rotateআপনার মুঠোফোনটি ল্যান্ডস্কেপে রাখুন।
পাঠ্যপুস্তক ৩য় পত্র - ছয়
বাংলা ভাষা ডিপ্লোমা পাঠক্রম
পাঠ্যপুস্তক
(তৃতীয় পত্র : অধ্যায়-ছয় : প্রকল্প)
দ্বিতীয় ষাণ্মাসিক - তৃতীয় পত্র
বাংলা পাঠের গুরুত্বপূর্ণ স্তর : লিখন, পঠন এবং সৃজন
বাংলা পাঠের গুরুত্বপূর্ণ স্তর :
লিখন, পঠন এবং সৃজন
তৃতীয় পত্র   ❐   অধ্যায় -  ছয়
প্রকল্প: রসাস্বাদন এবং সৃজন
Project: Appreciation and Creation
প্রকল্প: রসাস্বাদন এবং সৃজন
Project: Appreciation and Creation
৬.0   ভূমিকা

এই পাঠক্রমের মধ্যে রয়েছে-

কবিতা, গল্প, মননশীল গদ্য, পাঠপরিকল্পনা-স্ক্রিপ্ট। এর মধ্যে যে কোনও একটি বিষয়কে ঐচ্ছিক বিষয় হিসেবে গ্রহণ করে প্রকল্প তৈরি করতে হবে।

ভাষাশিক্ষার অন্যতম অঙ্গ হল পঠিত ভাষার সৃজনশীল নিদর্শনগুলোর সঙ্গে পরিচিত হওয়া, এর রসাস্বাদন, এবং এর আঙ্গিক, ভাষা, শৈলীর বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা অর্জন। শুধু তাই বা কেন? এসব সৃজনকর্মে অংশ গ্রহণও এ পাঠের সঙ্গে সম্পর্কিত।

অধিত বিষয়ের গভীরে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে পাঠকদের মনে সৃজন-অনুপ্ররণ জাগে এবং পড়তে পড়তে, শিখতে শিখতে নিজের মনেও স্রষ্টার ভূমিকায় নামার ইচ্ছা জাগে। তখনই সমস্ত প্রক্রিয়াটি একটি পূর্ণতায় পৌঁছোয়। পাঠকের ভূমিকা থেকে লেখকের ভূমিকায় উত্তরণ পঠন-কর্মের অভীষ্টও।

আমাদের এ পর্বে রয়েছে কিছু সৃজনশীল কর্মের অনুশীলন। এটা ভুললে চলবে না. সৃজনশীলতার সঙ্গে মননশীলতার গভীর সম্পর্ক। কোনও কবিতা, গল্প, সংগীত, নাটক বা সিনেমার ‘ক্রিটিক্যাল অ্যাপ্রিসিয়েশন’ বা সমালোচনা করলে সমালোচকও ভেতরে ভেতরে সৃজনশীল কর্মের দিকে এগিয়ে যান। কবিতা পড়তে পড়তেই কবিতা লেখায় হাতেখড়ি, গদ্য লিখতে লিখতেই গদ্যকার। বইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুললেই বই লেখার অনুপ্রেরণা। সৃজনশীলতা হয়তো মানব মনের একটি স্বাভাবিক প্রবণতা- এটা যেমন ঠিক, তেমনি এটাও স্বীকার করতে বাধা নেই, ভেতরে সামান্য সৃজনশীলতা থাকলে অনুশীলনের মাধ্যমে এর বিকাশ সম্ভব। অন্তত গদ্য রচনার ক্ষেত্রে তো অনুশীলন আর প্রয়োজনের চাপে সার্থক লেখা হয়ে উঠতেই পারে।

কবিতার ক্ষেত্রে এ ব্যাপারে কিছু নির্দিষ্ট ভাবে বলা কঠিন। জীবনানন্দ দাশ বলে রেখেছেন, ‘সকলেই কবি নয় কেউ কেউ কবি।’ ইঙ্গিতটি সুস্পষ্ট - কবিতা রচনা শেখা যায় না। এর উৎসারণ রহস্যজনক ভাবে অন্তরের ভেতর থেকে শক্তিপদ ব্রহ্মচারী 'হঠাৎ কোন রহস্যময় হিরণ্য আলোকের কথা' বলেছেন যার মধ্যে ঘটে কবিতার উদ্ভাসন।

তবে এ পৃথিবীর বহু দেশে বহু যুগেও প্রতিভাবান কবি রয়েছেন যাঁদের কাব্য রচনা spontaneous overflow হলেও মূলত ছিল সচেতন প্রয়াস। মহাকবি মিল্টন বা মাইকেল মধুসূদন দত্ত হলেন দ্বিতীয়োক্ত দলের। আধুনিক বাংলা কবিদের মধ্যে বুদ্ধদেব বসু, বিষ্ণু দে এরা ছিলেন কবিতা-সমালোচক, শিক্ষক এবং কবি। এদের কাব্য রচনা প্রধানত সচেতন প্রয়াস বই কিছু নয়। কিন্তু রামপ্রসাদ-কমলাকান্ত, হাসন রাজা, লালন ফকির পদ লিখেছেন ভেতরের অনুপ্রেরণায়, পদ্য লিখব বলে দীর্ঘ সাধনার পর নয় নিশ্চিতভাবেই।

আজকাল দেশবিদেশের বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে সাহিত্য রচনার পাঠক্রম একেবারে প্রাতিষ্ঠানিক ভাবেই চালু হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রণালীবদ্ধ ভাবে লেখালেখি শেখানো হয়। Creative Writing, Mass Communication, Media Management-এর পাঠ নিয়ে বেরিয়ে আসছেন সফল লেখক, সাংবাদিক, নাট্যকার, চিত্রনাট্যকার, রেডিও-টিভির লেখক, এমনকি কথাসাহিত্যিকও।

আমাদের পাঠক্রমে এ পর্বে দুটো কর্ম রয়েছে। প্রথমটি হল সৃজনশীল কর্মের রসাস্বাদন (অ্যাপ্রিসিয়েশন), এবং দ্বিতীয়টি হল লিখনকর্মের পদ্ধতি অনুসরণ করে মৌলিক কিছু লিখে নেওয়া।

পড়ুয়াদের জন্য পাঁচটি বিকল্প রয়েছে, এর যে কোনও একটি ঐচ্ছিক প্রকল্প গ্রহণ করে প্রকল্পটি হাতে লিখে বা মুদ্রিত আকারে জমা দিতে হবে নির্ধারিত সময়ে।

ঐচ্ছিক প্রকল্প : -

৬.১   কবিতা

মানুষ সততই নিজের প্রাণের গভীর গোপন কথা প্রকাশ করতে চায়। এ প্রকাশের রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন মাধ্যম। কী প্রকাশ করতে চাই এর উপরই নির্ভর করে আমরা কী লিখব - কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, না পত্র? গদ্যে যা প্রকাশ অসম্ভব তার জন্য রয়েছে সংগীত, চিত্রকলা, স্থাপত্য ভাস্কর্য। এ এক অন্তহীন যাত্রা।

