দক্ষিণ আসামে কাছাড়, করিমগঞ্জ (সম্প্রতি শ্রীভূমি) ও হাইলাকান্দি জেলা নিয়ে বাংলাভাষী অধ্যুষিত এলাকা বরাক উপত্যকায় ১৯৬১ সালে আসাম রাজ্যভাষা নিয়ে সংঘটিত আন্দোলন একটি চলমান ভাষা আন্দোলন। বহুভাষিক আসাম রাজ্যে মাঝারি, ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষার অধিকারের জন্য এ আন্দোলন আজও রাজ্যে ভাষাদ্বন্দ্ব, ভাষাবিবাদের কোন সমাধানের পথ দেখাতে পারেনি। ১৯৬১ সালের পর দ্বিতীয়বারও ১৯৭২ সালে এ আন্দোলন বরাক ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় আছড়ে পড়ে। এরপর ১৯৮৫ সালে আবার তৃতীয়বারের জন্য সংঘটিত হয় এ আন্দোলন। প্রত্যেকবারই শহিদের রক্তপাতে আন্দোলনে সাময়িক বিরতি ঘটে।
কোনও স্থায়ী, চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হওয়া তো দূরের কথা, এই প্রক্রিয়ায় বৃহত্তর আসাম রাজ্যের মানচিত্র খণ্ডবিখণ্ড হয়ে একাধিক প্রদেশও গঠিত হওয়ার পরও ভাষা দ্বন্দ্বের অবসান হল না। ইতিমধ্যে ১৯৯৬ মাতৃভাষার অধিকার চেয়ে আন্দোলনে নেমে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি জনগোষ্ঠীর সত্যাগ্রহী সুদেষ্ণা সিংহ আত্মাহূতি দিলে ভাষার প্রশ্নে বরাক উপত্যকায় ভাষা শহিদের সংখ্যা একাদশ থেকে বেড়ে হল পঞ্চদশ।
আসলে ১৯৬০ সালে গৃহীত আসাম রাজ্যভাষা আইনের প্রতিক্রিয়া স্বরূপ যে ভাষা অভিমান, ভাষা দ্বন্দ্ব, ভাষা রাজনীতি এবং এরই হাত ধরে ভাষাদাঙ্গা আসাম সহ সমগ্র উত্তর পূর্বাঞ্চলকে আন্দোলিত করেছে এর অভিঘাত সমগ্র অঞ্চলটির জনজীবনকে একটি জতুগৃহের মধ্যে টেনে রাখছে।
১৯৬১ সালের উনিশে মে-তে শিলচর রেলস্টেশনে পুলিশে গুলিতে নিহত একাদশ শহিদের পদচিহ্ন ধরে কেবলমাত্র বাঙালি নয় গোটা আসামে অসমিয়া এবং অন্যান্য জনজাতীয় শহিদের সংখ্যা তিন শতাধিক বলে একটা হিসেব বের করেছেন অসমিয়া ভাষাতাত্ত্বিক অধ্যাপক দেবব্রত শর্মা এবং তাঁর সহযোগী দয়াসাগর কলিতা, যাদের মৃত্যুর কারণ এই ভাষা বিবাদ আর ভাষা রাজনীতি।
পটভূমি:
“We do not desire to make any recommendation about the details of the policy to be followed in prescribing the use of minority languages for official purposes. However, we are inclined to the view that a State should be treated as unilingual only where one language group constitutes about seventy per cent or more of its entire population. Where there is a substantial minority constituting thirty per cent. or so of the population, the State should be recognised as ‘bilingual’ for administrative purposes.”(Report of the States Reorganization Commission 1955 : page 212, section 783)
ওই একই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে—
“The linguistic complexion of the existing State establishes very clearly its composite character, in spite of the very interesting -post-1931 spread of Assamese according to the census figures. It is not surprising that the rapid increase in the past two decades in the number of persons speaking Assamese has been disputed; and the veracity of the 1951 Census figures has been questioned in certain quarters. We have not deemed it necessary to enter into this controversy, but we would like to draw attention to the fact that in spite of this rapid increase the Assamese-speaking population still constitutes only about 55 per cent, of the population of the State.”(page 194, section 719)
সংগৃহীত চিত্র : ভাষা আন্দোলন - বরাক উপত্যকা
আসলে আসামে ভাষা-বিবাদের সূচনা অনুসরণ করতে হলে ফিরে যেতে হয় সেই ১৮৭৪ সালে যখন বাংলা প্রদেশ থেকে কাছাড়, সিলেট এবং গোয়ালপাড়া জেলাকে (সঙ্গে খাসি জয়ন্তীয়া পার্বত্য জেলাও) বিচ্ছিন্ন করে দরং, কামরূপ, লখিমপুর, নওগাঁ, শিবসাগর—এই ৫ টি জেলা নিয়ে আদি আসামের পরিসরকে বৃদ্ধি করে আসামকে ব্রিটিশ প্রশাসনের আওতায় চিফ কমিশনার শাসিত প্রদেশ হিসেবে পুনর্গঠন করা হয়। ওই সংযুক্তির ফলে একদিকে আসাম যেমন ভূপরিমাণ এবং রাজস্বের নিরিখে, অপরদিকে তেমনি জনসংখ্যার নিরিখেও একটি প্রদেশ হিসেবে বিবেচিত হবার যোগ্যতা অর্জন করে। এ সংযুক্তির পূর্বে ৫ টি জেলার মোট জনসংখ্যা ছিল ১৪,৯১,২২৭; সে সঙ্গে যুক্ত হল সিলেটের ১৭,১৯,৫৩৯, গোয়ালপাড়ার ৪,৪৪,৭৭৪ এবং কাছাড়ের ২,০৫,০২৭ নিয়ে সর্বমোট ২৩,৬৯,৩২৭ সংখ্যক জনসংখ্যা (A Stastical Account of Assam, by WW Hunter, c.1879 Vol-1,2, reprint Gauhati-1998)। এ সংযুক্তি নিয়ে আসামের সেদিনের মোট জনসংখ্যা হয়েছিল ৩৮,৬০,৫৫৪। লক্ষ্যণীয় কিঞ্চিদধিক সাড়ে আটত্রিশ লক্ষ জনসংখ্যার মধ্যে কিঞ্চিদধিক প্রায় সাড়ে তেইশ লক্ষ জনগণই বাঙালি (কিছু সংখ্যক জনজাতি বা অন্যান্যদের বাদ দিলে)। সেই থেকে আসামে বাঙালি জনগোষ্ঠীর এ আধিক্য অসমিয়া জনগণের মনে শঙ্কার বীজ বপন করা সঙ্গত। আর ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গীভূত হওয়ার ফলে একদিকে যেমন আসাম একটি প্রদেশের মর্যাদা লাভ করল তেমনি তাকে নিজস্বতা অর্থাৎ separate identity -র সঙ্গে সমঝোতাও করতে হল—আসামের পশ্চিম সীমান্তে ভারতীয় উপমহাদেশের মূলভূমির দরজা অবারিত হয়ে আসামে নবযুগের সূচনাও হল। ব্রিটিশ ভারতের বঙ্গীয় প্রদেশ থেকে কৃষিজীবী, মৎস্যজীবী, পেশাজীবী, শ্রমজীবী এবং চাকুরিজীবী, আর অতঃপর শিক্ষিত কেরানি, আমলা, দেশীয় প্রশাসনিক আধিকারিক, শিক্ষক, অধ্যাপক শ্রেণির আত্মপ্রকাশ হল চিফ কমিশনার শাসিত আসামে।
এই পুরো প্রক্রিয়ায় আসামের জনসংখ্যায় ইতিমধ্যেই ৮৭৮,১০০ সংখ্যা নিয়ে এগিয়ে থাকা বাঙালি জনসংখ্যার সঙ্গে ক্রমাগত পূর্ববঙ্গীয় এবং পশ্চিমবঙ্গীয় জনগোষ্ঠীর সংযুক্তি অসমিয়া জনসংখ্যাকে পেছনে রেখেই চলছিল। ১৮৭৪ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত ৭৩ বৎসরে বাঙালিদের সংখ্যা হ্রাস হওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই, বরং সমহারে বৃদ্ধি হওয়াটাই স্বাভাবিক। এ হিসেবটা জাতীয়তাবাদী শিবিরের না জানার কথা নয়।
১৯৫১ সালের জনগণনায় তাই নানা উপায় অবলম্বনে অসমিয়া জনসংখ্যা বৃদ্ধি দেখানোর প্রয়াস ছিল, এতে সেন্সাস কমিশনারের মুখ থেকেই উচ্চারিত হয়েছিল শব্দগুচ্ছটি বায়লজিক্যাল মিরাকল, অর্থাৎ জৈবিক রহস্য। পূর্ববঙ্গ থেকে কয়েক প্রজন্ম ধরে আগন্তুক কৃষক, মৎস্যজীবী, ব্রহ্মপুত্রের বুকে ভেসে ওঠা দ্বীপ কিংবা অস্থায়ী নিম্নভূমি (চর চাপরি) অঞ্চলে প্রকৃতির সঙ্গে নিরত সংগ্রামে রত বাঙালি জনগোষ্ঠীকে নিজেদের অসমিয়া বলে লিখিয়ে নেওয়া এবং নব্য অসমিয়া বলে উদার আহ্বান জানানো এসব প্রয়াসের অন্তর্গত। বিষয়টিকে আরও পাকাপোক্ত রূপ দেবার জন্য বিধান সভায় ‘আসাম সরকারি ভাষা বিল-১৯৬০’ উত্থাপন—এই হল আসামে ভাষা আন্দোলনের আদি কথা।
অবশ্য এরও একটা আদি পর্ব আছে। ১৮২৬ সালে ইয়ান্দাবু চুক্তির পর আহোম রাজশক্তির হাত থেকে ইংরেজ শাসনাধীনে যাবার পর, ১৮৩৬ সাল থেকে ১৮৭৩ সাল পর্যন্ত আসামে সরকারি কাজকর্মে অসমিয়া নয় বাংলা ভাষাই কার্যকরি ছিল। ইংরেজ প্রশাসকদের ঔপনিবেশিক স্বার্থ চরিতার্থে এ পদক্ষেপ অসমিয়াদের মনে যে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল এ ক্ষোভ আজও প্রশমিত হয়নি যতই এ ঘটনার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষিত হোক না কেন। বাঙালিদের থেকে অসমিয়াদের মাতৃভাষার উপর আগ্রাসনের সম্ভাবনা সাধারণ এবং আলোকপ্রাপ্ত জনমানসেও স্থান লাভ করেছে। বাঙালি আমলা, কেরানিরা বুঝি এ চক্রান্তে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে।
স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রথম এবং মধ্যপর্বে অবশ্য আসামে ভাষা-সাম্প্রদায়িকতা খুব একটা প্রশ্রয় লাভ করেনি। কিন্তু সংসদীয় রাজনীতিতে অসমিয়া বাঙালি দ্বন্দ্বের প্রকাশ দেখা যায় গভর্নর শাসিত আসামে ১৯২১ থেকে ১৯৩৭ এবং এর পরবর্তী দিনগুলোতে।
বাঙালিদের আসামে, এমনকী কাছাড়ে বৈধতা নিয়েও আসাম বিধান পরিষদে প্রশ্ন উঠেছিল ১৯২৬ সালেই যখ কাছাড় জেলার নির্বাচিত সদস্য খান সাহেব রাশিদ আলী লস্ককে উচ্চারণ করতে হয়েছিল কয়েকটি তীর্যক বাক্য যার ঐতিহাসিকতা সন্দেহের উর্ধে। প্রশ্ন উঠেছিল বাঙালিরা কাছাড়ে কতদিন থেকে বসতি করছেন। উত্তরে তিনি বলেছেন—‘বরং প্রশ্ন করুন রোমানরা কবে থেকে রোমে বসবাস করছেন’। তিনি এও বলেন:
“Bengalees of Cachar haven’t come from Assam valley, they haven’t descended from mountains and hills, not from heaven either either…”(Assam Legislative Council Proceedings, vol.6, 1926, p.85)।
খান সাহেব বলেছেন এরা যদি কোথাও থেকে এসে থাকে তা হল সিলেট …they are from Sylhet)। এ সিলেট-কাছাড় নিয়ে বিস্তৃত সমতল ভূখণ্ড আসলে আবহমান কালের বাংলার সঙ্গে ভৌগোলিক, নৃতাত্ত্বিক, সামাজিক, লৌকিক ভাবে সম্পৃক্ত।
ওই সন্দেহ, অসূয়ার প্রকাশ দেখা গেছে স্বাধীনতার একেবারে প্রাক্ মুহূর্তে যখন বাঙালি হিন্দু মুসলমান ব্যস্ত হয়ে পড়লেন কুৎসিৎ সাম্প্রদায়িকতার অনুশীলনে, তখন অসমিয়ারা মন দিলেন (পারলেন কি) নিজেদের ঘর গোছানোতে। ভাষাতাত্ত্বিক বিরিঞ্চিকুমার বরুয়া ওই দুর্যোগ মুহূর্তে বললেন:
“Culturally, racially and linguistically, every non-Assamese is a foreigner in Assam. In this connection, we must bear in mind that Assam from the very ancient times never formed a part of India.”(The Assam Tribune, 20th July 1947)(The Assam Tribune, 20th July 1947)
আসামে ভাষা দ্বন্দ্ব এবং চলমান আন্দোলনের পটভূমিটি বুঝতে হলে উপরের এ কথাটিও মনে রাখা প্রয়োজন।
দেশবিভাগ এবং স্বাধীনতার অব্যবহিত পরই আসামের মুখ্যমন্ত্রী লোকপ্রিয় গোপীনাথ বরদলই জানিয়ে দিলেন:
“It is not the intention of the Government to make Assam a bi-lingual state. For the homogeneity of the province, they (i.e., non-Assamese) should adopt the Assamese language…।”
আর উচ্চারিত হল সেই অমোঘ বাক্য:
“Assam is only for Assamese.”
