rotateআপনার মুঠোফোনটি ল্যান্ডস্কেপে রাখুন।
পাঠ্যপুস্তক ৩য় পত্র - দুই
বাংলা ভাষা ডিপ্লোমা পাঠক্রম
পাঠ্যপুস্তক
(তৃতীয় পত্র : অধ্যায়-দুই : অভিধান )
দ্বিতীয় ষাণ্মাসিক - তৃতীয় পত্র
বাংলা পাঠের গুরুত্বপূর্ণ স্তর : লিখন, পঠন এবং সৃজন
বাংলা পাঠের গুরুত্বপূর্ণ স্তর :
লিখন, পঠন এবং সৃজন
তৃতীয় পত্র   ❐   অধ্যায় -  দুই
অভিধান, অভিধানচর্চা এবং এর ব্যবহার
অভিধান, অভিধানচর্চা এবং এর ব্যবহার
 
২.০   উদ্দেশ্য   

এ পর্বটিতে যা জানতে পারবেন —

  1. অভিধানের অর্থ এবং রকমফের
  2. অভিধান চর্চার প্রয়োজনীয়তা
  3. বাংলা অভিধানচর্চার ইতিহাস
  4. অভিধান ব্যবহারবিধি
২.১   ভূমিকা

অভিধান আমাদের অতি প্রয়োজনীয় একটি বই। এর ব্যবহার স্কুল কলেজে যেমন রয়েছে, তেমনি প্রাত্যহিক জীবনেও। বাজারে অন্যান্য বইয়ের চাইতে ডিকশনারি অর্থাৎ অভিধানের চাহিদা এখনও অনেক বেশি। জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস, যোগেন্দ্রচন্দ্র রায় বিদ্যানিধি, সুবলচন্দ্র মিত্র, কাজি আবদুল ওদুদ, রাজশেখর বসু এদের অভিধান ছাড়াও সাহিত্য সংসদ প্রকাশিত অভিধান, আর সর্বকালীন রেকর্ড সৃষ্টিকারী এ-টি দেব ইংলিশ থেকে বেঙ্গলি, বেঙ্গলি থেকে ইংলিশ ডিকশনারি এখনও বাজার আলো করে আছে। লেখাপড়ার বাড়িতে অভ্যাসবশত একখানা অভিধান রাখা হয়। সাধারণত কিছু শব্দের অর্থ বের করা, আর এলোমেলো ভাবে পাতা ওল্টানো ছাড়া অভিধানের যথাযোগ্য ব্যবহার হয় কি না এ নিয়ে সন্দেহ আছে।

অভিধান বিষয়ক এ অধ্যায়ে অভিধান পরিচিতি, অভিধান ইতিহাস, অভিধানের আঙ্গিক, রচনাপদ্ধতি নিয়ে কিছু আলোকপাত করা হবে। ভাষা-সাহিত্য-সমাজ ও সংস্কৃতিচর্চায় অভিধান-পরম্পরা, অভিধান ও অভিধানকারদের পরিচিতি দেবারও প্রয়াস থাকবে এখানে। সেই সঙ্গে আলোচিত হবে শব্দকোষ, শব্দাভিধান, বানান অভিধান, প্রতিশব্দ, বিপরীতার্থক শব্দের অভিধান এসবও।

২.২   অভিধানের কী ও কেন

সাধারণ্যে এটাই ধারণা, ডিকশনারির কাজ হল শব্দের ‘মানে’ বের করে দেওয়া। একটা কঠিন বা অপরিচিত শব্দ পেলে খোঁজ পড়ে অভিধানের। এ প্রবণতা অবশ্য ইংরেজি পড়ুয়াদের মধ্যেই একটু বেশি। অজানা আনকোরা নতুন ইংরেজি শব্দের মানে দেখিয়ে দিতে এ.টি দেবের E to B ডিকশনারি বাঙালির জনপ্রিয় ডিকশনারিগুলোর অন্যতম। ঘরে ঘরে খোঁজ নিয়ে দেখুন ইংরেজি ডিকশনারির একাধিক খণ্ড (পকেট সংস্করণ সহ) থাকা সত্ত্বেও বাংলা (বাংলা টু বাংলা, এ ভাবেই বলা হয়) অভিধানের সাক্ষাৎ পাবেন কদাচিৎ। বাংলা শব্দের মানে তো জানাই আছে, অভিধান দেখতে হবে কেন, এরকমই আমাদের ধারণা। আসলে এর মূলে আছে এ গ্রন্থটির আঙ্গিক, বিষয়বস্তু সম্পর্কে উদাসীনতা (অজ্ঞতাও)।

যে কোনও একটি বাজার চলতি অভিধানের পাতা খুলুন, দেখুন কী আছে এতে :

(১)   শীর্ষশব্দ: head word।

(২)   শব্দের পদ: বি, বিণ, সর্ব, অব্য, ক্রি ইত্যাদি।

(৩)   উচ্চারণ : ডায়েক্রিটিক চিহ্ন সহ বা চিহ্নবিহীন, অনেক সময় রোমান হরফেও।

(৪)   লিঙ্গ: স্ত্রী, পুং।

(৫)   ব্যুৎপত্তি : কীভাবে শব্দটি এল, এবং কোন মূলশব্দ থেকে- সং, আ, ফা, ইং।

(৬)   অর্থ: উদাহরণসহ, সমশব্দ, বিপরীতার্থক শব্দ দিয়েও।

(৭)   প্রয়োগ: সাহিত্যকৃতি থেকে, ব্যাকরণ গ্রন্থ থেকে, প্রাত্যহিক কথোপকথন থেকেও।

অবশ্য সব অভিধানে যে উপরে বর্ণিত সবকিছু থাকবে, তা নয়। কোনও অভিধানে আলোচিত হয় ব্যাকরণের সূক্ষ্ম, জটিল বিষয়, সংস্কৃত বা অন্য সাহিত্য, ব্যাকরণগ্রন্থ থেকে উদাহরণসূত্র, তত্ত্বকথা- যেমন আছে আচার্য হরিচরণের ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’-এ। নানা তত্ত্বের সমাহারে এ গ্রন্থ নিছক অভিধান নয়, হয়ে উঠেছে একটি কোষগ্রন্থ।