আমাদের সৃজনশীল প্রকাশ মাধ্যমের অন্যতম হল কবিতা। এখন কবিতা কী - এ দুরূহ প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চাইতে এক কলি কবিতা শুনিয়ে দেওয়া সহজ। তবে মনে রাখা চাই, প্রকাশভঙ্গির উপরই কবিতার আশ্রয়। একটি উচ্চারণ নিছক সংবাদ হয়েই থাকবে, না হয়ে উঠবে একটি ‘প্রকাশ’, এটা নির্ভর করে প্রকাশভঙ্গির উপর।

শোনা যাক, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দুটো কলি-

আমি তখন ছিলেম মগন গহন ঘুমের ঘোরে
যখন বৃষ্টি নামল,
তিমির নিবিড় রাতে...।

এখানে মূলতঃ একটি সংবাদই উপস্থাপন করা হয়েছে। বৃষ্টি আসার সংবাদ, কোনও বিরাট কিছু নয়। কবি তখন ঘুমিয়ে ছিলেন, গভীর অন্ধকার রাতে তাঁর অজান্তেই নেমে এল এই বৃষ্টিধারা। এ অভিজ্ঞতা সবারই হয়। কিন্তু সামান্য এই কথাটি অতি সাধারণ নিরলঙ্কার ভাষায় উচ্চারিত হওয়া মাত্রই পাঠক/শ্রোতার মতে একটি গভীর অনুরণনের সৃষ্টি হয়ে গেল। রচনাটি লাভ করল একটি ভিন্নতর মাত্রা। কবি অন্তরের একটি গভীর অনুভূতিকে বাইরে নিয়ে এলেন, শ্রোতাদের অনুভূতির সঙ্গে মিলিয়ে দিলেন। তাই সংবাদটি হয়ে উঠল নিটোল এক কাব্য।

এই যে একের অনুভূতিকে বহুজনের সঙ্গে মেলানো, অন্তরের জিনিসকে বাইরে টেনে আনা, ক্ষণকালকে সর্বকালের সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া, এটাই পূর্ণ প্রকাশ, এটাই কবিতা।

কারা যেন বাড়ি করছে গগনচুম্বী আশায়
আমি তখন ব্যস্ত থাকি আরেক ভালোবাসায়।
সরল রেখায় টেনে নামাই সামান্য বিন্দুকে
হাজার রকম ব্যাখ্যা করে হাজারটা নিন্দুকে
...
হঠযোগীর মতন আমি রাংতা করি সোনা
ভেতর জুড়ে ব্যস্ত আনাগোনা।
রয়ে গেলাম অপেক্ষমান শ্যামা কিংবা রামার
কবিতা তুই আমার।
— শক্তিপদ ব্রহ্মচারী

এ প্রকাশ হতে পারে নরনারীর ব্যক্তিগত প্রেমের, হতে পারে দেশপ্রেম, নিসর্গ প্রেম, হতে পারে জীবন সম্বন্ধে কোনো গভীর মুগ্ধবোধ, হতে পারে উচ্ছ্বাস, আহ্লাদ, অবসাদ, বিষণ্ণতা, কিংবা বিদ্রোহ, সংগ্রাম কিংবা প্রতিরোধের।

কবিতা হতে পারে ছন্দবদ্ধ শব্দশ্রেণীর শৃঙ্খলে বাঁধা, কবিতা হতে পারে মুক্তছন্দে, গদ্যের আকারে, কাব্যিকতা, অলঙ্কার বর্জিত; আবার, কবিতা হতে পারে সালঙ্করা, সংগীতময় ছন্দের তালে ঝংকৃত। কবিতা হতে পারে একেবারে প্রাত্যহিক কথোপকথনের মতো সহজ সরল, কবিতা হতে পারে অতিশয় দুর্বোধ্য, দুরতিক্রম্য।

বাংলার মুখ
জীবনানন্দ দাশ
বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই আমি পৃথিবীর রূপ
খুঁজিতে যাই না আর : অন্ধকারে জেগে উঠে ডুমুরের গাছে
চেয়ে দেখি ছাতার মতো ব্ড় পাতাটির নিচে বসে আছে
ভোরের দয়েলপাখি – চারিদিকে চেয়ে দেখি পল্লবের স্তূপ
জাম-বট-কাঁঠালের-হিজলের-অশথের করে আছে চুপ;
ফণীমনসার ঝোপে শটিবনে তাহাদের ছায়া পড়িয়াছে;
মধুকর ডিঙা থেকে না জানি সে কবে চাঁদ চম্পার কাছে
এমনই হিজল-বট-তমালের নীল ছায়া বাংলার অপরূপ রূপ

দেখেছিল; বেহুলাও একদিন গাঙুড়ের জলে ভেলা নিয়ে –
কৃষ্ণা-দ্বাদশীর জোৎস্না যখন মরিয়া গেছে নদীর চড়ায় –
সোনালি ধানের পাশে অসংখ্য অশ্বত্থ বট দেখেছিল, হায়,
শ্যামার নরম গান শুনেছিল - একদিন অমরায় গিয়ে
ছিন্ন খঞ্জনার মতো যখন সে নেচেছিল ইন্দ্রের সভায়
বাংলার নদ-নদী-ভাঁটফুল ঘুঙুরের মতো তার কেঁদেছিল পায়॥

বিশ্লেষণ ও রসাস্বাদন (Analysis and Appreciation) :

আসলে কবিতার কোনও বিশ্লেষণ হয় না, প্রয়োজনও নেই । কবিতা পাঠই এর অন্তর্নিহিত বার্তাকে পৌঁছে দেয় পাঠক মনে। জীবনানন্দ দাশের ‘রূপসী বাংলা’ কাব্যগ্রন্থের অন্যতম এ বিষয় বাংলার নিসর্গ প্রকৃতি, লোকায়ত মিথ, কথকতা একেবারে জীবন্ত হয়ে উঠে এসেছে তার বর্ণ-গন্ধ-চিত্র-ধ্বনি এবং আলো-আঁধারির খেলা নিয়ে। কবিতার ছত্রে ছত্রে দেশপ্রেম আর প্রকৃতিপ্রেম মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে। প্রিয় মাতৃভূমির আম-জাম-কাঁঠাল-হিজল-অশ্বথ থেকে একেবারে ব্রাত্য অর্কিড, শটিবন, ভাঁটফুল, আর শ্যামা-খঞ্জনা, নদীর চড়ায় মরে যাওয়া কৃষ্ণদ্বাদশীর জোছনা, সোনালী ধান সবই জীবন্ত, বাঙময় হয়ে উঠেছে। গাঙুড়ের জলে মৃতস্বামী নিয়ে ভেসে যাওয়া বেহুলা, দেবসভায় তাঁর নৃত্য এই সমস্ত কিছু নিয়ে চতুর্দশটি পদ সম্বলিত এ কবিতার আবেদন আমাদের প্রাণের গভীরে। এই বাংলার নদী-মাঠ-ভাঁটফুলে কবি নিজেকে সমর্পণ করেছেন। তিনি বাংলাকে ধারণ করেছেন নিজ সত্তার গভীরে। তাঁর আর কোনও কাঙ্ক্ষিত জগৎ নেই, এটাই তাঁর পরম প্রাপ্তি।