যে বাক্য জাতির জনক মহাত্মা গান্ধিকে পর্যন্ত বিচলিত করেছিল। তিনি সেই বহু উদ্ধৃত বাক্যটি উচ্চারণ করেছিলেন:
“If Assam is for Assamese, Bihar for Biharis, and Punjab for Punjabis, India for whom?”
তবে প্রাক্-স্বাধীনতাকালীন ভাগ বাটোয়ারা পর্বে আসামের ক্ষমতাশীন নেতৃবর্গ সিলেট এবং পারলে কাছাড়কেও পাকিস্তানে হস্তান্তরিত করার ব্যাপারে উৎসাহী ছিলেন। সিলেট প্রকৃতই যখন বাউন্ডারি কমিশনের সুপারিশে এবং গণভোটে সীমান্তের ওপারে চলে যাওয়াকে স্বাগত জানিয়ে ‘অসম জাতীয় মহাসভার’ পক্ষ্য থেকে এক বিবৃতিতে জানানো হয়—‘সিলেটের পাকিস্তানে যোগদানের সঙ্গে সঙ্গে আসামের বৌগোলিক বিস্তৃতি ছোট হয়ে উঠেছে, তবে একভাষী অঞ্চল হিসেবে স্বীকৃতির পথে আসাম একধাপ এগিয়েছে যা আসামকে স্বাধীন ও সার্বভৌম হওয়ার পথকে সুগম করেছে’ (শিলং টাইমস, ২৭ আগস্ট, ১৯৪৭)। তবে ২১ জুলাই ১৯৪৭ সালে সিলেট বিদেশ হয়ে যাওয়াতে আসাম ট্রিবিউন লিখেছে ‘অসমিয়া জনসাধারণ এক বিরাট বোঝা থেকে মুক্তি পেয়েছে’। আর এ উল্লাসের সবচাইতে অমার্জনীয় সংস্করণটি উচ্চারিত হয়েছিল স্বাধীনতার অব্যবহিত পর আসাম বিধান সভার প্রথম অধিবেশনে গোপীনাথ বরদলই মন্ত্রীসভা অনুমোদিত রাজ্যপাল স্যার আকবর হায়দরির ভাষণে—‘আসামের স্থানীয়রা এখন নিজের গৃহের প্রভু। এখন নিজের জনগণের কাছে দায়বদ্ধ একটি সরকার প্রাপ্তি ঘটেছে, এবং এ সরকার নিজের জনগণের কাছে জবাবদিহি করতেও বাধ্য। ভ্রাতৃপ্রতীম জনজাতীয়দের সঙ্গে মিলেমিশে তাঁরা নিজ ভাষা-সংস্কৃতির প্রচার ও প্রসারে নীতি প্রণয়নে এগিয়ে আসবেন। বাঙালিরা এখন হীনবীর্য, এবং ইচ্ছে থাকলেও এরা আর পাহাড় আর সমতলে কোনও প্রভাব খাটাতে পারবে না। আমি আমার রাজ্যবাসীর কাছে আবেদন রাখছি তাঁরা যেন এ আগন্তুকদের প্রতি সদয় ব্যবহার করেন; তবে বিনিময়ে অবশ্যই যেন এরা আমাদের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শনও করেন’ (৫ নভেম্বর, ১৯৪৭)।
এই অবস্থায় সিলেট বিদায় হলেও সিলেটিকে (বাঙালিকে) মুছে ফেলা সম্ভব হল না। অখণ্ড ভারতীয় চেতনাকে মনে প্রাণে ধারণ করা বাস্তুচ্যুত বাঙালিরা-- সিলেট, ময়ননসিং, কুমিল্যা প্রভৃতি জেলা থেকে স্বাধীন সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী ধর্মনিরপেক্ষ ভারতবর্ষের আসাম রাজ্যের যে অঞ্চলটিকে র্যাডক্লিফ সাহেবের ফিতার এদিকে রাখা সম্ভব হয়েছে--এদিকে সরে এসেছেন—কেউ এসেছেন একেবারে তৎক্ষণাৎ, আর কেউ এসেছেন ধীরে ধীরে ৪৭ থেকে ৫২, ৫২ থেকে ৭১ অবধি।
ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে এ ছাড়াও আরও কিছু কথা বলা প্রয়োজন। স্বাধীনতার পরবর্তী বিক্ষিপ্ত দাঙ্গা হাঙ্গামা, অগ্নিসংযোগ এবং হত্যালীলার একটি পর্ব শেষ হবার পর ১৯৫৫ সালে রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন আসার পর আসাম আবার অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে। কমিশন অভিমত প্রকাশ করেন যে, কোন রাজ্যকে তখনই একভাষী রাজ্য (Uni-lingual) বলে ঘোষণা করা যাবে যখন এর ৭০% বা এর বেশি জনগণ একটি ভাষায় কথা বলবেন, আর যে ক্ষেত্রে ৩০% শতাংশ বা এরকম সংখ্যালঘু ভিন্নভাষী জনগণের বসবাস থাকবে সেখানে রাজ্যটি হবে দ্বিভাষী (bi-lingual)। কমিশন আসামের জনবিন্যাসের composite character সম্বন্ধে নিঃসন্দেহ হয়ে বলেন:
“It is not surprising that the rapid increase in the past two decades in the number of persons speaking Assamese has been disputed and the veracity of 1951 census figures has been questioned in certain quarters”.(State Reorganization Commission Report, p.211, sec.733, 1955)
এ পরিস্থিতিতে উগ্রজাতীয়তাবাদীদের প্রয়াসে আসামে ব্যাপক হাঙ্গামা শুরু হয়। রাজ্যে বংশ পরম্পরায় বসবাসকারি এবং একই সঙ্গে নবাগত উভয়ের বৈধতা অস্বীকার করে কৃষদের মাঠের ফসল পুড়িয়ে, হাতি দিয়ে ঘর বাড়ি ধ্বংস করে এদেশ থেকে তাড়ানোর প্রচেষ্টার সঙ্গে সরকারি চাকরিতে—একেবারে নিচু থেকে উর্ধ্বতন আমলা পদে বঞ্চিত করা, বাঙালি ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষার ক্ষেত্র প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা, নিয়মিত রাজস্ব প্রদানকারি বাঙালি পরিবারকে বাস্তুভিটা থেকে উৎখাতের নোটিশ ধরিয়ে দেওয়া, রাতারাতি বাংলা মাধ্যমের স্কুলগুলোকে অসমিয়া মাধ্যমে রূপান্তরিত করা –এসব প্রক্রিয়ার ফলে বাঙালি সহ অন্যান্য ভাষিক গোষ্ঠীর মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হল। ১৯৫০ সালের পর এ হল দ্বিতীয় ‘বঙ্গাল খেদা’, যে খেদা আন্দোলন অবশ্য, ১৯৬০ এবং ১৯৭২ সালে পুনরায় সংঘটিত হয়ে ১৯৭৮ সালের পর নতুন নাম ধারণ করে অব্যাহত রয়েছে।
এ-ই যখন সার্বিক পরিস্থিতি তখন ১৯৬০ সালে আসাম প্রদেশ কংগ্রেস কমিটি অসমিয়াকে ‘একমাত্র রাজ্যভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তুতি প্রায় শেষ করে আনে। ওই বৎসর ৭ মে, ১৯৬০ অন-অসমিয়া জাতিগুলোর মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হওয়ার ফলশ্রুতিতে শিলচরে ‘নিখিল আসাম বাংলা ভাষা সম্মেলন’ এর ছায়াতলে একটা সমাবেশের আয়োজন করা হয় যেখানে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর উপর সুদীর্ঘকাল ধরে চলে আসা অবিচার ও বৈষম্যের কথা পর্যালোচনা করে কাছাড়, মণিপুর, ত্রিপুরা, লুশাই পাহাড় ও উত্তরকাছাড় পার্বত্য অঞ্চলকে নিয়ে South East Regional Economy Convention করার প্রস্তাব গৃহীত হয়।
শিলচরে জননেতা চপলাকান্ত চক্রবর্তীর সভাপতিত্বে ‘নিখিল আসাম বাংলা ভাষা ভাষা সম্মেলন’ –এর প্রস্তাবিত সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৬০ সালের ২ এবং ৩ জুলাই। এতে ছিল আসামের পার্বত্য অঞ্চল ছাড়াও রাজ্যের বিভিন্ন এলাকা--ধুবড়ি, গোয়ালপাড়া, গৌহাটি, যোরহাট, শিলং, তেজপুর, নওগাঁ থেকে বাঙালি ছাড়াও বিভিন্ন জাতি, জনজাতির অংশগ্রহণ। কাছাড় জেলা কংগ্রেসের সদস্য, বিধায়কদের বিরোধিতা সত্বেও প্রদেশ কংগ্রেস প্রস্তাবিত ভাষা বিল উত্থাপনের দিকে এগিয়ে গেলে কাছাড়ের সদস্যরা এর বিরোধিতাই করবেন জানিয়ে দেন।
এ সম্মেলন শেষ হবার পরপরই ৩ জুলাই থেকে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় ব্যাপক হাঙ্গামা শুরু হলে প্রায় চল্লিশেরও অধিক লোক প্রাণ হারান, ১০ হাজারের উপর বাড়িঘর অগ্নিতে ভষ্মীভূত হয়, ৫০ হাজারেরও অধিক লোক বাস্তুহীন, নিরাশ্রয় হয়ে পশ্চিমবঙ্গ এবং কাছাড়ে আশ্রয় গ্রহণ করেন। এ ঘটনায় পুলিশের গুলিতে রঞ্জিত বরপুজারি সহ কতিপয় অসমিয়া আন্দোলনকারিও শহিদ হন।
ইতিমধ্যে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় রাজ্যভাষা বিল উত্থাপনের জন্য প্রবল চাপ, ‘রাজ্যভাষা দাবি দিবস’ উদ্যাপন, সাহিত্য সভার পক্ষ থেকে সরকারের নিকট চরমপত্র প্রদান ইত্যাদিও হয়ে গেছে। ততদিনে অক্টোবর মাসের তৃতীয় সপ্তাহ এসে গেছে। কংগ্রেস সভাপতি কর্তৃক তারবার্তায় ভাষা বিলটি আপাতত স্থগিত রাখার অনুরোধ পর্বও হয়ে গেছে। বিলটি যথারীতি সদনে উত্থাপিত হলে বিধান সভায় কাছাড়ের অবাঙালি সদস্য নন্দকিশোর সিংহ এর প্রতিবাদে জোরালো বক্তব্য রাখেন। সদস্য জ্যোৎস্না চন্দ মহোদয়া ভাষা বিলে মহকুমা পরিষদ বিধির সংযোজন নিয়ে আপত্তি তোলেন এবং নন্দ সিং ছাড়াও হেমচন্দ্র চক্রবর্তী, রামপ্রসাদ চৌবে, গৌরীশঙ্কর রায় হিন্দি, বাংলা ও অসমিয়াকে রাজ্যভাষা করার দাবি উঠান। ২২ অক্টোবর বিলটিওকে আরও কয়েকদিন স্তগিত রাখার দাবিও জানানো হয়। কিন্তু ২৩ তারিখ এ ব্যাপারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়ে যায় এবং রাত ১০ টায় সঙ্ঘ্যাধিক্যের জোরে প্রস্তাবটি পাস হয়ে যায়। কাছাড়ের সদস্যদের ভোটদানে বিরত থাকা, বা সদন পরিত্যাগ এ বিষয়ে কিছু কোন ব্যাপারই নয়।
এ হল ১৯৬০-৬১ সালের ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপট। পরবর্তী দিনে সারা রাজ্য ব্যাপী সংঘটিত আন্দোলন, কাছাড় এবং ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় বিভিন্ন স্তরে আন্দোলন, প্রতি আন্দোলন, অন্তর্ঘাত এবং সংঘটিত দাঙ্গা হাঙ্গামা, আন্দোলনের মূল কেন্দ্র কাছাড় জেলাতে স্থিত হওয়া, কাছাড় জেলা থেকে নেতৃত্বের আত্মপ্রকাশ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর আগমন, শিলং বৈঠক, আন্দোলকে ভেতর থেকে দুর্বল করার লক্ষ্যে শান্তি পরিষদের কার্যাবলি, ভ্রাতৃঘাতী সংঘর্ষে ইন্ধন জোগানো এবং বিধান সভায় গৃহীত আইনে ত্রিভাষা সূত্র অনুযায়ী সংশোধনী সংযোজন এ নিয়ে ভাষা আন্দোলনের প্রথম পর্ব।
তবে সে সঙ্গে বাংলা প্রেসিডেন্সি থেকে ১৮৭৪ সালে বাঙালি অধ্যুসিত কাছাড়, সিলেট, গোয়ালপাড়া, এবং সংলগ্ন মেঘালয়কে কেটে এনে নবসৃষ্ট চিফ কমিশনার শাসিত আসাম রাজ্য গঠন করার সঙ্গে সঙ্গে এ নতুন সংযোজন (জেলা হিসেবে পুনর্গঠিত) আদি পাঁচটি অঞ্চল নিয়ে সাবেক আসামের জনবিন্যাসে ব্যাপক পরিবর্তনও আনল। ঔপনিবেশিক শাসনতন্ত্রে একদিকে স্বতন্ত্র একটি প্রদেশের জন্য প্রয়োজনীয় ভূ-পরিমাণ, ভূ-রাজস্ব, সম্পদ এবং জনসংখ্যা কাঙ্ক্ষিত লক্ষমাত্রায় পৌঁছানোর সঙ্গে আসামে বঙ্গভাষী জনসংখ্যা বৃদ্ধি আসামের একভাষী চরিত্রলক্ষণ নিয়ে গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে একটা বাঁধা হয়ে দাড়ালো। ভাষাভিত্তিক জাতিসত্তা গঠনের ক্ষেত্রে সূচনায়ই এ প্রতিবন্ধকতা অসমিয়া সমাজক সংকটের দিকে ঠেলে দিল। যে চারটি স্বতন্ত্র অংশ নিয়ে এ আসামের জন্ম তা হল : (১) আহোম রাজ্য, যা ছিল ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় সীমায়িত এবং যাকে কামরূপ, দরং, শিবসাগর, লখিমপুর, এবং নগাঁও (এর দক্ষিণাংশ অবশ্য আহোম নয় ডিমাসা রাজ্যের অন্তর্গত) এ —নিয়ে ৫টি জেলায় ভাগ করা হয়, (২) মোগল সাম্রাজ্যের বাংলা সুবা নিয়ে গোয়ালপাড়া, (৩) গারো, খাসিয়া জয়ন্তীয়া পাহাড়, উত্তর কাছাড় মিকির পাহাড়, নাগা পাহাড় সহ পার্বত্য অঞ্চল সমূহ, (৪) সিলেট ও কাছাড়ের সমভূমি, যেখানে বাঙালির সংখ্যাধিক্য তবে সে সঙ্গে ডিমাসা, মণিপুরি, নিজস্ব ভাষা সংস্কৃতি নিয়ে হিন্দিভাষী সহ আরও কিছু ভিন্নভাভাষী নিয়ে একত্রে চা শ্রমিক এবং নাগা, কুকি, মার আরও কিছু ক্ষুদ্র জনজাতি সমন্বিত ভূমি।
