক সুজিৎ চৌধুরীর তিনটি রচনা সন্নিবেশিত হয়েছে। এতে আপনি –

  • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মননশীল প্রবন্ধের একটি বিশেষ ধারার সঙ্গে পরিচিত হবেন যেখানে দেখবেন কবির মননশীলতার সঙ্গে সৃজনশীলতার অপূর্ব সংমিশ্রণ ঘটেছে।
  • প্রাক্-স্বাধীনতার কাল থেকে সাম্প্রতিক কাল অবধি যে সাম্প্রদায়িক ভাবনার চোরাস্রোত আমাদের সমাজকে পীড়িত করে আসছে এস ওয়াজেদ আলীর প্রবন্ধ পাঠে করে এ বিষয়টি নতুন আলোকে উপলব্ধি করবেন।
  • ঐতিহাসিক ও সমাজ বিজ্ঞানী সুজিৎ চৌধুরীর বাল্য ও কৈশোরে পাঠাভ্যাস গড়ে ওঠার আত্মজীবনীমূলক এ রচনায় যে এক শিশুর পরিণত বয়সে একজন সমাজ সচেতন, সংবেদনশীল গবেষক হয়ে ওঠার সংকেত রয়েছে তা আবিষ্কার করতে সক্ষম হবেন।

৩.১   লেখক পরিচিতি

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১ - ১৯৪১): রবীন্দ্রনাথের অনেকগুলো সত্তার মধ্যে মননশীল সত্তার চরম বিকাশ ঘটেছে তাঁর প্রবন্ধাবলিতে। ব্যক্তিগত প্রবন্ধ, সামাজিক, শিক্ষা বিষয়ক, সংগীত-সাহিত্য-শিল্প বিষয়ক প্রবন্ধ ছাড়াও কবি লিখেছেন জীবনী, আত্মজীবনী, চিঠিপত্র, সমালোচনা, বক্তৃতার জন্য লিখিত বয়ান, গ্রন্থের ভূমিকা ইত্যাদি যেখানে তাঁর মননশীলতা এবং গদ্যশৈলী দেখে আমরা চমকিত হই। ‘বিচিত্র প্রবন্ধ’, ‘কালান্তর’, ‘আত্মপরিচয়’, ‘বিশ্বভারতী’, ‘প্রচীন সাহিত্য’, ‘শব্দতত্ত্ব’, ‘শান্তিনিকেতন’, ‘শিক্ষা’, ‘সংগীতচিন্তা’, ‘সাহিত্যের পথে’, ‘ইতিহাস’, ‘মানুষের ধর্ম’ ইত্যাদি সংকলন গ্রন্থে প্রকাশিত প্রবন্ধে কবির বিচিত্রগামী চিত্তের পরিচয় নিহিত। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অসংখ্য কবিতা, গানের পাশাপাশি যে বিশাল গদ্যের সম্ভার রেখে গেছেন এদিকে দৃষ্টিপাত করলেও আমরা চমকিত হই বই কি। (কবির জীবনের বিস্তৃত তথ্যাদির জন্য এ বইয়ের প্রথম অধ্যায় দেখুন, পৃ.১৬)

৩.২   মূলপাঠ
কেকাধ্বনি
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ঠাৎ গৃহপালিত ময়ূরে ডাক শুনিয়া আমার বন্ধু বলিয়া উঠিলেন- আমি ঐ ময়ূরের ডাক সহ্য করিতে পারি না; কবিরা কেকারবকে কেন যে তাঁহাদের কাব্যে স্থান দিয়াছেন বুঝিবার জো নাই।

ঠাৎ গৃহপালিত ময়ূরে ডাক শুনিয়া আমার বন্ধু বলিয়া উঠিলেন- আমি ঐ ময়ূরের ডাক সহ্য করিতে পারি না; কবিরা কেকারবকে কেন যে তাঁহাদের কাব্যে স্থান দিয়াছেন বুঝিবার জো নাই।

কবি যখন বসন্তের কুহুস্বর এবং বর্ষার কেকা, দুটাকেই সমান আদর দিয়াছেন তখন হঠাৎ মনে হইতে পারে কবির বুঝি বা কৈবল্যদশাপ্রাপ্তি হইয়াছে- তাঁহার কাছে ভালো ও মন্দ, ললিত ও কর্কশের ভেদ লুপ্ত।

কবি যখন বসন্তের কুহুস্বর এবং বর্ষার কেকা, দুটাকেই সমান আদর দিয়াছেন তখন হঠাৎ মনে হইতে পারে কবির বুঝি বা কৈবল্যদশাপ্রাপ্তি হইয়াছে- তাঁহার কাছে ভালো ও মন্দ, ললিত ও কর্কশের ভেদ লুপ্ত।

কেবল কেকা কেন, ব্যাঙের ডাক ও ঝিল্লীর ঝংকারকে কেহ মধুর বলিতে পারে না। অথচ কবিরা এ শব্দগুলিকে উপেক্ষা করেন নাই। প্রেয়সীর কন্ঠস্বরের সহিত ইহাদের তুলনা করিতে সাহস পান নাই, কিন্তু ষড়্‌ঋতুর মহাসংগীতের প্রধান অঙ্গ বলিয়া তাঁহারা ইহাদিগকে সম্মান দিয়াছেন।

এক প্রকারের মিষ্টতা আছে তাহা নিঃসংশয় মিষ্ট, নিতান্তই মিষ্ট। তাহা নিজের লালিত্য সপ্রমাণ করিতে মুহূর্তমাত্র সময় লয় না। ইন্দ্রিয়ের অসন্ধিগ্ধ সাক্ষ্য লইয়া মন তাহার সৌন্দর্য স্বীকার করিতে কিছুমাত্র তর্ক করে না। তাহা আমাদের মনের নিজের আবিষ্কার নহে, ইন্দ্রিয়ের নিকট হইতে পাওয়া। এইজন্য মন তাহাকে অবজ্ঞা করে; বলে, ও নিতান্তই মিষ্ট, কেবলই মিষ্ট। অর্থাৎ উহার মিষ্টতা বুঝিতে অন্তঃকরণের কোনো প্রয়োজন হয় না, কেবলমাত্র ইন্দ্রিয়ের দ্বারাই বোঝা যায়। যাহারা গানের সমজদার এই জন্যই তাহারা অত্যন্ত উপেক্ষা প্রকাশ করিয়া বলে, অমূক লোক মিষ্ট গান করে। ভাবটা এই যে, মিষ্ট গায়ক গানকে আমাদের ইন্দ্রিয়সভায় আনিয়া নিতান্ত সুলভ প্রশংসা দ্বারা অপমানিত করে; মার্জিত রুচি ও শিক্ষিত মনের দরবারে সে প্রবেশ করে না। যে লোক পাটের অভিজ্ঞ যাচনদার সে রসসিক্ত পাট চায় না; সে বলে, আমাকে শুকনো পাট দাও, তবেই আমি ঠিক ওজনটা বুঝিব। গানের উপযুক্ত সমঝদার বলে, বাজে রস দিয়া গানের বাজে গৌরব বাড়াইয়ো না, আমাকে শুকনো মাল দাও, তবেই আমি ঠিক ওজনটি পাইব, আমি খুশি হইয়া ঠিক দামটি চুকাইয়া দিব। বাহিরের বাজে মিষ্টতায় আসল জিনিসের মূল্য নামাইয়া দেয়।

যাহা সহজেই মিষ্ট তাহাতে অতি শীঘ্র মনের আলস্য আনে, বেশিক্ষণ মনোযোগ থাকে না। অবিলম্বেই তাহার সীমায় উত্তীর্ণ হইয়া মন বলে, আর কেন, ঢের হইয়াছে।

এইজন্য যে লোক যে বিষয়ে বিশেষ শিক্ষা লাভ করিয়াছে সে তাহার গোড়ার দিককার নিতান্ত সহজ ও ললিত অংশকে আর খাতির করে না। কারণ, সেটুকুর সীমা সে জানিয়া লইয়াছে; সেটুকুর দৌড় যে বেশিদূর নহে তাহা সে বোঝে; এইজন্য তাহার অন্তঃকরণ তাহাতে জাগে না। অশিক্ষিত সেই সহজ অংশটুকুই বুঝিতে পারে, অথচ তখনো সে তাহার সীমা পায় না--এইজন্যই সেই অগভীর অংশেই তাহার একমাত্র আনন্দ। সমঝদারের আনন্দকে সে একটা কিম্ভূত ব্যাপার বলিয়া মনে করে, অনেক সময় তাহাকে কপটতার আড়ম্বর বলিয়াও গণ্য করিয়া থাকে।

এইজন্যই সর্বপ্রকার কলাবিদ্যাসম্বন্ধে শিক্ষিত ও অশিক্ষিতের আনন্দ ভিন্ন ভিন্ন পথে যায়। তখন এক পক্ষ বলে, তুমি কী বুঝিবে! আর-এক পক্ষ রাগ করিয়া বলে, যাহা বুঝিবার তাহা কেবল তুমিই বোঝ, জগতে আর-কেহ বোঝে না।

একটি সুগভীর সামঞ্জস্যের আনন্দ, সংস্থান-সমাবেশের আনন্দ, দূরবর্তীর সহিত যোগ-সংযোগের আনন্দ, পার্শ্ববর্তীর সহিত বৈচিত্র্য-সাধনের আনন্দ--এইগুলি মানসিক আনন্দ। ভিতরে প্রবেশ না করিলে, না বুঝিলে, এ আনন্দ ভোগ করিবার উপায় নাই। উপর হইতেই চট্‌ করিয়া যে সুখ পাওয়া যায়, ইহা তাহা অপেক্ষা স্থায়ী ও গভীর।

এবং এক হিসাবে তাহা অপেক্ষা ব্যাপক। যাহা অগভীর, লোকের শিক্ষা বিস্তারের সঙ্গ, অভ্যাসের সঙ্গ ক্রমেই তাহা ক্ষয় হইয়া তাহার রিক্ততা বাহির হইয়া পড়ে। যাহা গভীর তাহা আপাতত বহুলোকের গম্য না হইলেও বহুকাল তাহার পরমায়ু থাকে, তাহার মধ্যে যে-একটি শ্রেষ্টতার আদর্শ আছে তাহা সহজে জীর্ণ হয় না।

জয়দেবের "ললিতলবঙ্গলতা' ভালো বটে, কিন্তু বেশিক্ষণ নহে। ইন্দ্রিয় তাহাকে মন-মহারাজের কাছে নিবেদন করে, মন তাহাকে একবার স্পর্শ করিয়াই রাখিয়া দেয়--তখন তাহা ইন্দ্রিয়ের ভোগেই শেষ হইয়া যায়। "ললিতলবঙ্গলতা'র পার্শ্বে কুমারসম্ভবের একটা শ্লোক ধরিয়া দেখা যাক—

আবর্জিতা কিঞ্চিদিব স্তনাভ্যাং

বাসো বসানা তরুণার্করাগম্‌ ।

পর্যাপ্তপুষ্পস্তবকাবনম্রা

সঞ্চারিণী পল্লবিনী লতেব ।

ছন্দ আলুলায়িত নহে, কথাগুলি যুক্তাক্ষরবহুল; তবু ভ্রম হয়, এই শ্লোক "ললিতলবঙ্গলতা'র অপেক্ষা কানেও মিষ্ট শুনাইতেছে। কিন্তু তাহা ভ্রম। মন নিজের সৃজনশক্তির দ্বারা ইন্দ্রিয়সুখ পূরণ করিয়া দিতেছে। যেখানে লোলুপ ইন্দ্রিয়গণ ভিড় করিয়া না দাঁড়ায় সেইখানেই মন এইরূপ সৃজনের অবসর পায়। "পর্যাপ্তপুষ্পস্তবকাবনম্রা'--ইহার মধ্যে লয়ের যে উত্থান আছে, কঠোরে কোমলে যথাযথরূপে মিশ্রিত হইয়া ছন্দকে যে দোলা দিয়াছে, তাহা জয়দেবী লয়ের মতো অতিপ্রত্যক্ষ নহে; তাহা নিগূঢ়; মন তাহা আলস্যভরে পড়িয়া পায় না, নিজে আবিষ্কার করিয়া লইয়া খুশি হয়। এই শ্লোকের মধ্যে যে-একটি ভাবের সৌন্দর্য তাহাও আমাদের মনের সহিত চক্রান্ত করিয়া অশ্রুতিগম্য একটি সংগীত রচনা করে, সে সংগীত সমস্ত শব্দসংগীতকে ছাড়াইয়া চলিয়া যায়; মনে হয়, যেন কান জুড়াইয়া গেল--কিন্তু কান জুড়াইবার কথা নহে, মানসী মায়ায় কানকে প্রতারিত করে।

আমাদের এই মায়াবী মনটিকে সৃজনের অবকাশ না দিলে, সে কোনো মিষ্টতাকেই বেশিক্ষণ মিষ্ট বলিয়া গণ্য করেনা। সে উপযুক্ত উপকরণ পাইলে কঠোর ছন্দকে ললিত, কঠিন শব্দকে কোমল করিয়া তুলিতে পারে। সেই শক্তি খাটাইবার জন্য সে কবিদের কাছে অনুরোধ প্রেরণ করিতেছে।

কেকারব কানে শুনিতে মিষ্ট নহে, কিন্তু অবস্থাবিশেষে সময়বিশেষে মন তাহাকে মিষ্ট করিয়া শুনিতে পারে, মনের সেই ক্ষমতা আছে। সেই মিষ্টতার স্বরূপ, কুহুতানের মিষ্টতা হইতে স্বতন্ত্র। নববর্ষাগমে গিরিপাদমূলে লতাজটিল প্রাচীন মহারণ্যের মধ্য যে মত্ততা উপস্থিত হয় কেকারব তাহারই গান। আষাঢ় শ্যামায়মান তমালতালীবনের দ্বিগুণতর ঘনায়িত অন্ধকারে, মাতৃস্তন্যপিপাসু ঊর্ধ্ববাহু শতসহস্র শিশুর মতো অগণ্য শাখাপ্রশাখার আন্দোলিত মর্মরমুখর মহোল্লাসের মধ্য, রহিয়া-রহিয়া কেকা তারস্বরে যে একটি কাংসক্রেংকারধ্বনি উত্থিত করে তাহাতে প্রবীণ বনস্পতিমন্ডলীর মধ্যে আরণ্যমহোৎসবের প্রাণ জাগিয়া উঠে। কবির কেকারব সেই বর্ষার গান; কান তাহার মাধুর্য জানে না, মনই জানে। সেইজন্য মন তাহাতে অধিক মুগ্ধ হয়। মন তাহার সঙ্গ সঙ্গ আরো অনেকখানি পায়--সমস্ত মেঘাবৃত আকাশ, ছায়াবৃত অরণ্য,নীলিমাচ্ছন্ন গিরি শিখর, বিপুল মূঢ় প্রকৃতির অব্যক্ত অন্ধ আনন্দরাশি।

বিরহিণীর বিরহবেদনার সঙ্গ কবির কেকারব এইজন্যই জড়িত। তাহা শ্রুতিমধুর বলিয়া পথিকবধূকে ব্যাকুল করে না, তাহা সমস্ত বর্ষার মর্মোদ্‌ঘাটন করিয়া দেয়। নরনারীর প্রেমের মধ্যে একটি অত্যন্ত আদিম প্রাথমিক ভাব আছে; তাহা বহিঃপ্রকৃতির অত্যন্ত নিকটবর্তী, তাহা জলস্থল-আকাশের গায়ে গায়ে সংলগ্ন। ষড়্‌ঋতু আপন পুষ্পপর্যায়ের সঙ্গ সঙ্গ এই প্রেমকে নানা রঙ রাঙাইয়া দিয়া যায়। যাহাতে পল্লবকে স্পন্দিত, নদীকে তরঙ্গিত, শষ্যশীর্ষকে হিল্লোলিত করে, তাহা ইহাকেও অপূর্ব চাঞ্চল্যে আন্দোলিত করিতে থাকে। পূর্ণিমার কোটাল ইহাকে স্ফীত করে এবং সন্ধ্যাভ্রের রক্তিমায় ইহাকে লজ্জামণ্ডিত বধূবেশ পরাইয়া দেয়। এক-একটি ঋতু যখন আপন সোনার কাঠি লইয়া প্রেমকে স্পর্শ করে, তখন সে রোমাঞ্চকলেবরে না জাগিয়া থাকিতে পারে না। সে অরণ্যের পুষ্পপল্লবেরই মতো প্রকৃতির নিগূঢ়স্পর্শাধীন। সেইজন্য যৌবনাবেশবিধুর কালিদাস ছয় ঋতুর ছয় তারে নরনারীর প্রেম কী কী সুরে বাজিতে থাকে তাহাই বর্ণনা করিয়াছেন; তিনি বুঝিয়াছেন জগতে ঋতু-আবর্তনের সর্বপ্রধান কাজ প্রেম-জাগানো, ফুল ফোটানো প্রভৃতি অন্য সমস্তই তাহার আনুষঙ্গিক। তাই যে কেকারব বর্ষাঋতুর নিখাদ সুর তাহার আঘাত বিরহবেদনার ঠিক উপরে গিয়াই পড়ে।