সভ্যতা, নগর, শিল্প-বিজ্ঞান, রাজনীতি, যুদ্ধ সমস্ত কিছুকে পেছনে ফেলে তিনি পৌঁছে গেছেন তাঁর শেষ আশ্রয় বাংলার কোলে, তিনি দেখেছেন বাংলার মুখ।

প্রত্যেক পাঠকই, তা তিনি পৃথিবীর যেখানেই থাকুন না কেন, যে কোন ভাষায়ই কথা বলুন না কেন এ কবিতাটিকে নিজের মতো করে পাঠ করতে পারবেন নিজের প্রেক্ষিতে, নিজের মানে নিজেই খুঁজে নিতে পারবেন, এখানেই কবিতার চমৎকারিত্ব।

কবিতার নিবিড় পাঠ :

উপরের কথাগুলো অস্বীকার করেও আপনি নিজের মতো করে কবিতাটির ব্যাখ্যা খুঁজে নিতে পারেন। অপরাপর স্বদেশ-ভাবনার বা প্রকৃতি বন্দনার কোনও কবিতা বা গানের সঙ্গে এর বিষয়বস্তু, শব্দচয়ন, প্রকাশভঙ্গি মিলিয়ে দেখতে পারেন। রবীন্দ্রনাথের 'আমার সোনার বাংলা' বা নজরুল ইসলামের ‘শ্যামলা বরণ বাংলা মায়ের রূপ দেখে আয়’ গান দুটো পড়ে দেখুন তো, জীবনানন্দের কবিতার সঙ্গে এর কতটুকু মিল বা কতুটুকু পার্থক্য। লক্ষ করুন কবিগুরুর ‘যে তোমারে ছাড়ে ছাডুক, আমি তোমায় ছাড়ব না মা’ পদটিতে ওই একই মনোভাব রয়েছে, কিন্তু প্রকাশভঙ্গি আলাদা।

আইরিশ কবি W.B. Yeats এর ‘Lake Isle of Innisfree’ কবিতাটির ‘ইনিসফ্রি’ আর ‘রূপসী বাংলা’ দুটোই ভৌগোলিক বাস্তব হয়েও কাল্পনিক এবং কাল্পনিক হয়েও ভৌগোলিক বাস্তব-এটা লক্ষ করেছেন কি?

নিজের সঙ্গে নিজে :

  • কবি যা বলতে চেয়েছেন, তা কি স্পষ্ট হল? (১০০ শব্দে)
  • কবিতার কোন্ পঙক্তি আপনার মনকে ছুঁয়েছে? পঙক্তি (গুলো) আপনার মনে কী ভাবনা জাগিয়েছে, লিখুন। (১০০ শব্দে)
  • কবিতার উল্লিখিত প্রাকৃতিক লতাগুল্ম এবং প্রাণীজগতের একটি তালিকা তৈরি করুন।
  • বেহুলার কাহিনিটির সারাংশ লিখুন। (৩০০ শব্দে)
  • আপনার গ্রাম বা শহর নিয়ে গদ্যে বা পদ্যে চার পাঁচটি পঙক্তি লিখুন।

স্বপ্নে দেখা ঘরদুয়ার
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

পুকুর, মরাই, সবজি-বাগান, জংলা ডুরে শাড়ি,
তার মানেই তো বাড়ি।
তার মানেই তো প্রাণের মধ্যে প্রাণ,
নিকিয়ে-নেওয়া উঠোনখানি রোদ্দুরে টান্‌-টান্‌।
ধান খুঁটে খায় চারটে চড়ুই, দোলমঞ্চের পাশে
পায়রাগুলো ঘুরে বেড়ায় ঘাসে।
বেড়ালটা আড়মোড়া ভাঙছে; কুকুরটা কান খাড়া
করে শুনছে, কথা বলছে কারা।
পুবের সূর্য পাশ্চিমে দেয় পাড়ি,
দুপুরবেলার ঘুমের থেকে জেগে উঠছে বাড়ি।
লাঠির ডগায় পুঁটলি বাঁধা, অনেকটা পথ ঘুরে
লোকটা যাচ্ছে দূরের থেকে দূরে।
ওর চোখেও কি এমন একটা বাড়ির স্বপ্ন টানা?
ওর মনেও কি গন্ধ ছড়ায় গোপন হাস্‌নুহানা?
ও বড়বউ, ডাকো, ওকে ডাকো,
ওই যে লোকটা পার হয়ে যায় কাঁসাই নদীর সাঁকো।

  • কবিতার একটি সারাংশ লিখুন। (৫০ শব্দে)
  • কবিতাটির কথক কে? কবি স্বয়ং না আর কেউ?
  • কবিতায় একটা গল্পের আভাস আছে কি?
  • কবিতায় নাটকীয়তা লক্ষ করেছেন কি?
  • কবিতার মানুষজন, প্রাণীকূলের একটি তালিকা তৈরি করুন।
  • একই থিমের উপর বা দেশভাগের কথা মনে রেখে একটি কবিতার কয়েকটি পঙক্তি লিখতে চেষ্টা করুন। (পদ্যে কিংবা গদ্যে)
৬.২   গল্প

এখানে গল্প মানে ছোটগল্প। এই ছোট শব্দটি বিশেষ ব্যঞ্জনাময়। আকারে ছোট হলেও এর ব্যাপ্তি অনেক বড়; আবার নাম গল্প হলেও সব সময় এতে গল্পই থাকে না, বা গল্প থাকলেও এর কোন নির্দিষ্ট শুরু নেই, শেষও অনেক সময় মুক্ত (Open ended)। গল্পের সুবিন্যস্ত প্লট থাকতে পারে, আবার প্লট-বিহীনতাই (Plotlessness) একটি প্লট হতে উঠতে পারে।

এ গল্পের ফোকাস বা অভিমুখ ‘একটি’ দিকে কিংবা এরও একটি খন্ডিত দিকে। উপন্যাসের মতো বহু ঘটনা, বহু চরিত্র, বহু দিন এর প্রেক্ষিত হতে পারে না। এখানে জীবনের একটি খণ্ডিত দিকেই আলোকপাত করার প্রয়াস থাকে।

ছোটগল্পের কোনও নায়ক বা নায়িকা নেই, ইংরেজিতে এ’কে বলে Anti-hero। নামগোত্রহীন নারীপুরুষ, পথের ভিখিরি, গৃহস্তবাড়ির ঝি, ঘুঁটে কুডুনি, নিঃসঙ্গ পথিক, পরাজিত সৈনিক, অন্ধকার জগতের বাসিন্দা, রাস্তায় জিনিস ফেরি-করা বৃদ্ধ- যে-কোনও কেউই এতে স্থান পেতে পারেন।