সামগ্রিক ভাবে বিচিত্র নৃ-ভাষিকগোষ্ঠী নিয়ে আদিকাল থেকেই চুটিয়া, বরাহি, কচারি, মরান, বড়ো ইত্যাদি সহ নানা ক্ষুদ্র, মাঝারি জনজাতি নিয়ে রাজ্যটি একটি একভাষী রাজ্যের দাবিদার হবার যোগ্যতা অর্জন করতে হলে জনবিন্যাসগত চরিত্রলক্ষণ সম্পূর্ণভাবে অন্যরকম অন্যরকম হওয়া উচিত ছিল। ১৮৭৪ সালে ঔপনিবেশিক মানচিত্র নির্মাণ করে এবং ১৯০৫ সালে আবার সংযুক্ত ‘পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশ’ গঠন করার ফলে জনবিন্যাসে আরও পরিবর্তন সংঘটিত হল। এ সংযুক্তি যদি না ঘটত তবে শিবসাগর-লখিমপুর-শোনিতপুর-কামরূপ-নওগাঁ নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই একটি একভাষিক প্রদেশ হিসেবে আসামের স্থিতি হতে পারত হয়ত বা। কিন্তু ইতিহাস যে অন্যপথে চলে গেল।
এটা তো ঠিক উত্তরবঙ্গ-গোয়ালপাড়া-বড়পেটা-কোচবিহার সীমান্ত নিয়ে নিম্ন আসাম (সম্প্রসারিত) সম্পূর্ণভাবে তো সাবেক আসামের সঙ্গে (অহোমভূমি) খাপও খায়নি। এ অঞ্চলটি যে ইতিমধ্যেই মোগল শাসনাধীন সুবে বাংলার অন্তর্গত অঞ্চলে পরিণত হয়ে গিয়েছিল, এবং এ সূত্রে বঙ্গদেশ সহ ভারতীয় উপমহাদেশের মূল ভূমির সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত হয়ে গিয়েছিল। এর পেছনে স্বার্থান্বষী ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক চক্রান্তই ছিল প্রধান, এর পেছনে কোনও একটি বিশেষ জনগোষ্ঠীর (বাঙালি) চক্রান্ত সন্ধান নিতান্তই অনৈতিহাসিক প্রয়াসই হবে । (পৌরাণিক কাহিনির উপর ভিত্তি করে প্রাচীন ইতিহাস বাদ দিলেও প্রাচীন মধ্যযুগের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে ‘Assam from very ancient times never formed a part of India’ তত্ত্বটি খুব সুদৃঢ় ভিত্তির উপর দাঁড়ায় না)।
ওদিকে নিম্ন আসামের জনবিন্যাস, সমাজ ও রাষ্ট্র গঠন প্রক্রিয়ায় বঙ্গদেশাগত জনগণ ছাড়াও উত্তর ভারতীয়, এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাগত জনগোষ্ঠীর ভূমিকা প্রকট হল। মোগলকে গৌরবের সঙ্গে বার বার প্রতিহত করলেও মুসলিম অনুপ্রবেশ ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি, এবং মুসলিম জনগোষ্ঠী ছাড়াও উত্তরবঙ্গের জনজাতি, স্বাধীন কোচ রাজ্যের অধিবাসী—এদের নিয়েও বর্ণিত অঞ্চলে সমাজগঠন এবং জনবিন্যাস রচনায় একটা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রচিত হয়ে গেল। তাছাড়াও কামরূপ-কোচ-আহোম রাজসভার আনুকূল্যে আগত জনগোষ্ঠী নিয়ে ইতিপূর্বেই একটা মিশ্র ভাষিক সমাজের আত্মপ্রকাশ তো ঘটেই ছিল। এই যে সাবেক আসামের মৌল চরিত্রের রূপান্তর এ প্রেক্ষিতে আসাম যে শুধুমাত্র ‘একটি জনগোষ্ঠীর’ ভূমি, এ দাবি কোন মতেই গ্রহণযোগ্যতা লাভ করতে পারে না।
আর ওদিকে ভারতীয় মূলভূমি থেকে পূর্বমুখী প্রব্রজনে কৃষক সমাজ, বিভিন্ন পেশাজীবী, বণিক সমাজ, উনিশ শতকে সরকারি কর্মচারী, আমলা, উকিল মোক্তার, ডাক্তার কবিরাজ, মাস্টার, কেরানি নিয়ে একটি সমাজ কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হল। সে সঙ্গে চা শিল্পের আত্মপ্রকাশ, খনিজ সম্পদের ব্যবহার, রেল সম্প্রসারণ –এ সব নিয়ে আসামের সমাজ ও রাষ্ট্রজীবনে যে পরিবর্তন এল এতে আসামের সঙ্গে অপরাপর প্রদেশের ফারাক ঘুচতে থাকল। এ প্রেক্ষিতে ‘every non-Assamese is foreigner in Assam’ বা ‘Assam for Assamese’—এ জাতীয় ধারণা বাস্তবের সঙ্গে খুব সঙ্গতিপূর্ণ হতে পারে না। রাজ্যের ক্ষমতাসীন রাজনীতিকদের এ মানসিকতা থেকে বেরিয়ে না আসায় জাতিবদ্বেষের বাতাবরণ রয়েই গেল। আসামের ভাষা সমস্যার বীজ তো এখানেই।
নব সৃষ্ট আসাম প্রদেশের রাজধানী হিসেবে খাসি পাহাড়ের শিলং শহরের আত্মপ্রকাশ ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা এবং সুরমা উপত্যকা নামে দুটি স্বতন্ত্র প্রশাসনিক ইউনিট নিয়ে উনবিংশ শতকে আসামের যাত্রা শুরু হলে নানাবৈচিত্রের সমাহার এ রাজ্যে ভাষা নিয়ে প্রতিযোগিতা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং ভাষিকগোষ্ঠীর মধ্যে ক্ষমতার লড়াই, রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে দিনে দিনে প্রকট হতেই থাকে। ঔপনিবেশিক শাসকেরা আবার তাদের স্বার্থে সেই যে ১৮৩৮ সালে আসামে সরকারি কাজে যে বাংলা ভাষা চালু করে ভাষাদ্বন্দ্বের সূচনা করেন এটাই একটা লক্ষণীয় বিষয়। এরপর বঙ্গভঙ্গ এবং১৯০৫ সালে সংযুক্ত ‘আসাম এবং বঙ্গ’ প্রদেশ গঠন ( যুক্ত প্রদেশের রাজধানীকে বছরের কয়েকটি মাসের জন্যআবার ঢাকায় স্থানান্তরিত করা)—এ সবই ভারতীয় উপমহাদেশের এ অঞ্চলটিতে স্থায়ী অশান্তির পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য যথেষ্ট। আসামে ভাষা রাজনীতি, ভাষা দ্বন্দ্ব, পক্ষান্তরে ভাষা আন্দোলনের পটভূমি এতেই রচিত হয়েছে।
১৯৬০ সালের ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপট অনুধাবন করতে হলে ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার সঙ্গে সম্পৃক্ত দেশভাগের কথাও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। যে সংকট অসমিয়া জনগোষ্ঠীকে পীড়িত করেছিল তার সূচনা হয়েছিল চিফ কমিশনার শাসিত প্রদেশ গঠনের সময়েই—বাঙালি অধ্যুসিত সিলেট কাছাড় আসামে সংযোজিত হলে স্বাভাবিক ভাবেই আসাম নামে চিহ্নিত ভূখণ্ডে সংখ্যার দিকে পিছিয়ে গেল, এরপর দেশভাগের পর বিপুল সংখ্যক শরণার্থীর সংস্থান করে দিয়ে এ সংকটের পীড়ন আরও তীব্র থেকে তীব্রতর হয়েছে। এ প্রসঙ্গে নিম্নলিখিত অংশটি উদ্ধার করা যেতে পারে—
“Another myth is that Assamese people might become a minority in Assam due to influx from Bangladesh. The nation has been given to understand that the bulk of the Bengalis in Assam are illegal migrants without taking note of the fact that the inclusion of Bengali-populated districts of Cachar, Sylhet and Goalpara from Bengal presidency in Assam in 1874 rather increased the Bengali population by 2.4 lakh over Assamese and other population of the state and that continued in the following days with the Assamese population trailing behind. [This could be realized very well by the chauvinists and that is why they wanted to establish the supremacy of one-language gainst multi-lingual feature of the state by hurridly introducing the Assam State Language Bill in 1960, which started the process of disintegration of the undivided Assam.]” (Sanjib Deblaskar, Bengalis in Assam: Nationality Challenged, a paper presented in Symposium, Press Club of India, New Delhi, Mrch 27, 2018)
সংগৃহীত চিত্র : ভাষা আন্দোলন - বরাক উপত্যকা
এখানে জনসংখ্যা বিষয়ক একটা পরিসংখ্যান দেওয়া যাক্:
Statistical Account of Assam, W W Hunter – Vol. : 1-2 (1879, reprint 1979)
অনুযায়ী ১৮৭২ সালের জনসংখ্যা ছিল নিম্নরূপ—
সিলেট :
১৭,১৯,৫৩৯
গোয়ালপাড়া :
৪,৪৪,৭৬১
কাছাড় :
২,০৫,০২৭
মোট :
২৩,৬৯,৩২৭
দেখা গেল সেই সময় আসামের ৫ টি জেলার জনসংখ্যা— ১৪,৯১,২২৭। এর সঙ্গে বাঙালি-অধ্যুসিত অঞ্চলের ২৩,৬৯, ৩২৭ সংখ্যাটি যোগ করলে আসামের মোট জনসংখ্যা দাঁড়ায় ৩৮,৬০,৫৫৪, যে সংখ্যাটি একটি প্রদেশ গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় নির্দিষ্ট মাত্রায় এনে দেয় আসামকে। কিন্তু এতে বঙ্গভাষী জনসংখ্যা যে অসমিয়া জনসংখ্যার চাইতে অনেক বেশী হয়ে যায়। তবে আপাতত এ নিয়ে বেশী অনুশীলনের প্রয়োজন নেই। যা মনে রাখা প্রয়োজন তা হল জনসংখ্যার এ মৌল গরমিলটি অনুধাবন করার ফলেই আসামে ১৯৫০ সালের আদম সুমারির ফলাফলে একটি ‘বায়োলজিক্যাল মিরাকল’ অর্থাৎ অসমিয়া জনতাত্ত্বিক বিস্ফার দেখানোর প্রয়োজন ছিল বই কি।
নিরাপত্তার কারণেই হোক, প্রলোভনের ফলেই হোক, বা হোক না ভীতি প্রদর্শনেই-- এক বিরাট সংখ্যক অধিবাসী বা অভিবাসীকে এ রাজ্যে ভাষিক পরিচিতি পালটে নিতে হয়েছিল ( লোক গণনাকর্মীর এদের নিবেদন স্মর্তব্য ‘লেইখ্যা নিন আমি অসইম্যা’)।
এ গাণিতিক হিসেবের মধ্যে নিহীত শুভঙ্করের ফাঁকিটি আর কেউ না বুঝলেও এ উদ্যোগের পিছনে যারা সক্রিয়ছিলেন এরা এটা ঠিকই বুঝেছেন। তাই প্রথম সুযোগেই বিধান সভায় ভাষা বিলটি উত্থাপন করে সংখ্যার জোরে পাস করিয়ে নিতে মরিয়া হয়ে উঠতেই হল সরকারের, এবং এ জন্য দরকার হল জাতি বিদ্বেষ সৃষ্টি করার, প্রয়োজন হল দাঙ্গা পরিস্থিতি সৃষ্টি করা। পরিণামে যা হবার তা-ই হল—গ্রাম, শহরে শিশু-নারী-বৃদ্ধরাহলেন অত্যাচারিত, প্রাণ হারালেন নিরীহ মানুষ, ঘর পুড়ল অকাতরে।
স্বাধীনতার অব্যবহিত পরই অসমিয়া গণমানসে একটি আশঙ্কার প্রতিধ্বনি শোনা গেল আসাম বিধানসভার প্রথম অধিবেশনে। ৫ নভেম্বর ১৯৪৭ সালে বিধানসভায় লোকপ্রিয় গোপীনাথ বরদলই মন্ত্রীসভা অনুমোদিত রাজ্যপাল স্যার আকবর হায়দরি আই.সি.এস. প্রদত্ত ভাষণে ‘নেটিভস অব আসাম’কে ‘Masters of their own home’ বলে অভিনন্দিত করে বলা হল—‘The Bengalees has no longer the power, even he had the will to impose anything on the peoples of these hills and valleys …’।
হায়দরাবাদি প্রাক্তন আই সি এস সিভিলিয়ান স্যার আকবর হায়দরির জবানিতে ‘বাঙালিরা এখন হীনবীর্য’ বলে উল্লেখিত হবার পর ‘এ স্ট্রেঞ্জার’দের জন্য এও উচ্চারিত হল—‘I would therefore appeal to you to exert all the influence you possess to give the stranger in our midst a fair deal, provided of course he in his turn deals loyally with us.’ অর্থাৎ বলা হয় স্বাধীন ভারতের অঙ্গরাজ্য আসামে বাঙালিরাও সুব্যবহার পাবে, তবে সেটা হবে আনুগত্যের বিনিময়ে।
কেন্দ্রীয় সংসদে অপরাপর ভাষিকগোষ্ঠীর অধিকার অস্বীকার করে নীলমণি ফুকন মহোদয়ের বক্তব্যে ধ্বনিত হল— ‘Regarding our language Assamese must be the state language of the province.’।
উল্লেখ করা প্রয়োজন, ইতিমধ্যে মুখ্যমন্ত্রী (তখন বলা হত প্রধানমন্ত্রী) লোকপ্রিয় গোপীনাথ বরদলৈ কর্তৃক উচ্চারিত হল আরও একটি উক্তি— ‘Assam for Assamese’ –শ্লোগান হিসেবে প্রচারিত এ উক্তি জাতির জনক মহাত্মা গান্ধীকে পর্যন্ত বিচলিত করেছিল । জননেতার পুরো বয়ানটি এখানে উদ্ধার করা প্রয়োজন:
‘It is not the intention of the Government to make Assam a bi-lingual state. For the homogeneity of the province, they (i.e., non-Assamese) should adopt the Assamese language … Assam is only for Assamese.’