অভিধানের কারবার অতি অবশ্যই শব্দ নিয়ে, কিন্তু সার্বিকভাবে অভিধান তো একটি জাতীয় জীবনের দর্পণই। যখনই একটি জাতির জীবনে আত্মসচেতনতার উন্মেষ ঘটে, বিদ্বজ্জনেরা মনোনিবেশ করেন অভিধান রচনায়। ‘এনলাইটেনমেন্ট’-এর সূত্র ধরে যখন বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ভাষা, সাহিত্য, দর্শন এবং উদ্যোগে ইংরেজরা সারা বিশ্বে একটি অপ্রতিদ্বন্দ্বী জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছিল তখনই অভিধান প্রণয়নের প্রয়োজন অনুভূত হল। ডক্টর স্যামুয়েল জনসন সেই অষ্টাদশ শতকে লিখলেন A Dictionary of the English Language (১৭৫৫)। ঔপনিবেশিক বাংলায় উনবিংশ শতাব্দীর নবজাগরণে আত্মপ্রকাশ করল এক নয়, আধ-ডজন ডিকশনারি-হোক না সে বিদেশিদের দ্বারা, বিদেশী ভাষায়। এ পথ দিয়েই তো আত্মপ্রকাশ করল দেশীয় অভিধান, দেশীয় ভাষায়। অভিধানের হাত ধরেই একটি ভাষা সাবালকত্ব লাভ করে, জাতিসত্তার ভিত্তিটা সুদৃঢ় হয়, জাতীয়তাবোধের উন্মেষও ঘটে। পশ্চিমী ঔপনিবেশিকদের বিরুদ্ধাচরণ করে স্বাধীন সার্বভৌম জাতিরাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশের পেছনেও ভাষা সচেতনতা, ভাষাতত্ত্ব, ভাষাবিজ্ঞানচর্চার একটা ভূমিকা ছিল। আব্দুল হাই, মুনীর চৌধুরী, মুস্তফা জব্বার এরা উনিশশো ষাটের দশকে আয়ুব শাহির বিরুদ্ধে লড়তে লড়তেই ভাষাবিজ্ঞানের চর্চা অব্যাহত রেখেছেন। মুনীর চৌধুরী অবশ্য মুক্তিযুদ্ধে প্রাণও দিয়েছেন, কিন্তু বাংলা ভাষার সঙ্গে প্রযুক্তির মেলবন্ধন ঘটিয়ে গেছেন তিনি। তাঁর ‘মুনীর অপ্টিমা’, আর জব্বারের ‘বিজয় কী বোর্ড ও সফটওয়ার’ বাংলা ভাষাকে বহুদুর এগিয়ে নিয়ে গেছে। একথা অনস্বীকার্য যে, অভিধানের হাত ধরেই একটি ভাষা সাবালকত্ব লাভ করে এবং জাতিসত্তার ভিত্তিটি সুদৃঢ় হয়, একটি জাতির মধ্যে আত্মসচতনতা জেগে ওঠে।

অভিধান যে কেবলমাত্র একটি ‘মানে বই’ নয় এটা বোঝাতেই এত কথা। এ সচেতনতার অভাবে আজ আমরা এঙ্গলোবেঙ্গলি ডিকশনারির পেছনে ছুটি, স্কুল-কলেজ লাইব্রেরিতে, ব্যক্তিগত সংগ্রহে বাংলা (চলতি পরিভাষার বেঙ্গলি-টু বেঙ্গলি) অভিধান অগ্রাধিকার পায় না। অভিধান যেন ইংরেজি শেখার একটি সহায়ক গ্রন্থ, আর কিছুই নয়।


অভিধান

অভিধান একই সঙ্গে ব্যাকরণ, দর্শন, বিজ্ঞানের আকর। এ বিবেচনা মাথায় রেখে অভিধানের পৃষ্ঠা ওল্টালে একটি সৃজনশীল গ্রন্থপাঠের অভিজ্ঞতা লাভও সম্ভব। অভিধানকে ভিত্তি করে মানসভ্রমণ যে কী সুখকর কর্ম এর কিছু উদাহরণ দেওয়া যাক্। একটি ইংরেজি Etymological ডিকশনারি খুলুন (Chambers হলে ভাল)। বের করুন Admiral বা Assassination শব্দদুটো। ডিকশনারি জানাবে শব্দগুলো আরবি-মূলের, প্রথমটি এসেছে ‘আমির-উল-বহর’ থেকে। ‘আমির’ মানে ‘নেতা/প্রভু/প্রধান’, ‘উল’ মানে ‘এর’, আর ‘বহর’ মানে ‘সাগর’। শব্দটির অর্থ হল ‘নৌ-সেনাপ্রধান’ ইংরেজিতে অ্যাডমিরাল। আরবি শব্দটিকে দশম শতকে ক্রুসেড, অর্থাৎ ধর্মযুদ্ধের সময় ফরাসি যোদ্ধারা আরবীয় যোদ্ধাদের থেকেই গ্রহণ করেছে। শব্দটি ফ্রান্সে পৌঁছেছে। Amiral হয়ে, এবং সাগর পেরিয়ে ইংল্যান্ড গিয়ে হল Admiral। D-বর্ণটির প্রয়োগে feminine ভাষার শব্দটিতে masquiline চরিত্রলক্ষণ আরোপিত হল।

আর, দ্বিতীয় শব্দটির উৎসে আছে আরবীয় মরুভূমিতে উৎপন্ন একধরনের গুল্ম ‘হাসিস’, যার নির্যাস পাণীয়ের সঙ্গে মিশিয়ে ক্রুসেডের সময় আরবি সেনানায়করা ইউরোপীয় যোদ্ধাদের কপট সন্ধিতে ডেকে এনে পান করাত, যা তাদের মৃত্যু ডেকে আনত ধীরে ধীরে। এ থেকে assassin-ভীতি ছড়িয়ে পড়ল ইউরোপীয় শিবিরে, এবং ক্রমে হাসিস দিয়ে শত্রুনিধন, অর্থাৎ assassination কর্মটির অর্থসম্প্রসারণ ঘটল যে-কোনও রাজনৈতিক হত্যার প্রতিশব্দ হিসেবে।

রাজশেখর বসুর ‘চলন্তিকা’ খুলে দেখুন, ‘গোলাপ’ শব্দটি উৎস-সংকেতে আছে ফা. গুলাব। সারাবিশ্বে অন্যতম জনপ্রিয় এ ফুলটির আদিভূমি যে পারশ্যদেশ, এ অনুসন্ধানের শুরু হতে পারে এখান থেকেই। প্রাচীন ও মধ্যযুগের সাহিত্য, লোকসংস্কৃতি, ইতিহাস ঘেঁটে দেখুন কুন্দ-কুসুম-বেলী-চামেলি-কত ফুলের সাক্ষাৎ পাবেন, কিন্তু পাবেন না গোলাপ। পূজাবিধিতে এ ফুলটি অনুপস্থিত, কারণ ফুলটি বিদেশি এবং অর্বাচীনও। খুলুন হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, দেখবেন এ দেশে পদ্মফুল ফুটছে। সেই মহাভারতের যুগে, রামায়ণের যুগেও, এর উল্লেখ রয়েছে অমরকোষ টীকা, কালিদাসের উত্তরমেঘ, রঘুবংশ, কৃত্তিবাসী রামায়ণ থেকে ভারতচন্দ্র, বিদ্যাসুন্দর আর মনসামঙ্গলেও। যদি কৌতূহল হয় শেফালি ফুল সম্বন্ধে, বঙ্গীয় শব্দকোষ জানাচ্ছে। এ ফুলটি সুবাস ছড়িয়েছে কালিদাসের ‘ঋতুসংহার’, কৃত্তিবাসের ‘রামায়ণ’-এর কালেও। এখন পাঠক কোনও উদ্ভিদ বিজ্ঞানের বই না খুলে অভিধান বা শব্দকোষ খুঁজে দেখলেই জানতে পারবেন কত কিছু, একেবারে স্বল্প পরিশ্রমে।

(এ পাঠক্রমের প্রথম ষান্মাসিক, ২য় পত্রের বইতে আরও দেখুন পৃ. ৪৬-৫০।)