এ গল্পের প্লট তৈরি হতে পারে যে-কোনও ঘটনাকে কেন্দ্র করে। অন্ধকারে একটি ভৌতিক অবয়বের নেমে আসা, থেমে যাওয়া, রাতের গাড়িতে হঠাৎ ভেসে আসা হিন্দিগানের কলি, নির্জন দুপুরে পথ দিয়ে চলে যাওয়া লোকটির মিলিয়ে যাওয়া ছায়া, জানালার পাশে দাঁড়ানো নিঃসঙ্গ মেয়েটির চুল ওড়া আরও কত কি! নদীর বুকে আলোর ঝলক, নায়িকার মুচকি হাসি, হলদে পাখির মৃদু স্বর, বর্ষাঘন নিবিড় রাত্রি, দেশ রাগিনীর মীড়, গঙ্গা ফড়িঙের লাফিয়ে চলা কিংবা জোনাকিদের ঝিকিমিকিতে ছোটগল্পের উপাদান লুকিয়ে থাকতে পারে যা ধরা দেবে তাঁকেই যাঁর দেখার চোখ আছে, শোনার কান আছে, সংবেদনশীল মন আছে।

এ গল্প যত না বলে, তার চাইতে বেশি দেয় ইঙ্গিত। কথায় নয়, আভাসেই তার বর্ণনা। গল্পকার পাঠকের সামনে সব কিছু মেলে ধরেন না, পাঠককে নিজেই নিজের মনে গল্পটা তৈরি করে নিতে উদ্বুদ্ধ করেন।

এখানে গল্প নয়, উপস্থাপনাই মুখ্য। পাঠককে নির্দিষ্ট ছকে বেঁধে রাখা নয়, পাঠককে মুক্ত আকাশে ছেড়ে দেওয়াই সার্থক ছোটগল্পের কাজ। (দ্রষ্টব্য, প্রথম ষান্মাসিক, ১ম পত্রের নবম অধ্যায় পৃ. ৬৯-৭১)

এ আঙ্গিকটি একান্তভাবেই আধুনিক যুগের, যে যুগে মানুষের গ্রন্থপাঠের সময় হয়ে এসেছে সংকুচিত, বড় আকারের কাহিনি পাঠের সময়, ধৈর্য এবং মানসিক প্রস্তুতিও কমে গেছে, অথচ তাঁকে তো পড়তে হবেই - তো সেটা বাসে, ট্রেনে চলার সময়ে, কর্মব্যস্ত দিনের শেষে বিকেলে চা খেতে খেতে, কিংবা রাত্রিতে ঘুমিয়ে পড়ার আগেই হোক্। তাই অল্প সময়েই পড়ে শেষ করা যায় ক্ষুদ্র কলেবরের এ গল্পের উদ্ভব। আকারে ছোট অথচ অন্তঃস্থ ব্যাপ্তি অনেক বিস্তৃত। গল্পটা শেষ হয়েও শেষ হয় না, মনের ভেতর কেবলই চলে এর অনুরণন, যেমন বলেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ‘ শেষ হয়েও হইল না শেষ।’ (প্রথম ষান্মাষিক, পৃ. ৭০ দ্রষ্টব্য ১)

মুদ্রণ প্রযুক্তির বিস্ফারের সঙ্গে সঙ্গে প্রকাশিত অসংখ্য পত্রপত্রিকায় সহজে স্থান করে দিতে সক্ষম এ গল্পের জনপ্রিয়তা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। এ গল্প চার-পাঁচ পৃষ্ঠার হতে পারে, পঞ্চাশ-ষাট বা এর বেশিও হতে পারে যদি এর আঙ্গিক বা টেকনিক হয় ছোটগল্পের। এখানে ওকাশভঙ্গি বা উপস্থাপনই মুখ্য। বাংলা সাহিত্যে বনফুল (বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়) এক পৃষ্ঠায়ই ছোট গল্প লিখেছেন। আসলে গল্প বা কাহিনি নয়, কথনভঙ্গির উপরই ছোটগল্পের অস্তিত্ব নির্ভরশীল।

ইংরেজ কথাসাহিত্যিক ই এম ফর্স্টার ছোটগল্পের প্লট এবং কাহিনির পার্থক্য বোঝাতে একটা চমৎকার উদাহরণ দিয়েছেন। কাহিনি কী বোঝাতে তিনি লিখেছেন- The king died and then the queen died. এরপর আসছে প্লট- The king died and then the queen died of grief.

রাজা মারা গেলেন, তারপর রানি মারা গেলেন। এখানে আছে একটা বার্তা। কিন্তু যখন বলা হল, রানি ‘শোকে’ মারা গেলেন, অমনি এতে যোগ হল একটি ভিন্ন মাত্রা। প্রেক্ষিতের স্তর পেরিয়ে এ প্রতিবেদন হয়ে উঠল অন্তর্মুখী, ইঙ্গিত এল রাণীর মর্মপীড়নের। কাহিনির উত্তরণ ঘটল প্লটে।

শেষ পড়া
আলফঁস দদে

সকালে স্কুলের জন্য বেরোতে আমার অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। বকুনি খাওয়ার ভয় করছিল আমার। কারণ আমেল স্যার আগের দিন বলে দিয়েছিলেন যে তিনি আমাদের পার্টিসিপল নিয়ে প্রশ্ন করবেন। আর, বিশ্বাস কর, ওই পার্টিসিপলের কিছু শিখিনি আমি। একবার মনে হল পালিয়ে যাই, স্কুলে যাবার আছিলায় সারাদিন বাইরে ঘুরে বেড়াই। চারপাশ এত উষ্ণ, এত ঝক্ককে। বনের প্রান্তে পাখিরা কিচির-মিচির করছে, করাত কলের পেছনটায় খোলা মাঠে প্রুশিয়ান সৈন্যরা কুচকাওয়াজ করছে। পার্টিসিপলের নিয়মের চেয়ে এসব অনেক বেশি টানছিল আমায়, কিন্তু কীভাবে জানি না নিজেকে শেষ অব্দি আটকে ফেল্লাম আমি, স্কুলের দিকে দৌড় লাগালাম।

টাউনহলের সামনে দিয়ে যখন যাচ্ছি, দেখি নোটিশবোর্ড ঘিরে এক জটলা। গত দু’বছর ধরে আমাদের সব খারাপ খবর ওই নোটিশবোর্ডেই টাঙানো হয়েছে - যুদ্ধে হেরে যাওয়ার খবর, সেনাবাহিনীতে জোর করে ভর্তি করানোর খবর, সেনাধ্যক্ষের অর্ডার, সবকিছু। না থেমে, একটানা দৌড়ে যেতে যেতে, মনে হল: আজ আবার কী ব্যাপার ঘটেছে কি জানি?