এ প্রেক্ষিতেই গোয়ালপাড়া জেলার ভাষিক লক্ষণকে পালটে দিতে ২৫০ টি বাংলা মাধ্যমের স্কুলকে কমিয়ে আনা হল মাত্র তিনটি সংখ্যায় (১৯৫০-৫১ সালের মধ্যে )। ১৯৬০ সালের ২১ এবং ২২ এপ্রিল আসাম প্রদেশ কংগ্রেস কমিটিতে অসমিয়াকে একমাত্র রাজ্য সরকারি ভাষা হিসেবে পাস করানোর জন্য প্রস্তাব গ্রহণ করা হল। কাছাড়ের সদস্যদের মতামত হল অগ্রাহ্য।
রাজ্য ভাষা বিল এবং প্রতিবাদী আন্দোলনের সূচনা
উপরে বর্ণিত প্রেক্ষাপটে ১৯৬০ সালের ১০ অক্টোবর বিধান সভায় উত্থাপিত রাজ্য ভাষা বিল। আসামের মুখ্যমন্ত্রী তখন কাছাড়ের বদরপুর থেকে নির্বাচিত প্রতিনিধি বিমলাপ্রসাদ চালিহা। ১০ তারিখ উত্থাপিত বিলটি ২৪ অক্টোবর রাত বারোটায় ৫৬-০ ভোটে এক তরফা গৃহীত হয়ে গেল। মুখ্যমন্ত্রী এবং আবদুল মতলিব মজুমদার ছাড়া কাছাড়ের বাঙালি অবাঙালি প্রতিনিধি দলমত নির্বিশেষে সবাই প্রতিবাদে সভাকক্ষ ত্যাগ করেন। একতরফা গৃহীত আইনটি হল Assam Official Language Act , 1960 (Assam Act no.XXXIII of 1960)। আইনটি গৃহীত হবার অব্যাবহিত পরেই শিক্ষাবিদ, বুদ্ধিজীবী, সচেতন রাজনৈতিক মহল এবং ছাত্র যুবসমাজে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। ২ ও ৩ জুলাই ১৯৬০ সালে শিলচর গান্ধীবাগে ‘নিখিল আসাম বাংলা ভাষা ও অনসমিয়া ভাষা সম্মেলন’। সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন প্রখ্যাত সাংবাদিক চপলাকান্ত ভট্টাচার্য, এম,পি (পশ্চিমবঙ্গ)। ২ জুলাই ১৯৬০ শনিবার বিকেল ৩ টায় অভ্যর্থনা সমিতির পক্ষে বৈদ্যনাথ মুখোপাধ্যায় শ্রী চপলাকান্ত ভট্টাচার্যকে সভাপতির আসনে বৃত করেন। মঞ্চে আসন গ্রহণ করেন আসামের সরবরাহ মন্ত্রী ময়ীনুল হক চৌধুরী, খাসিয়া নেতা হুভার হুইনি নিউতা, এম পি, সুরেশ চন্দ্র দেব, এম পি এবং এম-এল-এ নন্দকিশোর সিং, বিশ্বনাথ উপাধ্যায় এবং হাইলাকান্দি, করিমগঞ্জের বিশিষ্ট নেতৃবর্গ। প্রথমে কয়েকটি লিখিত বার্তা পাঠ করে শোনানো হয়। সম্মেলনে উপস্থিত থাকতে না পারার জন্য দুঃখ প্রকাশ এবং সম্মেলনের সাফল্য কামনা করে বার্তা প্রেরণ করেন আসামের নেতা মাদ্রাজের রাজ্যপাল, বিষ্ণুরাম মেধী, পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল পদ্মজা নাইডু, সাহিত্যিক হেমেন্দ্রপ্রসাদ ঘোষ, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, রেজাউল করিম, মুখ্যমন্ত্রী বিমলাপ্রসাদ চালিহা, অরুণচন্দ্র গুহ, প্রফুল্লচন্দ্র সেন, ড.ত্রিগুণা সেন, অতুল্য ঘোষ, অজয় মুখার্জি, ড৽আর আহমেদ, অনাথবন্ধু রায়, হরেশ্বর দাস, হেমচন্দ্র চক্রবর্তী প্রমুখ।
সম্মেলনে স্বাগত ভাষণে বৈদ্যনাথ মুখোপাধ্যায় বলেন যেহেতু এই প্রদেশের নাম আসাম, অনসমিয়া ভাষাভাষীগণ সেই কারণেই কাহারও কাহারও নিকট বহিরাগতরূপেই প্রতীয়মান হইতেছেন। এরা যেন এই রাজ্যের পক্ষে বোঝা স্বরূপ। শ্রীহট্ট ও পূর্ববঙ্গ হইতে লক্ষ লক্ষ হিন্দু দেশনায়কগণের প্রদত্ত প্রতিশড়ুতির উপর চনির্ভর করিয়া অসমিয়াভাষীদিগকে আত্মীয় জ্ঞান করিয়াই এই রাজ্যে আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছিলেন। কিন্তু আজ ইহারা চরম উপেক্ষার পাত্র—অবাঞ্ছিত অতিথি।
…গায়ের জোরে একশ্রেণির লোক যে আজ অসমিয়া ভাষাকে আমাদের উপর চাপাইয়া দিতে চাহিতেছেন তাহারা ভুলিয়া যাইতেছেন যে, গায়ের জোর দেখানোর অর্থই হইতেছে তাঁহাদের দাবির পিছনে কোন যুক্তি নাই—এই কথা স্বীকার করিয়া লওয়া। অসমিয়া ভাষার প্রতি মমতা অপেক্ষা বাংলা ও অন্যান্য ভাষার প্রতি বিদ্বেষের কথাটাই বড়ো হইয়া উঠিতেছে।
বিশিষ্ট সাহিত্যিক, চিন্তাবিদ কাজি আব্দুল ওদুদ বলেন—
“ইংরাজের হাত হইতে স্বাধীনতা কাড়িয়া আনিবার জন্য আমরা এক উদ্দেশ্যে একযোগে কাজ করিয়াছিলাম, কিন্তু স্বাধীনতা লাভের পর আমাদের সামনে সমস্যা ভিন্ন আকারে দেখা দিয়াছে। দেশের সামনে আজ সব চাইতে বড় সমস্যা দাঁড়াইয়াছে বৈচিত্র্যের মধ্যে একত্বকে কী করিয়া রক্ষা করা যায়। অসমিয়াগণ যখন অসমিয়া ভাষাকে রাজ্যভাষা করিতে চান তখন আপাতদৃষ্টিতে তাহাকে ন্যায়সংগত দাবি বলিয়াই মনে হয়। কিন্তু এই প্রশ্নের মীমাংসায় আসামের বিশেষ অবস্থার কথাও চিন্তা করিতে হইবে। আসাম বহু ভাষাভাষী রাজ্য। এখানে কোনো একটি ভাষাকে অপর সব ভাষার উপর প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত করিতে দেওয়া যায় না। কোনো একটি ভাষাকে সরকারি ভাষা করিয়া দিলেই কী তাহা বাস্তবিকপক্ষে বড় হইয়া যাইতে পারে? পৃথিবীতে অনেক রাজ্যে অনেক ভাষাকেই সরকারি ভাষা করা হইয়াছে- কিন্তু তাহাদের সবগুলিই ভাষা হিসেবে বড় নয়। কোনো ভাষাকে বড় করিতে হইলে মহৎ লোকের সৃষ্টি করিতে হয়। ডান্ডাবাজির দ্বারা সাহিত্যের উৎকর্ষসাধন হয় না। মহৎ সাহিত্যের সৃষ্টির জন্য মহৎ মানুষ সৃষ্টির প্রয়োজন। মনুষ্যত্বের বিকাশ ছাড়া সাহিত্য সৃষ্টি হয় না। সরকারি অর্থ সাহায্য লাভ করিয়াও কোনো সাহিত্য বড় হইতে পারে না। সরকারি অর্থের সাহায্যে অভিধান প্রস্তুত করা যাইতে পারে, অনুবাদ করা যাইতে পারে-কিন্তু সাহিত্য সৃষ্টি পৃথক জিনিস। বাঙ্গালী যাঁহারা আসামে আছেন- তাঁহাদের বিশেষ দায়িত্ব বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ সম্পদ অসমিয়াদের নিকট তুলিয়া ধরা আর অসমিয়া এবং আসামের অন্যান্য ভাষার মধ্যে শ্রেষ্ঠ বস্তু যাহা আছে তাহা বাংলা সাহিত্যের জন্য আহরণ করিয়া বাংলা ভাষাকে আরো সমৃদ্ধ করা। বাঙ্গালীরাও কর্তব্যবুদ্ধি প্রণোদিত হইয়া আসামের উন্নতির জন্য সচেষ্ট হইবেন। প্রেমের দ্বারা সকলের মন জয় করিতে হইবে।” (জনশক্তি, শিলচর ২৯ জুন ১৯৬০)
ভারত সীমান্তে চিন এবং পাকিস্তানের শত্রুতা এবং এ সঙ্গে নবসৃষ্ট আভ্যন্তরীন জটিলতা যে খুব সুবুদ্ধির পরিচায়ক নয় এ কথাটি মনে করিয়ে দিয়ে বৈদ্যনাথ মুখোপাধ্যায় এ ভুবনের কৃতী সন্তান বিপিনচন্দ্র পাল, ড. সুন্দরীমোহন দাস, মৌলবী আব্দুল করিম, কামিনীকুমার চন্দ, শচীন্দ্র সিংহ, ভুবনমোহন বিদ্যার্ণবের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করে স্বাধীনতা আন্দোলনে শ্রীহট্ট-কাছাড়ের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা, ১৯২১ সালে সুরমা উপত্যকার চা শ্রমিক আন্দোলনের কথা স্মরণ করেন। প্রকাশ্য অধিবেশনে ভাষণ দেন পশ্চিমবঙ্গের চিন্তাবিদ লেখক কাজি আব্দুল ওদুদ।
এদিন সন্ধ্যা সাতটায় শিলচর সাংস্কৃতিক ভবনে খাসিয়া জননেতা হুভার হুইনির সভাপতিত্বে আসামের পার্বত্য অঞ্চলের প্রতিনিধি সহ অন-অসমিয়া ভাষাভাষীদের সভায় অধ্যাপক শরৎচন্দ্র নাথ, আশুতোষ দত্ত ও ভাষণ দান করেন। বিশিষ্ট ডিমাসা আইনজীবী অনিলকুমার বর্মন একসময় যে ডিমাসা জাতি যে সমগ্র আসামে রাজত্ব করেন এ কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রশ্ন করেন অম্বিকাগিরি রায়চৌধুরী কোন অধিকারে কাছাড়কে আসাম থেকে বের করে দিতে চান? তিনি বলেন তাঁরাই বরং আসাম থেকে বের হয়ে যান। উত্তর কাছাড়ের লোক বাংলা বলে এবং বাংলায় শিক্ষালাভ করে এ কথা বলে তিনি রাজ্য ভাষা হিসেবে বাংলাকে হঠিয়ে দেবার বিরুদ্ধে মতামত দেন। কাবুই নাগা প্রতিনিধি সারা রাজ্যে অসমিয়া ভাষা চালু করার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান। খাসিয়া-জয়ন্তীয়া জেলা পরিষদের চিফ এক্সিকিউটিভ টি, কাজি বলেন, ‘আসাম উপত্যকার ষড়যন্ত্রের ফলেই শ্রীহট্ট পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এর ফলে খাসিয়া পাহাড়ে মানুষের দুর্গতি বেড়েছে। তিনি বলেন, একতরফা অসমিয়া ভাষা প্রবর্তনের বিরুদ্ধে পার্বত্য অঞ্চলের সকল জাতি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। রাজ্যভাষা আইনের বিরোধিতা করে বক্তব্য রাখেন পূর্ব ভারত উপজাতীয় ইউনিয়নের সহ সভাপতি এবং মিজো জেলা প্রতিনিধি থাঙ্গারিডেমা, কাছাড় পার্বত্য জাতি সমিতির সম্পাদক থেংটুয়ামা, কাছাড়ের মণিপুরি প্রতিনিধি শ্রী বি, সিং, জৈন্তা পাহাড়ের প্রতিনিধি শ্রী পর্শনা। রাত দশটায় জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে অনুষ্ঠান সমাপ্ত হয়।