বিদ্যাপতি লিখিয়াছেন—

মত্ত দাদুরী ডাকে ডাহুকী

ফাটি যাওত ছাতিয়া ।

এই ব্যাঙের ডাক নববর্ষার মত্তভাবের সঙ্গ নহে, ঘন বর্ষার নিবিড় ভাবের সঙ্গ বড়ো চমৎকার খাপ খায়। মেঘের মধ্যে আজ কোনো বর্ণবৈচিত্র্য নাই, স্তরবিন্যাস নাই; শচীর কোনো প্রাচীন কিংকরী আকাশের প্রাঙ্গণ মেঘ দিয়া সমান করিয়া লেপিয়া দিয়াছে, সমস্তই কৃষ্ণধূসরবর্ণ। নানাশস্যবিচিত্রা পৃথিবীর উপরে উজ্জ্বল আলোকের তুলিকা পড়ে নাই বলিয়া বৈচিত্র্য ফুটিয়া ওঠে নাই। ধানের কোমল মসৃণ সবুজ, পাটের গাঢ় বর্ণ এবং ইক্ষুর হরিদ্রাভা একটি বিশ্বব্যাপী-কালিমায় মিশিয়া আছে। বাতাস নাই। আসন্ন বৃষ্টির আশঙ্কায় পঙ্কিল পথে লোক বাহির হয় নাই। মাঠে বহুদিন পূর্বে খেতের কাজ সমস্ত শেষ হইয়া গেছে। পুকুরে পাড়ির সমান জল। এইরূপ জ্যোতির্হীন, গতিহীন, কর্মহীন, বৈচিত্র্যহীন, কালিমালিপ্ত একাকারের দিনে ব্যাঙর ডাক ঠিক সুরটি লাগাইয়া থাকে। তাহার সুর ঐ বর্ণহীন মেঘের মতো, এই দীপ্তিশূন্য আলোকের মতো, নিস্তব্ধ নিবিড় বর্ষাকে ব্যাপ্ত করিয়া দিতেছে; বর্ষার গন্ডিকে আরো ঘন করিয়া চারিদিকে টানিয়া দিতেছে। তাহা নীরবতার অপেক্ষাও একঘেয়ে। তাহা নিভৃত কোলাহল। ইহার সঙ্গ ঝিল্লীরব ভালোরূপ মেশে। কারণ, যেমন মেঘ, যমন ছায়া, তেমনি ঝিল্লীরবও আর-একটা আচ্ছাদনবিশেষ; তাহা স্বরমণ্ডলে অন্ধকারের প্রতিরূপ; তাহা বর্ষানিশীথিনীকে সম্পূর্ণতা দান করে।

৩.৩   পাঠসূত্র

‘কেকাধ্বনি’ এবং এ পর্যায়ের ‘নববর্ষা’, ‘পাগল’ প্রভৃতি প্রবন্ধ পাঠ করলে একই সঙ্গে গদ্য এবং পদ্যপাঠের অনুভূতি লাভ করা সম্ভব হয়। ভাবের গভীরতায়, তত্ত্বকথার সরস প্রকাশশৈলীতে প্রবন্ধগুলো পাঠকের মনকে আবিষ্ট করে। প্রসঙ্গ থেকে প্রসঙ্গান্তরে ঘুরে একটি মানসপরিক্রমা সমাপনান্তে পাঠক স্থিত হন একটি গভীর উপলব্ধিতে। প্রবন্ধটি পাঠের আগে এবং শেষে পাঠকের অন্তর্জগতে একটা রূপান্তর ঘটে। পাঠক লাভ করেন একটা নতুন দৃষ্টিভঙ্গি, তাঁর চিন্তা এবং অনুভবের ক্ষেত্রটিও হয় সম্প্রসারিত। এক একটি কবিতার যেমন শক্ত বাঁধুনি - প্রতিটা পঙক্তি, শব্দ একে অপরের সঙ্গে কার্যকারণ সূত্রে নিবিড়ভাবে গ্রন্থিত, এ প্রবন্ধেরও তেমনি আঙ্গিকের বাঁধন। প্রতিটি কথা, পঙক্তি, প্রসঙ্গ, অনুষঙ্গের অভিমুখ একটি দিকেই যেখানে এর পূর্ণ প্রকাশ।

ময়ূরের কেকারব নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত এবং ধ্বনিময় এ বিশ্বসংসারের বিশাল সংগীতসভায় কর্কশ বলে নিন্দিত এ কেকাধ্বনিরও যে একটা স্থান, রয়েছে একটা ভূমিকা-এ কথাটির সঙ্গে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠা আমাদের শ্রুতিঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন্দনভাবনা, সৌন্দর্যচেতনা, সংগীতচেতনা নিয়ে তত্ত্বকথা কবি তাঁর অনির্বচনীয় গদ্যে প্রকাশ করেছেন। আমাদের শব্দময় এ পৃথিবীতে প্রতিটি ধ্বনি, শব্দ তার নিজস্ব প্রেক্ষিতে অনন্য এবং অপরিহার্য। আমাদের এ পৃথিবীটা কোনও নীরব, মুক কিছু নয়, এটি একটি শব্দময় পৃথিবী। এ অনন্ত শব্দরাজির মধ্যে ডুবে আছি বলেই আলাদা করে সবসময় এটা অনুভব করি না, কিন্তু প্রকৃতিই প্রতিটি ধ্বনিকে তার নিজস্ব স্থানে সংস্থাপন করে রেখেছে। এখানে ব্রাত্য বলে কোনটিকেই সরিয়ে ফেলার জো নেই। কবিরা এটা সঠিকভাবে উপলব্ধি করেন বলেই ঋতুর আবহ রচনায় সব শব্দকেই স্থান দেন। বিপুল সমারোহে বর্ষার আত্মপ্রকাশে অরণ্যভূমিতে প্রবল ধ্বনিময় নৃত্যোৎসবের মুহূর্তে কেকাধ্বনি যেন পূর্ণতা আনে। এ ধ্বনি একান্তই বর্ষার গান, অন্য প্রেক্ষিতে কেকাধ্বনি শ্রুতিসুখকর না হলেও বর্ষার বিপুল তরঙ্গময় প্লাবনধারায় তা সঠিক আবহই রচনা করে। কবিরা কেকাধ্বনিকে কাব্যে স্থান দিয়ে মোটেও রসভঙ্গ করেননি। কবি সে সঙ্গে বলছেন বর্ষার অনুষঙ্গে দাদুরির (ব্যাঙের) ডাক, ঝিল্লির একটানা রব এসবের একটা মাধুর্য আছে যথার্থ প্রেক্ষিতে তা শ্রবণকে নন্দিতই করে। এই নিন্দিত দাদুরির আওয়াজই অনুপম প্রেমসংগীত বৈষ্ণব গীতিতে বিরহের আবহ রচনা করেছে।

যা কিছু শ্রুতিসুখকর তা'ই যে উৎকৃষ্ট এমনটি নাও হতে পারে। কবি বলেছেন, যাতে শ্রবণইন্দ্রিয়ের চাহিদামাত্র পুরণ হয়, মনের কাছে যা পৌঁছাতে পারে না, তাকে প্রকৃত সুন্দর বলা যায় না। আসলে সৌন্দর্যের সৃজনক্ষেত্র তো মন। মনের ভেতর শ্রবণযন্ত্র ধৃত শব্দরাজির যদি পুননির্মাণ না হয় তবে এ সুর, কথা, গান নিছক কোলাহল বই তো নয়। যে শিল্পী কেবল কণ্ঠমাধুর্য আর স্বপ্রক্ষেপণের চাতুর্যে শ্রোতাদের মনোরঞ্জন করেন, তিনি কোন স্থায়ী সৃজন করতে সক্ষম নন। উচ্ছ্বাস সৃষ্টি করেই তার কর্ম শেষ। প্রকৃত দীক্ষিত সমজদারের কাছে তা মূল্যহীন। জনপ্রিয়তা তো শ্রেষ্ঠতার মাপকাঠি নয়। শ্রবণসুখকর ছন্দের চমৎকারিত্ব, অলঙ্কারের সাজে সজ্জিত কবি জয়দেবের পদাবলির তুলনায় কালিদাসের গভীর দ্যোতনাঘন পদ যে আরও উঁচু স্তরের সৃষ্টি এটাই কবির অভিমত। ক্ষণিকের ছন্দে ঝংকৃত পদের আয়ুষ্কাল সীমিত।

বর্ষাঋতুর গভীর বেদনাভরা ব্যাকুল নিসর্গে ময়ূরের কেকাধ্বনি একান্তভাবেই মিশে যায়। তাই এত মধুর, পরাণভরানো এ রব। এ আহ্বানে শ্রবণইন্দ্রিয় নয়, জাগে মনের সাড়া। এ ধ্বনিতেই সংবেদনশীল মনের ভেতর সৃজন হয় অপূর্ব সংগীত। এখানে কেকাধ্বনি ভেতরের তন্ত্রীতে আঘাত করে সৃষ্টি করে বর্ষণগীতি। কর্কশ বলে নিন্দিত কাংস্যক্রেঙ্কারধ্বনি একটি উপলক্ষ মাত্র।

৩.৪   বিশেষ পাঠ

সাধারণ একটা মন্তব্যের সূত্র ধরে এক চিন্তাজাগানিয়া আলোচনার সূত্রপাত এবং নন্দনভাবনা, সৃজনতত্ত্ব, কাব্য এবং বিশ্বপ্রকৃতিতে শব্দ-ধ্বনি-সুরের ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার এ বয়ান পাঠককে টেনে নিয়ে যায় এক গভীর তত্ত্বের জগতে। গভীর বক্তব্যের এ চিত্তাকর্ষক উপস্থাপন। পাঠককে নিজের অজান্তেই চিন্তামগ্ন করে দেবার ক্ষমতা এ গদ্য রচনাটির। বর্ণনা একই সঙ্গে দৃষ্টিগ্রাহ্য এবং শ্রুতিগ্রাহ্য। শ্রবণইন্দ্রিয়ের সঙ্গে ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়, অর্থাৎ মনের সংযোগ ঘটলে যে বহুনিন্দিত, কর্কশ কেকাধ্বনি, উপেক্ষিত ব্যাঙের ডাক এবং একঘেয়ে ঝিল্লিরবও শ্রোতার নান্দনিক উপলব্ধির তন্ত্রীতে আঘাত করতে পারে এটাই নানা কথায়, উপমায়, যুক্তিজালে উপস্থাপন করা হয়েছে। কেকাধ্বনি কোকিলের পঞ্চম স্বরের মতো নয়, কিন্তু নিজস্ব ক্ষেত্রে তার আপন মাধুর্যও উপেক্ষণীয় নয়। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করতে হয় ইংরেজ কবি জন কিটসের ‘ওড টু অটাম’ কবিতায় বন্দিত শব্দ-লহরীর কথা। সন্ধ্যাবেলা কীটপতঙ্গের সমবেত ঐকতান, ঝিঁঝিপোকার শব্দ, ভেড়ার পালের রব, রবিনের শিস, শালিখপাখির কিচিরমিচির- এসব নিয়ে যে হেমন্তের ঐকতান, এর সঙ্গে সংগীতময় বসন্তঋতুর তুলনা হয়তো চলে না, কিন্তু এ সংগীতও নিস্বতায় ভাস্বর। কবি হেমন্ত ঋতুকে বলছেন, ‘Thou hast thy music too’ ।

নববর্ষার প্রবল উন্মত্ততার নিখাদ সুর হল কেকাধ্বনি। তেমনি ঘনঘোর বর্ষায় দিগন্ত বিস্তৃত বিরহবেদনার অভিব্যক্তির ভাষা তো খুঁজে পাওয়া যায় মত্ত দাদুরি আর ঝিল্লির কলরবে। কবিরা এ শব্দ-ধ্বনিকে তাঁদের কাব্যে উপেক্ষিতা করে রাখেননি। এ ধ্বনির গ্রহীতা শুধু শ্রবণ ইন্দ্রিয় নয়, মনের গভীরে তার বিস্তৃতি। এখানে মন কেবল গ্রাহক নয়, স্রষ্টাও।

একজন কবির লেখা প্রবন্ধ, কিন্তু কবিত্বের ভারে ন্যুব্জ নয় এ গদ্য। গভীর নন্দনতত্ত্ব, সৃজন ভাবনার গূঢ় বিষয় এতো অন্তরঙ্গভাবে আলোচিত এ প্রবন্ধটিকে দার্শনিকতার তত্ত্ব-কথার বাহন করে না রেখে কবি একটি সৃজনশীল সুখপাঠ্য রচনা হিসেবেই উপস্থাপন করেছেন।

টীকা :

জয়দেব : দ্বাদশ শতকের সংস্কৃত কবি। তিনি ছিলেন লক্ষণ সেনের (১১৯৯-১২০৫) রাজসভার পঞ্চরত্নের অন্যতম রত্ন। অন্যরা হলেন গোবর্ধণ আচার্য, শারণ, উমাপতি ধর, ধয়ী। তাঁর পিতার নাম ভোজদেব, মাতা বামাদেবী আর স্ত্রী পদ্মাবতী। জয়দেবের বিখ্যাত রচনা ‘গীতগোবিন্দম’, রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলা বিষয়ক একটি কাব্য।

কালিদাস : খ্রিস্টীয় ৪র্থ শতাব্দীতে উজ্জয়িনীর মহারাজ বিক্রমাদিত্যের রাজসভায় নবরত্নের অন্যতম এ কবি ‘অভিজ্ঞান শকুন্তলম’, ‘মালবিকাগ্নিমিত্রম’, ‘বিক্রমোর্বশী’ প্রভৃতি নাটক, এবং ‘রঘুবংশ’, ‘কুমারসম্ভব কাব্য’, আর 'মেঘদূত', 'ঋতুসংহার' প্রভৃতি গীতিকাব্যের রচয়িতা। তাঁর সময়কাল নিয়ে অবশ্য মতপার্থক্যও আছে। এক সূত্রে (‘মালবিকাগ্নিমত্রম’-এর সূত্রে, ১ম খ্রিঃ পূঃ শুঙ্গ বংশীয় রাজা অগ্নিমিত্রের অনুষঙ্গে) তাঁকে খ্রিঃ পূঃ ১ম শতকের কবি বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। কবি কালিদাসের জীবন নিয়ে অনেক কাহিনী প্রচলিত, এর মধ্যে দেবী সরস্বতীর আশীর্বাদে তাঁর বিদ্যালাভের কাহিনীটি সারা ভারতেই প্রচলিত।

বিদ্যাপতি (১৩৭৪ - ১৪৬১) : মিথিলার এ বৈষ্ণব কবি ব্রজবুলিতে রচিত রাধাকৃষ্ণ লীলা পদের জন্য বাংলা সাহিত্য অমর। বৈষ্ণবচূড়ামণি শ্রীচৈতন্যদেব প্রবর্তিত গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্মের অনুপ্রেরণায় রয়েছে বিদ্যাপতির পদাবলী। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ আশৈশব বিদ্যাপতির পদে নিমগ্ন ছিলেন এবং ওই পদের ভাষা ও ছন্দে রচনা করেন ‘ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলি’ (১৮৮৪)। ‘কেকাধ্বনি’ নিবন্ধে বিদ্যাপতির ‘এ ভরা বাদর, মাহ ভাদর শূন্য মন্দির মোর’ পদেরই কয়েকটি পঙক্তি উদ্ধৃত হয়েছে।

ললিতলবঙ্গলতা : কবি জয়দেবের ‘গীতগোবিন্দম’-এর খণ্ডিত এ শ্লোকটি ‘কেকাধ্বনি’তে উদ্ধৃত হয়েছে কালিদাসের ‘কুমারসম্ভব’ কাব্যের সঙ্গে একটি তুলনা প্রসঙ্গে। কবিগুরু এখানে জয়দেবের কাব্যের চটুল, আলুলায়িত ছন্দের সঙ্গে গম্ভীর কালিদাসী পদের তুলনা করেছেন। অবশ্য জয়দেবের কবিতার প্রতি কবিগুরুর গভীর অনুরাগ এবং মুগ্ধবোধ কখনওই কম ছিল না।

দাদুরি : বাংলা প্রাণীবাচক ব্যাঙের সংস্কৃত নাম। বিদ্যাপতির কাব্যে প্রবল বর্ষায় ‘ময় দাদুরি ডাকে ডাহুকী’ একটি বিশেষ অবহের সৃষ্টি করেছে। তাছাড়াও রবীন্দ্র সমসাময়িক কাদি অতুলপ্রসাদ সেনের একটি গানে আছে, ‘ডাকিছে দাদুরি মিলন তিয়াসে ঝিল্লি ডাকিছে উল্লাসে (বঁধুয়া, নিদ নাহি আঁখিপাতে)। এখানে বর্ষার বিরহ-আবহ তৈরি করতে ওই অনাদৃত শব্দসমূহের প্রয়োগ। প্রসঙ্গত, একটি বাংলা ছড়ায় এ ব্যাঙের উল্লেখ রয়েছে- ‘তাঁতির বাড়ি ব্যাঙের বাদা কোলাব্যাঙের ছা, খায় দায় গান গায় তাইরে নারে না’।

অনুশীলন - (ক)
(১)
‘কেকাধ্বনি’ প্রবন্ধের মূল বিষয়টা কী?
(২)
এ পাঠে যে সমস্ত শব্দ বা ধ্বনির উল্লেখ করা হয়েছে এর একটা তালিকা তৈরি করুন।
(৩)
বর্ষার আবহ তৈরি করতে ময়ূরের রব ছাড়াও আর কীসের রবের ভূমিকা রয়েছে?
(৪)
দাদুরি শব্দের অর্থ কী? কোন্ কবিতায় এ শব্দটির প্রয়োগ আছে? প্রাণীর ডাক নিয়ে (এ পাঠ্যবই ছাড়া) আর কোনও ছড়া বা কবিতা মনে পড়ছে কী?
(৫)
কালিদাস আর জয়দেবের কবিতার বৈশিষ্ট্য কী?
(৬)
উত্তর লিখুন : -
 
(ক)
কোন্ কোন্ ব্রাত্য শব্দকে কবিরা কাব্য উপেক্ষা করেননি? ওই শব্দগুলোকে তাঁরা কীসের অঙ্গ বলে সম্মান দিয়েছেন?
 
(খ)
ব্যাঙের ডাক কীসের সঙ্গে চমৎকার ভাবে খাপ খায়?
 
(গ)
যদিও শুনতে সুমিষ্ট নয় তবু সময় বিশেষে কেকারব কীভাবে, কখন, কেন সুমিষ্ট শোনায়?
 