আমি যখন পাগলের মতো ছুটছিলাম, গ্রামের কামার, হখটার- সে তখন তার কর্মচারীর সঙ্গে দাঁড়িয়ে নোটিশ পড়ছিল- আমাকে পেছন থেকে ডেকে বলল। ‘অত জোরে ছুটিস না ছোরা, স্কুলে যাওয়ার অঢেল সময় পড়ে আছে তোর।’ আমার মনে হল আমাকে নিয়ে মজা করছে সে, এক ছুটে আমেল স্যারের বাগানে গিয়ে যখন পৌঁছলাম, তখন আমি হাঁপাচ্ছি।

সাধারণত স্কুল যখন শুরু হয়, সদর রাস্তা থেকে স্কুলের হৈ চৈ শোনা যায়- ডেস্ক বন্ধ হচ্ছে, খুলছে, সবাই একসঙ্গে চেঁচিয়ে পড়াশোনা করছে, সবারই কানে হাত যাতে যা পড়ছে তা যেন ভালো করে বুঝতে পারে, স্যারের বেত টেবিলের ওপর দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। কিন্তু সেদিন সবকিছুই ছিল ভারি ঠাণ্ডা, ভারি চুপচাপ। আমি ঠিক করেছিলাম এই হৈ-চৈ-এর সুযোগ নিয়ে, স্যারের নজর এড়িয়ে ঢুকে পড়ব। কিন্তু সেদিন সবকিছুকেই রবিবার সকালের মত শান্ত হতে হবেই যে। জানালা দিয়ে দেখলাম আমার বন্ধুরা যে যার জায়গায় বসে আছে, আমেল স্যার তাঁর সেই ভয়ংকর বেত হাতে নিয়ে পায়চারি করছেন, নিজের হাতে দরজা খুলে সবার চোখের সামনে গিয়ে ঢুকতে হল আমায়। ভেবে দ্যাখ, লজ্জায় কতটা লাল হয়ে উঠেছিলাম আমি, কী ভীষণ ভয় করছিল আমার।

কিন্তু কিছুই ঘটল না। আমেল স্যার আমাকে দেখলেন আর, কী আশ্চর্য, স্নেহের সুরেই বললেন, ‘তাড়াতাড়ি নিজের জায়গায় গিয়ে বস, ফ্রানৎস্। আমরা আজ তোমাকে ছাড়াই শুরু করে দিয়েছিলাম।’

বেঞ্চের ওপর লাফিয়ে নিজের ডেস্কে গিয়ে বসলাম আমি। আর, একটু পরে যখন ভয়-ডর খানিকটা কেটে গেল আমার, দেখলাম আমাদের স্যার তাঁর সেই সুন্দর সবুজ কোট পরে আছেন, পরে আছেন তাঁর কুঁচি-দেওয়া শার্ট, মাথায় ছোট্ট কালো সিল্কের টুপি, সবকিছুই কাজ-করা। এইগুলো সাধারণত তিনি ইন্সপেক্টর আসার দিন আর প্রাইজের দিন ছাড়া পরেন না। পুরো স্কুল কী গম্ভীর, কী অদ্ভুত রকমের শান্ত। কিন্তু যা দেখে আমি সবচেয়ে অবাক হলাম তা হল পেছনের বেঞ্চগুলোয় (যেগুলো সাধারণত সবসময় খালি থাকে) গ্রামের বুড়োরা ছাত্রদের মতো চুপচাপ বসে আছে: বৃদ্ধ হাউসার- তাঁর মাথায় তিনকোণা টুপি, প্রাক্তন মেয়র, প্রাক্তন পোস্টমাস্টার, আর এছাড়া আরও অনেকে। সবাইকে খুব বিষণ্ণ দেখাচ্ছিল। হাউসার নিয়ে এসেছে পুরনো এক বর্ণপরিচয়, তার পাতাগুলির কোণা আঙুলের ঘষায় কুঁকড়ে গেছে, হাঁটুর ওপর খোলা ওই বই, তার ওপর হাউসারের চশমা আড়াআড়ি পড়ে আছে।

যখন আমি এসব নিয়ে ভাবছিলাম, আমেল স্যার চেয়ারে গিয়ে বসলেন, আর আমার সঙ্গে একটু আগে যেরকম মৃদু ও গম্ভীর গলায় কথা বলেছিলেন, ওই একই সুরে বললেন:

‘ছেলেরা, তোমাদের আজকে আমি শেষবারের মতো পড়াব। বার্লিন থেকে অর্ডার এসেছে আলসস আর লরেনের স্কুলগুলোতে এখন থেকে শুধুমাত্র জার্মান পড়ানো হবে। আজ তোমাদের শেষ ফ্রেঞ্চ পড়া। আমি চাই সবাই আজ খুব মন দিয়ে ক্লাস কর।’

যেন বাজ পড়ার আওয়াজের মতন শোনাল তাঁর কথাগুলি। হায় হায়, কী বোকা, কী বোকা আমি, ওরা তার মানে টাউনহলে এই নোটিশই টাঙিয়েছে। আমার শেষ ফ্রেঞ্চ ক্লাস। অথচ, আমি এখনও ভালো করে লিখতেই শিখে উঠিনি। কখনও আর মাতৃভাষা শেখা হবে না। দুঃখে মন ভরে গেল আমার। এতদিন ধরে আমি ফরাসি-পড়া কিছু শিখে উঠিনি, স্কুল পালিয়ে পাখির ডিম খুঁজে বেড়িয়েছি, সার নদীর জলে হুটোপুটি করে কাটিয়েছি। কিছুক্ষণ আগে পর্যন্ত যে বইগুলি আমার কাছে জঞ্জাল বলে মনে হচ্ছিল, ভারি, অর্থহীন এক গাধার বোঝা বলে মনে হচ্ছিল - আমার গ্রামার বই, মহাপুরুষদের জীবনী বই, এখন সবকিছুকেই মনে হল পুরনো বন্ধুর মতো যাদের আমি কোনওকালেই ত্যাগ করতে পারব না। আর আমেল স্যারের কথাটাও ভাব, তিনি যে আমাদের চিরতরে ছেড়ে চলে যাচ্ছেন, আমরা যে আর কখনও তাঁকে দেখতে পাব না, একথা আমাকে ভুলিয়ে দিল তাঁর ওই রাশভারি বেত আর ক্ষ্যাপাটে স্বভাবের কথা।

হতভাগ্য মানুষ। তার মানে, এই শেষ ক্লাসের সম্মানে তিনি তাঁর রবিবারের সুন্দর পোশাক পরে এসেছেন। এতক্ষণে আমি বুঝতে পারলাম, কেন গ্রামের সব বৃদ্ধ পেছনের বেঞ্চগুলোয় এসে বসেছেন। কারণ, তাঁরা নিজেরাও দুঃখ পাচ্ছেন পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছিলেন বলে। এটা তার মানে, তাঁদের মতো করে মাস্টারমশাইকে সম্মান জানানো - যে মাস্টারমশাই চল্লিশ বছর ধরে নিষ্ঠাভরে এই স্কুলে পড়াচ্ছেন। তাঁরা, তার মানে, সম্মান জানাচ্ছেন তাঁদের দেশকেও, যে দেশ এখন থেকে আর তাঁদের নয়।