অক্টোবর ভাষা বিল একতরফা গৃহীত হলে ৬ এবং ৭ নভেম্বর নিখিল আসাম বাংলা ভাষা সম্মেলনের উদ্যোগে হোজাইতে এক অভিবর্তন অনুষ্ঠিত হল। এতে আহ্বায়ক ছিলেন রমণীকান্ত বসু (ধুবড়ি), মোহিত মোহন দাস (করিমগঞ্জ), কালীকৃষ্ণ ব্যানার্জি, জ্ঞানেশচন্দ্র সেন (গৌহাটি), শান্তিরঞ্জন দাসগুপ্ত (হোজাই)। রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী বৈদ্যনাথ মুখোপাধ্যায়ের পৌরোহিত্যে অভিবর্তনে বাংলা ভাষার স্বীকৃতি এবং দাঙ্গায় ক্ষতিগ্রস্থদের পুনর্বাসনের দাবি জানা হয়।
ইতিমধ্যে ৫ নভেম্বর ১৯৬০ করিমগঞ্জে অনুষ্ঠিত হয় জনসম্মেলন এই সম্মেলনে গঠিত হয় গণসংগ্রাম পরিষদ। মেঘালয়ের খাসি, গারো, উত্তর কাছাড়, কারবি আংলং এবং লুশাই হিলসের অন-অসমিয়া জনগোষ্ঠীও এ বিক্ষোভে সামিল হয়। কিন্তু এ সব কিছু উপেক্ষা করে ১৭ ডিসেম্বর বিধান সভায় পাস হওয়া ভাষা বিল রাজ্যপালের অনুমোদন লাভ করে। এরপর ২০ নভেম্বর কাছারের নরসিংপু্রে যোগী সম্মেলনীর ৩৬ তম অধিবেশনে ইতিহাসবিদ রাজমোহন নাথ বি, ই তত্ত্বভূষণের সভাপতিত্বে ‘রাজ্য ভাষা বিল সংশোধন করে বাংলা ভাষাকে অসমিয়া ভাষার সম-মর্যাদা দেওয়া না হলে আসামের বাংলা ভাষাভাষী এলাকাকে ‘বৃহত্তর আসাম হইতে বিচ্ছিন্ন করা অপরিহার্য’ হলে তজ্জন্য এই সভা’ সুষ্ঠু জনমত সংগঠন ক্রমে শান্তিপূর্ণ ও সংঘবদ্ধ সংগ্রাম পরিচালনার জন্য আহ্বান জানানো হয়। (প্রস্তাবক ও সমর্থক বৈদ্যনাথ নাথ এবং সুনীলবরণ নাথ।)
এরপর ১৯৬১ সালের ১৫ জানুয়ারি করিমগঞ্জ শহরে কংগ্রেস দলের আহ্বানে বাংলা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এক অভিবর্তন অনুষ্ঠিত হয়। এতে পৌরহিত্য করেন নেতাজির একনিষ্ট সহকর্মী শীলভদ্র যাজি। অতঃপর ৫ ফেব্রুয়ারি করিমগঞ্জ টাউল ব্যাঙ্ক প্রাঙ্গনে হাইলাকান্দির আইনজীবী আব্দুর রহমানের পৌরোহিত্যে গণ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সিদ্ধান্ত হয় বৈষম্যমূলক রাজ্যভাষা আইন প্রত্যাহার না হলে রাজ্যের অন-অসমিয়া ও বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চল নিয়ে স্বতন্ত্র প্রশাসনিক সংস্থা গড়ে তোলার দাবি নিয়ে আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। এই উদ্দেশ্যে কান্দ্রীয় ভাবে কাছাড় গণ সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে শিলচর, করিমগঞ্জ এবং হাইলাকান্দি এ তিন মহকুমা থেকে সদস্য নির্বাচন করা হয়।
৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৬১ তারিখে হাইলাকান্দিতে আরেকটি বিশেষ সভায় আব্দুর রহমানকে সভাপতি এবং নলিনীকান্ত দাসকে (করিমগঞ্জ) সাধারণ সম্পাদক, এবং বিধুভূষণ চৌধুরীকে কোষাধ্যক্ষ হিসেবে মনোনীত করে কাছাড় গণসংগ্রাম পরিষদ গঠিতহয়।
মহকুমা স্তরে কাছাড়ের জন্য সভাপতি হিসেবে জিতেন্দ্র নাথ চৌধুরী ও সম্পাদক পরিতোষ পাল চৌধুরী, করিমগঞ্জের জন্য সভাপতি হিসেবে ব্যোমকেশ দাস ও সম্পাদক নৃপতিরঞ্জন চৌধুরী, হাইলাকান্দির জন্য সভাপতি কেশবচন্দ্র চক্রবর্তী ও সম্পাদক হরিদাস দেবকে মনোনীত করা হয়।
এই ভাবে গণসংগ্রাম পরিষদ ১৩৬৮ বঙ্গাব্দের ১ বৈশাখ (১৫ এপ্রিল, ১৯৬১) সংকল্প দিবস হিসেবে পালন করার পর পরবর্তী একমাসব্যাপী সভা সমিতি, শোভাযাত্রা, পদযাত্রার মাধ্যমে জনসাধারণের কাছে আন্দোলনের বার্তা পৌঁছে দেবার কার্যসূচি রূপায়নে নেমে যায়। মহকুমা সমিতিগুলোকে আবার নিজ নিজ এলাকায় আঞ্চলিক সমিতি গঠন করে আন্দোলনকে আরও সুসংহত রূপ দেবার নির্দেশও দেওয়া হয়, এবং সারা কাছাড়ে গড়ে ওঠে অসংখ্য আঞ্চলিক শাখা।
প্রথম অবস্থায় যে সংগ্রামী চেতনা গড়ে উঠেছিল কামরূপ, গোয়ালপাড়া, হোজাই এলাকা নিয়ে, ক্রমে সেটা ঘনীভূত হল কাছাড় জেলার পরিধিতে। অপরদিকে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় অসমিয়া রাজ্য ভাষার স্বপক্ষে ব্যাপক আন্দোলন এবং জনমত গঠনও শুরু হয়, শুরু হয় রাজনৈতিক তৎপরতা, সৃষ্টি হয় ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গার পরিস্থিতি, সংঘটিত হল সন্ত্রাস, গৃহদাহ গণহত্যা। কাছাড়ে যেমন বাংলা ভাষার দাবিতে বঙ্গভাষী জনগণ পথে নামল, তেমনি অসমিয়া ভাষার দাবিতে অসমিয়া জনগণের সঙ্গে বঙ্গভাষী ছাড়াও অনসমিয়া জনগণও এগিয়ে গেল, একাধিক বাংলাভাষীর প্রাণও গেল এতে। ষাটের ভাষা আন্দোলনের অসমিয়া ইতিহাসকার দেবব্রত শর্মা ( এবং দয়াসাগর কলিতা) বলেছেন এই যে দুই উপত্যকায় ভাষার জন্য যাদের প্রাণ গেল, এদের জাতিগত পরিচয় দূরে সরিয়ে একত্রে ভাষাশহিদ বলাই তো সঙ্গত। এতে অসমিয়া রাজ্যভাষার সমর্থক বাঙালি যেমন আছেন তেমনি ভাষা কিংবা সাস্কৃতিক স্বাতত্র সম্বন্ধে নিতান্তই অজ্ঞ, এবং শান্তি সম্প্রীতি রক্ষায় নিবেদিত প্রাণ বাঙালি ও অসমিয়াও রয়েছেন। এদের একটি বিশদ তালিকা করার প্রয়াস পেয়েছেন দেবব্রত শর্মা এবং দয়াসাগর কলিতা যে তালিকায় শিলচরের একাদশ শহিদ যেমন আছেন, তেমনি ‘অসমিয়া ভাষার জন্য জীবন দেওয়া বাঙালি কমিউনিস্ট’ নগাওঁর শিশির নাগও আছেন। আছেন অসমিয়া শহিদ সাহিত্যিক সূর্য বরা, ছাত্র অনিল বরা, মজম্মিল হক এবং নাম না জানা আরও অনেক শহিদ। [সে সঙ্গে হাইলাকান্দির আলগাপুরে এককভাবে রাজ্যভাষা হিসেবে অসমিয়া ভাষার সমর্থনেপ্রকাশ্য দিবালোকে বাংলাভাষা আন্দোলনের বিরুদ্ধে খাড়াকরা রাজনৈতিক মদৎপুষ্ট আইনভঙ্গকারি কতিপয়ভাড়াটে লুঠতরাজ, অগ্নিসংযোগেরত অবস্থায় পুলিশের গুলিতে নিহত নিরক্ষরমানুষ (এরা ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় কোনও কোনও মহলে শহিদ বলেও চিহ্নিত)]।
ফিরে যাওয়া যাক আন্দোলন প্রসঙ্গে, —কাছাড় গণসংগ্রাম পরিষদ ১৩৬৮ বঙ্গাব্দের ১ বৈশাখ, অর্থাৎ নববর্ষের দিনটিকে সংকল্প দিবস হিসেবে পালন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। স্থির হর ওই দিন থেকে একমাস ব্যাপী সভা, শোভাযাত্রা, পদযাত্রা ইত্যাদির মাধ্যমে জনগণের মধ্যে আন্দোলনের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া হবে। খ্রিস্টিয় ক্যালেন্ডারে সংকল্প দিবস ছিল ১৯৬১ সালের এপ্রিল মাসের ১৫ তারিখ। ২ মে তারিখ করিমগঞ্জে এক জনসভায় সিদ্ধান্ত হয় ১৯ মে পালিত হবে সর্বাত্মক ও পূর্ণ হরতাল। সরকারি প্রাশাসনিক ব্যাবস্থা অচল করে দেবার সমস্ত পন্থা গৃহীত হবে।
আসাম প্রদেশ কংগ্রেস কমিটীড় সভাপতি শরৎচন্দ্র সিংহ বিজ্ঞপ্তি জারি করে কংগ্রেস কর্মীদের সংগ্রাম থেকে বিরত থাকতে নির্দেশ দেন। নিখিল ভারত কংগ্রস কমিটির সভাপতি সঞ্জীব রেড্ডিও অনুরূপ কড়া নির্দেশ জারি করেন দলীয় কর্মীদের প্রতি। প্রাথমিক ভাবে কিছু বিভ্রান্তি দেখা দিলেও এ নির্দেশ কংগ্রেস এবং অপর রাজনৈতিক দল সিপি আই –এর কর্মীদের আন্দোলনে সমর্থন দিতে কোন কুন্ঠা ছিল না। সংগ্রাম পরিষদের মুখ্য কার্যালয় ছিল করিমগঞ্জ, কিন্তু জেলা সদর শিলচরই হয়ে ওঠে সংগ্রামের মুখ্য কেন্দ্র। শিলচর মহকুমা সমিতির সদস্যদের মধ্যে মতানৈক্য দেখা দিলে সমিতির সমস্ত কার্যভার এসে যায় সম্পাদক পরিতোষ পাল চৌধুরীর হাতে এবং কেন্দ্রীয় সমিতির তাঁকেই সর্বাধিনায়ক হিসেবে সংগ্রাম পরিচালনার দায়িত্ব দেন। তাঁর নেতৃত্ব উনিশে মে সারা কাছাড়ের সঙ্গে শিলচর মহকুমায়ও সর্বাত্মক বন্ধের প্রস্তুতি নেওয়া হয়। দলে দলে স্বেচ্ছাসেবীরা নিজেদের নাম লিখিয়ে ধর্মঘটে যাবার প্রস্তুতি নিতে থাকলেন। স্কুল কলেজের ছাত্রছাত্রী ছাড়াও সার্বিক ভাবে যুব সমাজেও সংগ্রামী কার্যসূচিতে অংশগ্রহণে আগ্রহ দেখা গেল। বড়খলা, বিহাড়া, কাটিগড়া, বদরপুর, উধারবন্দ, লক্ষীপুর, জয়পুর, রাজাবাজার, সোনাই, ধলাই ছাড়াও মাছিমপুর, শ্রীকোণা, শালচাপরা, ভাঙ্গা, শ্রীগৌরী এবং করিমগঞ্জ শহর, এবং শহরতলি, সুপ্রাকান্দি, নিলামবাজার, কায়স্থগ্রাম হয়ে পাথারকান্দি, আর হাইলাকান্দি, লালা, কাটলিছড়া পেরিয়ে দুল্লভছড়া সর্বত্রই স্থানীয় নেতৃত্বে ছোট ছোট সমিতিসংগ্রামী কার্যসূচি গ্রহণ করছে। আসলে কয়েকদিন ধরে জেলা ভিত্তিক পদযাত্রা, পথসভা, এবং গ্রামেগঞ্জে জনসংযোগের ফলে ব্যপক জনসচেতনতাও জেগে উঠেছে। স্বাধীনতা আন্দোলনের পর এটাই ছিল দ্বিতীয় গণ আন্দোলন যার প্রভাব সারা কাছাড়ে সর্বস্তরের জনগণের কাছে ছড়িয়ে পড়েছিল। স্বাধীনতা পরবর্তী দিনে উপত্যকা জুড়ে যে বস্ত্রসংকট, লবন সংকট, কেরোসিন সংকট, খাদ্য সংকট নিয়ে হাহাকার সৃষ্টি হয়েছিল এর সঙ্গে শরণার্থীদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ, উদাসীনতা, ছাত্রদের সরকারি বৃত্তি প্রদানে সরকারি বিধিনিষেধ, ভূ- আবাসন, জমিবন্টন ইত্যাদি ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক আচরণ–সবকিছুরই বিরুদ্ধে জমে ওঠা ক্ষোভ একযোগে ভাষা আন্দোলনে প্রতিফলিত হয়েছিল, আন্দোলনটি হয়ে উঠেছিল সর্বাত্মক।