(ঘ)
মার্জিত রুচি এবং শিক্ষিতের মনের দরবারে কে প্রবেশ করতে পারে না?
 
(ঙ)
‘কেকাধ্বনি’ প্রবন্ধে কালিদাস আর বিদ্যাপতি কোন্ প্রসঙ্গে এসেছেন?


৩.১   লেখক পরিচিতি

এস ওয়াজেদ আলী, বি. এ. (কেল্টাব), বার-এট-ল (১৮৯০ - ১৯৫০): মাতুলালয়ে ধর্মীয় আবহে লালিত ওয়াজেদ আলীর পিতা নবাবপুরে একটি জায়গীরের অধিকারী ছিলেন। গ্রামের পাঠশালায় তাঁর শিক্ষা শুরু হয়। আট বৎসর বয়সে তিনি পিতা বিলায়েৎ আলীর তত্ত্বাবধানে শিলঙে ইংলিশ স্কুলে ভর্তি হন। ওখানে এনট্রেন্স পরীক্ষায় স্বর্ণপদক লাভ করেন, অতঃপর আলীগড় মেয়ো কলেজ থেকে আই. এ. পাশ করে এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি. এ. পাশ করেন। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি লন্ডন যান এবং ওখান থেকে বার অ্যাট ল ডিগ্রি প্রাপ্ত হন। ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দ দেশে ফিরে এসে কলকাতা হাইকোর্টে আইন ব্যবসা শুরু করেন। ১৯২২ সালে বিদেশিনী পত্নীর (২য়া) প্রয়াণ এবং পারিবারিক ব্যবসায়ে ক্ষতি, অমিতব্যয়িতায় প্রচন্ড আর্থিক সংকট ঘনীভূত হয় তাঁর জীবনে, সে সঙ্গে শারীরিক সমস্যায়ও ওয়াজেদ আলী বিব্রত হন। তিনি তখন সাহিত্যে মনোনিবেশ করেন, এবং বন্ধু প্রমথ চৌধুরীর পরামর্শে বাংলায় লিখতে শুরু করেন। ১৯৩২ সালে তিনি শুরু করেন একটি পত্রিকা ‘গুলিস্তান’, এবং তৎকালীন বাংলা সাহিত্যের প্রায় সব বিশিষ্ট লেখকেরাই এতে সহযোগী হন। সমসাময়িক বাংলার সমাজ ও সংস্কৃতি তাঁর পত্রিকায় আলোচিত হয়। পত্রিকার প্রচ্ছদে হিন্দু-মুসলিমের মিলনের বার্তা’ই যে এর মূল সুর, তা দুস্পষ্টভাবে ঘোষিত হয়। কাজি নজরুল ইসলাম, ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, কাজি আব্দুল ওদুদ, কেদারনাথ চট্টোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রমথনাথ বিশী প্রমুখ বিশিষ্টজনেরা এতে লেখালেখি করেন। ওয়াজেদ আলী ছিলেন গভীর রসবোধ সম্পন্ন, রুচিশীল, এবং বহুবিষয়ে ওয়াকিবহাল এক নাগরিক (urban) গদ্যকার, যিনি কলকাতার রাস্তায় পায়ে হেঁটে বিচরণ করতেন, যা তাঁর কাছে এক পরম সুখকর কর্ম ছিল। শেষদিকে পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয়ে তিনি গৃহবন্দি হয়ে যান এবং ১৯৫১ সালে প্রয়াত হন। জীবনের শিল্প (১৯৪১), প্রাচ্য ও প্রতীচ্য (১৯৪৩), ভবিষ্যেতের বাঙালি (১৯৪৩) তাঁর অন্যতম প্রবন্ধ সংকলন।

মুক্তির পথ’ প্রবন্ধটি দ্বিজেন্দ্রলাল রায় সম্পাদিত ভারতবর্ষ পত্রিকার ১৩৪৮ বঙ্গাব্দের আষাঢ় মাসে প্রকাশিত সংখ্যা থেকে সংগৃহীত।

৩.২   মূলপাঠ 
মুক্তির পথ
এস ওয়াজেদ আলী
মুক্তির পথ
এস ওয়াজেদ আলী

বারকার সেন্সাস নিয়ে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে যথেষ্ট মন কষাকষি দেখা দিয়েছে। হিন্দু মুসলমানের উপর অন্যায় সংখ্যাবৃদ্ধির অভিযোগ আনছেন, আর মুসলমান হিন্দুর উপর অন্যায় সংখ্যাবৃদ্ধির অভিযোগ আনছেন, আর উভয় সমাজের নেতৃস্থানীয়েরা এমন সব কথা বলছেন, যা শুনে প্রত্যেক ভদ্রলোকেরই মাথা হেঁট হয়। মনে স্বতঃই প্রশ্ন ওঠে, আমরা কি সত্যই আত্মনিয়ন্ত্রণশীল হবার যোগ্য?

বারকার সেন্সাস নিয়ে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে যথেষ্ট মন কষাকষি দেখা দিয়েছে। হিন্দু মুসলমানের উপর অন্যায় সংখ্যাবৃদ্ধির অভিযোগ আনছেন, আর মুসলমান হিন্দুর উপর অন্যায় সংখ্যাবৃদ্ধির অভিযোগ আনছেন, আর উভয় সমাজের নেতৃস্থানীয়েরা এমন সব কথা বলছেন, যা শুনে প্রত্যেক ভদ্রলোকেরই মাথা হেঁট হয়। মনে স্বতঃই প্রশ্ন ওঠে, আমরা কি সত্যই আত্মনিয়ন্ত্রণশীল হবার যোগ্য?

সংবাদপত্রাদিতে যে সব লেখা বের হচ্ছে, তা পড়ে মনে হয়, হিন্দু চান মুসলমানের সংখ্যা কমুক, আর মুসলমান চান হিন্দুর সংখ্যা কমুক। এ মনোবৃত্তি জাতীয়তার আদর্শকে এগিয়ে নিয়ে যাবে না, তাতে সন্দেহ নাই। লজ্জা এবং পরিতাপের বিষয় এই যে, তথাকথিত নেতৃস্থানীয়েরা জনসাধারণকে উচ্চতর আদর্শের সন্ধান দেওয়া তো দূরের কথা, তাঁরা এমন সব মন্তব্য প্রকাশ করছেন, যার ফলে হিন্দু জনসাধারণেরা মুসলমানদের মরণ কামনা করছে, আর মুসলমান জনসাধারণ হিন্দুদের মরণ কামনা করছে। বিষের ধারা তো চারিদিক থেকে আমাদের জীবনে এসে পড়ছে। এই সেন্সাস-সমস্যা তাতে নূতন এক উৎকট বিষের আমদানি করেছে। যাঁরা হিন্দু-মুসলমানের মিলন চান এবং উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্প্রীতির ভাব প্রতিষ্ঠিত দেখতে চান, তাঁদের জন্য এই সেন্সাস-বিভ্রাট নূতন এক সমস্যার আমদানি করেছে। তাঁদের তরফ থেকে কি এই সমস্যার উপর নূতন আলোকপাত করা যায় না?

সংবাদপত্রাদিতে যে সব লেখা বের হচ্ছে, তা পড়ে মনে হয়, হিন্দু চান মুসলমানের সংখ্যা কমুক, আর মুসলমান চান হিন্দুর সংখ্যা কমুক। এ মনোবৃত্তি জাতীয়তার আদর্শকে এগিয়ে নিয়ে যাবে না, তাতে সন্দেহ নাই। লজ্জা এবং পরিতাপের বিষয় এই যে, তথাকথিত নেতৃস্থানীয়েরা জনসাধারণকে উচ্চতর আদর্শের সন্ধান দেওয়া তো দূরের কথা, তাঁরা এমন সব মন্তব্য প্রকাশ করছেন, যার ফলে হিন্দু জনসাধারণেরা মুসলমানদের মরণ কামনা করছে, আর মুসলমান জনসাধারণ হিন্দুদের মরণ কামনা করছে। বিষের ধারা তো চারিদিক থেকে আমাদের জীবনে এসে পড়ছে। এই সেন্সাস-সমস্যা তাতে নূতন এক উৎকট বিষের আমদানি করেছে। যাঁরা হিন্দু-মুসলমানের মিলন চান এবং উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্প্রীতির ভাব প্রতিষ্ঠিত দেখতে চান, তাঁদের জন্য এই সেন্সাস-বিভ্রাট নূতন এক সমস্যার আমদানি করেছে। তাঁদের তরফ থেকে কি এই সমস্যার উপর নূতন আলোকপাত করা যায় না?

আমাদের অবিকৃত মন বলে, যে-হিন্দু চায় যে মুসলমানের সংখ্যা কমুক, সে - হিন্দু কৃপার পাত্র; আর যে-মুসলমান চায় যে হিন্দুর সংখ্যা কমুক, সে - মুসলমানও কৃপায় পাত্র। অথচ এই শ্রেণীর লোকেরই এখন প্রাধান্য।

কোন কারণে যদি হিন্দুর সংখ্যা কমতে থাকে, তা হলে যে-মুসলমান প্রকৃতই দেশপ্রেমিক তার চিন্তান্বিত হওয়া উচিত; পক্ষান্তরে যদি কোন কারণে মুসলমানের সংখ্যা কমতে থাকে, তা হলে যে-হিন্দু প্রকৃতই দেশপ্রেমিক তারও চিন্তান্বিত হওয়া উচিত। কেন না, যে সত্যিকার দেশপ্রেমিক, সে হিন্দুমুসলমান নির্বিশেষে সকলেরই মঙ্গল চাইবে, আর যদি এই দুই সমাজের কোনটি ক্ষতিগ্রস্থ হতে থাকে, তা হলে তার প্রতিকারের বিষয় সচেষ্ট হবে। এ মনোবৃত্তি ছাড়া অন্য কোন মনোবৃত্তি নিয়ে যে দেশের বিভিন্ন সমস্যার বিষয় চিন্তা করে, তাকে আমি প্রকৃত দেশপ্রেমিক বলি না।

পরিতাপের বিষয় এই, যে-মনোবৃত্তিকে আমি এখানে কাম্য বলে উল্লেখ করলুম, সে মনোবৃত্তি আপাততঃ এ দেশে একান্তই বিরল।

এর কারণ কি? আর প্রতিকারের উপায়ই বা কি?

একটি গল্প বলি শুনুন। বিলাতে একবার কয়েকজন বন্ধু ডল টেম্পল্-এ ডিনার খাচ্ছিলুম। আমাদের দলে একজন দক্ষিণ আফ্রিকার ইংরেজ ছিলেন তাঁর নাম রাসেল। বয়স অনুমান ৩৫ বৎসর। এই পরিণত বয়সেই তিনি আইন শিখতে এসেছিলেন। কল্-নাইট্-এর ডিনার। প্রচুর সুরার সদ্ব্যবহার হচ্ছিল। কত রকম গল্প-গুজব চলছিল। ভারতীয় বন্ধুরা সেই চিরন্তন হিন্দু-মুসলিম সমস্যার আলোচনাই করছিলেন। ইংরেজেরা আলোচনা করছিলেন জার্মানীর সামরিক তোড়জোড়ের কথা, ইটালীর অভিপ্রায়ের কথা, আন্তর্জাতিক আরও অনেক কথা।

রাসেল এক চুমুকে এক গ্লাস শ্যাম্পেন শেষ করে বললেন, “শোন, শোন, আফ্রিকার একটা অদ্ভুত গল্প বলি তোমাদের। রাজনীতির আলোচনা তো রোজই কর। আমি যে গল্প বলব, সে রকম গল্প বোধ হয় তোমরা কখনও শোন নি।”

আমি গল্প শুনতে বরাবরই ভালবাসি। আগ্রহের সঙ্গে বললুম “বল, বল, তোমার গল্পটাই তা হলে বল।” রাসেল এক নিঃশ্বাসে আর এক গ্লাস শ্যাম্পেন শেষ করে বললেন শোন তবে মনোযোগ দিয়ে।"

“আমি জোহান্সবার্গের এক হোটেলে অবস্থান করছিলুম। একদিন স্ট্রাইকিং গোছের একটা লোক হোটেলের অতিথি হল। লোকটার চেহারায় যথেষ্ট বৈশিষ্ট্য ছিল। মাংস পেশীবহুল বলিষ্ঠ দেহ। অনাবশ্যক মেদ-মাংসের কোন চিহ্ন কোথাও নাই। চোখের দৃষ্টি অতি তীক্ষ্ণ, সুদৃর-প্রসারী- ঠিক ঈগল পাখীর মত। অথচ তাতে একটা করুণার ভাব মাখানো ছিল। লোকটিকে একটু অন্যমনস্ক বলে মনে হত। যেন কোন সদ্য-ঘটিত দুর্ঘটনার স্মৃতি তার মনকে হাচ্ছন্ন করে রেখেছে। লোকটিকে জানবার জন্য আমার মনে কৌতুহল হচ্ছিল।

একদিন দুপুরে দেখি লোকটি হোটেলের লাউঞ্জের এক কোণে একা সোফায় বসে আছে। গমনে টিপয়ে এক গ্লাস বিয়ার। অন্যমনস্কভাবে সে বিয়ার পান করছে, আর কোন্ সুদুরের কথা ভাবছে। আমি ওয়েটারকে এক বোতল বিয়ার আনতে বলে সোফায় বসে বললুম “আপনার আপত্তি নাই তো?” একান্ত সৌজন্যের সঙ্গে ভদ্রলোক বললেন, “বসুন, আমি বড় আনন্দিত হলুম।”

ওয়েটার বিয়ার নিয়ে এল। বন্ধুর-তাঁর নাম জানতে পারলুম-হক্। বিয়ার প্রায় শেষ হয় এসেছিল। অমুমতি নিয়ে তাঁর জন্য এক বোতল বিয়ারের অর্ডার দিয়ে আলাপ আরম্ভ করলুম।

কত কথা যে হয়েছিল সে সব বলতে গেলে সমস্ত রাত কেটে যাবে। তার দরকারও নাই। তবে কেন যে তাঁর চোখে মুখে অমন অন্যমনস্কতার ভাব ছিল, তাই নিয়ে তিনি যে গল্প বললেন তাই এখন তোমাদের শুনাই।

রাসেল বললেন,

“কিছুদিন পূর্ব্বে স্মীড (Schmid) নামক এক ডাচ বন্ধুতে আর আমাতে মিলে উগান্ডার জঙ্গলে গিয়েছিলুম, কতকটা দেশভ্রমণের উদ্দেশ্যে, আর কতকটা ভাগ্যপরীক্ষার জন্য। সারা দিন ঘুরে ঘুরে একবার ভয়ানক ক্লান্ত হয়ে পড়লুম। গভীর জঙ্গল। জনমানবের চিহ্ন কোথাও নেই। গভীর জঙ্গল। আগুন জ্বালিয়ে একটা গাছের তলায় আমরা আস্তানা বাঁধলুম রাতটি কাটাবার জন্য। রাইফেল দুটি পাশে রেখে আমরা একটু আরাম নেবার চেষ্টা করলুম। বলাবাহুল্য অল্প সময়ের মধ্যেই আমরা গভীর নিদ্রায় অভিভূত হলুম।

আমাদের ঘুম ভাঙ্গল রাত দুপুরে - বর্ব্বর সমর-বাদ্যের কর্ণবিদারক কলরোলে। ভয়ঙ্করমূর্তি কাফ্রি নরনারীর দল আমাদের আমাদের ঘিরে হট্টগোল করছিল। দেখলুম আমাদের রাইফেল দুটি এবং আসবাব-পত্র ইতিমধ্যে তারা হস্তগত করেছে। তারা যে আমাদের কি বলছিল, কিছুই বুঝতে পারলুম না। আমাদের কথাও তারা বুঝলে না। বর্শা উদ্যত করে শেষে আমাদের দিকে তারা অগ্রসর হল। তাদের বাধা দেবার কোন উপায় আমাদের ছিল না। আপাতত আত্মসমর্পণই যুক্তিসঙ্গত বলে আমরা স্থির করলুম। যতক্ষণ প্রাণ আছে, ততক্ষণ আশাও আছে।

কাফ্রিরা আমাদের খোলা একটা মাঠে নিয়ে গেল। মাঠের মাঝখানটা বৃত্তাকারের কাঠের বেড়া দিয়া ঘেরা। প্রবেশের দ্বারটি অদ্ভুত রকমের একটা তালা দিয়ে তারা বন্ধ করে দিলে, আর আমাদের প্রহরী নিযুক্ত করলে এক কাফ্রি তরুণীকে। সে প্রত্যহ দুবেলা আমাদের আহার দিয়ে যেত - শুটকি মাছের তরকারী আর রুটি, অথবা সিদ্ধ মাংস। আমাদের পানের জন্য সে এক রকম দেশী মদ দিয়ে যেত, তাতে গুড়ের মত এক রকম মিষ্ট জিনিস মেশান থাকতো। খেতে বেশ সুস্বাদ, তবে একটু বেশী খেলেই ভয়ানক ঘুম আসতো, আর সমস্ত দেহটা যেন অসাড় হ’য়ে যেত।