যারা ভাষা নিয়ে প্রাগ্রসর চর্চা (Advance study) করেন, এরা তো বটেই, আর যাঁরা মোটামুটি চর্চা করেন এরাও জানেন বাংলার সঙ্গে মিশে আছে বিস্তর আরবি-ফারসি-তুরকি শব্দ এবং এ থেকে উৎস অসংখ্য শব্দ আমাদের প্রাত্যহিক কথাবার্তায়ই রয়েছে। এরকম একটি Phrase হল ‘তুঘলকি কাণ্ড’। একটা আরবি ডিকশনারি ঘাঁটালে যা তথ্য বেরোবে তা আমাদের চমকিত করে দেবে বই কি। শব্দটির ঐতিহাসিক ভিত্তিতে আছেন দশম শতকের দিল্লির সুলতান মোহম্মদ বিন-তুঘলক, যিনি অনেক হঠকারি সিদ্ধান্ত নিয়ে ইতিহাসে ধিকৃত। কিন্তু ইতিহাসের পরিহাসই এটা, অদ্যাবধি আমাদের সমস্ত ভর্ৎসনা সেই দিল্লিশ্বরের উপর নয়, তাঁর স্বর্গত পিতৃদেবের উপরই বর্ষিত হচ্ছে। সুলতানের নাম মোহম্মদ, তুঘলক তাঁর শ্রদ্ধেয় পিতৃদেবের নাম। কিন্তু আমরা গালি পাড়ি, ‘এসব কী তুঘলকি কাণ্ড।’ অভিধানে আছে ‘বিন’ শব্দের অর্থ পুত্র। নামটির অর্থ হল ‘তুঘলকের পুত্র মোহম্মদ’। তদ্রুপ ইদানীং কুখ্যাত পুত্রের দোষে শ্রীযুক্ত লাদেন মহোদয় বিশ্বব্যাপী নিন্দিত হচ্ছেন। কিন্তু ভর্ৎসনা যার প্রাপ্য তাঁর নাম ‘ওসামা’, ইনি আসলে লাদেনের ‘বিন’ অর্থাৎ পুত্র। অভিধান না দেখায়ই এ ঐতিহাসিক বিপত্তি।

কথাটা বলে নেওয়া প্রয়োজন, আমাদের স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে আরবি-ফারসির প্রাথমিক জ্ঞান সম্পন্ন ব্যক্তির অভাব নেই, এবং অভিধান দেখে বাংলা ভাষা চর্চায় সহায়তা করতে সক্ষম মৌলভি বা শিক্ষক, অধ্যাপকরা আমাদের আশেপাশেই আছেন। বাংলা ভাষা শিক্ষায় এদের সাহায্য নেওয়া নিতান্তই অপরিহার্য।

মনে রাখুন :

  • অভিধান শুধুমাত্র ‘মানে বই’ নয়।
  • অভিধান অনেক ধরনের হয়-যেমন শব্দাভিধান, প্রয়োগ অভিধান, বানান অভিধান,শব্দকোষ ইত্যাদি।
  • অভিধান একটি জাতীয় জীবনের দর্পণ।
  • তথ্য ও তত্ত্বের আকর হলেও অভিধান একটি সুখপাঠ্য গ্রন্থও বটে।
২.৩   বাংলা অভিধানের কথা

ইতিপূর্বে আমরা বিদেশি ভাষাবিদ প্রণীত অভিধানের প্রসঙ্গ আলোচনা করেছি (১ম যাণ্মাসিক পাঠক্রম - ১ এবং ২ অধ্যায়)। আমরা পর্তুগিজ পাদ্রি মনোএল, ইংরেজ পণ্ডিত হ্যালহেড, ফরস্টার, কেরি সাহেব, মার্সম্যান, বিমস প্রভৃতি ভাষাবিদদের কাজ সম্বন্ধে জেনেছি। এবার আসা যাক্ দেশীয় পণ্ডিতদের ভাষাতত্ত্ব ও অভিধানচর্চা প্রসঙ্গে। অবশ্য বাংলায় প্রথম দ্বিভাষিক, অর্থাৎ ইংরেজি-বাংলা ডিকশনারির-প্রণেতা সেই বিদেশি পণ্ডিত উইলিয়াম কেরিই। তাঁর দুই খণ্ডে, ২১৬০টি শব্দ সমন্বিত, A Dictionary of the Bengali Language প্রকাশিত হয় ১৮১৫ এবং ১৮২৫ খ্রিস্টাব্দে। এতে রয়েছে পদ পরিচয়, লিঙ্গপরিচয়, শীর্ষশব্দের রোমান প্রতিবর্ণও। তবে, এর আগে ১৮০৯ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয়েছে মোহনপ্রসাদ ঠাকুর প্রণীত ‘সংস্কৃত-বাংলা অভিধান’, এবং ১৮১০ সালে ‘বাংলা ইংরেজি অভিধান।’

এ পর্যায়ের জন্য অভিধানগুলো মধ্যে অন্যতম হল তারাচাঁদ চক্রবর্তীর Dictionary in Bengali and English (1827), রামচন্দ্র বিদ্যাবাগীশের ‘বঙ্গভাষাভিধান’ (১৮১৭), তারাচন্দ্র শর্মার ‘শব্দার্থ প্রকাশ অভিধান’ (১৮৩৮), জগন্নাথ মল্লিকের ‘শব্দকল্পতরঙ্গিনী’ (১৮৩৯), দ্বিগম্বর ভট্টাচার্যের ‘শব্দার্থ প্রকাশভিধান’ (১৮৫২), মুক্তারাম বিদ্যাবাগীশের ‘শব্দাম্বুধি’ (১৮৫৪) ইত্যাদি। এ তালিকার বাইরে আরও অনেক অভিধান রয়েছে, ঊনবিংশ শতকে ভাষার বিকাশ ও বাঙালিজাতির আত্মসচেতনতার প্রসারে যাদের বিশেষ ভূমিকা ছিল। বিংশ শতাব্দীর প্রথম থেকেই প্রকাশিত হতে শুরু হয়েছে বাংলা অভিধান, যার মধ্যে সুবলচন্দ্র মিত্রর ‘সরল বাংলা অভিধান’ (১৯০৬), রজনীকান্ত বিদ্যাবিনোদের ‘বঙ্গীয় শব্দসিন্ধু’, হরিচরণ দে'র ‘নূতন বাংলা অভিধান’ (১৯১১), আশুতোষ ধর প্রণীত ‘আশুতোষ অভিধান’ (১৯১২) অন্যতম। ১৯১৩ থেকে ১৯১৫ সাল পর্যন্ত চার খণ্ডে প্রকাশিত যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধি প্রণীত ‘শব্দকোষ’, ১৯১৭ সালে জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের ‘বাঙ্গালা ভাষার অভিধান’, প্রকাশচন্দ্র দত্তর ‘সরল বাঙালা অভিধান’ (১৯১৭), আর ১৯২৩ সালে কাজী ওয়ায়েজউদ্দিন আহমেদের ‘মক্তব অভিধান’ ইত্যাদি।