উনিশে মে ছিল সর্বাত্মক বন্ধের দিন। সকাল ছ’টার আগেই তারাপুর রেলস্টেশনে সত্যাগ্রহীরা রেললাইন অবরোধ করে বসেছিল। পুরোপুরি শান্তিপূর্ণ ছিল এ ধর্ণা। কিন্তু দুপুর ২.৩৫ মিনিটে বিনা প্ররোচনায় পুলিশের গুলি চালনা এগারোটি তাজা প্রাণ ছিনিয়ে নিল।
উনিশে মে’র শহিদেরা:
প্রথম দিন মোট নয়টি মৃতদেহ সনাক্ত হয় এবং শোক মিছিলে এদেরই বহন করা হয়। পরদিন রেলস্টেশনের পুকুরে সত্যেন্দ্র দেবের মৃতদেহ উদ্ধার হয়, আর হাসপাতালে মৃত্যু হয় গুলিবিদ্ধ বীরেন্দ্র সুত্রধরের। এ নিয়ে শহিদের সংখ্যা হয় এগারো। এই শহিদেরা হলেন—
সংগৃহীত চিত্র : ১৯শে মে ১৯৬১ সালের একাদশ ভাষা শহিদ
সত্যাগ্রহীর উপর গুলিবর্ষণের প্রতিবাদের বিধান সভার সদস্য জ্যোস্না চন্দ, রণেন্দ্রমোহন দাস, নন্দকিশোর সিং, বিশ্বনাথ উপাধ্যায় পদত্যাগ করেন। শিলচর মহকুমা পরিষদের সভাপতি বিশিষ্ট স্বাধীনতা সংগ্রামী সনৎকুমার দাসও পদত্যাগ করেন।
জেলায় ১৪৪ ধারা জারি থাকলেও সংগ্রাম পরিষদের নির্দেশে জেলা জুড়ে ধর্ণা এবং প্রতিবাদী সভা, সমাবেশ, মিছিল অব্যাহত থাকে। ইতিমধ্যে পুলিশি সন্ত্রাসে আহত ৫২ জন নরনারীর একটি তালিকা আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে (২২ মে, ১৯৬১)।
এরই মধ্যে ৭ জুন ১৯৬১ সত্যাগ্রহীরা আন্দোলনের কর্মসূচি হিসেবে শিলচর জজ কোর্ট দখল করল। পুলিশ চৌদ্দ জনকে গ্রেফতার করে আবার ১৪ জুন তারিখ মুক্ত করে দিল। এ অভিনব সত্যাগ্রহের ঘটনা আন্দোলনকে আরও উজ্জীবিত করে তুলল। সমগ্র উপত্যকা জুড়ে লাগাতার আন্দোলন চলতে থাকে। সবার মুখেই এককথা, 'জান দেব, জবান দেবনা।'
দেশের বিভিন্ন পত্রিকায় বিশেষত পশ্চিমবঙ্গের সকল পত্রিকায় ভাষা আন্দোলনের খবর সহ অন্যান্য সকল সংবাদ নিয়মিত বের হতে থাকে। এতে সারা দেশে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। বাংলাভাষার জন্য এই সংগ্রামের প্রতি দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সমর্থন আসতে থাকে। জনগণের চাপের কাছে নতি স্বীকার করে আসাম সরকার গৌহাটি হাইকোর্টের চিফ জাস্টিস গোপালজি মেহরোত্রাকে দিয়ে গুলি চালনা সম্পর্কে একটি কমিশন গঠন করাতে বাধ্য হয়, 'মেহরোত্রা কমিশন' নামে খ্যাত এ কমিশন যথারীতি সাক্ষীসাবুদ গ্রহণ করে রিপোর্ট আসাম সরকারের কাছে জমাও দিয়েছিল। কিন্তু সরকার জনতার দাবি অগ্রাহ্য করে এই রিপোর্ট কোনদিন প্রকাশ করেনি এবং শহিদ পরিবারগুলোকেও কোনও ক্ষতিপূরণ বা সাহায্যও করেনি। কংগ্রেস দল ছাড়াও আসামে জনতা দল, অসম গণপরিষদ এবং বিজেপি দলের সরকার পরবর্তীতে ক্ষমতায় এসেছে। কিন্তু কোনও সরকারই শহিদের পরিবারগুলো এবং আহতদের জন্য কোনও সরকারি ক্ষতিপুরণ বা সাহায্য বরাদ্দ করেনি।
অন্যদিকে কাছাড় জেলার প্রখ্যাত ব্যক্তি সংগঠনগুলোর উদ্যোগে আরেকটি বেসরকারি তদন্ত কমিশন গঠন করা হল। পাঁচজনের এই কমিটিতে সদস্য ছিলেন-১) শ্রী নির্মলচন্দ্র চ্যাটার্জি বার এট-ল, উপসভাপতি সুপ্রিমকোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন এবং সিনিওর অ্যাডভোকেট সুপ্রিমকোর্ট। ২) শ্রী অজিত কুমার দত্ত, অ্যাডভোকেট সুপ্রিমকোর্ট অব ইন্ডিয়া এবং অ্যাডভোকেট ক্যালকাটা হাইকোর্ট ৩) শ্রী রণদেব চৌধুরী, বার এট-ল, সম্পাদক ক্যালকাটা উইকলি নোটস্, সিনিয়র অ্যাডভোকেট সুপ্রিমকোর্ট অব ইন্ডিয়া এবং ক্যালকাটা হাইকোর্ট, ৪) শ্রী স্নেহাংশুকুমার আচার্য, এম এল সি, বার এট-ল, অ্যাডভোকেট সুপ্রিমকোর্ট অব ইন্ডিয়া এবং ক্যালকাটা হাইকোর্ট, এবং ৫) শ্রী সিদ্ধার্থশংকর রায়, এম এল এ-বার এট-ল, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী পশ্চিমবঙ্গ, অ্যাডভোকেট সুপ্রিমকোর্ট অব ইন্ডিয়া এবং ক্যালকাটা হাইকোর্ট।
তদন্ত প্রতিবেদন
এন সি চ্যাটার্জি বেসরকারি তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন
নির্মলচন্দ্র চ্যাটার্জি অর্থাৎ এন সি চ্যাটার্জিকে কমিশনের চেয়ারম্যান নিযুক্ত করা হয়। তিনি পশ্চিমবঙ্গের শ্রীমতী মায়া রায়কে কমিশনের সেক্রেটারি নিযুক্ত করেন। এই বেসরকারি তদন্ত কমিশন এনসি চ্যাটার্জি কমিশন নামে খ্যাত। কমিশন ৩১ মে, ১ এবং ৩ জুন ১৯৬১ তারিখ শিলচরে শুনানি গ্রহণ করে। ২৩ জন সাক্ষী-সাক্ষ্য প্রদান করেন। শিলচর জেলা বার অ্যাসোসিয়েশন শুনানি কার্যে কমিশনকে সহায়তা করে। কমিশনের সদস্যরা শিলচর সিভিল হাসপাতালে যান এবং তখন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সত্যাগ্রহীদের লিখিত জবানবন্দি গ্রহণ করেন। ৩ জুন পূর্ব উল্লিখিত ত্রিশ জন চিকিৎসাধীন সত্যাগ্রহীদের মধ্যে আঠারো জন তখনও চিকিৎসাধীন ছিলেন। এন সি চ্যাটার্জি কমিশন ২ জুন ১৯৬১ তারিখ করিমগঞ্জ শহরে যান এবং সরজমিনে পরিদর্শন করেন। সেখানে তারা ১৩ জন ব্যক্তির জবানবন্দি গ্রহণ করেন, তন্মধ্যে কাছাড় গণসংগ্রাম পরিষদের সভাপতি আব্দুর রহমান চৌধুরীও ছিলেন।
এই তদন্ত কমিশন শিলচরের নিরীহ সত্যাগ্রহীদের উপর গুলি চালনা ও করিমগঞ্জে পুলিশি আতিশয্যকে অযৌক্তিক বলে রায় দিয়ে আক্রান্তদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণের জন্য আহ্বান জানান।
পুলিশের গুলি চালনা এবং একাদশ সত্যাগ্রহীর শহিদত্ব বরণ করার পর সংগ্রামের লেলিহান শিখা দিনে রাতে জ্বলতে শুরু করল। পুলিশ, মিলিটারির প্রতি জনসাধারণের ঘৃণা উঠল চরমে। একের পর এক আরও সংগ্রামের কার্যসূচি ঘোষিত হতে থাকল।
পরিস্থিতি সামাল দিতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রী রাজ্যে ছুটে আসেন এবং রাজধানী শিলঙে ৬ জুন একটি বিবৃতি জারি করেন। এটাই শাস্ত্রী সূত্র হিসেবে পরচিতি লাভ করে। সংগ্রাম পরিষদ, এমন-কি কাছাড় কংগ্রেস কমিটিও এটি প্রত্যাখ্যান করে। এরপর শাস্ত্রীজি এক তারবার্তা প্রেরণ করে সংগ্রাম পরিষদকে দিল্লিতে আমন্ত্রণ জানান।
১৮ জুন ১৯৬১ এক জরুরি বৈঠকে মিলিত হয়ে কাছাড় গণ সংগ্রাম পরিষদ তিনমাসের জন্য আন্দোলন স্থগিত ঘোষণা করেন। দিল্লি যাত্রার জন্য ১২ সদস্যের যে প্রতিনিধিদল মনোনীত করা হয় এরা হলেন- আব্দুর রহমান চৌধুরী, নলিনীকান্ত দাস, হুরমত আলি বড়লস্কর, কেশবচন্দ্র চক্রবর্তী, বিশ্বনাথ উপাধ্যায়, অনিলকুমার বর্মণ, ভূপেন্দ্রকুমার সিংহ, জীতেন্দ্রনাথ চৌধুরী, অধ্যাপক শরৎচন্দ্র নাথ, সনৎকুমার চক্রবর্তী, বিধূভূষণ চৌধুরী ও গোলাম ছবির খান। এই প্রতিনিধিদলকে সাহায্য করার জন্য রথীন্দ্রনাথ সেন সহ ৫ জনের একটি দলও নির্বাচিত করা হয়। প্রতিনিধি দলটি ২ জুলাই ১৯৬১ ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রীর নিকট সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি আব্দুর রহমান চৌধুরীর দস্তখত সম্বলিত একটি স্মারকলিপি পেশ করেন। পরদিন অর্থাৎ ৩ জুলাই ১৯৬১ খ্রিঃ ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর নিকটও একটি স্মারকলিপি পেশ করেন। এতে দস্তখত করেন সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি আব্দুর রহমান চৌধুরী এবং সাধারণ সম্পাদক নলিনীকান্ত দাস।
দিল্লি আলোচনা গণসংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দের মতে বিশেষ ফলপ্রসূ না হলেও কেন্দ্রীয় সরকারের উপর একটা চাপ সৃষ্টি হয়। এই স্মারকলিপি দুটিতে ভাষার প্রশ্ন ছাড়াও এই উপত্যকার উন্নয়নের অনেক রূপরেখাও তুলে ধরা হয়েছিল। অবশেষে আসাম রাজ্যসরকার আন্দোলনকারীদের কাছে নতি স্বীকার করে এবং রাজ্যভাষা আইন ১৯৬০-এ একটি সংশোধনী আনা হয়।
সংশোধিত ধারাটি নিম্নরূপ :
‘5. Safeguard of the use of Bengali Language in the District of Cachar-. Without Prejudice to the provision contained in S.3, the Bengali Language shall be used for administrative and the official purposes upto and including district level in the district of Cachar.’