বন্ধু স্মীড তৃপ্তির সঙ্গে আকণ্ঠ সেই দেশী মদ পান করতেন, আর সারা দিন তন্দ্রাময় থাকতেন। তাঁর ব্যবহার মোটেই আমার ভাল লাগতো না। আমরা কাফ্রিদের হাতে বন্দী। কি করে মুক্তি পেতে পারি দিনরাত তাই নিয়ে চিন্তা করা দরকার, এ কি মদ খেয়ে ঘুমোবার সময়? তা ছাড়া নেশার প্রভাবে ঘুমিয়ে যাওয়া কখনও আমি পছন্দ করিনি। ঘুম আসবে, তেমন ভাবে নেশা করব কেন? জেগে থাকাই তো জীবন। আমি পান করি চেতনাকে বেশী করে পাবার জন্যে, চেতনাকে বিলুপ্ত করবার জন্যে নয়। তার পর, অসভ্যদের মধ্যে আত্মসম্মান হারিয়ে মদ খেয়ে বেসামাল হওয়া, সেটাও আমার কাছে নিতান্ত হেয় কাজ বলেই মনে হত। স্মীডকে বোঝাবার অনেক চেষ্টা করেছিলুম, কিন্তু কোন ফল হয় নি। তাঁর মুখে সেই একই বুলি- ‘ঈট, ড্রিঙ্ক, এন্ড বি মেরি, ফর টুমরো উই ডাই।’ আমি এক চুমুকের বেশী মদ কখনও খেতুম না, আর সেটুকুও বাধ্য হয়েই খেতুম। কেননা, সে দেশের আনফিল্টার্ড জলের উপর আমার বিশ্বাস ছিল না। স্মীডের শরীর দেখে অবাক হয়ে যেতুম। তিনি অসম্ভব রকম মোটা হয়ে যাচ্ছিলেন। বন্দী অবস্থায় তাঁর এই ফ্যাটী ডিজেনারেসি দেখে সত্যই আমি দুঃখিত হতুম।

কাফ্রিরা রোজ এসে আমাদের দেখে যেত। গায়ে পিঠে হাত দিয়া আমরা আশানুরূপ মোটা হয়েছি কি-না তারা তা পরীক্ষা করতো। স্মীডকে পরীক্ষা করে যে তারা অনাবিল আনন্দ পেত, সে তাদের মুখ দেখলেই বোঝা যেত। তাদের রসনা থেকে সত্যই জল পড়তো। আমার দেহ পরীক্ষা করে কিন্তু তাদের ভ্রুকুঞ্চিত হত। আমি ক্রমেই রোগা হয়ে যাচ্ছিলুম। সেটা তাদের মোটেই ভাল লাগতো না।

ইঙ্গিতে ইসারায় আমাদের রক্ষিণীকে প্রশ্ন করে বুঝলুম, তারা আমাদের বড় এক জাতীয় পরবের জন্য দেবতার বলি রূপে প্রস্তুত করছে। আমরা যথাসম্ভব মোটা হই এই তাদের ইচ্ছা। হৃষ্টপুষ্ট বলির সামগ্রীই দেবতার বেশী প্রিয়। আমাদের মদের সঙ্গে এমন এক জিনিস মিশিয়ে দেওয়া হয়, যাতে করে দেহ অসম্ভব রকম পুষ্টি লাভ করে। আমরা যাতে মোটা হই সেই জন্য এই মদ অপর্যাপ্ত পরিমাণে আমাদের দেওয়া হচ্ছে। স্মীডের দেহ যে ভাবে ভরে উঠেছে তা দেখে তারা সত্যই সন্তুষ্ট। তবে আমি যে শুকিয়ে যাচ্ছি এতে তারা সত্যই দুঃখিত। আমি যাতে যথেষ্ট পরিমাণে পানাহার করি সে বিষয় বিশেষ লক্ষ রাখতে রক্ষিণীকে তারা তারা নির্দেশ দিয়েছে। রক্ষিণী বললে – এতে বিচিত্র কিছুই নাই। রোগা জন্তর মাংস কে খেতে চায় বল?

আমি স্মীডকে আমাদের অবস্থার কথা বললুম, আর পানাহারের বিষয় সংযম অবলম্বন করতে উপদেশ দিলুম। অপরিমিত মাদক দ্রব্যের ব্যবহারে তাঁর মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটেছিল। তিনি আমার কথার গুরুত্ব বুঝতে পারলেন না। হাসতে তাঁর সেই পুরান গৎ আওড়াতে লাগলেন –‘জট, ড্রিঙ্ক, এন্ড বি মেরি, ফর্ টুমরো উই ডাই।’

দেখলুম, স্মীডকে উপদেশ দিয়া লাভ নাই। নিজের বিষয়ই ভাবা দরকার। পানাহার তো আমি কম করতুমই, এখন আরও কমিয়ে দিলুম। আর দিন রাত কেবল মুক্তির কথাই চিন্তা করতে লাগলুম। মুক্ত জীবনের স্বপ্ন দেখতে লাগলুম, মুক্তির উপায়ের কথা ভাবতে লাগলুম, আর মুক্তির জন্য প্রার্থনা করতে লাগলুম।

আমাদের তরুণ রক্ষিণী আমার আচার ব্যবহার দেখে আমার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল। মধ্যে মধ্যে সে আমার সঙ্গে কথা এবং ইঙ্গিতের সাহায্যে আলাপ করতো, আর আমার বর্তমান দুরবস্থার জন্য দুঃখ প্রকাশ করতো।

একদিন সে বললে, ‘তোমার উপর আমার দরদ জন্মেছে, তোমাকে এই বিপদ থেকে মুক্তি না দিলে আমি শাস্তি পারব না।’

আমি মুক্তিই খুঁজছিলুম, মুক্তির চিন্তাতেই মশগুল ছিলুম। মুক্তির একটা উপায় হয়েছে দেখে আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে উঠলুম। স্মীভকে জাগিয়ে বললুম ‘রক্ষিণী আমাদের সাহায্য করবে, চল এখান থেকে পালান যাক।’

স্মীড তখন অসম্ভব রকম মোটা হয়ে গিয়েছিলেন। সর্ব্বক্ষণ তিনি তন্দ্রার আবেশে মগ্ন থাকতেন। দুর্গম বন জঙ্গল অতিক্রম করে পালাবার শক্তি তাঁর ছিল না। আমার প্রস্তাব শুনে জড়িতকণ্ঠে বললেন, 'দরকার নেই বাবা। বনে জঙ্গলে বাঘ ভাল্লুকের খোরাক হওয়ার চেয়ে এখানে মানুষের খোরাক হওয়াই ভাল।' দেখলুম স্মীডের মুক্তির সম্ভাবনা নাই।

সুযোগ বুঝে রক্ষিণীর সাহায্যে একাই রাত্রিযোগে বেরিয়ে পড়লুম। আসবার সময় সেই করুণহৃদয় রক্ষিণীকে আমার অন্তরের ধন্যবাদ জানিয়ে এলুম, তার জন্য বেশী কিছু করবার ক্ষমতা আমার ছিল না। স্মীডকে ভাল করে বিদায় অভিবাদন করতেও পারলুম না। তিনি তখন মদের নেশায় বিভোর।

দশ দিন দশ রাত ক্রমাগত বন জঙ্গল পার হয়ে, কপালের জোরে অসংখ্য বিপদ অতিক্রম করে আমি শেষে বৃটিশ দক্ষিণ-আফ্রিকার এলাকায় এসে পৌঁছুলুম। বড় একটা দোকানে গিয়ে ম্যানেজারকে আমার এই অপূর্ব্ব য়্যাভেঞ্চারের কথা বললুম। তিনি ছিলেন হৃদয়বান লোক। আমার দুঃখে সহানুভূতি প্রকাশ করলেন। আর প্রয়োজনীয় কাপড়-চোপড় এবং কিছু নগদ টাকা আমায় তিনি দিলেন। তাঁর কাছ থেকে বিদেয় নিয়ে আমি এই জোহান্সবার্গে এসেছি, এখান থেকে আমার ফার্ম দুদিনের পথ।”

রাসেল গল্প শেষ করে বললে, ‘কেমন গল্প’?

আমরা সকলেই মুক্তকণ্ঠে বললুম, এমন গল্প আমরা কখনও শুনিনি।

সে অনেক দিনের কথা, কিন্তু রাসেলের গল্প এখনও ভুলতে পারিনি। বর্তমান সেন্সান। বিভ্রাটের কথা ভাবতে ভাবতে গল্পটি হঠাৎ আমার মনে এল। আমার মনে হল, এই গল্পের মধ্যেই যেন আমাদের মুক্তির ইঙ্গিত আছে।

পাঠক বলবেন, গল্প তো হল। কিন্তু এর সঙ্গে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ সমস্যার সম্পর্ক কি? শুনুন তবে।

আমাদের দেশের এই বর্তমান সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষটাকে যদি গল্পের কাফ্রি উপজাতি রূপে ধরে নেওয়া হয়, আর কাফ্রিদের বিদ্বেষের লভ্যাংশ রূপে ধরে নেওয়া হয়, তাহ'লে সাম্প্রাদায়িক বিদ্বেষ নামক রাক্ষসের হাত থেকে বাঁচবার একটা উপায় এই গল্প থেকে পাওয়া যেতে পারে।

হক্ এবং স্মীড উভয়কেই কাফ্রিরা তাদের মদ খেতে দিয়েছিল। হক্ ছিল বুদ্ধিমান, সংযমী লোক। সে সেই মদ যথাসম্ভব বর্জন করেছিল। পক্ষান্তরে স্মীডের বুদ্ধি ছিল মোটা। কাফ্রিদের দেওয়া মদ সে অপয্যাপ্ত পরিমাণেই ভক্ষণ করেছিল। হক্ এবং স্মীড উভয়েই ছিল বন্দী। হক্ কিন্তু দিনরাত মুক্তির চিন্তায় মগ্ন থাকতো, মুক্তির স্বপ্ন দেখতো, আর মুক্তির উপায় উদ্ভাবন করতো, তাই শেষে সে তার বাঞ্ছিত মুক্তি লাভ করে ধন্য হল।

স্মীড মুক্তির কথা ভাববার অবসর পেত না। দিনরাত সে কাফ্রিদের দেওয়া মদের নেশায় বিভোর থাকতো। মুক্তির উপায় যখন উপস্থিত হ'ল, তখন সে মুক্তির স্পৃহাই হারিয়ে ফেলেছিল। সুতরাং মুক্তিলাভ তার ভাগ্যে আর ঘটল না।

কাফ্রি রক্ষিণীকে আমাদের কৌশলী বুদ্ধি ধরে নিল। যে সজাগ থাকে, যার কোন একটা উদ্দেশ্য কিম্বা কাম্য আছে, কৌশলী বুদ্ধি তাকেই পথ দেখায়; আর সেই বুদ্ধির নির্দেশের সদ্ব্যবহার করতে পারে। হক্কে বুদ্ধি পথ দেখিয়েছিল, আর সেও বুদ্ধির প্রদর্শিত পথ অবলম্বন করতেও পেরেছিল। স্মীডকে বুদ্ধি পথ দেখায় নি। বন্ধু হিসাবে হক্ যদিও তাকে মুক্তির পথে নিয়ে যেতে চেয়েছিল, আলস্য এবং নিবুদ্ধিতার দরুণ স্মীভ কিন্তু বন্ধুর সাহায্য গ্রহণ করতেই পারলে না।

আমাদের মধ্যে যে হকে্‍র মত সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ নামক রাক্ষসের দেওয়া লাভের মোহ যথাসম্ভব বর্জন করবে, আর এই রাক্ষসের হাত থেকে মুক্তি পাবার চিন্তায় সদা বিভোর থাকবে, তাকে কাফ্রি রক্ষিণীরূপী সুবুদ্ধি এসে মুক্তির পথ শেষে বাতলে দেবে, আর মুক্তির অদম্য স্পৃহা সে পথ অবলম্বন করতে তাকে বাধ্য করবে। পক্ষান্তরে, যে স্মীডের মত সাম্প্রদায়িক-বিদ্বেষ রাক্ষসের প্রদত্ত লাভের মদ অপর্যাপ্ত পরিমাণে ভক্ষণ করবে, তার মন থেকে মুক্তির স্পৃহা চলে যাবে, মুক্তি লাভের জন্য যে সাধনার দরকার, সে সাধনার ক্ষমতা তার লোপ পাবে, আর বন্ধুরা মুক্তির উপায় বলে দিলেও সে উপায় সে অবলম্বন করতে পারবে না। সাম্প্রদায়িক-বিদ্বেষ রূপ রাক্ষসই শেষে তাকে ভক্ষণ করবে।

(প্রাচীন বানান অপরিবর্তিত)
৩.৩   পাঠসূত্র

‘ভারতবর্ষ’ শীষক একটি নিবন্ধ লিখে এস, ওয়াজেদ আলী বাঙালি পাঠকের কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন, বিশেষ করে সেই উক্তিটির জন্য- ‘সেই ট্র্যাডিশন সামনে চলছে....।’ কলকাতার এক মুদির দোকানে বৃদ্ধ মালিকের সুর করে রামায়ণ পাঠ এবং এক প্রৌঢ় এবং কয়েকটি শিশুর শ্রবণের দৃশ্যটি কুড়ি বছরের পর পুনরাবৃত্তি দেখে লেখক সনাতন ভারতীয় জীবনধারার এক অপরিবর্তনীয় চিরন্তন রূপ আবিষ্কার করে যে প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন অদ্যাবধি তা পাঠকের স্মৃতিতে সচল।

‘মুক্তির পথ’ নিবন্ধটিতে বাঙালি তথা ভারতবাসীর মধ্যে সাম্প্রদায়িক ভেদভাবনার একটি চোরাস্রোতের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। এ চিন্তাভাবনা একটা জাতিকে ভেতরে ভেতরে দুর্বল, নিঃস্ব করে দিচ্ছে তা লেখক সেই ১৯৪১ সালের জনগণনার সময়ই উপলব্ধি করেছিলেন। সাম্প্রদায়িকতা এমনই এক মারণব্যাধি যা মানুষকে একদিকে করে অপরিণামদর্শী, অপরদিকে করে নিশ্চেতন। জনগণনাকে কেন্দ্র করে হিন্দু-মুসলিমদের মধ্যে যে একটা অস্বাস্থ্যকর চর্চা শুরু হয়, এর অমানবিক দিকটির প্রতি লেখক অঙ্গুলি নির্দেশ করে এ চিন্তার উৎসের প্রতিও দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। ঔপনিবেশিক আমলের এ সেন্সাস বিষয়টি গাণিতিক তথ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে এতে সংযুক্ত হয়েছিল ভিন্নতর ভাবনা। জনসংখ্যার দিকে কোন্ ধর্মীয় জনগোষ্ঠী কার থেকে পিছিয়ে, কা'দের জনসংখ্যা অন্যায়ভাবে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হচ্ছে- এসব অনুশীলন যে কতটা অমানবিক, সভ্য সমাজের কাছে নিতান্তই লজ্জার এটা মানুষ বুঝতেই পারছে না। অনুশীলনটি এমন অমানবিক স্তরে পৌঁছেছে যে মানুষের হিসাবনিকেশ দেখে মনে হয় হিন্দুরা মুসলমানের মৃত্যু কামনা করছেন, মুসলমান করছেন হিন্দুর। মানুষের মনের ভেতর সুপ্ত পাশবিক বৃত্তিই যেন এই সেন্সাস উপলক্ষে বেরিয়ে আসে।

নিবন্ধটিতে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রসঙ্গ এনে লেখক গল্পের মধ্যে বুঝিয়ে দিলেন সাম্প্রদায়িকতা এক ধরনের নেশাজাত পাণীয় যা পান করে মানুষ অপরিণামদর্শী হয়ে যায়। কফ্রিদের হাতে বন্দি শ্বেতকায় স্মীড ওই নেশাদ্রব্য পান করে এক বিভ্রান্তির মধ্যে আকণ্ঠ নিমজ্জিত। এ থেকে বেরিয়ে না এলে নরখাদকের হাতে মৃত্যু অবধারিত। গল্পের আড়ালে লেখক ভারতবাসীর ওই মাতাল অবস্থার কথাই বলছেন। ওই সাম্প্রদায়িকতায় ডুবে থাকা দেশবাসী ভালোমন্দ বোঝার ক্ষমতা হারিয়ে বসে আছে।

স্বাধীনতা প্রাপ্তির আটটি দশক অতিক্রান্ত হতে চলল, আজও দেশবাসীর এ ঘোর কাটেনি। দশকে দশকে জনগণনা এলে মানুষ আজও মানুষ পরস্পর পরস্পরের মৃত্যু কামনা করে। সেই ট্র্যাডিশন আজও চলছে, এখানেই নিবন্ধটির গুরুত্ব।

৩.৪   নিবিড় পাঠ

এস ওয়াজেদ আলী যে-সময়ে বাংলা লেখা শুরু করেন তখনও গদ্যে, বিশেষ করে প্রবন্ধ সাহিত্যে সাধুভাষাকে হাঠিয়ে চলতিভাষার আধিপত্য প্রতিষ্ঠা হয়নি। রবীন্দ্রনাথ তখন সাধু এবং চলতি উভয় রীতিতেই গদ্য লিখে চলেছেন। গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক এবং সাহিত্যবিষয়ক প্রবন্ধে তখনও সাধুভাষার দাপট, যদিও ‘সবুজপত্র’ সম্পাদক প্রমথ চৌধুরী চলতি গদ্যরীতির সম্ভাবনার দিক উন্মোচিত করে দিয়েছেন। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন প্রমথ চৌধুরীর সঙ্গে ওয়াজেদ আলীর বিশেষ সখ্য ছিল, এবং তিনিও গদ্য কলকাতার চলতি ভাষাকে চমৎকারভাবে প্রয়োগ করে গেছেন।

যে সামাজিক সংকটের দিকে তিনি অঙ্গুলি নির্দেশ করেছেন এটা এ ধরনের ভাষায় খুব সহজেই পাঠকের কাছে পৌঁছোতে পারে। হিন্দুদের সংখ্যা বেড়ে যাবে তাই মুসলিমদের ভয়, মুসলিমরা সংখ্যা গরিষ্ঠ হয়ে গেলে সর্বনাশ- তাই উভয় পক্ষেরই প্রতিপক্ষের মরণকামনা করার মধ্যে সভ্যসমাজের চরম লজ্জার ব্যাপার রয়েছে এটাই লেখক বলতে চেয়েছেন। এই মানসিক বিকৃতির প্রতি সচেতনতা সৃষ্টির জন্যে তিনি একটি গল্পের অবতারণাও করেছেন যার অন্তর্নিহিত অর্থ পাঠককে ক্ষণিকের জন্য হলেও চিন্তান্বিত করে তোলে।