বাংলা অভিধান তথা ভাষাতত্ত্বচর্চার আচার্য হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রণীত বৃহদায়তন গ্রন্থ, ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’ প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে সৃষ্টি হল নতুন যুগ। ১৯৩২ থেকে ১৯৫১ সাল পর্যন্ত এ অভিধানের ৫টি খণ্ড প্রকাশিত হয়। পরবর্তী কালে সাহিত্য অকাদেমি, নতুন দিল্লি এ গ্রন্থটিকে দুই খণ্ডে প্রকাশ করেছেন (১৯৬৬)। দীর্ঘ ২৮ বছর অক্লান্ত পরিশ্রমে বাঙালিদের জন্য কী কর্মটি তিনি করে গিয়েছেন এর কিছু পরিচয় পাওয়া যাবে বুদ্ধদেব বসুর ‘একটি জীবন’ গল্পতে যেখানে জগত্তারিনী স্কুলের হেডপণ্ডিতের মধ্যে প্রচ্ছন্ন রয়েছেন হরিচরণ (এ নিয়ে একটি বাংলা ছবিও রয়েছে)। ইংরেজ অভিধানকার ডক্টর স্যামুয়েল জনসনের সঙ্গে তুলনা করে ভাষাচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পর্কে বলেন-‘এই অলস নিরুৎসাহ, অল্পোদ্যম এবং আশাভঙ্গ জাতির মধ্যে তিনি এক পুরুষসিংহ’। একটা পর্যায়ে অবশ্য কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর প্রতিভার পরিচয় পেয়ে সাহায্যের হাত বাড়ান, কিন্তু তবুও এ বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থানের জন্য হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে অশেষ কষ্ট স্বীকার করতে হয়েছে।

‘চলন্তিকা’ নামক বহুল প্রচলিত বাংলা অভিধান প্র ণেতা রাজশেখর বসু হরিচরণও তাঁর অভিধান সম্পর্কে বলেছেন- ‘তিনি সংস্কৃত সাহিত্য হইতে রাশি রাশি প্রয়োগের দৃষ্টান্ত আহরণ করিয়াছেন। এই বিশাল কোষগ্রন্থে যে শব্দসম্ভার ও অর্থবৈচিত্র্য রহিয়াছে তাহাতে কেবল বর্তমানে বাংলা সাহিত্যের চর্চা সুগম হইবে এমন নয়, ভবিষ্যৎ সাহিত্য ও সমৃদ্ধ হইবে।’ ইউরোপে যে-কাজ একদল পণ্ডিত একটি বিশাল প্রতিষ্ঠানের ছত্রচ্ছায়ায় দীর্ঘদিনের প্রয়াসে এবং বিশাল ব্যয়সাপেক্ষে সম্পন্ন করেন বা করেছেন। আচার্য হরিচরণ দারিদ্র, পাণ্ডিত্য এবং একনিষ্ট সাধনা সম্বল করেই এ কাজটিতে নিজেকে নিঃশেষ করে দিলেন।



সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় এ মহাগ্রন্থের নবসংস্করণের ভূমিকায় লিখেছেন –

এরূপ অভিধান বাঙ্গালা ভাষায় ইতিপূর্বে বাহির হয় নাই। এতাবৎ শ্রীযুক্ত জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের অভিধান বাঙ্গালার সর্বশ্রেষ্ঠ অভিধান পরিগণিত ছিল। এই অভিধানের শব্দসংখ্যা ৭৫,০০০। বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়ের অভিধানের শব্দ-সংখ্যা নিঃসন্দেহ-রূপে আরও অনেক অধিক হইবে। অর্থ-বিচার ও প্রয়োগ প্রদর্শনে শ্রীযুক্ত জ্ঞানেন্দ্রবাবু বিশেষ কৃতিত্ব দেখাইয়াছেন। বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় যথেষ্ট পরিমাণে প্রয়োগ উদ্ধার করিয়া দিয়াছেন এবং সংস্কৃত শব্দাবলীর পূর্ণ আলোচনার জন্য বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়ের অভিধান সাহিত্যিক ও শিক্ষার্থীর পক্ষে অপরিহার্য হইবে। দাস মহাশয়ের অভিধান এখন আর ছাপা নাই, তবে ইহার নতুন সংস্করণ প্রস্তুত হইতেছে। ইহার পুনঃপ্রকাশ হইলে শ্রীযুক্ত হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়ের অভিধান, শ্রীযুক্ত জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস মহাশয়ের অভিধান এবং শ্রীযুক্ত রাজশেখর বসুর ‘চলন্তিকা’ বাঙ্গালা ভাষার যথাক্রমে সর্ববৃহৎ, মধ্যম এবং লঘু অভিধান বলিয়া পরিগণিত হইবে। (কলিকাতা-১৩৭২)।

হরিচরণের আগে প্রকাশিত হয়েছে রাজশেখর বসুর ‘চলন্তিকা’ (১৯৩০)। ‘ত্রিশ হাজারেরও অধিক সংস্কৃত, সংস্কৃতজাত, দেশজ ও বিদেশি’ শব্দের ৭৩০ (+পরিশিষ্ট ৯৬) পৃষ্ঠার এ অভিধানের অনেকগুলো সংস্করণ বেরিয়েছে, দেশে-বিদেশে এর অনেকগুলো নকল সংস্করণও (ফটোকপি) বাজারে সহজলভ্য। রাজশেখর বসু অবশ্য নিজের জীবদ্দশায়ই এর সংশোধিত, সংযোজিত সংস্করণ বের করে গেছেন, এবং ১৯৫৫ সালে এর ৮ম সংস্করণে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বানান-পদ্ধতিও গ্রহণ করে গেছেন। তাছাড়া পরিশিষ্ট অংশে শব্দের ক্রিয়ারূপ, বিভক্তি, কারক, সর্বনামের তালিকা এবং ইংরেজি পরিভাষিক শব্দের বাংলা অনুবাদ সংযোজন করে এ বইকে প্রতিদিনের ব্যবহারযোগ্য করে তুলেছেন।

১৯৫৪ সালে কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয় আশুতোষ দেব সংকলিত ইংরেজি-বাংলা অভিধান, Student's Favourite Dictionary - যে অভিধানের জনপ্রিয়তা প্রশ্নাতীত। গ্রামেগঞ্জে শিক্ষিত মানুষ তো বটেই, যাদের স্কুলের গন্ডি পেরোনো হয়নি, এদেরও অতি পরিচিতজন এই এ, টি দেব। যে-কোনও বইয়ের দোকান, স্কুল-কলেজ লাইব্রেরি সর্বত্রই একখণ্ড এটি দেব থাকবেই। উচ্চশিক্ষার গর্বে আমরা যতই গরীয়ান হই না কেন, এটি দেব ঘেঁটেই আমাদের শব্দ-সন্ধানের সূচনা, এটা স্বীকার করতে হবে। আমাদের উত্তর-স্বাধীনতা পর্বের অবহেলিত উত্তরাধিকারই হল এটি দেবের অভিধান।

আমাদের এই পর্বের অভিধান প্রকাশনায় মাইলফলক হল ১৯৫৯ সালে প্রকাশিত, শৈলেন্দ্র বিশ্বাস প্রণীত ‘সংসদ বেঙ্গলি ইংলিশ ডিকশনারি’।