যখন এই কথাগুলো ভাবছিলাম আমি, আমার নাম ডাকা হল। আমার পড়া দেওয়ার পালা। এমনটা কি হতে পারত না যে আমি পার্টিসিপলের ওই ভয়ংকর নিয়মগুলো গড়গড় করে, স্পষ্টভাবে, একটিও ভুল না করে বলে যেতে পারতাম না? কিন্তু প্রথমেই আমার সব গুলিয়ে গেল। ডেস্কে হাত চেপে, চোখ তুলে তাকানোর মতো সাহস না পেয়ে, দাঁড়িয়ে রইলাম আমি। শুনলাম আমেল স্যার আমাকেই বলছেন:

‘ছোট্ট ফ্রানৎস, আমি তোমাকে বকব না, তোমার নিজেরই নিশ্চয় এখন সাংঘাতিক খারাপ লাগছে। দ্যাখ, এই হলগে ঘটনা- প্রতিদিন আমরা নিজেদের বলে এসেছি: আমার তো সময়ের অভাব নেই, সব পড়া কালকেই বরং করব। আর দ্যাখ, এখন আমরা কোথায় এসে দাঁড়িয়েছি। আলসাসের এই এক মস্ত গোল: সে সবসময়ই পড়াশোনাকে পরের দিনের জন্য পিছিয়ে দেয়। এখন, মাঠের ওই লোকগুলোর তোমাদেরকে বলার অধিকার থাকবে, ‘এটা তাহলে কী হল, তোমরা নিজেদের ফরাসি বলে ভাব, আর এদিকে তোমরা না পার নিজেদের ভাষা বলতে না পার তা লিখতে।’ কিন্তু তোমার অবস্থাই যে সবচেয়ে খারাপ তা নয়, ফ্রানৎস্। আমাদের সকলেরই নিজেদের গালিগালাজ করার অনেক কারণ থেকে গেছে।

‘তোমাদের মা-বাবা তোমাদের পড়াতে তেমন গরজ করেননি। তারা বরং দু’পয়সা কামাতে তোমাদের খামারে কিংবা কলে পাঠাতে পছন্দ করেছেন। আর আমার নিজেরও তো অনেক দোষ আছে। তোমাদের যখন পড়াশোনা করবার কথা, তখন অনেকদিনই কি আমি তোমাদের ফুল গাছে জল দিতে বাগানে পাঠাইনি? আর যখন আমি মাছ ধরতে চেয়েছি, তোমাদের কি আমি এমনি ছুটি দিয়ে দিইনি?

তারপর, একে একে আমেল স্যার ফরাসি ভাষা নিয়ে কথা বলে গেলেন। বললেন যে এই ভাষা পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরী ভাষা - সবচেয়ে স্পষ্ট, সবচেয়ে যুক্তিগ্রাহ্য, আর আমরা যেন নিজেদের মধ্যে এই ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখি। আমরা যেন কখনও একে ভুলে না যাই। কারণ একটি জাতি যখন পরাধীন হয়ে পড়ে, যতদিন তারা তাদের ভাষাকে আঁকড়ে ধরে থাকে, ততদিন তাদের কাছে তাদের বন্দিশালার চাবি মজুত থাকে। তারপর তিনি একটি গ্রামার বই খুললেন আর আমাদের পড়া বুঝিয়ে দিলেন। আমি নিজেই অবাক হয়ে গেলাম, কী সুন্দর তরতরিয়ে সবকিছু সেদিন বুঝে ফেলছি আমি। তিনি যা বললেন সবকিছুই মনে হল কী সোজা, কী সোজা। মনে হল, এর আগে আর কখনও আমি এত মন দিয়ে পড়িনি আর স্যারও কখনও এত মন দিয়ে পড়াননি। মনে হল, হতভাগ্য ওই ব্যাক্তিটি যেন যাবার আগে আমাদের সবকিছু দিয়ে যেতে চাইছেন, একটি জোরালো ধাক্কায় সবকিছু যেন আমাদের মাথায় ঢুকিয়ে দিতে চাইছেন।

গ্রামারের পর, আমাদের লেখার ক্লাস হল। সেদিন আমেল স্যার আমাদের কপি করার জন্য নতুন পাতা নিয়ে এসেছিলেন। তার ওপর সুন্দর, গোল গোল ছাঁদে লেখা ছিল: ‘ফরাসি দেশ, আলসাস, ফরাসি দেশ, আলসাস’। ওই পাতাগুলোকে মনে হচ্ছিল যেন ছোট ছোট পতাকার মতো, ক্লাসের ভেতর চারদিকে পত্পত করে উড়ছে। আমাদের ডেস্কের ওপরে পাতে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল তাদেরকে। তোমাদের দেখা উচিত ছিল সেদিন সবাই কী গভীর মনোযোগ নিয়ে ক্লাস করে যাচ্ছিল, কী চুপচাপ ছিল সবকিছু। একমাত্র শব্দ ছিল পাতার ওপর কলম চালানোর। একবার কয়েকটি গুবরে পোকা ঘরে উড়ে এল, কিন্তু কেউ তাদের পাত্তা দিল না, এমনকী ছোট ছোট পড়ুয়ারাও না। ছাদে পায়রারা বক্সকম্ করে যাচ্ছিল, আর আমার মনে হল: ‘ওরা কি ওই পায়রাদেরও জার্মান গান শেখাবে না কি?’

যখনই পড়ার ফাঁকে ফাঁকে আমি চোখ তুলে দেখছিলাম, আমেল স্যার তাঁর চেয়ারে চুপ করে বসেছিলেন, একটার পর একটা জিনিসে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে। যেন তিনি মনের ভেতর সবকিছুকেই ছাপিয়ে নিয়ে যেতে চান। ভেবে দ্যাখ, চল্লিশ বছর ধরে একটানা, একই ক্লাসে পড়িয়ে গেছেন তিনি, জানালার বাইরে তাঁর বাগান আর তাঁর সামনে এই ক্লাস- সবই একইরকম। শুধু ডেক্স আর বেঞ্চগুলো ঘষায় ঘষায় মসৃণতর হয়েছে, বাগানের একটি দুটি গাছ দীর্ঘতর হয়েছে, আর যে লতাটি তিনি নিজের হাতে পুঁতেছিলেন, তা জানালা দিয়ে লতিয়ে ছাদে উঠে গেছে। এইসব কিছু ছেড়ে যেতে নিশ্চয়ই তাঁর প্রাণ ভেঙে পড়ছিল। ওপরের ঘরে তখন বোনের হেঁটে চলার শব্দ শোনা যাচ্ছিল। তিনি সবকিছু গোছগাছ করছিলেন। তাঁদেরকে তো ঠিক আগামীকালই দেশ ছেড়ে চলে যেতে হবে।