অনুশীলন - (খ)
১)     সংক্ষিপ্ত উত্তর লিখুন : -
  1. সেন্সাস বলতে কী বোঝায়?
  2. সেন্সাসকে কেন্দ্র করে সমাজে কী ধরনের চিন্তাচর্চা হয়, এর একটা বিবরণ দিন।
  3. হিন্দু-মুসলিমরা পরস্পরের প্রতি কী কামনা করেন সেন্সাসের সময়?
  4. লেখক ঠিক কা'দের কৃপার পাত্র বলে চিহ্নিত করেছেন?
  5. প্রকৃত দেশপ্রেমিকের কোন্ প্রেক্ষিতে চিন্তান্বিত হওয়া উচিত?
২)     উত্তর লিখুন : -
  1. নিবন্ধে বর্ণিত কাহিনীটির সার কথাটা কী?
  2. স্মীড সাহেবের জীবনদর্শনটা কী?
  3. দুইজন শ্বেত বন্দিকে নিয়ে কাফ্রিদের কী পরিকল্পনা ছিল ?
  4. কাফ্রিদের অভিসন্দিটা কে ফাঁস করে দিয়েছিল ?
  5. এখানে কীসের মুক্তির কথা বলা হয়েছে ?
৩)     উত্তর লিখুন : -
  1. বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্যে এস ওয়াজেদ আলী কীসের জন্য স্মরণীয়?
  2. ‘মুক্তির পথ’ প্রবন্ধে লেখকের যে অসাম্প্রদায়িক মনোভাবের প্রকাশ এ বিষয়ে আপনার মতামত দিন।


৩.১   লেখক পরিচিতি

সুজিৎ চৌধুরীি (১৯৩৭ - ২০০৯): শ্রীহট্ট জেলার বানিয়াচঙ গ্রামে মামার বাড়িতে রুন্ম। পিতা দেশসেবক ও সাংবাদিক বিধুভূষণ চৌধুরী, মাতা সুপ্রভা চৌধুরী। করিমগঞ্জ কলেজ থেকে স্নাতক এবং গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসে স্নাতকোত্তর, এবং ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোকলোর রিসার্চ ডিপার্টমেন্ট' থেকে ‘Hindu Folkcults of the Barak Valley’ বিষয়ক বদর্ভে Ph.D. ডিগ্রি। করিমগঞ্জ রবীন্দ্রসদন মহিলা কলেজে অধ্যাপনা, সিমলায় Indian Institute of Advanced Studies এ Resident Fellow (১৯৯৩-৯৫), আসাম বিশ্ববিদ্যালয়, শিলচর এ Netaji Subhash Chandra Centre for Research in National Movement and National Integration এ Visiting Fellow (১৯৯৮-২০০০) হিসেবে গবেষণা করেন।

তাঁর ‘প্রাচীন ভারতে মাতৃপ্রাধান্য: কিংবদন্তীর পুনর্বিচার’ গ্রন্থটি দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের নরসিংহ দাস পুরস্কার লাভ করে, নয়া দিল্লির ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট প্রকাশিত ‘অসমিয়া গল্প সংকলন’ অনুবাদের জন্য তিনি ২০০৪ সালে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে সাহিত্য অকাদেমি, নতুন দিল্লি আয়োজিত বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় শতবার্ষিকী বিশেষ বক্তৃতা প্রদান করেন ২০০৩ সালে। আজীবন ইতিহাসচর্চার জন্য বরাক উপত্যকা বঙ্গসাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলন তাঁকে রাজমোহন নাথ শতবার্ষিকী, এবং অচ্যুতবরণ তত্ত্বনিধি স্মারক সম্মান প্রদান করেন। ‘শ্রীহট্ট-কাছাড়ের প্রাচীন ইতিহাস’ (১৯৯২, ২০০৩, ২০০৬), আত্মজীবনী মূলক গ্রন্থ ‘হারানো দিন হারানো মানুষ’, (দুই খণ্ড, ২০০৫, ২০১০) ‘Folklore and History: A Study of Hindu Folkcults of the Barak Valey of Northeast India’ (২০০৭), The Bodos (২০১৩) তাঁর বিশেষ উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। তাঁর কয়েকটি উল্লেখযোগ্য গদ্যসংকলনের মধ্যে রয়েছে ‘বরাক উপত্যকা প্রসঙ্গ: সত্য ও তথ্য’ (১৯৮৯), ‘বরাক উপত্যকার সমাজ ও রাজনীতি’ (২০০৭), ‘ছিন্নচিন্তা ভিন্ন সুর’ (২০০৮), ‘সময়ের পদাবলী’ (২০০৯), ‘নির্বাচিত প্রব’ (২০১০) ইত্যাদি।

একষট্টির ভাষা আন্দোলনের অন্যতম কর্মী, বরাক উপত্যকা বঙ্গসাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলনের বিভিন্ন পদাধিকারী সুজিৎ চৌধুরী ভাষা ও সাহিত্য, ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞানের উপর অসংখ্য নিবন্ধ লিখেছেন Journal of the Folklore Society, Kolkata Journal of the Anandaram Baruah Institute of Language, Art and Culture, Guwahati Journal of the Indian Institute of Advance Study, Shimla, Journal of the Department of Bengali, University of Gauhati, The Economic an Political Weekly, The Statesmam, Point and Counter point ছাড়াও পরিচয় গবেষণা পর্ষদ পত্রিকা: (বরাক উপত্যকা বঙ্গসাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলন প্রকাশিত) প্রভৃতিেভাষা সাহিত্য বিষয়েও তাঁর অনেক গুরুত্বপূর্ণ নিবন্ধ রয়েছে। স্বাধীনতা সংগ্রামীর পুত্র আজীবন সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী সুজিৎ চৌধুরী সারাজীবন ধর্মীয় এবং ভাষিক সম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে। সংগ্রাম করে গেছেন এবং এবং এ জন্য নানা ধরনের নিগ্রহ, এমনকী শারীরিক নিগ্রহও সহ্য। করেছেন। ২০০৯ সালে ব্যাঙ্গালুরুতে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

৩.২   মূলপাঠ
বাল্য ও কৈশোর বই পড়ার স্মৃতি
সুজিৎ চৌধুরী
বাল্য ও কৈশোর বই পড়ার স্মৃতি
সুজিৎ চৌধুরী

মার গল্পের বই পড়ার নেশাটা প্রথমে দানা বাঁধে দাড়িয়াপাড়া বাসায় থাকতে। জেঠিমার গল্পের বই। ওখানে থাকতেই নেশাটার পত্তন ঘটে, সে কথাটা আগে একটু বলেছি, এখন আরেকটু বিশদ করে বলছি কারণ আমার জীবনের সব চাইতে বড় অর্জন এই বইয়ের নেশা।

মার গল্পের বই পড়ার নেশাটা প্রথমে দানা বাঁধে দাড়িয়াপাড়া বাসায় থাকতে। জেঠিমার গল্পের বই। ওখানে থাকতেই নেশাটার পত্তন ঘটে, সে কথাটা আগে একটু বলেছি, এখন আরেকটু বিশদ করে বলছি কারণ আমার জীবনের সব চাইতে বড় অর্জন এই বইয়ের নেশা।

পাইলগাঁও থেকে সদ্য এসেছি, মা কাছে নেই, একটু মনমরা থাকি। এ নিয়ে জেঠিমার দুশ্চিন্তা দেখে বাবা বললেন, ‘ও তো গল্পের বই পড়তে ভালোবাসে, গল্পের বই হাতে দিন।’ পাইলগাঁও থাকতে গল্পের বই বলতে তো পড়েছি রূপকথার গল্প, ছোটদের রামায়ণ আর মহাভারত আর নীতিকথার গল্প। তবুও ওইগুলিই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পড়তাম বলে বাবা ধরে নিয়েছিলেন যে আমি গল্পের বই ভালবাসি। জেঠিমা বলে দিলেন ছোট পিসিকে আমাকে একটা বই পড়তে দেওয়ার জন্য। পিসি হচ্ছেন জেঠিমার ননদ, জ্যাঠামশাইর খুড়তুতো বোন, নাম বীনা। তিনি ছিলেন বইয়ের আলমারির তত্ত্বাবধায়ক। ছোটপিসি খুঁজে পেতে আমার ভাল লাগতে পারে এমন একটা বই বের করে দিলেন।

পাইলগাঁও থেকে সদ্য এসেছি, মা কাছে নেই, একটু মনমরা থাকি। এ নিয়ে জেঠিমার দুশ্চিন্তা দেখে বাবা বললেন, ‘ও তো গল্পের বই পড়তে ভালোবাসে, গল্পের বই হাতে দিন।’ পাইলগাঁও থাকতে গল্পের বই বলতে তো পড়েছি রূপকথার গল্প, ছোটদের রামায়ণ আর মহাভারত আর নীতিকথার গল্প। তবুও ওইগুলিই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পড়তাম বলে বাবা ধরে নিয়েছিলেন যে আমি গল্পের বই ভালবাসি। জেঠিমা বলে দিলেন ছোট পিসিকে আমাকে একটা বই পড়তে দেওয়ার জন্য। পিসি হচ্ছেন জেঠিমার ননদ, জ্যাঠামশাইর খুড়তুতো বোন, নাম বীনা। তিনি ছিলেন বইয়ের আলমারির তত্ত্বাবধায়ক। ছোটপিসি খুঁজে পেতে আমার ভাল লাগতে পারে এমন একটা বই বের করে দিলেন।

প্রথম দিনে ওই বিশেষ বইটি বের করে দেওয়ার জন্য আমি ছোটপিসির কাছে কৃতজ্ঞ। বইটির নাম ‘গহনগিরির সন্ন্যাসী’, লেখক কালীপদ চট্টোপাধ্যায়। এটা কোনও ক্লাসিক বই নয়, লেখকও নামীদামি কেউ নন, কিন্তু এত মনোমুগ্ধকর ছোটদের বই আমি কমই পড়েছি।

বইটির প্রকাশক আশুতোষ লাইব্রেরি, যাঁরা ছিলেন ছোটদের বিখ্যাত পত্রিকা ‘শিশুসাথী’রও প্রকাশক। আশুতোষ লাইব্রেরির বইয়ের মলাটে থাকত সবুজ-হলুদ-লাল-রঙের মিশেল। ওই বইয়ের মলাটে ছিল গেরুয়াপরা একজন সন্ন্যাসী আর একজন কিশোরের ছবি, দুজনে মিলে একটা ঘড়ার ডালা খুলছেন, ঘড়ার খোলা মুখ দিয়ে দিয়ে গড়িয়ে পড়েছে হলুদ-রঙের মোহর, তার বিচ্ছুরিত দীপ্তি কিশোরটির মুখমণ্ডলকে আলোকোজ্জ্বল করে তুলছে। ষাট বছর আগের কথা, কিন্তু ছবিটা এখনও চোখের সামনে ভাসছে। কাহিনী অংশ এমনিতে সাদামাটা, ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়ে একটি ছেলে গিয়েছিল দিদির বাড়িতে, শরদাই বলে একটাই পাহাড় ছিল কাছে সেখানে বেড়াতে গিয়ে ছেলেটি জংলিদের হাতে পড়ে, সেখান থেকে তাকে উদ্ধার করেন এক মানব প্রেমিক সন্ন্যাসী। দুজনে মিলে তারা প্রাচীন এক রাজ্যের ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পায়, তারপর খুঁজে পায় গুপ্তধন, ইতিমধ্যে সন্ন্যাসী জানতে পারেন যে ছেলেটি হচ্ছে ওই রাজ্যের শাসকদেরই একমাত্র জীবিত বংশধর। তাঁরা দুজনে মিলে ওই অঞ্চলের বনের মানুষের কল্যাণে গুপ্তধনের টাকাটা খরচ করার পরিকল্পনা নেন। কাহিনী অতি সাধারণ হলেও পাহাড়ের বর্ণনা, জঙ্গলের বর্ণনা, ঘটনার সংস্থাপন, সন্ন্যাসীর ব্যক্তিত্ব সব মিলিয়ে পরিবেশনটা এত সাবলীল যে বইটা হাতে নিয়ে শেষ না করে উঠতে পারি নি। এ জাতীয় অ্যাডভেঞ্চারের বই এবারেই আমি প্রথম পড়লাম, আর পড়ে একেবারে মাত হয়ে গেলাম। আগে পড়েছি রূপকথা, সেখানে রাজপুত্র বা সওদাগরপুত্রের সঙ্গে আত্মস্থ হওয়ার ব্যাপারটা থাকত না, এখানে স্কুলের একটি ছাত্রের জায়গায় নিজেকে বসিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে কোনও অসুবিধেই ছিল না। এইভাবেই গল্পের এই পাঠকের ইচ্ছাপূরণের বা স্বপ্নবুননের উপাদান যোগায়, কল্পনার ঘোড়া তখন ছোটানো যায় ইচ্ছেমতো।

‘গহনগিরির সন্ন্যাসী’র লেখক বইয়ের ভূমিকায় জানিয়েছেন যে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেওয়ার এর মাস তিনেকের ছুটিতে তিনি এই কিশোর উপন্যাসটি লিখেছিলেন। অর্থাৎ বইটা লেখার সময়ে লেখকের বয়স ষোলো সতেরো। এত কম বয়সে অমন চমকপ্রদ উপাদান সব যথাযোগ্যভাবে ব্যবহার করে এত সুন্দর একখানি বই লিখেছিলেন যে ভদ্রলোক, পরবর্তীকালের তাঁকে কিন্তু লেখক হিসেবে আমরা আর পাইনি। বিগত শতকের পঞ্চাশের দশকে কলকাতা থেকে 'বিশ্ববার্তা' বলে একটি সাময়িকী বেরোত, তাতে একটা বড়দের উপন্যাস ধারাবহিকভাবে লিখেছিলেন এক কালীপদ চট্টোপাধ্যায়। এক দরিদ্র যুবকের জীবন সংগ্রামের কাহিনী। ইনি সেই কালীপদ চট্টোপাধ্যায় বলে আমার ধারণা। তারপর সাহিত্যজগতে এই ভদ্রলোকের আর হদিশ পাইনি। ‘গহনগিরির সন্ন্যাসী’ বইটি এরপর আরও দু'চার বছর কারো কারো হাতে দেখেছি, তারপর তা সম্পূর্ণ হারিয়ে গেছে। নিজের ছেলেকে পড়ানোর জন্য পরে কলকাতার পুরানো বইয়ের দোকানে তন্নতন্ন করে খুঁজেছি, কেউ দিতে পারেনি। আশুতোষ লাইব্রেরি বা তার সহযোগী প্রতিষ্ঠান বৃন্দাবন ধর অ্যান্ড সন্সও উঠে গেছে। মনে হচ্ছে এত সুন্দর বইটি বোধহয় ধরাধাম থেকেই চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে গেল।

এরপর ছোটপিসিকে ধরলাম ওই ধরনের আরও বই দেওয়ার জন্য। তিনি প্রথমে দিলেন সুনির্মল বসুর ‘কেউটের ছোবল’, তারপর অখিল নিয়োগীর ‘উদাসী বাবার আখড়া’, দুটো বই-ই দেব সাহিত্য কুটিরের কাঞ্চনজঙ্ঘা সিরিজের। খুব জমজমাট বই দুটোই, ‘কেউটের ছোবলে’ কল্পনার বিস্তারও রয়েছে, ‘উদাসী বাবার আখড়া’ ঘটনাবহুল। দুটো দুই স্বাদের। এরপর ছোটপিসি বললেন, “এবারে বাঁধানো ‘সন্দেশ’ পড়ো, মজার গল্প কবিতা রয়েছে, আবার বহু জানবার কথাও পাবে।” এবারে ঢুকলাম উপেন্দ্রকিশোর-সুকুমার রায়ের খাস তালুকে। পাগলা দাশুর গল্প বেরিয়েছিল পরপর কয়েক সংখ্যায়, কাজলদা বলল, ‘আগে ওগুলো পড়ে নে, খুব ভাল লাগবে।’ নাটকের অভিনয় নিয়ে গল্পটিতে দেবদূত হিসেবে দাদুর পুনঃপ্রবেশের অংশটি পড়ে আমি তো হেসেই কুটিকুটি। গ্রামের একেবারে সাধারণ মানুষেকে নিয়ে উপেন্দ্রকিশোরের গল্পগুলি আমার সবচাইতে বেশি ভাল লেগেছিল। আর ভাল লাগত ‘বনের খবর’, লীলা মজুমদারের বাবা লিখে পাঠাতেন শিলং থেকে। কবিতাগুলোর কথা বলে লাভ নেই, যেমন মজাদার কথা, তেমনি মজাদার ছবি। ‘আবোল তাবোলে’র অনেকগুলো কবিতাই পড়েছি তখন। বোধহয় পাঁচ বছরের বাঁধানো ‘সন্দেশ’ ছিল জেঠিমার কাছে।

ওই সময়টাতে আমরা নিজেদের বাড়িতে চলে আসি। ছোটপিসি বললেন, ‘তোর যখন এত বই পড়ার নেশা, তুই বই নিয়ে যাবি যখন ইচ্ছে। যতদিন নিয়মিত বই ফেরত দিবি, ততদিন নিয়মিত বই পাবি।’ বলা বাহুল্য, দাড়িয়াপাড়া বাড়িতে যাওয়ার পর প্রত্যেক দিন পড়িমড়ি করে একেকখানা বই শেষ করতাম, তারপর সেই জঙ্গলের রাস্তা ধরে সন্ধেবেলা গিয়ে নতুন বই বদলে আনতাম।