ভাষা আইন
আসাম সরকারি ভাষা আইন, ১৯৬০ এবং আসাম সরকারি ভাষা (সংশোধন) আইন, ১৯৬১
এটাই কাছাড় জেলায় বাংলা ভাষার ব্যবহার সম্পর্কে রক্ষাকবচ। এতে বলা হয়েছে “৩নং ধারায় বর্ণিত বিষয়ের সারবত্তাকে অস্বীকার না করে বাংলা ভাষাকে কাছাড় জেলার মধ্যে প্রশাসনিক ও অন্যান্য দাফতরিক কাজে অবশ্যই ব্যবহার করতে হবে।” এভাবেই আসাম সরকারের ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দের ৩৩ নং আইন ‘The Assam official Language Act 1960’ সংশোধিত হয়ে গেল, এবং শহিদের রক্তের বিনিময়ে তৎকালীন অবিভক্ত কাছাড় (আজকের দিনের বরাক উপত্যকায়) বাংলা ভাষার অধিকার রক্ষিত হল।
এ আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্বের সূচনা হয় ১৯৭২ সালে শিক্ষার মাধ্যম নিয়ে গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন সার্কুলারকে কেন্দ্র করে যেখানে অসমিয়া ভাষাকে কলেজ স্তরে শিক্ষার মাধ্যম ঘোষিত হলে এর প্রতিবাদ ধ্বনিত হয় বঙ্গভাষীদের পক্ষ থেকে এবং একজনের শহিদত্বের পর বিষয়টিতে আপাতত স্থিতি আসে। স্থায়ী সমাধানের জন্য কাছাড়কে পৃথক করে দেওয়া, কাছাড়ের জন্য রাজ্য স্তরে বিশ্ববিদ্যালয় কোনটিই সমগ্র আসামের বাঙালির জন্য মঙ্গলজনক নয় এ বিবেচনায় বিষয়টি অমীমাংসিত ভাবে শেষ হয়, যার পুনুরুত্থান হয় ১৯৮৬তে মাধ্যমিক শিক্ষা পর্ষদের জারি করা নয়া ভাষা সার্কুলারে, যার প্রতিবাদে সংঘটিত হয় আরেকটি ভাষা আন্দোলন যেখানে দুজন আন্দোলনকারিকে আবার শহিদত্ব বরণ করতে হয়। ভাষার প্রশ্নে সরকারের অনড় নীতির ফলে উদ্ভুত এই পরিস্থিতি থেকে আত্মপ্রকাশ করে আরেকটি আন্দোলন, শিক্ষা সংরক্ষণ এবং আকসার নেতৃত্ব কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলন যে আন্দোলনের পরিসমাপ্তি ঘটে ১৯৯৩ সালে শিলচরে ‘আসাম বিশ্ববিদ্যালয়’ নামে একটি কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় রূপায়নে।
ইতিমধ্যে সুরমা সাহিত্য সম্মিলনী, নর্ম্যাল স্কুল ভিত্তিক বিদ্বজ্জনের প্রিতিষ্ঠিত কাছাড় অনুসন্ধান সমিতির ঐতিহ্যানুসারে ১৯৭৭ সালে আত্মপ্রকাশ করে বরাক উপত্যকা বঙ্গ সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলন। ‘কাছাড় সাহিত্য পরিষদ’সংস্থার নাম নিয়ে শুরু হওয়া এ সংস্থাটি বর্তমান পরিচিতি নিয়ে বরাক উপত্যকার আশা আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হিসেবে বাঙালি সহ অপরাপর সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীরও অধিকার নিয়ে বৌদ্ধিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে আসছে।
ভাষা আন্দোলন, বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলন পেরিয়ে বরাক উপত্যকার চলমান আন্দোলনে বর্তমানে যোগ হয়েছে নিজ ভূমিতে নিজের বৈধতা প্রমাণ, নিজেদের ঐক্য বিনাশকারী বিভিন্ন শক্তির চক্রান্ত প্রতিহত করে এগিয়ে চলার সামনে এক নতুন প্রত্যাহ্বান। বলা চলে নির্বাসিতা বাংলায় এও আরেক সম্প্রসারিত আন্দোলন যার উৎসে সেই ভাষা আন্দোলনই।
বরাকবাসীর আত্ম জিজ্ঞাসা আত্ম অনুসন্ধান, এবং অস্তিত্ব সচেতনতার সূচনা এ বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলনের হাত ধরেই। ভাষা আন্দোলনে যে প্রশ্নগুলো অমোঘ হয়েছিল, এ প্রশ্নের উত্তরের জন্যই ইতিহাস, সমাজতত্ত্ব, ভাষাতত্ত্ব, অর্থনীতির দিকে সচেতন বিদ্বজ্জনের দৃষ্টি আকর্ষিত হয়, যার ফল স্বরূপ সাহিত্য, সংস্কৃতির বিকাশ এ ভূমির মনোজগতে নুতন প্রাণের জোয়ার আনে।
ভাষা আন্দোলনের বিস্তারিত ইতিহাস ইত্যাদির জন্য প্রদত্ত সূত্রগুলো অনুসন্ধান করতে পারেন। সূত্র:
সুবীর কর, বরাক উপত্যকার ভাষা সংগ্রামের ইতিহাস, ১৯৯৯, শিলচর সানগ্রাফিক্স, শিলচর
পরিতোষ পালচৌধুরী, কাছাড়ের কান্না, ১৯৭১, শিলচর
দিলীপকান্তি লস্কর, শহিদ তীর্থ, লালনমঞ্চ প্রকাশনী, ২০২১, করিমগঞ্জ
সুকুমার বিশ্বাস, আসামে ভাষা আন্দোলন ও বাঙালি প্রসঙ্গ-১৯৪৭-১৯৬১, ২০১৭, পারুল প্রকাশনী,কলকাতা।
বঙ্গীয় সমভূমির স্বাভাবিক সম্প্রসারণ বরাক উপত্যকা যে আবহমান কালের বাংলার সঙ্গে ভৌগোলিক, নৃতাত্ত্বিক, ভাষিক এবং লৌকিক সূত্রে সম্পৃক্ত এ নিয়ে যে বাঙালিকে যে পাঁজি পুথি দেখে তথ্যাদি সংগ্রহ করে নিজেদের বৈধতা প্রমাণ করতে হবে তা কে ভেবেছিল? কিন্তু বিগত শতকের প্রথম পর্ব থেকেই, যখন কাছাড়-করিমগঞ্জ-সিলেট একত্রে সুরমা ভ্যালি ডিভিশন হিসেবে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির আওতায় ছিল, তখনও সিলেট (বা একত্রে সুরমা উপত্যকার) ভাষিক চরিত্রলক্ষণ নিয়ে কিছু বিপরীতমুখী তত্ত্বের মৃদু প্রচার দেখা গিয়েছিল। ঔপভাষিক বৈশিষ্ট্যের নিরিখে সিলেট অঞ্চলের কথ্যভাষা বুঝি বাংলা নয়, এ ধরনের চিন্তার প্রচারও ছিল। বিশিষ্ট পণ্ডিত ভুবনমোহন বিদ্যার্ণব ( শিলচর নর্মাল স্কুলের অধ্যাপক) সিলেটের মৌলবি বাজারে ১৯১৪ সালে অনুষ্ঠিত সুরমা উপত্যকা সাহিত্য সম্মিলনীর তৃতীয় অধিবেশনে প্রদত্ত সভাপতির ভাষণে এ নিয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করেছেন। ১৯০৯ সালে Imperial Gazeteer- একটা কথা লেখা হয়েছিল, “the local dialect known as ‘sylheti’ differs materially from the language spoken in Bengal proper’। এই যে সিলেটি কথ্যভাষা মূলস্রোত বাংলাভাষা থেকে আলাদা-- এ বিবেচনায় এটাকে বাংলা বলে অস্বীকার করার প্রবণতার পেছনে যে একধরনের অজ্ঞতা রয়েছে এদিকে যে ক’জন তৎকালীন বিদ্বজ্জন দৃষ্টিপাত করেছেন বিদ্যার্ণব এদের মধ্যে অন্যতম। তিনি বলেছেন “সকলেই জানেন শ্রীহট্ট-কাছাড়ের ভাষা বঙ্গভাষা, কিন্তু একদিকে পশ্চিমবঙ্গে বাগ্ব্যবহার ও উহার সাহিত্য মন্দাকিনীর পবিত্র ধারা পুরাতন খাত পরিত্যাগ করিয়া ক্রমেই নতুন পথে সরিয়া যাইতেছে, অপরদিকে শ্রীহট্ট-কাছাড়ের সেই পুরাতন পথেই চলিতেছে। ফলে উভয়ের মধ্যে ব্যবধান বৃদ্ধি পাইয়া, শ্রীহট্ট-কাছাড়ের নিম্নশ্রেণীর কথ্যভাষা বঙ্গভাষা কি না, পাশ্চাত্য পণ্ডিতগণের মনে তদ্বিষয়ে সন্দেহ সন্দেহ সঞ্চার করিয়াছে”। বিদ্যার্ণব মহোদয় বলেন, “শ্রীহট্টের কথ্যভাষা পুরাতন গৌড়ীয় বঙ্গভাষারই প্রতিকৃতি। পশ্চিমবঙ্গে রাজনীতি, ধর্মনীতি, সামাজিক অবস্থা প্রভৃতির সংস্কার সংগঠন ও পরিবর্তনে ভাষার দ্রুতগতিতে পরিবর্তন ঘটিয়াছে। শ্রীহট্টতে তেমন ভাবে সংস্কারের স্রোত বহে নাই”। তাঁর মূল কথাটি এখানে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক—“আমাদের কথ্যভাষার প্রবাহ অদ্যাপি বহুলাংশে সেই ‘গৌড়ীয় খাতে’ই প্রবাহিত হইতেছে”।
এখানে আলোচনাক্রমে প্রাসঙ্গিক কথাটিও বলা প্রয়োজন, অবিভক্ত কাছাড় (বরাক উপত্যকা) ভাষাগত দিকে যে সিলেটি উপভাষা অঞ্চলেরই অন্তর্গত। কাছাড়ের কথ্য ভাষা পূর্বী- সিলেটি উপভাষারই অনুরূপ, যদিও এতে কিছু আঞ্চলিক বিভিন্নতা রয়েছে, যা না থাকাই অসম্ভব। কাছাড়ের কথ্যভাষাটি যে মূল বাংলার সঙ্গে ঘনিষ্টভাবে সম্পর্কিত এ নিয়ে ভাষা তাত্ত্বিক বিশ্লেষণও ইতিমধ্যেই প্রকাশিত হয়েছে। ভক্তিমাধব চট্টোপাধ্যায় ‘প্রাচীন গদ্যের আদিরূপ’ গ্রন্থে বলেছেন যে কাছাড়ের গ্রামীন কথ্যভাষা অষ্টাদশ শতকের বাংলা সাধু গদ্যের খুব কাছাকাছি। এটা যে কোন কেউই লক্ষ্য করতে পারেন গ্রাম কাছাড়ের মানুষের মুখে দিয়াছি (দিছি), গিয়াছি (গেছি), করিলাম, খাইলাম, দেখিলাম, পাইলাম ইত্যাদি ক্রিয়াপদ একেবারে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে উৎসারিত। মধ্যযুগীয় কাছাড়ের রাজসভা থেকে প্রকাশিত পত্রাদি, সনন্দ, প্রস্তরলিপি ইত্যাদির ভাষাও ব্যাকরণগত ভাবে বাংলা। তদ্রুপ ওই সময় বঙ্গদেশ এবং সংলগ্ন আহোম রাজসভা, কোচ বিহার, জৈন্তা রাজ্যের কাছাড়সহ ব্রিটিশ প্রশাসক রেসিডেন্টের সঙ্গে আদানপ্রদানে বাংলা ভাষার ব্যবহার দেখা যায়। এ লিপিগুলোর ভাষা শব্দতাত্ত্বিক, রূপতাত্ত্বিক এবং প্রায়োগিক দিকে প্রাচীন কাছাড় (বা সিলেট-সুরমা উপত্যকার) আঞ্চলিক ভাষার অনুরূপই। ১৭৯৭ থেকে ১৭৯৪ পর্যন্ত এসব আবেদন, মঞ্জুরিপত্র, নিয়োগপত্র, চুক্তিপত্র বা লিপিমালায় বাংলা গদ্যের যে আত্মপ্রকাশের ধারাটি সনাক্ত করা গেছে, এ ভাষাই এ ভূমিতে প্রচলিত বাংলা কথ্য এবং লেখ্য ভাষার নমুনা যার সঙ্গে বঙ্গীয় মূল ভাষার গভীর নৈকট্য বিদ্যমান। ১৭১৭ শক অর্থাৎ ১৭৯৫ খ্রিস্টাব্দে আহোমরাজ কমলেশ্বর সিং কাছাড়ের মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রকে অসমিয়া বয়ানে পত্র লিখেছেন, কিন্তু এর business part – অর্থাৎ যে সব অংশে তিনি বন্ধুত্ব, সখ্য কিংবা ভীতি প্রদর্শন (threat)করছেন সেখানে বাক্যগুলো বাংলা হয়ে গেছে:
“ …সম্প্রতি ঈশ্বরের কৃপাত সেই শত্রু দমন করিয়া দেশ পাইছি… যদিস্যাৎ সেই বরমুরা এবং ভগনীয়া ও ময়ামারিয়া ছারি দেয় না তবে যি হবে তাহা আপনে চাক্ষু দেখিবেন…(অর্থাৎ you shall see by yourself what will be the consequence)।
আরেকটি পত্রের বয়ানও প্রাসঙ্গিক:
“তোমার ফৌজ এখন হইতে উঠি গেলে আমাদের একটি প্রাণি একদিনো প্রাণিরক্ষা পায়িব না অতএব আমাদের সকলকে অনুগ্রহ করিয়া কাপ্তান ওবালিচ সাহেবকে ফৌজসমেত থাকিয়া শত্রু দমন করি দেশটা প্রতুল করিবার নিমিত্তে হুকুম দিবেন”…(গভর্নর জেনারেল, কলকাতা সমীপে আহোম রাজ, ১৭৯৪ খ্রিস্টাব্দে)।
ডিমাসা মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র ১৭৯৬ সালে কলকাতায় গভর্নর জেনারেলকে লিখেছেন:
“আমার মুলুকের লুক তুমার মুলুকে জাইতে পারে না তুমার মুলু… আমার মুলুকে আসিতে পারে না এই বিসয়ে গরিব লুকের নালিশ নিমিত্যে আমার উকিল শ্রীখুসালরাম দত্তকে পত্র দিয়া তুমার নিকট পাঠাইতেছি”।
১৭৩৬ খ্রিস্টাব্দে মাইবং থেকে মহারাজ কীর্তিচন্দ্র বড়খলার মনিরাম লস্করের প্রতি অভয়পত্রে লিখেছেন— (লিপি-১) “রাজ্যের মনুষ্য যে জনে উজিরর বাক্যে না চলে মেল দেওনে হেলা করিয়া দেয়রঙ্গ করে …তারে সর্ব্বদণ্ড করিমু এতধর্থে অভয়পত্র দিলা—ইতি ১৬৫৮(তারিখ) ২৯ ভাদ্রশ্য”।