এ পর্বে আরও দুটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন হল গোলাম মুরশিদ প্রণীত ‘বেঙ্গলি-ইংলিশ-বেঙ্গলি অভিধান’ (২ খণ্ড, লন্ডন, ১৯৮৮), এবং বাংলা একাডেমি, ঢাকা প্রকাশিত ‘বিবর্তনমূলক বাংলা অভিধান’ (২০ খণ্ড, ২০১৫)। তিন হাজারেরও বেশি পৃষ্ঠার এ অভিধানে বাংলা ভাষায় পরিবর্তনের সমস্ত স্বাক্ষর ধরে রাখার প্রয়াস নেওয়া হয়েছে। যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে যে ভাষারও পরিবর্তন হয় এটা যদি অভিধানে ধরে না রাখা যায়, তবে ভাষার অগ্রগতি ব্যাহত হতে বাধ্য। বাংলা ভাষায় ১৮১৭ সাল থেকে অদ্যাবধি অসংখ্য অভিধান রচিত হলেও Oxford English Dictionary (OED)-এর মতো Progressive অর্থাৎ বিবর্তনমূলক অভিধান রচিত হয়নি। অক্সফোর্ড অভিধানটিতে শব্দের ব্যুৎপত্তি এবং এ সঙ্গে শব্দের প্রথম ব্যবহারের তারিখ এবং দৃষ্টান্ত দেওয়া থাকে, দেওয়া থাকে দশকে দশকে শব্দের অর্থান্তর ও রূপান্তরের উদাহরণ। এ অভিধান পাঠ করলে এক একটা ইংরেজি শব্দ বহু শতাব্দী অতিক্রম করে কীভাবে বর্তমান রূপ এবং অর্থ লাভ করেছে তা জানা যায়। ১৯২৮ সালের আগে সুবলচন্দ্র মিত্র (১৯০৬), জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস (১৯১৭) অনেক সীমাবদ্ধতা নিয়েই চমৎকার অভিধান রচনার নমুনা দেখিয়ে দিলেও, বাংলা অভিধান-পদ্ধতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রয়াস দেখা যায়নি। ইতিমধ্যে বাংলা শব্দসংখ্যা বিপুল পরিমাণে বেড়েছে, কিন্তু নতুন প্রেক্ষিতে নতুন অভিজ্ঞতায়, নতুন প্রাসঙ্গিকতায় আমাদের ব্যবহৃত শব্দ, শব্দগুচ্ছ, শব্দশ্রেণী আমাদের অভিধানে ঠাঁই পাচ্ছে না। বাংলা সাহিত্য, পত্রপত্রিকা, নাটক, সিনেমা, ইতিহাস, দর্শন, বিজ্ঞান চর্চার অনুষঙ্গে শুধু নতুন শব্দই আসেনি এসেছে নতুন প্রকাশভঙ্গি, অর্থান্তরও। এ সব বিবেচনায়ই বাংলাদেশের এই বিবর্তনমূলক অভিধান অক্সফোর্ড ডিকশনারির প্রতিস্পর্ধী নয়, তবে এর অভীষ্ট ওই দিকেই।

২.৪   অভিধান কত রকমের হতে পারে

ব্যুৎপত্তিগত দিকে ‘অভিধান’ মানে ‘শব্দার্থ’। শব্দটি এসেছে ‘অভিধা’ থেকে। হরিচরণে বলা হয়েছে, অভিধা হল ‘যাহা দ্বারা অভিহিত হয়, সংজ্ঞা, আখ্যা, নাম’ (বঙ্গীয় শব্দকোষ, পৃ ১৫১)। ‘চলন্তিকা’য় আছে, অভিধা হল শব্দের অর্থবোধক শক্তি। তবে রাজশেখর বসু অভিধানের অর্থ হিসেবে ‘শব্দকোষ’ই ব্যবহার করেছেন। আসলে শব্দকোষের অর্থ ইংরেজি এনসাইক্লোপিডিয়ার কাছাকাছি, তবে এনসাইক্লোপিডিয়া নয়। হরিচরণের শব্দকোষে যা আছে তা হল এনসাইক্লোপিডিয়ার চরিত্রলক্ষণ। তার ব্যাপ্তিটা বিশাল। এনসাইক্লোপিডিয়া নিশ্চিত ডিকশনারির প্রতিশব্দ নয়, এর বাংলা প্রতিশব্দ হল বিশ্বকোষ। শব্দকোষ অতি অবশ্যই অভিধান, কিন্তু সব অভিধান তো শব্দকোষ নয়। ‘চলন্তিকায়’ যা পাওয়া যাবে না তার জন্য যেতে হবে হরিচরণে, কারণ হরিচরণের গ্রন্থটি শব্দকোষ। এতে শব্দের অর্থ বা মানের চাইতে আরও অনেক কিছু রয়েছে যা অপরাপর ডিকশনারিতে নেই।

কোষগ্রন্থ ছাড়াও রয়েছে বিষয় ভিত্তিক অভিধান। ব্যুৎপত্তি অভিধান (Etymaln বানান অভিধান, অপভাষা (Slang) অভিধান, উচ্চারণ অভিধান, লোকসংস্কৃতি প্রচিয় বিজ্ঞান অভিধান ইত্যাদি। (আঞ্চলিক ভাষা ও শব্দের অভিধানের কথা প্রথম যান্মাসিক, ই। এ আলোচিত হয়েছে।)

ইংরেজি প্রায় সব ডিকশনারিতেই শব্দের উচ্চারণ দেখিয়ে দেওয়া হয় টেকনিক্যারি অর্থাৎ ডায়াক্রিটিক চিহ্ন দিয়ে, কিংবা respell বা phonetic spelling দিয়ে। বাংলায়। অভিধানে এটা থাকেনা। এ জন্য ১৯৯২ সালে ঋষি দাস সংকলিত, পবিত্র সরকারের ভূমিকায় প্রকাশিত হয়েছে “উচ্চারণযুক্ত আধুনিক বাংলা অভিধান”। ইতিমধ্যে এর ৮টি সংস্কর বেরিয়েও গেছে। বাংলাভাষার বিস্তৃতি এবং প্রসারের ফলে উচ্চারণে সঠিক দিশা দেখানে প্রয়োজন তো আছেই। রেডিও-টিভি-সিনেমা-রেকর্ড-মঞ্চনাটকে উপস্থাপনের জন্য উচ্চারণে একটা নির্দিষ্ট মাপ থাকা চাই। তাছাড়াও উচ্চারণই আমাদের বানান প্রকরণকে নিয়ন্ত্রণ ব্যয় বাংলা বানান বিভ্রমের অনেকগুলো কারণের একটি অবশ্যই উচ্চারণ। বাংলা শব্দের মান্যচলিত উচ্চারণ কী হবে তার যেমন ব্যাকরণ সিদ্ধ নিয়ম আছে তেমনি এর ব্যতিক্রমও রয়েছে। তৎসম তদ্ভব শব্দের ক্ষেত্রটা মোটামুটি চিহ্নিত হলেও বিদেশি, আঞ্চলিক বা প্রাদেশিক শব্দের উচ্চার ও বানান নিয়ে সমস্যার অন্ত নেই।

আবার নিরক্ষর, অর্ধসাক্ষর, শিক্ষিত অথচ উচ্চারণ-অসচেতন বা উচ্চারণ নিয়ে একেবারে উদাসীন-এ সব ধরনের লোকের বাক্-প্রকরণ নিয়েই বাংলাভাষার উচ্চারণ জগৎ।

 