তখনকার দিনে ছোটদের গল্পের বইয়ের জগৎ মূলত দুটি প্রকাশক প্রতিষ্ঠানের দৌলতেই জমজমাট ছিল। আগুয়ান ছিল দেবসাহিত্য কুটির, একটু পেছনে আশুতোষ লাইব্রেরি বা অন্য নামে বৃন্দাবন ধর অ্যান্ড সন্স। দেব সাহিত্য কুটিরের জনপ্রিয় দুটি সিরিজ ছিল, প্রহেলিকা সিরিজ আর কাঞ্চনজঙ্ঘা সিরিজ। প্রহেলিকা সিরিজে বেরোত শুধুই ডিটেকটিভ বই, কাঞ্চনজআ সিরিজে মূলত অ্যাডভেঞ্চারের বই, তবে তাতে ডিটেকটিভ গল্পের আভাসও মাঝে মধ্যে থাকত। দুটো সিরিজেই সবচাইতে জনপ্রিয় লেখক ছিলেন হেমেন্দ্রকুমার রায়। তাঁর ডিটেকটিভ গল্পের মুখ্য চরিত্র ছিল জয়ন্ত ও মানিক, সঙ্গে মোটাসোটা পেটুক দারোগা সুন্দরবাবু। হেমন্ত-রবীন জুটি নিয়েও ডিটেকটিভ গল্প লিখেছেন হেমেন্দ্রকুমার, তবে সেগুলো সংখ্যায় বেশি নয়। তাঁর অ্যাডভেঞ্চার কাহিনীর নায়ক ছিল বিমলকুমার। এদের নিয়ে লেখা প্রথম যে অ্যাডভেঞ্চার কাহিনীটি পড়ি, তা হচ্ছে 'আবার যখের ধন'। আফ্রিকায় গুপ্তধন খুঁজতে যাওয়ার কাহিনী, প্রথম এ ধরনের বই পড়েছি বলেই একেবারে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। হেমেন্দ্রকুমারের ভাষা খুবই সাবলীল, তার মধ্যে বিমলের কথাবার্তা বাঙালিদের বীর হিসেবে প্রমাণ করার ঘোষণা থাকত মাঝে মধ্যে, সেটা আমাকে খুবই উৎসাহ যোগাত। উৎসাহটা অবশ্য কল্পনার জগতে বিচরণ করেই ক্ষান্ত হত, অত্যন্ত কুঁড়ে ছিলাম বলে বাস্তব অ্যাডভেঞ্চারের পথে পা বাড়ানো আর হয়নি। 'আবার যখের ধন' নামের মধ্যেই নিহিত রয়েছে যে বিমলকুমার এর আগেও আরেকবার যখের ধনের সন্ধানে গিয়েছিল, কিন্তু সিলেট থাকতে সে বইটা আর যোগাড় করতে পারিনি, কাজলদার এক বন্ধু বইটা নিয়ে আর ফেরত দেয়নি। পরে করিমগঞ্জে চলে আসার পর বইটা পড়ি। তাতে ব্যক্তিগতভাবে উদ্দীপিত হওয়ার ব্যাপারটা হল ওটা খাসিয়া পাহাড়ে অভিযানের কাহিনী, আর সিলেটের ছাতক দিয়ে সে অভিযানের শুরু। ‘সূর্যনগরীর গুপ্তধন’ও যথেষ্ট জমজমাট বই, পরে বুঝেছি ওটা King Solomon's Mine থেকে নেওয়া। কোনও কোনও বইয়ে আবার হেমেন্দ্রকুমার জয়ন্ত-মানিক আর বিমল-কুমারকে এক সঙ্গে নামিয়েছেন, যেমন ‘সুলু সাগরের ভুতুরে দ্বীপ’। অবশ্য ওটা দেব সাহিত্য কুটিরের বই নয়, ওটা ছেপেছিলেন বেঙ্গল পাব্লিশার্স। আরেকটা বইয়েও এরা চারজন এক সঙ্গে এসেছে, তার নাম ‘প্রশান্ত মহাসাগরের আগ্নেয় দ্বীপ’। এইচ জি ওয়েলস-এর বিখ্যাত বই হচ্ছে ‘দি আইল্যান্ড অর্ড, মোরো’, বইটাকে ক্লাসিক ধরা হয়। এক ডাক্তার পশুকে অপারেশন করে মানুষ বানানোর চেষ্টা করতেন, তাই নিয়ে বিয়োগান্তক কাহিনী। হেমেন্দ্রকুমারের ‘প্রশান্ত মহাসাগরের আগ্নেয় দ্বীপ’ লেখা হয়েছে এইচ জি ওয়েলস-এর বইয়ের উপসংহার হিসেবে। যথেষ্ট ভাল গল্প, তবে ক্লাসিক মাত্রাটা আর কী করে আসবে? পরে বিভূতিভূষণের ‘চাঁদের পাহাড়’ পড়ার পর বুঝতে পেরেছি যে আ্যডভেঞ্চার হিসেবেও হেমেন্দ্রকুমার খুব উচ্চমানের কিছু লেখেননি, কিন্তু আমার বইপড়ার উষালগ্নকে তিনিই রাঙিয়ে দিয়েছিলেন, একথা স্বীকার না করলে অকৃজ্ঞতা হবে।

প্রহেলিকা সিরিজের গা ছমছম করা ডিটেকটিভ কাহিনীর মধ্যে রয়েছে ‘রাত যখন সাতটা’, ‘কবরের নীচে’ বা ওরকম আর কিছু বই। প্রথম দুটো বইয়ের লেখকের নাম ছিল সব্যসাচী, স্থল্পনামের অন্তরালে কে ছিলেন তা জানি না। বইগুলোর সাহিত্যিক মান খুব ভাল ছিল না, কিন্তু তৎকালীন জনপ্রিয় মোহন সিরিজ বা স্বপনকুমারের চাইতে ভাল। ওগুলো দু’চারটা পড়ার পর আর পড়িনি। দেব সাহিত্য কুটির বিভূতিভূষণকে দিয়ে ‘মিসমিদের কবচ’ নামে একটি ডিটেকটিভ বই লিখিয়েছিল, সেটা আদৌ ভাল হয়নি। বরঞ্চ বুদ্ধদেব বসুকে দিয়ে ‘কালবৈশাখীর ঝড়’, ‘ছায়া কালো কালো’ আর ‘ভূতের মতো অদ্ভুত’ নামে তিনখানা ডিটেকটিভ গল্প লিখিয়ে নিয়েছিলেন, সেগুলো পড়তে দিব্যি ভাল লেগেছিল। তাঁর নায়ক চঞ্চল চরিত্রটাই খুব চিত্তাকর্ষক। তবে তিনটির অন্তত দুটি যে বিদেশি গল্প থেকে নেওয়া বোঝা যায়। এই বিদেশি গল্পের অনুকরণের এসঙ্গে একটা মজাদার কথা মনে পড়েছে। বুদ্ধদেব বসু আর প্রেমেন্দ্র মিত্র বাল্যবন্ধু, তদুপরি কল্লোল-গোষ্ঠীর লেখক বলে ঘনিষ্ঠতা যৌবনে আরও ঘনীভূত হয়। সে সময়ে সাহিত্য রচনা করে সংসার করে সংসার নির্বাহ প্রায় অসম্ভব ছিল। শরৎচন্দ্র ছাড়া আর কেউই পারেননি। প্রেমেন্দ্র মিত্র ছিলেন ‘কল্লোল’ গোষ্ঠীর সব চাইতে প্রতিভাবান লেখক, কিন্তু লেখালেখিতে অর্থ উপার্জন আশানুরূপ হচ্ছে না দেখে তিনি সিনেমার পরিচালক হিসেবে কয়েকটি ছবি তোলেন। তার মধ্যে ‘হানাবাড়ি’ আর ‘চুপি চুপি আসে’ রীতিমত জনপ্রিয় হয়। দুটোই ডিটেকটিভ গল্প। এর মধ্যে ‘চুপিচুপি আসে’ সম্পর্কে বুদ্ধদেব খবরের কাগজের পাতায় প্রকাশ্যে অভিযোগ তোলেন যে তাঁর গল্প প্রেমেন্দ্র মিত্র না বলে কয়ে ব্যবহার করেছেন। প্রেমেন্দ্র যথারীতি প্রতিবাদ করলেন। বুদ্ধদেব তখন দৃষ্টান্ত দিয়ে কোথায় কোথায় মিল রয়েছে তা দেখিয়ে দিলেন। প্রেমেন্দ্র মিত্র এই বিতর্কের ইতি টানেন এই বলে যে ‘আসলে আমরা দুজনেই একই ইংরেজি গল্প থেকে কাহিনীটা ধার করেছি।’ প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখি যে প্রেমেন্দ্র মিত্র ‘ড্রাগনের নিঃশ্বাস’ বা ‘কুহকের দেশে’ ইত্যাদি অপূর্ব অ্যাডভেঞ্চার কাহিনী লিখেছেন, কিন্তু সেগুলো পড়েছি পরবর্তী সময়ে, তাঁর পরাশর বর্মার গোয়েন্দা কাহিনীও তাই। নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়ের গোয়েন্দার নাম ছিল বিজয়, তাকে নিয়ে লেখা ‘বিজয় অভিযান’ জনপ্রিয় হয়েছিল। অখিল নিয়োগী বা স্বপনবুড়োর বই ছিল ‘উদাসী বাবার আখড়া’ আর ‘তিব্বত ফেরত তান্ত্রিক’, ওদুটো বইও আমরা গোগ্রাসে গিলেছি, যেমন গিলেছি সুনির্মল বসুর ‘কেউটের ছোবল’। সুনির্মল বসু শিশুসাহিত্যের অন্যান্য ক্ষেত্রেও মনমাতানো সব বই লিখেছেন, কিন্তু তাঁর প্রতিভার যথার্থ স্বীকৃতি জোটেনি বলেই আমার ধারণা। এই ‘কেউটের ছোবল’ গল্পটার মধ্যেও নতুনত্ব ছিল, চমকপ্রদ জঙ্গলের বর্ণনা, শিশু ও কিশোর চরিত্রগুলো আলাদা করে চেনা যায়, ভাষা স্বচ্ছন্দ ঝরঝরে।

ডিটেকটিভ বইয়ের বাইরে দেব সাহিত্য কুটির বের করত অনুবাদ সিরিজ, প্রায় সমস্ত নামী বিদেশী বইয়ের সংক্ষিপ্ত কিশোর সংস্করণ বের করতেন তাঁরা। এখনও। কিছু চালু রয়েছে। আমরা বিদেশী ক্লাসিক কাহিনীগুলোর মোটামুটি গল্পের অংশটা ওগুলে পড়েই জেনেছি। মূল সাহিত্যের গুণাগুণ তো কিছু বোঝা যেত না ওগুলো থেকে, কিন্তু বইগুলোর নাম জানা হয়ে যেত, গল্পের আদলটাও পাওয়া যেত, বালক-কিশোরদের কাছে সেই প্রাপ্তিটাই কম কিসের। আমরা ডিকেন্স থেকে শুরু করে গ্রিক ক্লাসিক্স পর্যন্ত বহু বই সম্পর্কে অবহিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছি ওই মাধ্যমে। ওই সিরিজ সম্পর্কে ব্যক্তিগতভাবে আরও আগ্রহের ব্যাপারটা দাঁড়ায় পরে, আমি যখন কলেজে পড়ি। আমার অগ্রজতুল্য ঘনিষ্ঠ বন্ধু মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় তখন প্রেসিডেন্সিতে বি এ পড়েন। তাঁর দুটো অনুবাদ ছাপা হয় ওই সিরিজে, ‘ব্ল্যাক অ্যারো’ আর ‘লাস্ট অব দি মোহিকানস্’। কপিরাইট বেচে দিয়ে দেড়শ টাকা করে পেয়েছিলেন মানবদা বইগুলো থেকে। আবার কোনও কোনও বইকে বিদেশি আবরণ ঘুচিয়ে বাঙালি আবহের সঙ্গে মিলিয়ে প্রকাশ করা হত। এ ধরনের সব চাইতে সার্থক প্রয়াস ছিল হেমেন্দ্রকুমার রায়ের ‘দেড়শ খোকার কান্ড’, মূল বইটা বোধহয় জার্মান। পরে খুব সফল বাংলা ছায়াছবি হয়েছিল ‘দেড়শ খোকার কান্ড’। দেবসাহিত্য কুটিরের আর যে বইটা আমার মনে দাগ। কেটেছিল তার নাম ‘হারানো দিন’, লেখক যদ্দুর মনে পড়ে শচীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। উত্তরপ্রদেশের স্কুলের হোস্টেলে একটি বাঙালি ছাত্রের নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার কাহিনী, সম্পূর্ণ ভিন্ন স্বাদের গল্প, এ ধরনের গল্প বাংলায় বেশি লেখা হয়নি। বইটা হারিয়ে গেছে, এরপর কোথাও দেখিনি। পুনরুদ্ধার করলে বাংলা কিশোর সাহিত্যের সম্পদ বাড়বে বলে আমার ধারণা। দেব সাহিত্য কুটিরের বিখ্যাত পূজাবার্ষিকীগুলোর কথা আর ‘মাসিক শুকতারা’র কথা পরে প্রসঙ্গ এলে বলা যাবে।

আশুতোষ লাইব্রেরির ডিটেকটিভ বা অ্যাডভেঞ্চার বইয়ের কোনও সিরিজ ছিল না, যেমন ছিল দেবসাহিত্য কুটিরের। প্রকৃতপক্ষে আশুতোষ লাইব্রেরি ডিটেকটিভ বই বিশেষ বেরও করেননি, অ্যাডভেঞ্চার কাহিনী কিছু ছেপেছেন, তার মধ্যে অনুবাদই বেশি। তাঁরা ছাপতেন মূলত কিশোর উপন্যাস ও কিশোর গল্প সংকলন। এর মধ্যে সব চাইতে উল্লেখযোগ্য যে বইটির নাম করতে হয় তা হল, ‘ভোম্বল সর্দার’, মূলত চারখণ্ডের বই, তখন পড়েছি প্রথম খণ্ড, বাকিগুলো পরে পড়েছি। এখন অবশ্য পুরো চারখণ্ডেই একই বাঁধাইয়ে পাওয়া যাচ্ছে। বইয়ের লেখক খগেন্দ্রনাথ মিত্র, তাঁর সম্পর্কে আরও কিছু কথা পরে বলব। এখন ভোম্বল সর্দারের কথাই বলি।

ভোম্বল বাপ-মা মরা কিশোর, সে কাকার কাছে মানুষ, কাকা একটা জমিদার-কাছারিতে নায়েব ছিলেন। তিনি কড়া গার্জেন, তবে স্নেহও করতেন ভোম্বলকে। আসলে ভোম্বলই ছিল ডানপিটে, তাই তার নামের সঙ্গে ‘সর্দার’ কথাটা যুক্ত হয়েছিল। বাড়ি থেকে পালিয়ে ভোম্বলের এম বাংলায় ঘুরে বেড়ানোর কাহিনী নিয়ে গল্প। এই সুত্রে লেখক তাঁর শিশু ও কিশোর পাঠকদের রামবাংলা দেখিয়ে আনেন। এ ব্যাপারে অমন সফল লেখক খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। ‘ভোম্বল মাদার’ যারা একবার পড়েছে, নিশ্চিতই তারা তাতে তৃপ্ত হয়নি, বারবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে না গড়ে উপায় থাকে না- এমন আকর্ষণ বইখানার। একা একটা কিশোর ছেলে বাড়ি থেকে এলিয়েছে, কখনও আশ্রয় পাচ্ছে, কখনও পাচ্ছে না, বিচিত্র সব ঘটনা আর বিচিত্র সব চরিত্র। আশুতোষ লাইব্রেরি যে প্রথম খণ্ড বের করেছিলেন তার মলাটে ছবিটা ছিল এইরকম: ধুতি কারা, খালি গা, ভোম্বল গাঁয়ের রাস্তা দিয়ে হাঁটছে, তার পাশে একটা বাতাবি লেবুর গাছ, তাতে সবুজ রঙের অজস্র লেবু ধরে রয়েছে। রং ব্যবহার করা হয়েছিল মূলত ফিকে সবুজ ও ফ্রিকে হলুদ। এই প্রকাশনারই অন্যান্য বইয়ে অনেক কড়া রং ব্যবহার করা হত, এখানে তা করা হয়নি। তাতে ছবিটাতে এমন একটা স্নিগ্ধ আভা ফুটে বেরিয়েছিল যে মনে হচ্ছিল গ্রামবাংলার স্নিগ্ধতা সবটুকুই বোধহয় এখানে মজুত হয়ে আছে। ভেতরে সাদা কালো স্কেচজাতীয় আরেকটা ছবির নীচে লেখা ছিল ‘বুড়ি বসে পুঁইশাক কাটছিল’। ছবিটাতে ছিল খড়ে ছাওয়া মাটির ঘরের একটুখানি দেখা যাচ্ছে, দাওয়ায় গোটা দুই শিশু, একটু দূরে লাউ ও পুঁই গাছের মাচা, তারপর গুল্ম জাতীয় কিছুর বাগান, তার মধ্যে নিকানো উঠানে বঁটি দা দিয়ে মুখ তোবড়ানো এক বুড়ি কিছু একটা কাটছেন। এই ধরনের বাড়িঘর, বাগান আমি অনেক দেখেছি ওই বয়সেই, তাই এগুলি যে বাস্তব থেকে সরাসরি তুলে নেওয়া এমন ধারণা তৎক্ষণাৎই হয়ে গেল। আর ওই বুড়ির চেহারা এখনও আমার কাছে গ্রামীণ বুড়ি ঠাকুরমা-দিদিমার প্রতীক। গ্রামেগঞ্জে-শহরে এঁদের আমি এখনও মাঝে মধ্যে খুঁজে পাই। চারখণ্ড একত্র করে যে বইটি বেরিয়েছে, তাতে এই ছবিটি বোধহয় এখনও রয়ে গেছে, তবে সেই অসাধারণ প্রচ্ছদটি হারিয়ে গেছে। ভোম্বল সর্দার আমাকে গ্রামবাংলার বহিরঙ্গ চিনিয়েছিল, ‘পথের পাঁচালী’ চিনিয়েছিল তার অন্তরঙ্গ রূপকে, আর শিবরাম চক্রবর্তীর ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’ চিনিয়েছে কলকাতাকে। আমাদের সময়কার বালকেরা বোধহয় এভাবেই তাদের ধ্যানে বাংলাকে অর্জন করত। আমার যেমন হয়েছে, বাস্তব বাংলা পাল্টেছে, ধ্যানের বাংলা টিকে রয়েছে।