কিন্তু স্কুলের পড়া শেষ অব্দি শোনার ধৈর্য ছিল তাঁর। লেখার পর আমাদের ইতিহাসের ক্লাস হল। তারপর বাচ্চারা তাদের বা, বে, বি, বো, বু পড়তে লাগল। পেছনদিকে, বুড়ো ব্রাউসার তাঁর চশমা তখন পরে নিয়েছে। আর দুহাতে বর্ণপরিচয়ের বই আঁকড়ে ধরে, বাচ্চাদের সঙ্গে সঙ্গে সেও বর্ণোচ্চারণ করে যাচ্ছিল। তোমরা যদি দেখতে, তাহলে বুঝতে পারতে যে সেও তখন কাঁদছিল। তার স্বর আবেগে কাঁপছিল। আর শুনতে এত অদ্ভুত লাগছিল তা যে আমরা সবাই একসঙ্গে হাসতে আর কাঁদতে চাইছিলাম। আঃ, কী ভীষণভাবে আমি সেই শেষ গড়ার দিনটি আজও স্মৃতিতে আগলে ধরে আছি।

পরপরই, চার্চের ঘড়িতে বারোটা বাজল। এরপরই অ্যাঞ্জেলাসের প্রার্থনা। একই সময়ে, কুচকাওয়াজ-সেরে-ফেরা প্রশিয়ানদের শিঙ্গাধ্বনি শোনা গেল আমাদের জানালার ঠিক নিচটায়। আমেল স্যার উঠে দাঁড়ালেন। প্রচণ্ড বিবর্ণ দেখাচ্ছিল তাঁকে। এর আগে তাঁকে কখনও এত দীর্ঘ বলে মনে হয়নি আমার।

‘বন্ধুরা’, তিনি বলতে গেলেন, ‘আমি-আমি’- কিন্তু কিছু একটা তাঁর গলার স্বরকে বুজিয়ে দিল। তিনি আর কিছু বলতে পারলেন না। ব্ল‍্যাকবোর্ডের দিকে এগিয়ে গেলেন তিনি। চকের একটি টুকরো হাতে নিয়ে, শরীরের সব শক্তি দিয়ে, যতটা বড় করে লেখা সম্ভব তত বড় করে লিখলেন: ‘ফ্রান্স দীর্ঘজীবী হোক।’

এরপর তিনি দেওয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়ালেন। আর একটিও কথা না বলে, হাতের একটি ইশারায় বুঝিয়ে দিলেন: ‘স্কুল শেষ, তোমরা এখন চলে যেতে পার॥’

অনুবাদ : -
অমিতাভ দেবচৌধুরী,
হা-রো-রে-র, অক্ষর প্রকাশনী, আগরতলা ২০০৮।
(অনুবাদ : - অমিতাভ দেবচৌধুরী, হা-রো-রে-র, অক্ষর প্রকাশনী, আগরতলা ২০০৮)

সারাংশ ও বিশ্লেষণ :

ফরাসিদেশের বর্ডার সংলগ্ন দুটো জেলা একবার জার্মান রাষ্ট্রশক্তি দখল করে নিয়েছিল। উনবিংশ শতকের (১৮৭১) এ ঘটনার প্রেক্ষাপটে গল্পটি লিখেছেন আলফস দদে। ওখানকার এক স্কুলমাস্টার স্কুল ছেড়ে চলে যাওয়ার দিন মাতৃভাষায় শেষ পাঠ দিচ্ছিলেন পড়ুয়াদের। এতদিন যাঁদের কাছে মাতৃভাষা ছিল নিতান্তই অবহেলার বিষয়, পোড়ে পাওয়া ধন, আজ নব্য ঔপনিবেশিকদের আদেশে যখন এ ভাষার অধিকার কেঁড়ে নেওয়া হল, তখন কেউই এ ভাষাকে ছাড়তে রাজি নয়। শিক্ষকমশাইও বলে গেলেন, সব হারানোর পর এখন মাতৃভাষাই তাঁদের শেষ অবলম্বন। এ ভাষাকে অবলম্বন করেই ওরা আবার নিজেদের সংগঠিত করতে পারে, মুক্ত করতে পারে মাতৃভূমিকে, ভেঙে ফেলতে পারে দাসত্ব শৃঙ্খল। হাতে মাত্র একটা দিন, তবু অকুতোভয় মাস্টারমশাই শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত পাঠদান করে সবার হাতে অনুশীলনের জন্য ধরিয়ে দিলেন কয়েকটি শব্দ, ‘ফ্রাঁস, আলসাস।’ শিশু পড়ুয়া ছাড়াও শ্রদ্ধা জানাতে আসা বয়স্ক নাগরিকদের নীরব অনুশীলনে সেদিন ফরাসি স্কুলটিতে অদ্ভুত এক পরিস্থিতি সৃষ্টি হল। ছোট্ট ছেলেটি যেন দেখল ক্লাসের ডেস্কে ডেস্কে উড়ছে পতাকা, এবং এতে লেখা ‘ফাঁস, আলসাস’, ঘরের কবুতরগুলোর আওয়াজেও যেন ভাষাহারানোর যন্ত্রণা শোনা যাচ্ছে। বিদায়ী বারুদ্ধ শিক্ষক একটুকরো খড়ি দিয়ে লিখে দিলেন ‘ফরাসি ভাষা দীর্ঘজীবী হোক্’, এবং ছাত্রদের জানিয়ে দিলেন তোমাদের পড়া সাঙ্গ হল।

গল্পের নিবিড় পাঠ :

শিরোনাম ‘শেষ পড়া’ কিন্তু বোঝা গেল ফরাসি জাতীর আত্মপ্রতিষ্ঠার আন্দোলনের মহড়াই এটা। অনুশীলনের কাগজে মাতৃভূমির নাম লিখে মাস্টারমশাই তো বিদ্রোহের পতাকাই উড়িয়ে দিলেন।

গল্পটির কথক লেখক নন, এক ক্ষুদে পড়ুয়া। তাঁর চোখ দিয়েই রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের দৃশ্য বর্ণিত হয়েছে। এবং সে সঙ্গে আলসাস-লরেনের মনোজগতের পরিবর্তনের দিকেও একটি ইঙ্গিত রয়েছে গল্পে। জনমানসে বিরাট একটা ঐতিহাসিক ঘটনার অভিঘাত ওই সামান্য পরিসরে উঠে এসেছে এত সুন্দরভাবে।

বর্তমান পৃথিবীতে মিডিয়া-ভাষার প্রবল প্রতাপে মাঝারি ও ক্ষুদ্র ভাষাভাষিক গোষ্ঠীর বিপন্নতার মুহূর্তে গল্পটি নতুন প্রাসঙ্গিকতায় ধরা পড়েছে। ভাষা-সংকটে পীড়িত ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলে, বিভিন্ন ভাষিকগোষ্ঠীর কাছে এ গল্পটির এক এক রকম আবেদন।