(লিপি-২): “ আমার বংশত জতদিবস রার্জশপদ আছে অত দিবস জদ বুনিয়াদ বশাংবলি হাকিমইতি জমিধারি তুমারে দিলাম এতে তুমার আইল শিমা উ বিশএত যে হিংশা করে তার প্রাণ রইক্ষা না করিমু আর আমার বংশে তুমার বংশরে পালন করিব মহা ২ অপরাধ পাইলে ৭ শাটা অপরাধ খেমিআ উচিত দণ্ড করিমু তুমার বংশে আমার নুন যে কবুল করে শ্রীরঁ—এই খাতিলজমা না ডুলিমু শত্য ৭ এতধক্তে খাতিলজমা পত্র দিলাম …”। (বিশেষ অভিনিবেশ সহকারে পাঠ করলে বাক্যগুলো বুঝতে খুব অসুবিধা হয় না। সেই সময় বাংলা লেখায় বিরতি চিহ্ন, যতি চিহ্ন ইত্যাদির প্রয়োগ নেই, কারণ বিদ্যাসাগর মশাই এরও এক শতাব্দী পরে বাঙালিকে এসব শিখিয়েছেন।)
পদ্মনাথ বিদ্যাবিনোদ থেকে সুজিৎ চৌধুরী, কামালুদ্দিন আহমেদ, জয়ন্তভূষণ ভট্টাচার্য, অমলেন্দু ভট্টাচার্য-- সবাই ডিমাসা রাজসভা প্রদত্ত এ নথির ভাষাকে মধ্যযুগীয় বাংলা ভাষা হিসেবেই সনাক্ত করেছেন। কাছাড়ি রাজসভা সূত্রে প্রাপ্ত এসব নথির প্রতিটি পঙক্তি, অক্ষরের মধ্যেই আমাদের নিজস্ব ভাষাতত্ত্বের উপাদান নিহিত।
এসঙ্গে রয়েছে সিলেট-কাছাড় থেকে সংগৃহীত অসংখ্য পুথি, লোকসাহিত্যের নিদর্শন, কীর্তন, আউল-বাউল-মারিফতি-ভাটিয়ালি, মরমি, ভাসান, রাখালের আই, ঠাঁট ইত্যাদি বিভিন্ন বর্গের সংগীত এবং সর্বোপরি রাজসভাশ্রিত মালসি গান, পৌরাণিক কাব্য, ‘শ্রীনারদী রসামৃত’ (১৭২২), বৈষ্ণবীয় ভাবে সিক্ত উনবিংশ শতকীয় নৃপতি-কবি গোবিন্দচন্দ্র কৃত ‘রাসোৎসব গীতামৃত’—এসবের মধ্যে সুস্পষ্ট হয়ে রয়েছে বৃহত্তর বাংলা সাহিত্যের আঙিনায় কাছাড়ের স্বাক্ষর।
ভৌগোলিক দূরত্ব হেতু অখণ্ড বঙ্গভূমির লেখ্য সাহিত্যে পূর্বোত্তর ভারতের এ প্রান্তিকভূমির ভাষা এবং সাহিত্য অন্তর্ভুক্তি লাভ করতে সক্ষম হয়নি, এবং এরই ফলশ্রুতিতে সিলেট-কাছারের ভাষার অস্তিত্বকে অস্বীকার করার একটা প্রবণতা দেখা গিয়েছিল বিংশ শতকের একেবারে প্রথম দশকেই। এর পেছনে প্রাদেশিক রাজনীতিরও একটা ভূমিকা ছিল। সিলেট কাছাড়ের আসাম ভূক্তি, আসামের রাজনীতিতে ভাষিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং অসমিয়া জাতীয়তাবাদের বিকাশ এবং এরপর দেশবিভাগের অব্যবহিত পরে জাতিদ্বন্দ্বের ফলে কাছাড় এবং আসামে বাঙালিদের অস্তিত্বকে অস্বীকার করার প্রবণতা দেখা দেয়, সিলেটি (এ নামেই কাছাড়ের উপভাষাকেও চিহ্নিত করা হয়) যে বাংলার নয় অসমিয়া ভাষারই একটি উপভাষা হিসেবে দেখার প্রয়াসও দেখা যায়। বিশিষ্ট ভাষাচিন্তাবিদ বেণুধর রাজখোয়ার Notes on the Sylhetee Dialect(1913) এ চিন্তাকে উৎসাহিত করল।
১৯৬০-৬১ সালের ভাষা আন্দোলনের অব্যবহিত পর বাংলা ভাষার বৈধতা কিছুটা সরকারি মান্যতা লাভ করার পর ভিন্নতর উদ্ভাবিত উপায়ের মাধ্যমে কাছাড়ের (আসামে) বাংলাকে অস্বীকার করার প্রয়াসের প্রেক্ষিতে বিষয়টিকে আরও গভীর ভাবে অনুধ্যানের প্রয়োজন অনুভূত হল।
আসাম রাজ্যে গত শতকের সাতের দশকের শেষ আর আটের শুরুতে বাংলা পাঠ্যপুস্তকের প্রচুর পরিমাণে ভ্যাজাল মিশ্রিত করে এমন একটা ভাষার জন্ম দেওয়ার প্রকল্প রচিত হল যে ভাষাটি বাংলার মতো হয়েও বাংলা নয়, অসমিয়ার মতো হয়েও অসমিয়াও নয়। এদিক ওদিকের ক্ষমতাবান ব্যক্তিত্ব, ক্ষমতার কাছাকাছি বিচরণশীল শিক্ষাজীবীর সহায়তায় বরাকেরই কতিপর বঙ্গসন্তানের মুখ দিয়ে এ ভাষার নাম উচ্চারিত হল ‘বরাকী’ ভাষা, এবং বলানো হল সে-মত পরিচর্যা করলে এ ভাষার সঙ্গে মূলস্রোত-বাংলার ব্যবধানও স্পষ্ট করে প্রতিষ্ঠা করা যাবে। বরাক উপত্যকার সামনে এ প্রবণতা বিরাট এক বিরাট এক ভাষাতাত্ত্বিক প্রত্যাহ্বান হিসেবে দেখা দিল।
প্রাতিষ্ঠানিক ভাষাতত্ত্বের পাঠ এবং অনুসন্ধানের পথ যেখানে সীমিত, সেখানে নির্জন একক গবেষকের প্রয়াসে শুরু হল ভাষাচর্চা, রচিত হল প্রাচীন ও মধ্যযুগের ইতিহাস, ঔপনিবেশিক আমলের ইতিহাস, সমাজতত্ত্ব, নৃতত্ত্ব, জনতত্ত্ব, লোকসংস্কৃতি নিয়ে অপ্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা। এ কর্মে প্রতিকূল রাজনৈতিক শক্তি এবং তাঁদের মদৎপুষ্ট সংগঠন ছাড়াও ভেতরে বাইরে আরও কিছু শক্তি খাড়া হল প্রতিপক্ষ হিসেবে।
বরাকসহ সমগ্র আসামে বিদেশি সনাক্তকরণ প্রক্রিয়া, ভোটার তালিকা সংশোধনী, নাগরিকপঞ্জি নবায়ন, নাগরিক আইন সংশোধনী, আসাম চুক্তির ছয় নম্বর ধারা রূপায়ন, খিলঞ্জিয়ার সংজ্ঞা নির্ধারণ ইত্যাদি কর্মযজ্ঞের বিপুল আয়োজনে বাঙালির শেষ অবলম্বন, মুখের ভাষাকে কোণঠাসা করে রাখার মুহূর্তে ভাষা এবং ভাষাতত্ত্বের দিকে সচেতন হওয়ার প্রয়োজন অনুভূত হল।
এই সচেতনতার পথেও আরেক প্রতিবন্ধকতা দেখা গেল, সিলেটি উপভাষাকে একটি স্বতন্ত্র ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা দেবার প্রয়াস, যে কর্মে সীমান্তের ওপারে, এপারে, বরাক-ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা সহ সাগরপারের কতিপয় চক্রও সক্রিয়। বছর কয়েক পূর্বে এদেরই কয়েকজন ব্যক্তি আসাম সাহিত্যসভার সভাপতি সমীপে বাংলাভাষার আগ্রাসনে সিলেটি বলে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ভাষার অবলুপ্তি ঘটছে এ নিয়ে একটা নালিশও রুজু করে বসলেন। প্রাক্ ঔপনিবেশিক আমলে সিলেট-কাছাড়ে আত্মপ্রকাশ হওয়া একটি লিপি, ‘নাগরিলিপি’কে সামনে রেখে ওদের এ পদক্ষেপ। এ ক্ষেত্রে যা বলার তা হল, যদি যথাসময়ে ভৌগোলিক, প্রশাসনিক অনুকূল পরিস্থিতির সুযোগ লাভ করত তবে হয়ত বিদ্যাসাগর, উইলিয়াম কেরি সাহেব আর শ্রীরামপুর মুদ্রণানলয় প্রসাদধন্য আমাদের পরিচিত বাংলা বর্ণমালার পরিবর্তে ওই লিপিই বাংলা ভাষার বাহন হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করত। ওই নাগরি লিপির যে সমস্ত পুথি আবিষ্কৃত হয়েছে সরবে পাঠ করলে শ্রোতারা বুঝতে পারবেন এ ভাষা বাংলা বই কিছুই নয়। এ লিপিতে যা রচিত হয়েছে সবই বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ, মূলস্রোত বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে সিলেট-কাছাড়ের অনবদ্য সংযোজন।
প্রাক্ স্বাধীনতা পর্বের সূত্র ধরলে বরাক উপত্যকায় ভাষাতত্ত্ব চর্চায় যারা আত্মনিয়োগ করেছেন এদের প্রায় সবাই অবিভক্ত সুরমা উপত্যকারই সন্তান যে উপত্যকার একটি খণ্ডিত অংশ নিয়েই আজকের বরাক উপত্যকা। এদের অনেকের কর্মভূমি ঔপনিবেশিক আসামের সিলেট-কাছাড় এবং ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা নিয়েই পরিব্যপ্ত ছিল। এরা বরাক-ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা এবং পূর্ববঙ্গ অর্থাৎ স্বাধীন বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলের যৌথ উত্তরাধিকার। এ ভূমির ভাষা সাহিত্য এবং ভাষাতত্ত্ব (সঙ্গে সমাজতত্ত্ব, নৃতত্ত্ব, ইতিহাস) নিয়ে প্রাথমিক এবং মৌলিক কাজ সবই সম্পন্ন হয়েছে প্রাক্-স্বাধীন পর্বেই। স্বাধীনতা-- যা এ ভূমিতে এসেছে খণ্ডিত হয়ে এবং লক্ষ লক্ষ জনের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের বার্তাবাহী হিসেবে—এর পরবর্তী পর্বে ভাষা, ভাষাতত্ত্ব নিয়ে নতুন উদ্যমে কাজ করার পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে হতেই অর্ধ শতক সময় অতিবাহিত হয়েছে এবং পরিবর্তিত জটিল রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে ভাষা এবং ভাষাতত্ত্ব নিয়ে যেটুকু কাজের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, এর অধিকাংশই ব্যয়িত হয়েছে/হচ্ছে খণ্ডিত ভূমিতে নিজেদের ভাষিক অস্তিত্বের বৈধতা প্রমাণ করতেই।
এ ভূমির ভাষাচিন্তকের মধ্যে যারা অগ্রণী—এদের অন্যতম হলেন মহামহোপাধ্যায় পদ্মনাথ ভট্টাচার্য বিদ্যাবিনোদ, অচ্যুতচরণ চৌধুরী তত্ত্বনিধি, রাজমোহন নাথ, ভারতচন্দ্র চৌধুরী বিদ্যাবারিধি, আসরফ হোসেন, সৈয়দ মুর্তাজা আলি, ভুবনমোহন বিদ্যার্ণব, শরচ্চন্দ্র চৌধুরী, মণিচরণ বর্মন, সুন্দরীমোহন দাস, এবং সে সঙ্গে শিলচর নর্মাল স্কুল ভিত্ত্বিক পণ্ডিতকূল—জগন্নাথ দেব, মুহাম্মদ বারি প্রমুখ। ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দে শিলচরে অনুষ্ঠিত ‘সুরমা সাহিত্য সম্মিলনী’র দ্বিতীয় অধিবেশন এ ভূমির ভাষাচর্চায় বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে। তবে ইতিপূর্বেই কাছাড়ের ইতিহাস নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ শুরু হয়ে যায়। যারা করেছেন এদের মধ্যে কৈলাশচন্দ্র সিংহ (শ্রীহট্টের তাম্রফলক ও কাছাড় রাজবংশাবলী, ১৮৮১-৮২), পদ্মনাথ বিদ্যাবিনোদ (হেড়ম্ব রাজ্যের দণ্ডবিধি, ১৯১০), উপেন্দ্রচন্দ্র গুহ (কাছাড়ের ইতিবৃত্ত, ১৯১১), মণিচরণ বর্মন (হৈড়িম্ব ভাষা প্রবেশ, ১৯১৩)—এদের নাম উল্লেখযোগ্য। পরবর্তী কালে এ ধারাটি প্রবহমান রেখেছেন নগেন্দ্রচন্দ্র শ্যাম, দেবব্রত দত্ত, সুধীর সেন থেকে শক্তিপদ ব্রহ্মচারী, অনুরূপা বিশ্বাস, ভক্তিমাধব চট্টোপাধ্যায় থেকে সুজিৎ চৌধুরী, কামালুদ্দিন আহমেদ, সুবীর কর যাঁদের নানাবিধ গবেষণাকৃতি কিংবা সৃজনশীল কর্মের মধ্যে ভাষাচিন্তা একটি বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। আর একান্তভাবে ভাষাতত্ত্ব নিয়েও চিন্তা ও কর্ম করে গেছেন জগগন্নাথ চক্রবর্তী যিনি ‘বরাক উপত্যকার আঞ্চলিক বাংলা ভাষার অভিধান ও ভাষাতত্ত্ব’ শীর্ষক একটি গ্রন্থ প্রণয়ন করে বাংলা বিদ্যাচর্চার জগতে এ ভূমিকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে গেছেন তাঁর স্বল্পকালীন জীবনে। এছাড়া আবিদরাজা মজুমদারও একক প্রয়াসে উপহার দিয়েছেন ‘বরাক উপত্যকার কথ্য বাংলার অভিধান’ যা এ অঞ্চলে ভাষাতত্ত্ব চর্চায় এক একটা মেইল ফলক বিশেষ। ভাষা এবং বাংলা বিদ্যাচর্চা নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন জন্মজিৎ রায়, এ সঙ্গে অমলেন্দু ভট্টাচার্য কাজ করে চলেছেন একাধারে ভাষা, লোকসংস্কৃতি, লোকসাহিত্য ইতিহাস, পুথিশাস্ত্র নিয়ে। সৃজনশীল এবং তাত্ত্বিক মননশীল রচনায় বরাক উপত্যকার বৌদ্ধিক পসিসরকে বিস্তৃত করে চলেছেন তপোধীর ভট্টাচার্য।