ভোম্বল বাড়ি থেকে পালিয়ে যেতে চেয়েছিল টাটানগর। এই গন্তব্যটা ছোটবেলা আমাকে খটকায় ফেলেছিল, কারণ সাধারণত ছেলেরা পালিয়ে যেতে চাইত কলকাতায়, তাহলে ভোম্বল টাটানগর যেতে চেয়েছিল কেন? এটা বুঝেছি বড় হওয়ার পর, খগেন্দ্রনাথ মিত্রের পরিচয় আরেকটু বিস্তৃতভাবে জানার পর। খগেন্দ্রনাথ মিত্র ছিলেন কম্যুনিস্ট, সোভিয়েত রাশিয়ায় তখন বিপুল শিল্পায়ন চলছে, আমাদের দেশেও বামপন্থী ধারণা ছিল শিল্প-শ্রমিকই হচ্ছে বিপ্লবের ভ্যানগার্ড, অতএব কিশোর ভোম্বল শিল্পনগরীতে গিয়ে সমাজ প্রগতির অগ্রপথিক হবে, এটাই খগেন্দ্রনাথ বলতে চেয়েছিলেন। চতুর্থ খণ্ডে ভোম্বল যে সত্যিই জামশেদপুরে পৌঁছেছিল, সে কথাটাও জানানো দরকার।

খগেন্দ্র মিত্রের আরও বই ছিল ছোটদের। যেমন ‘আফ্রিকার জঙ্গলে’- অতীব রোমাঞ্চকর বই, তবে মূলত এটা ‘গরিলা হান্টার্স’-এর অনুবাদ। একটা অনুবাদ গল্পের বই রয়েছে, নাম ‘সিংহের থাবা’। সবগুলোই রাশিয়ান গল্প, রাশিয়ার কিশোররা দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়ে আর্মান আক্রমণ প্রতিরোধের জন্য যেসব বীরত্বপূর্ণ কাজকর্ম করেছিল, সেগুলো নিয়ে গল্পগুলো, কিন্তু সুখপাঠ্য আর আদৌ প্রচারধর্মী নয়। শেষের দিকে ছোটদের জন্য একটা কিশোর পাক্ষিক বের করেছিলেন তিনি, নাম ছিল ‘কৈশোরক’। খবরের কাগজের আকার, গল্প কবিতা থাকত, আর থাকত কিশোরদের জানার আর উৎসাহিত করার মতো খবরসবর। খগেন মিত্র সমস্ত জীবন কিশোরদের জন্যই লিখেছেন, ফলে গোটা জীবন অভাবে কেটেছে। ‘ভোম্বল-সর্দার’ পার ছায়াছবিতে রূপান্তরিত হয়েছে, কেমন হয়েছিল জানি না।

আশুতোষ লাইব্রেরির আরেকটা মজাদার বই ছিল ‘হাবুলচন্দোর’। লেখক বোধহয় রবিদাস সাহারায়। হাবুল ছিল গ্রামের বোকাসোকা ছেলে, পিতৃহীন, জাতে ব্রাহ্মণ। বাবার অবর্তমানে পুরোহিতের কাজটা তাকে করতে হত, এনিয়ে তার ঝামেলা পোহাতে হত, কারণ কাজটা সে ভাল জানত না। এনিয়ে যে কাহিনীগুলো, সবগুলোই হাসিখুশিতে গিয়ে শেষ হয়েছে, কোথাও কোনও তিক্ততা নেই, বিপদের রেশ নেই। পড়লে মনটা প্রফুল্ল হয়। মলাটের ছবিতে বইয়ের মূল সুরটা ধরা পড়ে। হাবুলচন্দোর পুজো করবে বলে বেরিয়েছে, পুজোর সংখ্যা অনেক, তাই সে সাইকেল নিয়েছে। ছবিতে রয়েছে হাবুল প্রাণপণে সাইকেল চালাচ্ছে, তার পরনে হাফপ্যান্ট, গায়ে জড়ানো নামাবলী। আশুতোষ লাইব্রেরির সবচাইতে সার্থক প্রকাশনা ছিল বিদেশী বইয়ের বাংলা সংস্করণ। ওগুলো অনুবাদ করা হত না, গল্পটা বজায় রেখে কাহিনীটা বলা হত। এভাবে ‘রবিন হুডে’র যে কাহিনী তারাপদ রাহা বাংলায় লিখেছিলেন, তার মতো স্বচ্ছন্দ গদ্যে বলা বিদেশি গল্প আমরা কমই পেয়েছি। একই কথা বলা যায় ‘ট্রেজার আইল্যান্ড’ বা ‘রবিনসন ক্রুশো’র বাংলা সংস্করণ প্রসঙ্গে, দুঃখের বিষয় এদুটি বইয়ের লেখকের নামটা মনে করতে পারছি না। ‘হোঁদল কুৎকৎ’ বলে একটা মজার বই ছিল। সে তার ইংরেজি নাম বলত হার্ডিল কিট। লেখকের নাম যদ্দুর মনে পড়ে ষোড়শীকুমার চট্টোপাধ্যায়। আরেকটা ছোটগল্পের বই ছিল, নাম ‘টো টো কোম্পানীর ম্যানেজার’, লেখক হেমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। ওই বইয়ে ‘গাঙ্গার্জির গল্প’ বলে একটা গল্প ছিল, রমেন গাঙ্গুলীর উপস্থিত বুদ্ধির দৃষ্টান্ত ছিল তাতে। রমেন গাঙ্গুলিকে অফিসের সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমাদের ব্রাহ্মণরা তো সবাই আরজি, যেমন ব্যানার্জি, চ্যাটার্জি, মুখার্জি, তাহলে তুমি আবার গাঙ্গুলি হলে কী করে? তুমি কি ব্রাহ্মণ নও?’ রমেন গাঙ্গুলি হাত কচলে বললেন, ‘হুজুর আমার ক্ষেত্রে ওকথা খাটে না, কারণ আমি নিজেই তো R.G, রমেনের R গাঙ্গুলির - G। ‘টো টো কোম্পানির ম্যানেজার’ বইয়ের লেখক হেমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় শিলংয়ের স্থায়ী বাসিন্দা ছিলেন, সে খবর জেনেছি মাত্র সেদিন শ্যামাদাস ভট্টাচার্যের “শিলং-এর বাঙালি সমাজের অবদান” পড়ে। যাই হোক, আশুতোষ লাইব্রেরি উঠে যাওয়ায় বাংলার শিশু-কিশোর সাহিত্যের যে ক্ষতি হয়েছে তা এখনও পূরণ হয়নি।

জেঠিমাদের বাড়িতে গল্পের বইয়ের স্টক ছিল অফুরন্ত, তার অর্ধেকমাত্র শেষ করতে ও পারলাম, তারপর দেশভাগ হয়ে গেল, জ্যাঠামশাই বদলি হয়ে গেলেন তেজপুরে। আমরাও বাসা বদল করে শেখঘাট চলে এলাম, সেটা অন্য কাহিনী, পরে বলব। এখানে বলার মতো - কথা হল গল্পের বইয়ের ব্যাপারে আমি একেবারে আতান্তরে পড়ে গেলাম। ততদিনে আমার বই পড়ার নেশা একেবারে পাকাপোক্ত হয়ে গেছে, অথচ বই পাওয়ার কোনও উপায় নেই। বাবা আমাকে শিবরাম চক্রবর্তীর একটা বই কিনে দিলেন, তারপর সুনির্মল বসুর ‘ঝিলমিল’ বলে একটা বই, কিন্তু এভাবে আমার দাবি মেটানো সম্ভব ছিল না, আর বাবার পক্ষেও প্রত্যেক দিন নতুন বই কিনে দেওয়াটা সাধ্যের অতীত ছিল। আমার উদভ্রান্ত অবস্থা দেখে দাদা একটা পরামর্শ দিল। বলল, ‘তুই বরঞ্চ এখন নিজেই গল্প কবিতা লেখা শুরু কর, তাতে তুই নিজেই লেখক হয়ে যাবি।’ সেই সঙ্গে দাদার প্রস্তাব ছিল দুজনে মিলে একটা হাতে লেখা পত্রিকা করব, দাদার হাতের লেখা ভাল, ছবিও মোটামোটি আঁকতে পারত। তাই ম্যাগাজিন সুন্দর করে কপি করা আর সাজানোর দায়িত্ব দাদার, আর গল্প লেখার দায়িত্ব আমার।

আইডিয়া মন্দ লাগল না, আর বাবা শুনে খুশি হয়ে দাদাকে রঙের বাক্স আর তুলি কিনে দিলেন। গল্প তো অনেক পড়েছি, ভেবেছিলাম সেগুলোর একটু এদিক ওদিক করে দিব্যি গল্প লেখা যাবে। লিখতে গিয়ে দেখা গেল ব্যাপারটা অত সহজ নয়, প্লট জিনিসটা আদৌ দাঁড়ায় না। একটু জমাতে গেলেই পুরো নকলনবিশি হয়ে যায় আর সেটাতে বরাবরই আমার অস্বস্তি ছিল। কবিতার চেষ্টা করা গেল। তখন দেশাত্মবোধে রক্ত টগবগ করে ফুটছে, তাই কবিতার বিষয়বস্তু হল ক্ষুদিরাম। প্রথম দুটি পঙক্তি মনে রয়েছে, আমার ধারণা ছিল ওগুলো একেবারে যুগান্তকারী সৃষ্টি হয়েছে। পংক্তি দুটো হল ‘প্রণমি তোমার চরণে আজিকে, বিপ্লবী বীর ক্ষুদিরাম/ মস্তক মম নত হয়ে আসে স্মরিয়া তব মহৎ নাম’ ইত্যাদি। দাদার ধারণা ছিল বাবাও এই কাব্য প্রতিভায় বিমুগ্ধ হবেন; তাই সে বাবাকে গোটা কবিতাটা পড়ে শোনাল। বাবা আমাদের উৎসাহে একেবারে জল ঢেলে দিলেন, বললেন, ‘ও রকম কবিতা আজকাল কেউ লেখে না, আরও বেশি করে কবিতা পড়, তারপর লিখতে যাবে।’ সেই ১৯৪৭ সালে আমার এই মহৎ সৃষ্টিকে বাবা ব্যাকডেটেড বলে পুরো বাতিল করে দিলেন। বাবার নির্দেশ জীবনে খুব কম ক্ষেত্রেই হয়তো পালন করেছি, কিন্তু কাব্যচর্চা সম্পর্কে তাঁর নির্দেশ ষোলো আনার উপর আঠারো আনা মেনে নিয়েছি। অর্থাৎ সেই প্রথম আর সেই শেষ, জীবনে কোনওদিনই কবিতা লেখার সামান্যতম চেষ্টা আর করিনি।

(‘হারানো দিন হারানো মানুষ’, ২য় পর্ব, জ্যোতি প্রকাশনী, শিলচর, ২০১০ থেকে)
৩.৩    পাঠসূত্র

ঐতিহাসিক, সমাজ বিজ্ঞানী সুজিৎ চৌধুরীর বিচরণ সাহিত্যক্ষেত্রেও ছিল। তবে কোন পান্ডিত্যপূর্ণ সমালোচনা নিয়ে নয়, একান্তই মুগ্ধ এক পাঠকের দৃষ্টিকোণ থেকে। অবশ্য তাঁর সাহিত্য বিষয়ক আলোচনায় ইতিহাস চেতনা বা ইতিহাস মগ্নতা সব সময়েই অন্তলীন। দুই খণ্ডে রচিত ‘হারানো দিন হারানো মানুষ’ একটি গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যকৃতি হিসেবে কাছে সমাদৃত হয়েছে। দেশ গ্রাম হারিয়ে বাস্তচ্যুত হয়েও এক আজীবন শিশু যেন ভিন্নতর প্রেক্ষিতে এসেও মনের মধ্যে লালন করে গেছেন তাঁর হারিয়ে যাওয়া রূপসী বাংলাকে। স্বাধীনতা পরবর্তীকালীন খণ্ডিত যে নির্বাসিতা বাংলায় তিনি পা রেখেছেন তাকেই আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে তিনি করে তুলেছেন রূপসী। এ খণ্ডিত বাংলা অর্থাৎ বরাক উপত্যকা, তদানীন্তন অখণ্ড কাছাড় অঞ্চলের হাজার বছর পেছনে হেঁটে সংগ্রহ করেছেন প্রত্নকথার অণু পরমাণু। ঐতিহাসিক হিসেবে যে নিধনপুরের ময়ূরশাল্মলী বন, অশোক পলাশের রক্তিম জগতে, কালাপুর, চন্দ্রপুরী বিষয়ায় তাঁর বিচরণ- প্রত্নকথায়, তত্ত্বকথায়, বিজ্ঞসভায় হাজারটা কথনে যা ছিল অনুক্ত, সুজিৎ চৌধুরীর আত্মজীবনীতে তাই হল প্রকাশিত। ঐতিহাসিক হিসেবে নির্বাসিতা বাংলার বাহ্যিক অবয়ব নির্মাণ করে, এবং এরপর লোকসংস্কৃতি গবেষক হিসেবে এখানকার লোককথা, লোকশ্রুতি, লৌকিক আচার এবং সংস্কারের মধ্যে খুঁজে নিলেন তাঁর প্রাণের সুপ্ত অঙ্কুরগুলোকে। এমনি করে যে-নিসর্গ তিনি খুঁজে পেলেন এতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতেই আত্মচরিত লেখার ছলে হাজির করলেন জীবন্ত মানুষদের, পাখপাখালি, সাপ, মাছ, বৃক্ষ, লতাপাতা সমস্তকিছুকে এক করে। মায়াবী নিসর্গের প্রেক্ষাপটে হাজির করলেন দরদি মাস্টারমশাই, রাগী বাবা, উদাসীন বাবা, সর্বংসহা মাতৃদেবী, কৈশোরেই গার্জেনগিরিতে পাকা পাড়াতুতো, খুড়তুতো, মাসতুতো দিদিদের, গান গাওয়া ভিখারি, নৌকার মাঝি, পল্লিগ্রামের কীর্তনীয়া, দেশীয় ক্রিকেট প্লেয়ার, দুর্দান্ত সাতারু, গোপন পড়ুয়া, বাড়ির সম্ভ্রান্ত চাকর, স্কুলের দফতরি, নির্লোভ দেশপ্রেমী, ভোজন বিলাসী মধ্যবিত্ত, অকিঞ্চিৎকর আচ্ছাদনের নীচে কাঁপতে কাঁপতে শীতের রাতে বস্ত্রবিহীন পাখির দুঃখে কাতর শিশু, হঠাৎ উগ্রসাম্প্রদায়িকতার উত্তাপে বিব্রত ছাত্রদের।

সুজিৎ চৌধুরীর আত্মচরিত পড়লে মনে হয় তিনি যেন বিভূতিভূষণের সেই নিশ্চিন্দিপুর হারানো এক পরিণতবয়স্ক অপু। বাস্তুচ্যুতির অনুভূতি তাঁকে পীড়িত করেছে। কিন্তু এ দুঃখবোধকে তিনি বাজারজাত করেন নি। দেশ বিভাগের দায়ভার কারও উপর চাপিয়ে দোষারোপ করাও তাঁর উদ্দেশ্য নয়। কিশোর মনের মধ্যে তৎকালীন সাম্প্রদায়িকতার একটা চাপ এ আত্মচরিতে প্রচ্ছন্ন রয়েছে। কিন্তু পারিবারিক সংস্কৃতি তাঁকে মুক্তমনা করে তুলেছে। নির্বাসিতা ভূমিতে এসেও তিনি হিন্দু-মুসলিম বিদ্বেষের সমস্ত সম্ভাবনার মূলে আঘাত করেছেন এ আত্মচরিতের মাধ্যমে। এ বই এককথায় এক নিটোল ভালোবাসার দলিল। ব্যক্তি সুজিৎ চৌধুরী যেমন একসঙ্গে অনেক বিষয়ে মগ্ন থাকতে পারেন তেমনি একসঙ্গে বিচিত্র ধরনের মানুষকেও ভালোবাসতে পারেন। প্রিয় জন্মভূমি বিদেশ হয়ে গেলে অখণ্ড স্বদেশভূমির আরেকটি প্রান্তে শিশু কিশোরদের ছেড়ে চলে আসার মধ্যে বিষাদ আছে, কিন্তু কোন বিষবাষ্প নেই। শাহজালাল চত্বরে মুসলিম বন্ধু কিশোর-সুজিৎ চৌধুরীকে কোনও এক অজানা প্রত্যয়ে বলে, ‘তোদের আবার ফিরে আসতে হবে’। শিশুকিশোরের চোখ দিয়ে দেখা ভারতবর্ষের প্রান্তভূমির এক নির্মম পালাবদলের কাহিনী এ ‘হারানো দিন হারানো মানুষ’ উত্তরপূর্বাঞ্চলের সাহিত্যকৃতির এক অন্যতম নিদর্শন।

Excerpts from ‘Sujit Choudhury (1937-2009)’, by Sanjib Deblaskar, in “Historians and Historiography of Northeast India, Professor HK Barpujari Centenary Publication”, ed. By JB Bhattacharjee, Institute of Northeast India Studies, Kolkata, 2012.