পঞ্চাশ বছর আগে বাঙালি যেরকম উচ্চারণ করেছে, আজকের বাঙালি সেরকম করছে না। শুনুন বহুশ্রত রবীন্দ্রসংগীত-‘আজি বিজন ঘরে বিজন ঘরে নিশীথ রাতে’। এতে ‘বিজোন-অ’ ঘরে থেকে ‘বিজন ঘরে’, ‘নিশীথ-অ’ থেকে নিশীথ’ রাতে রূপান্তরের (দেখুন পবিত্র সরকারের ‘রবীন্দ্রসংগীতের উচ্চারণ’, বাংলা সংগীত মেলা, স্মরণিকা, ১৪০৭, কলকাতা) উদাহরণ তো আমাদের সামনেই রয়েছে। শ্রী সরকার লিখেছেন, “রেকর্ডে রবীন্দ্রনাথের আবৃত্তিতে যেখানে পরিষ্কার ‘বন’, ‘মন’ শোনা যায় সেখানে ঐ শব্দগুলোকে এখনকার মান্য চলতি ভাষায় ‘বোন’, ‘মোন, উচ্চারণ করি-এ সহজেই লক্ষ্য করা যায়। সাহানা দেবী বা শৈল দেবীর একক ‘স’-এর উচ্চারণ খানিকটা সম্মুখবর্তী ছিল তালব্য-শ ধ্বনির তুলনায়, এখন বিশুদ্ধ তালব্য-শ্ হিসেবে উচ্চারিত হয়। এখন আমরা ‘তেমনই’ কথাটিকে ‘ত্যামোনি’ উচ্চারণ করি, কিন্তু রবীন্দ্রসংগীতে ‘তেমন’ উচ্চারণ করতে হবে’- এটা ধার্য আছে।” রজনীকান্তর সেই গান, ‘তুমি নির্মল করো মঙ্গল করো’, এতে আছে ‘লক্ষ্যশূন্য লক্ষ বাসনা ছুটিছে গভীর আঁধারে।’ এসব শব্দের শুদ্ধ উচ্চারণের জন্য উচ্চারণ অভিধানই দেখতে হবে। আর, সে সঙ্গে Audio উচ্চারণ থাকলে তো আরও ভাল। ইংরেজিতে ওসব অনেক আগেই হয়ে গেছে। বাংলাদেশেও এ নিয়ে কাজ চলছে, ভারতে, অর্থাৎ বাংলাভাষার প্রথম কিংবা তৃতীয় ভুবনে কবে কী ভাবে এটা হবে সেটাও প্রশ্ন (প্রসনো, না প্রশনো না আর কিছু)।

ভাষা সম্পর্কিত অভিধানগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রয়োগ-অভিধান, বানান অভিধান, পরিভাষা কোষ, বিপরীতার্থক শব্দাবিধান, সমার্থক শব্দাভিধান (থিসোরাস), আঞ্চলিক শব্দাভিধান ইত্যাদি।

লিখতে গিয়ে সমস্যা হল, ‘কোথাও’ লিখবেন, না ‘কোথা’ লিখবেন, কারও লিখবেন না কারো, কোন ক্ষেত্রে লিখব ‘কী’, আর কোথায় ‘কি’, কৃতি আর কৃতী, পার পাড়, সর্বজনীন আর সার্বজনীন নিয়ে সংশয় হলে খুলতেই হবে প্রয়োগ-অভিধান। সরকারি কাজকর্মের সুবিধার জন্য আছে পরিভাষা কোষ, একেবারে সাংবিধানিক প্রধান থেকে তৃণমূল স্তরের আমলাদের দেশীয় পদবির অনুবাদ দেখতে হলে এই বই খুলতে হবে। তবে পশ্চিমবঙ্গের পরিভাষার সঙ্গে আসাম বা ত্রিপুরার, এবং বাংলাদেশের পরিভাষার বিস্তর তফাৎ আছে। Commissioner আয়ুক্ত, Deputy Commissioner উপায়ুক্ত, Superintendent of Police আরক্ষী অধীক্ষক, Sub-Registrar অব-নিবন্ধক এগুলো হল আসামে ব্যবহৃত পরিভাষা যা বাংলা, অসমিয়া উভয় ভাষাতেই চলে। অফিস আদালতের কাজকর্মে তো পরিভাষা অপরিহার্য, কিন্তু সৃজনশীল সাহিত্য পাঠ, এমনকি রচনায়ও এ নীরস বইটির প্রয়োজন হয় বই কি।

এ কথাটি অতীব সত্য, সাক্ষর বাঙালি কখনওই এক শব্দের একই বানান লিখতে পারেনি, পারছেও না। ১৯৩৬ সাল থেকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এবং এরপর বাংলা একাডেমী, ঢাকা, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি বানান প্রকরণকে একটি সুসংহত বিধির আওতায় আনতে চাইছেন, যদিও কাজটি খুব সহজসাধ্য নয়। তবে সমতা আনার জন্য একাধিক বানান অভিধান প্রকাশিত হয়েছে, এগুলো দেখাও প্রয়োজন। পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমির ‘আকাদেমি বানান অভিধান’ (১৯৯২)-এর অনেকগুলো সংস্করণ হয়ে গেছে এবং এটি ইতিমধ্যে বাঙালির নিত্য ব্যবহৃত বইও হয়ে উঠেছে। আর, বাংলায় রয়েছে অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক শব্দকোষ-পুরাণ শব্দকোষ, মহাভারত শব্দকোষ, লোকসংস্কৃতি শব্দকোষ, বিজ্ঞান শব্দকোষ, অর্থনীতি শব্দকোষ ইত্যাদি।

 

বিভিন্ন সংবাদপত্র বা অ্যাকাডেমিকসের নিজস্ব বানান বিধি এবং নিত্য ব্যবহারের জন্য মুদ্রিত পুস্তিকাও রয়েছে। এর মধ্যে আনন্দবাজার পত্রিকার ব্যবহার বিধি, সংবাদপত্র বা অ্যাকাডেমিকসের নিজস্ব বানান বিধি 'বাংলা কী লিখবেন, কেন লিখবেন (১৯৯১), এবং ‘বাংলা লেখক ও সম্পাদকের অভিধান’ (১৯১৪) বইগুলোর অনেকগুলো সংস্করণ বেরিয়ে গেছে। এবং লেখক সম্পাদক ছাড়া সাধারণ পাঠক ও ভাষা-অন্বেষুদের কাছে জনপ্রিয়তাও লাভ করেছে। অবশ্য এ বইয়ের নির্দেশ যে সর্বজনগ্রাহ্য তাও নয়। বিশেষ করে প্রাদেশিক, এমনকি বিদেশী নামের বানানেও বিস্তর অসঙ্গতি রয়েছে এতে। তিলক না লিখে বলা হয়েছে ‘লিখুন টিলক’, ‘লিখুন পাটিল’, ‘বাবা আমটে’। আনন্দবাজার পত্রিকায় ক্রিকেটর সুনীল গাভাস্কার-এর স্থলে ‘গাওস্কর’ ছাপা হলেও পাঠক এটা স্বীকার করেননি। মহাত্মা গান্ধীকে ‘গাঁধি’ লিখতে নির্দেশ দেওয়া হলেও পত্রিকায় মুদ্রিত বানান পাঠকদের ভ্রকুঞ্চনের কারণ হয় বই কি।

২০১৪ সালে প্রকাশিত হয়েছে ‘মুসলমান শব্দকোষ’, (জাহিরুল হাসান)। ধর্মীয় নয়, সমাজতাত্ত্বিক এবং ঐতিহাসিক দিক থেকে ইসলামীয় অনুষঙ্গে বাংলা ভাষায় আসা শব্দ এবং এর হাত ধরে ব্যক্তিনাম, ঘটনা, সাহিত্যের অভিজ্ঞান নিয়ে এ কোষগ্রন্থটি সার্বিক ভাবে বাঙালি পাঠকদের জন্য লেখা। যাঁরা অনেক সময় আক্ষেপ করে বলেন, ‘এতকাল আমরা পাশাপাশি আছি অথচ মুসলমান প্রতিবেশীর সমাজ ধর্ম ভাষা সম্পর্কে কিছুই জানি না’- এরা তৃপ্ত হবেন বইটি হাতে পেলে।