...Sujit Choudhury wrote an autobiographical work in two parts in Bengali Harano Din Harano Manush (2005, 2010). Part one recorded his childhood experience in Sylhet, a buffer district in Assam, which earned a place of distinction for its bounty, rich natural resources and intellectual and cultural heritage. Cast in an autobiographical mode, it recounts the process of transition of an idyllic land toward a complex future. Viewed from the perspective of an adolescent, the book is a narrative of preparation for the historian who had imbibed the bearings of tradition that were to transform the boy into a keen observer of the society and the flora and fauna of the land along with folklore, folk rites and folk religion. The tradition of synthesis and religious harmony that were to be the major passion for the historian were his natural acquisitions. This part which may be looked as a 'song of innocence', is an excellent literary piece with a soft and tender touch of nostalgia written in a romantic vein. The second part may be termed as a 'song of experience' where a sudden change in the socio-political life of Sylhet is a shocker. The feeling of wonder of childhood days turned out to be one of bewilderment; the religious intolerance and political intrigues threatening the foundation of existence, process reaching its culmination in 1947 with the division of the land on communal basis resulting in cruel displacement of the people within their traditional homeland. (P. 269-270)

৩.৪    নিবিড় পাঠ

ভারতীয় উপমহাদেশের একেবারে প্রস্তিকভূমিতে অবস্থিত সিলেট জেলা সদরে সদ্য গ্রাম থেকে আসা এক কিশোরের সামনে বইয়ের জগৎটি কী ভাবে উন্মোচিত হল এর এক অন্তরঙ্গ প্রতিবেদন রয়েছে এ গদ্যংশটিতে। অবশ্য বইয়ের প্রতি একটা ভালোবাসার সম্পর্ক ইতিপূর্বেই তাঁর হয়ে গেছে, যদিও পাঠ করার অঢেল সামগ্রী তখন অকল্পনীয়। শহরে এসে তিনি পেলেন মনোমুগ্ধকর একটি বই ‘গহনগিরির সন্ন্যাসী’। লেখকের নামটি তাঁর মনে আছে, শুধু তাই নয় এর প্রকাশক এবং এদের অন্যতম (শিশুদের) পত্রিকাটির নামও মনে আছে। ইতিমধ্যে পড়া রূপকথার জগৎ ছেড়ে অ্যাডভেঞ্চারের বই তাঁর চোখের সামনে ভিন্নতর একটি দরজা খুলে দিল। লেখকের দেব সাহিত্য কুটিরের সঙ্গে পরিচয় হওয়া, কাঞ্চনজঙ্খা সিরিজের বইয়ের কথা, প্রহেলিকা সিরিজের বই পাঠ- এসবের স্মৃতিরোমন্থন এ পর্বের চরম প্রাপ্তি। কোন পাণ্ডিত্য নয়, বইয়ের জগতে মগ্ন হয়ে থাকার ওই পরম লগনের কথা আজকের টিভি, ই-বুক, ইন্টারনেটের যুগে কেমন ভিন্নতর সুখের ছবি এনে দেয়। সেই সব দিনগুলো ছিল দীর্ঘ, ছুটির দুপুরগুলো ছিল আরও দীর্ঘ, বই ছাড়া এত দীর্ঘ দিনগুলোতে কেই বা সঙ্গ দিত? আমাদের হারিয়ে যাওয়া সেই সব দিন উঠে এসেছে সুজিৎ চৌধুরীর কথনে।

তখনকার দিনে শিশু কিশোরদের জন্য বিদেশি ক্লাসিক সাহিত্যের অনুবাদ হাজির করতেন প্রকাশকেরা। এ অনুবাদ কোন অপটু শব্দের গায়ে প্রতিশব্দ বসানো কিছু নয়, এক অর্থে অনুসৃষ্টিই। কোন সমালোচনার পথে না হেঁটে সুজিৎ চৌধুরী ওই বিষয়ে একটু সন্ধানী আলো নিক্ষেপ করেছেন। অধুনালুপ্ত কয়েকটি প্রকাশনার প্রসঙ্গ এখানে এসেছে, এসেছে শিশু সাহিত্যিক হেমেন্দ্র রায়, বেঙ্গল পাবলিসার্স, আশুতোষ লাইব্রেরি, গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় অ্যন্ড সনস প্রভৃতি পুস্তক প্রকাশক, বিক্রেতার কথা, যা লেখক স্মৃতি থেকে উদ্ধার করেছেন। শৈশবের হারিয়ে যাওয়া বইয়ের জন্য লেখকের মর্মবেদনার কথাও রয়েছে। সুনির্মল বসুর ‘কেউটের ছোবল’, অখিল নিয়োগীর ‘উদাসীন বাবার আখড়া’ শেষ করে লেখকের প্রবেশ ঘটছে উপেন্দ্রকিশোর-সুকুমার রায়ের ‘খাস তালুকে’। লীলা মজুমদারের গল্প, সুকুমার রায়ের ‘আবোল তাবোল’ বইয়ের ছবি সহ ছড়া, কাঞ্চজঙ্খা সিরিজের বইয়ে মগ্ন থাকার সে দিনগুলো আজকের দিনে প্রকৃতই ইতিহাস। কেই খবর রাখে অনুদিত ‘কিং সলোমনস মাইনস’, এইচ জি ওয়েলসের ‘দি আইল্যান্ড অব ড. মোরো’র ছায়া অবলম্বনে হেমেন্দ্রকুমারের ‘প্রশান্ত মহাসাগরের আগ্নেয় দ্বীপ’ প্রভৃতি বইয়ের? লেখকের সামনে তখন প্রহেলিকা সিরিজের ‘রাত যখন সাতটা’, ‘কবরের নীচে’, অতঃপর ‘কালবৈশাখীর ঝড়’, ‘ছায়া কালো কালো’, ‘ভূতের মতো অদ্ভুত’, নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়ের ‘বিষয় অভিযান’, অখিল নিয়োগীর (স্বপন বুড়ো) ‘তিব্বত ফেরত তান্ত্রিক’, খগেন্দ্রনাথ মিত্র রচিত ‘ভোম্বল সর্দার’, অনুদিত ‘গরিলা হান্টার্স’, ‘সিংহের থাবা’, রবিদাস সাহারায়ের ‘হাবুলচন্দোর’; চমৎকার দুটো বই ‘ট্রেজার আইল্যান্ড’, ‘রবিনসন ক্রুশো’, অনুবাদকের নাম লেখক আর মনে করতে পারছেন না। আরো একটি বই, ‘হোঁদল কুৎকৎ’ এর লেখকের নাম সম্বন্ধে তিনি সংশয়হীন নন। সুজিৎ চৌধুরীর স্মৃতিতে রয়েছে হেড়স্বচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের নাম ‘টো টো কোম্পানীর ম্যানেজার’। সেকালের যে সমস্ত বই আর প্রকাশকের কথা লেখক স্মৃতি থেকে উদ্ধার করেছেন, এরা তো ইতিমধ্যেই বিস্মৃতির গর্ভে চলে গেছেন। সেদিনের শিশুর পরবর্তী দিনে একজন সমাজ বিজ্ঞানী, ঐতিহাসিক এবং প্রাবন্ধিক হয়ে ওঠার পেছনে শৈশবের গ্রন্থপাঠের যে বিরাট ভূমিকা তা তো স্পষ্ট। ত্রিশ থেকে চল্লিশের সেই গৌরবজক শিশুসাহিত্য ছিল বলেই আমরা বিশ শতকের পঞ্চাশ-ষাট দশক পর্যন্ত উন্নতমানের সাহিত্য পেয়েছি। পরবর্তী কালে বাংলার সাহিত্য জগতে এ দিকটি উপেক্ষিত হতে থাকে যার ফল তো আমরা দেখছি। একবিংশ শতকে এসে আমরা দেখতে পাচ্ছি ক্রমাগতই সমাজের শিশু কিশোররা বই, বিশেষ করে মাতৃভাষার বই থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। আজকের যে শিশু, সেই তো আগামী দিনের পাঠক এবং লেখক। এটা ভেবে আতঙ্কিত হতেই হয়- আগামী দিনের পাঠক কোন্ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আসবে? সুজিৎ চৌধুরীর শৈশবের বইপাঠের স্মৃতিচরণ আমাদের এদিকে অতি অবশ্যই সচেতন করে দিচ্ছে। অবশ্য পুরো আখ্যানটার মধ্যে কোনও সমালোচনা বা ক্ষোভ নেই, আছে এক ধরনের মুগ্ধতাবোধের প্রকাশ যা লেখককে শৈশবে আবিষ্ট করে রেখেছিল, পরিণত বয়সেও যার পিছুটান রয়েছে। এ স্মৃতিচারণে তিনি তাঁর সমাজ বিজ্ঞানী সত্তাকে সরিয়েই রেখেছেন। রচনাটি প্রকৃতই সুখপাঠ্য, গভীর সমাজতাত্ত্বিক একটা সংকেত এর মধ্যে অন্তর্লীন হয়ে আছে যদিও।

আনুষঙ্গিক প্রসঙ্গ :

‘হারানো দিন, হারানো মানুষ’ একটি স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থ। এখানে প্রাধান্য লাভ করেছে ব্যক্তি নয়, সময়ই। ভারতীয় উপমহাদেশের তদানীন্তন আসামের দক্ষিণ প্রান্তীয় ভূমি, সিলেট-কাছাড়ের একটা ক্রন্তিলগ্নে মধ্যবিত্ত সমাজ মানসের বিবর্তন, শিক্ষার ক্ষেত্রগুলো উন্মোচন হওয়া, শিক্ষকতা পেশায় আসা মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মধ্যে দেশ, সমাজ এবং রাজনীতি সচেতনতার উন্মেষ, জাতীয় কংগ্রেসের জনপ্রিয়তা এবং এরই সঙ্গে দ্বিজাতিতত্ত্বের আমদানি, হিন্দু-মুসলিম সমাজের মধ্যে ক্রমে গড়ে ওঠা প্রতিদ্বন্দ্বিতার মনোভাব, যার পরিণামে সাম্প্রদায়িকতার উগ্র প্রকাশ, দেশবিভাগের প্রস্তুতি এবং সর্বশেষে বাস্তুচ্যুতি পরিণত বয়সে এক সংবেদশীল কিশোরের দৃষ্টিতে দেখা এ দীর্ঘ ঘটনাপ্রবাহের আখ্যানই এ গ্রন্থের উপজীব্য। প্রথম পর্বটিতে রয়েছে সুন্দরী শ্রীভূমির নিসর্গের প্রেক্ষাপটে শিশুকিশোরদের এক স্বপ্নের জগতের কথা, যাকে বলা চলে ‘সং অব ইনোসেন্স’, আর দ্বিতীয় পর্বে আসে শৈশবের স্বপ্নের বিস্তার এবং অবশেষে স্বপ্নভঙ্গের কাহিনি , ইংরেজ কবি ব্লেকের ভাষায় ‘সং অব এক্সপেরিয়েন্স’।

এ গ্রন্থে লেখকের ব্যক্তিজীবন, পরিবারিক কথা ইত্যাদি প্রাসঙ্গিকভাবে এলেও তার মূল অভিমুখ এদিকে নয়। এখানে সুজিৎ চৌধুরী যেন নিশ্চিন্দিপুর খুঁজে বেড়ানো এক পরিণতবয়স্ক অপু। তিনি দেশ, গ্রাম হারিয়েও মনের ভেতর লালন করছেন তাঁর সেই রূপসী বাংলাকে, কিংবা হারিয়ে যাওয়া ‘ইনিসফ্রিকে’ (যেমন খুঁজছিলেন আইরিশ কবি ইয়েট্‌ট্স)। এ অতীতচারণ তাঁর কাছে কোনও রোমান্টিক বিলাসিতা নয়, এ এক উজ্জীবনী অভিযান। ঐতিহাসিক সুজিৎ চৌধুরী ইতিহাস আর প্রত্নতত্ত্বের পাহাড় ডিঙিয়ে বাংলার ‘ইডিলিক’ (idyllic) জগতে ফিরে যেতে চেয়েছেন এ হারানো দিনের কথকতার মাধ্যমে।

সমস্ত কিছুই একজন ব্যক্তিমানুষের দৃষ্টিতে দেখা, তাই এটা আত্মজীবনী। কিন্তু সে অর্থে আত্মজীবনী তো নয় এটা, বলা যায় আত্মজৈবনিক আখ্যান। বলা যায় এক অন্তরঙ্গ কথন। কবিগুরুর ‘জীবনস্মৃতি’তে যেমন ব্যক্তিজীবনের খুঁটিনাটি এলেও তা মুখ্য নয়, মুখ্য যে তী সেটা কী সেটা অবশ্য হাজার পঠনেও ধরা দেয় না। সুজিৎবাবুর এ রচনায়ও যেন এরই প্রচ্ছায়া। পাঠক প্রতিটি পঠনেই এক একটা নতুন কিছু খুঁজে পাবেন এখানে। আত্মজীবনীর সঙ্গে জীবনীগ্রন্থের বুঝি এখানেই তফাৎ। জীবনী লেখকের দায়বদ্ধতা থাকে তাঁর উদ্দিষ্ট ব্যক্তির সমস্ত তথ্য প্রণালীবদ্ধ ভাবে হাজির করা, আত্মজীবনীর এরকম কোন কিছু থাকার ব্যাপার নেই।

উনবিংশ শতক থেকে বাংলা তথা ভারতীয় ভাষায় আত্মজীবনী লেখা শুরু হয়, যদিও জীবনী এবং আত্মজীবনীর একটি গৌরবজনক অধ্যায়ের নিদর্শন রয়েছে প্রাচীন এবং মধ্যযুগে। বাণভট্টের হর্ষচরিত, থেকে ‘বাবরনামা’ সহ মুঘল দরবারে ‘আকবরনামা’ তো বটেই, বাংলায় ‘চৈতন্য চরিতামৃতের’ মতো জীবনীগ্রন্থের ঐতিহ্য রয়েছে। বাংলায় উনিশ শতকের গোড়া থেকে আত্মজীবনী রচনা শুরু হয় নতুন উদ্যমে। কেউ কেউ এতে নিজের কর্মজীবনের উপর উপর গুরুত্ব দেন, আবার অনেকে দেন বাল্যস্মৃতির উপর, যেমন রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর অবশ্য তাঁর আত্মজীবনীতে (‘বিদ্যাসাগরচরিত’ এ নামেই বইটি প্রকাশিত হয়েছে) পরিবার, বাল্যস্মৃতি এবং তৎকালীন সমাজকে একত্রে উপস্থাপন করেন। সেই সময়ের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের অনেকেই আত্মজীবনী লিখে গেছেন, এর মধ্যে রয়েছে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের, ‘আত্মচরিত’, জ্যোতিরিন্দ্রনাথের ‘জীবনস্মৃতি’, প্রমথ চৌধুরীর ‘আত্মকথা’, বিনোদিনী দাসীর ‘আমার কথা’, বিপিনচন্দ্র পালের ‘চরিতকথা’, মনোমোহন বসুর ‘সমাজচিত্র’, রাজনারায়ণ বসুর, ‘আত্মচরিত্র’, স্বামী বিবেকানন্দের ‘স্মৃতিকথা’, শিবনাথ শাস্ত্রীর ‘আত্মচরিত’, মীর মশারফ বসুর ‘সমাজচিত্র’। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করতে হয়। মহাত্মা গান্ধীর ইংরেজি গ্রন্থ, My Experiments with Truth, নেতাজি সুভাসচন্দ্র বসুর ‘তরুণের স্বপ্ন’ প্রভৃতি গ্রন্থেরও।

অনুশীলন - (গ)
 ১।
 ক)
‘বাল্য ও কৈশোরে বই পড়ার স্মৃতি’টি কী ধরনের রচনা ?
  
 খ)
এ রচনাটি কাদের উদ্দেশে লেখা? শিশুদের না বড়োদের ?
  
 গ)
লেখক যে বাল্যকালেই একজন সচেতন পাঠক ছিলেন এর পরিচয় কোথায় ?
  
 ঘ)
লেখকের বাল্যকালটা কোথায় কেটেছে ?
  
 ঙ)
এ অংশটুকু পড়ে কী মনে হয়, লেখকের বাল্যকাল কি সুখের, না দুঃখের ?
 ২।
 ক)
‘হারানো দিন, হারানো মানুষ’টি কী ধরনের বই ?
  
 খ)
জীবনী আর আত্মজীবনীর পার্থক্য কী? সুজিৎ চৌধুরীর এ বইটিকে কোন পর্যায়ে ফেলা যাবে ?
  
 গ)
বাল্য ও কৈশোরে লেখক কোথায় ছিলেন ?
  
 ঘ)
লেখক কার সাহচর্যে বইয়ের সংস্পর্শে আসেন ?
  
 ঙ)
পাইলগাঁওয়ে থাকতে লেখক কী ধরনের বই পড়তেন ?
 ৩।
 ক)
সুজিৎ চৌধুরীর প্রিয় বইগুলোর একটি তালিকা তৈরি করুন ।
  
 খ)
কিশোরপাঠ্য অনূদিত বই ক'টি সম্বন্ধে লেখক কী অভিমত দিয়েছেন ?
  
 গ)
কোন কোন প্রকাশকের উল্লেখ রয়েছে সুজিৎ চৌধুরীর গদ্যাংশে ?
  
 ঘ)
‘গহনগিরীর সন্ন্যাসী’ বইটির উপর একটি টাকা লিখুন ।
  
 ঙ)
সুজিৎ চৌধুরী কবিতা লেখার প্রচেষ্টা বাদ দিলেন কেন ?
 ৪।
 ক)
আত্মজীবনী এবং জীবনীর পার্থক্য কী ?
  
 খ)
‘হারানো দিন, হারানো মানুষ’-এর নির্বাচিত অংশটিতে লেখকের ঘনিষ্ট পারিবারিক কোন সদস্যের প্রসঙ্গ এসেছে ?

চতুর্থ পত্র
অধ্যায় - 
গদ্য