এ প্রসঙ্গের সমাপ্তিতে উল্লেখ করতে হবে ‘চরিতাভিধান’-এর কথা। অতীত, বর্তমানের মনীষীদের তথ্যবহুল জীবনী সম্বলিত এ ধরনের কোষগ্রন্থ দেশবিদেশে অগুনতি। বাংলায় সাহিত্য সংসদ প্রকাশিত এরকম একটি কোষগ্রন্থ হল ‘বাঙালি চরিতাভিধান’ (১৯৭৬)। সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্তের তত্ত্বাবধানে অঞ্জলি বসুর সম্পাদনায় ২০১০ সাল পর্যন্ত বইটির পাঁচটি সংস্করণ বেরিয়েছে। চার হাজারেরও বেশি জীবনী সম্বলিত এ অভিধান ছাড়াও আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ, ৪৩০ পৃষ্ঠায় ২০০০ জীবনী সম্বলিত ‘চরিতাভিধান’ (১৯৯৭) প্রকাশ করেছে না বাংলা একাডেমী, ঢাকা এবং সম্পাদনা করেছেন নুরুল ইসলাম ও সেলিনা হোসেন।

২.৫   কী ভাবে অভিধান ব্যবহার করব

ইতিমধ্যে আপনারা জেনে গেছেন, অভিধান নানা প্রকারের, যদিও প্রতিটি অভিধানের আঙ্গিক এবং পদ্ধতি মোটামুটি একই রকম। এই পদ্ধতিগত দিকে অবশ্য কোষগ্রন্থ এবং অভিধানের তেমন পার্থক্য নেই, পার্থক্য আছে শুধু বিষয় বৈচিত্র্যে। আপনি যদি কোন একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে একটু অতিরিক্ত কিছু তথ্য চান, তবে বিষয়-ভিত্তিক অভিধান বা কোষগ্রন্থ খুলতে হবে। উচ্চারণের জন্য বানান অভিধান।

ধরুন আপনি দর্শনের পাঠক, সুফি সম্পর্কে একটু বিস্তারিত জানতে চান। সাধারণ অভিধানে পাবেন, এটি মধ্যপ্রাচ্যে উদ্ভুত ধর্মীয় মতবাদ। শব্দটির মূলে রয়েছে ‘সুফ’, মানে একধরনের পোশাক যা ওই বিশেষ ধর্মীয় গোষ্ঠীর সন্তরা পরিধান করতেন। কিন্তু দর্শনের অভিধান (The Dictionary of Philosophy) খুলে দেখুন জেনে যাবেন কী ভাবে এ ধর্মীয় মতবাদ প্রাচীন মধ্যযুগে ভারতীয় উপমহাদেশে বিস্তার লাভ করেছিল, এর সঙ্গে শরিয়তী ইসলামের পার্থক্য কতটুকু, এর দার্শনিক ভিত্তি কী, ঔপনিষদিক তত্ত্বের সঙ্গে সুফিদর্শনের নৈকট্য কতটুকু, আজমির শাহির খাজা মৈনুদ্দিন চিস্তি কোন পন্থের সুফি ইত্যাদি। ডেমনি ‘শঙ্করাচার্য’ শব্দটির সূত্র ধরে আপনি পৌঁছে যাবেন ভারতীয় দর্শনশাস্ত্রের জগতে, পেয়ে যাবেন শঙ্করাচার্যের ভারত পরিক্রমার কথা, গীতাভাষ্য, মোহমুদগার প্রসঙ্গ, এবং পৌঁছে যাবেন মায়াবাদ দর্শনের মূলে, শুনে নেবেন শঙ্করচার্যের সেই উক্তি – ‘শ্লোকার্ধেন প্রবক্তামি যদুক্তং গ্রন্থ কোটিডি ব্রহ্মসত্যং জগন্মিথ্যা জীবব্রহ্মৈব নাপরঃ।’

বাংলা অভিধান ব্যবহারের পদ্ধতির সঙ্গে ইংরেজি ডিকশনারি ব্যবহারের পদ্ধতির কিছু পার্থক্য আছে, যদিও মৌলিক পদ্ধতি দুক্ষেত্রেই এক। অনেক সময় এক একটি অভিধানে বর্ণের ক্রমে কিছু পার্থক্য থেকে যায় এবং এতেই ঘটে বিপত্তি। স্বরবর্ণের পর ক, খ, গ না হয়ে ত এবং ৎ-এসে যায়। ‘চলন্তিকা’য় দেখুন ২য় শব্দ ‘অঋণী’র পর এসেছে ‘অংশ’, এরপর ‘আইল’, ‘আইশ’ (আঁশ)। হরিচরণেও তাই। বাংলা বর্ণমালায় ত এর পর ৎ নেই, কিন্তু অভিধানে এদের অবস্থান পাশাপাশি। এসব খুঁটিনাটি দিকগুলো দেখে নিলে অভিধান ব্যবহার করা সহজ হয়ে যায়। প্রত্যেকটি অভিধানের ভূমিকায় বা সূচনায় থাকে ১. বর্ণনানুক্রম, ২. অভিধানে ব্যবহৃত সংকেতাবলি। এই সংকেতগুলো বেশ কয়েক ধরনের হয়। মুখশব্দের (Head word) পাশে থাকে শব্দের পরিচিতি-এটা বিশেষ্য, বিশেষণ না আর কিছু; থাকে শব্দটি তৎসম, না আরবি-ফারসি মূলের, না ইংরেজি ঋণশব্দ।

তাছাড়াও সাংকেতিক চিহ্ন, ব্যুৎপত্তিগত উৎস, সন্ধি বিভাজন ইত্যাদিও দেখিয়ে দেওয়া হয়। প্রাচীন অভিধানগুলোতে অবশ্য আরও অনেক ধরনের সংকেত থাকত যা ছিল পাঠকদের রীতিমত ভীতির কারণ। আধুনিক অভিধান একেবারে সহজ এবং স্বচ্ছ করেই ছাপা হয়।

অভিধান ব্যবহার করার একটা প্রাক্-প্রস্তুতি প্রয়োজন। এ কাজটি অনেকের করা হয়ে ওঠে না, তাই বইটি তাদের কাছে একটি কঠিন, অতিশয় ভয় উদ্রেককারী ভারী গ্রন্থ ছাড়া আর কিছুই নয়। যে-কোনও কাজে পারদর্শিতা অর্জন করতে হলে সে কাজের কিছু পদ্ধতি রপ্ত করে নেওয়া দরকার। একজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অভিধান ব্যবহারকারীর (Dictionary user) সঙ্গে অদীক্ষিত পাঠকের তফাৎ থাকবেই। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্যক্তির যদি একটি শব্দ খুঁজে বের করতে লাগে ৪০ সেকেন্ড, অনভিজ্ঞ ব্যক্তির ৩ থেকে ৪ মিনিট লাগাও অসম্ভব নয়। কারণ তিনি তো অভিধান দেখার কোনও পদ্ধতি বা টেকনিকের হদিস পাননি। তাঁর শব্দসন্ধানের পদ্ধতি লক্ষ করলে দেখবেন ইনি প্রথম পাতা থেকে এলোমেলো ভাবে খুঁজে যাচ্ছেন, কখনও ডাইনে, কখনও বাঁয়ে এবং ঘেমেনেয়ে একশেষ হয়ে অবশেষে শব্দটির কাছে পৌঁছে যেন রক্ষা পেলেন। এরপর তিনি আরেকটি শব্দ খুঁজে দেখলেও দেখতে পারেন, কিন্তু তৃতীয়বার শব্দ খুঁজতে তাঁর হাত আপনাতেই আটকে যাবে। কিন্তু একজন প্রশিক্ষণ-প্রাপ্ত শব্দসন্ধানীর সামনে স্টপ-ওয়াচ রেখে দেখুন, তাঁর শব্দের কাছে পৌঁছানোর গতি ক্রমাগত বাড়তেই থাকবে। তিনি যে ট্রেনড্ পার্সন।

এ ট্রেনিংটি কী, তা এখন দেখা যাক। দেখুন, বাজার চলতি অভিধানগুলোর পৃষ্ঠাসংখ্যা এক হাজারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। এখন এক হাজারকে চার দিয়ে ভাগ করুন। একটি ভাগে পড়ছে ২৫০টি পাতা। এগুলো হল এক একটি ইউনিট। এবার হাতের আন্দাজে অনুমান করে নিন কতটুকুতে একটি ইউনিট হতে পারে। আপনার টার্গেট শব্দটি যদি ‘শ’ দিয়ে হয় তবে প্রথম, দ্বিতীয় বা তৃতীয় ইউনিট হাতড়ে সময় নষ্ট করার প্রয়োজন নেই। বইটি সোজা উল্টে দিন এবং শেষ ইউনিটের পাতা খুলুন। যদি প্রথম টার্নেই ‘স’ এসে যায় তখন ব্যাক করুন; যদি হাতে এসে যায় ‘ব’, তবে আবার এগিয়ে যান। কিন্তু কদাপিও এলোমেলোভাবে আগ-পিছ করবেন না। এগিয়ে যাওয়া বা পিছিয়ে যাওয়ার মধ্যে একটা পদ্ধতি থাকতে হবে।

আবার মনে করুন শব্দটি শুরু হয়েছে ‘ত’ দিয়ে। তখন ওই আগের হিসেবে প্রথম ইউনিট বাদ দিয়ে অর্থাৎ ২৫০ পরবর্তী পৃষ্ঠার কাছাকাছি বা ওই পৃষ্ঠাতেই, মানে দ্বিতীয় ইউনিটে যান প্রথম টানেই। অবশ্য মনে রাখুন এ ইউনিট সবই কাল্পনিক। এ পদ্ধতিতে কয়েক দিন অনুশীলন করে দেখুন, অভিধান আপনার হাতের মুঠোয়। তবে সব কিছুর আগে বর্ণমালার ক্রমটি (প্রথম অধ্যায়ে প্রদত্ত সূত্র অনুসারে) কণ্ঠস্থ করে নিন। দিনকতক পড়ার টেবিলে ব চোখের সামনে বর্ণমালার ক্রমটি টাঙিয়েও রাখতে পারেন। যাঁদের প্রতিদিনই অভিধান দেখতে হয়-লেখক, মুদ্রক, প্রুফ রিডার, সাংবাদিক, বিজ্ঞাপনকর্মী এবং ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক-এদের একটা পদ্ধতি জানা না থাকলে চলবে না। যাঁদের ভাষা নিয়েই কারবার এদের অনেকেই পদ্ধতি জানেন না বলে অভিধান দেখাটা প্রাত্যহিক কর্ম নয়, কদাচিৎ-কৃত্য হিসেবে ধরেন। এর ফলে আমাদের দেওয়াল লিখন, বিজ্ঞাপন, টেলিভিশনের পর্দা, সংবাদপত্র, ম্যাগাজিন, বইপত্র, সরকারি কাগজপত্র এবং পরীক্ষার উত্তরপত্রে ভুল বানানের মিছিল।

অনুশীলনী
(১)
  • অভিধান বলতে কী বোঝায়? অন্যান্য বইয়ের সঙ্গে এর পার্থক্য কী?
  • অভিধান কি কেবল শব্দার্থের বই, নাকি এর চেয়ে আরও কিছু?
  • কোষগ্রন্থ আর অভিধানের পার্থক্য কী, উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে দিন।
  • আমাদের জাতীয় জীবনে অভিধানের কি বিশেষ ভূমিকা আছে?
  • অভিধান যে একই সঙ্গে ব্যাকরণ, সাহিত্য, ইতিহাস, বিজ্ঞানের আকরগ্রন্থ- যথার্থতা প্রমাণ করুন।
(২)
  • বাংলা ভাষায় প্রথম অভিধান কে প্রণয়ন করেন?
  • বাংলায় প্রথম পর্যায়ের বিদেশি অভিধান প্রণেতাদের নাম করুন। এরা কী ভাষায়, কোন্ হরফে অভিধানগুলো লিখেছেন?
  • বাংলায় প্রথম দ্বিভাষিক অভিধান প্রণেতা কে, তাঁর অভিধানের নাম কী?
  • ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’ এর প্রণেতা এবং এ গ্রন্থ সম্বন্ধে সংক্ষিপ্ত টীকা লিখুন।
  • 'বিবর্তনমূলক বাংলা অভিধান'-এর বৈশিষ্ট্য কী? এ গ্রন্থটি কোথা থেকে প্রকাশিত হয়েছে?
(৩)
  • ইংরেজি ভাষার প্রথম সার্থক অভিধানকার কে? তিনি কবে এ অভিধান প্রণয়ন করেন?
  • Oxford English Dictionary কবে প্রথম প্রকাশিত হয়? এর বৈশিষ্ট্য কী?
(৪)
  • অভিধান শব্দটির ব্যুৎপত্তিগত অর্থ কী?
  • বানান অভিধানে কী পাওয়া যায়?
  • সমার্থক শব্দাভিধান কী?
  • পরিভাষা কোষের প্রয়োজন কোথায় সবচেয়ে বেশি?
  • এনসাইক্লোপিডিয়ার বাংলা প্রতিশব্দ কী?
  • চরিতাভিধানে কী থাকে?
  • লেখক ও সম্পাদকের নিত্য ব্যবহার্য একটি বাংলা বইয়ের নাম করুন।
  • আঞ্চলিক অভিধান কী?
  • পুরাণ শব্দকোষে কী থাকে?
  • এটি দেবের অভিধান কবে, কোথায় প্রথম প্রকাশিত হয়?
(৫)
  • অভিধান ব্যবহার করতে কী কী প্রাথমিক কাজগুলো সেরে নিতে হয়ে?
  • কীভাবে স্বল্প সময়ে আপনার প্রয়োজনীয় শব্দটির কাছে পৌঁছোবেন?
  • বাংলা বর্ণমালার ক্রমটি মনে রাখার সূত্র কী?
  • অভিধানে মূল টেক্সটের আগে কী থাকে? পরিশিষ্টেই বা কী থাকে?
  • যে কোনও অভিধান দেখে নিম্নলিখিত শব্দগুলোর উপর টীকা লিখুন:
    কীর্তন, নামাজ, সংস্কৃতি, প্রাচ্য, ইস্টি ।

তৃতীয় পত্র
অধ্যায় - 
অভিধান