নিজের সঙ্গে নিজে :

  • কেমন লাগল গল্পটি? (১০০ শব্দে)
  • গল্পটির চরম মুহূর্তটি (Climax) কোথায়?
  • গল্পের মুখ্য চরিত্র কে, মাস্টারমশাই না ফ্রানৎস্? (১০০ শব্দে)
  • কোন ঘটনায় আপনার মনে হয় গল্পটি একটি বার্তাবাহী প্রতিবেদনের স্তর অতিক্রম করে হয়ে উঠেছে একটি ছোটগল্প? (১০০ শব্দে)
  • গল্পটির সমাপ্তিটি অন্যভাবে লিখে দেখুন তো। (১০০ শব্দে)

আপনার পছন্দমত একটি মুদ্রিত গল্প নিন এবং পাঠ করে নিম্নলিখিত অনুশীলনী করুন : -

  • অতি সংক্ষিপ্ত সারাংশ লিখুন। (৫০ শব্দে)
  • গল্পের ন্যারেটিভ স্টাইলটি কী? First Person Narrative না Omnipresent Narrative? (৫০ শব্দে)
  • গল্পের কোনও কাহিনি বা স্টোরি-লাইন আছে কি, না একেবারে গল্প-বিহীন গল্প এটা? (৫০ শব্দে)
  • গল্পের শুরুটা পাল্টে দেখুন তো। (৫০ শব্দে)
  • গল্পকারকে আপনি ১০০ নম্বরের মধ্যে কত দেবেন?

সাতদিন একটি দৈনিক পত্রিকার খবরগুলো মনোযোগ দিয়ে পড়ুন। সংবাদ থেকে আট/দশটি গল্পের সম্ভাবনার একটি তালিকা তৈরি করুন। তালিকাটি এরকম হতে পারে : -

  • সড়কের পাশে সর্দারের মৃতদেহ উদ্ধার
  • নিখোঁজ স্কুলছাত্র
  • এক টাকার জন্য... (খুন)
  • পুলিশকর্তার বাইক (চুরি)
  • বাঙালিকে ভালোবাসার শর্ত
  • ফুটপাথের মানুষ
  • ফুটপাথবাসী প্রাক্তন সেনাকর্তাকে ফুটপাথে খুন
  • জন্মদিনের সেরা উপহার

গল্পের সৃজন প্রক্রিয়া :

  • এখন ওই তালিকা (তালিকা আপনি নিজেই তৈরি করতে পারেন) থেকে দুটো বিষয়কে আলাদা করুন গল্পের সম্ভাব্য প্লট হিসেবে।
  • ভেবে দেখুন গল্পটা সাসপেন্স না মনস্তাত্ত্বিক, না সামাজিক?
  • এরপর একটিমাত্র বাক্যে আপনার প্লটটি বুঝিয়ে দিন (নিজেকেই)।
  • স্থির করুন গল্পটির-
    — লোকেশন কোথায়,
    — সময়টি কী,
    — চরিত্র কে বা কারা
  • গল্পটই কীভাবে বর্ণিত হবে-
    — ‘আমি’ perspective এ,
    — না, কোনও চরিত্রের মুখ দিয়ে,
    — সর্বদ্রষ্টা perspective এ, (মানে ধরে নেওয়া হবে লেখক সব জানেন)।
  • ভাষাটা কী হবে- আঞ্চলিক সংলাপ থাকবে কি?
  • ক্লাইম্যাক্সটি কী?
  • একটি জুৎসই শিরোনাম দিন।
৬.৩   প্রবন্ধ

বাংলায় দুটো শব্দ আছে ‘প্রবন্ধ’ আর ‘নিবন্ধ’। প্রকৃষ্টরূপে বন্ধন, তাই প্রবন্ধ; তবে নিবন্ধ কী? শব্দগত ভাবে তো দুটো সমার্থক নয়। নি-উপসর্গের সাহায্যে অর্থটি যদি হয় নির্দিষ্ট বন্ধন যার, তবে কি প্রবন্ধের বন্ধনটি অনির্দিষ্ট? সংস্কৃত ভাষায় প্রবন্ধ শব্দের অর্থ পরিকল্পনা, তবে সেই একই প্রশ্ন, নিবন্ধ কী? এটা কি তাহলে অপরিকল্পিত রচনা? ইংরেজিতে Essay শব্দের ভেতরে প্রবন্ধ নিবন্ধ দুটোকেই ধরা যায়, কিন্তু বাংলায় দুটো শব্দের প্রয়োগ চলছে। তবে আপাতত এ প্রশ্নটি এখানেই থাকলে চলবে।

প্রবন্ধ বলতে আমরা বুঝি মননশীল গদ্য। এ গদ্যের একটা বিশেষ শৈলীও আছে, আছে তার একটা বিশেষ আঙ্গিক, সূচনা-মধ্যমা-সমাপ্তির আঁটোসাটো বাঁধুনি। একটি বিশেষ বিষয়কে কেন্দ্র করে প্রবন্ধ রচিত হয় এবং বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে, প্রসঙ্গ থেকে প্রসঙ্গান্তরে বিচরণ করলেও মূল প্রতিপাদ্যে লেখককে স্থিতি বজায় রাখতেই হয়। এখানেই প্রবন্ধের সঙ্গে মুক্তগদ্য, প্রতিবেদন, ফিচার, বার্তা-লিখনের পার্থক্য।

প্রবন্ধের আকার একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক। ষোড়শ শতকে প্রবন্ধের জনক মঁতেন বা ইংল্যান্ডের ফ্রান্সিস বেকন প্রবন্ধ লিখেছেন ক্ষুদ্র কলেবরে। Essai বা Essay নামকরণও তাঁদের। পরবর্তীকালে কলেবর সামান্য বৃদ্ধি পেলেও পঞ্চাশ-ষাট পৃষ্ঠার রচনাকে আমরা প্রবন্ধ বলি না, নিবন্ধ বলার প্রয়াস অনেকে নিলেও প্রবন্ধ আর নিবন্ধ আঙ্গিকগত এবং চরিত্রগত দিকে তো কাছাকাছিই।

বিংশ শতাব্দী থেকে একাবিংশ শতাব্দীতে প্রবন্ধের বিস্তার ঘটেছে বিভিন্ন ক্ষেত্রে- ধর্ম-দর্শন-ইতিহাস-বিজ্ঞান-সাহিত্য থেকে বিনোদন এবং ক্রীড়া জগৎ অবধি। প্রবন্ধ হয়ে উঠেছে সর্বত্রগামী। মেধা আর মননের সঙ্গে যখন যুক্ত হয় প্রকাশশৈলী, তখন প্রবন্ধটি প্রকৃতপক্ষে হয়ে ওঠে একটা সৃজনকর্ম। গল্প-কবিতা-নাটকের মতো প্রবন্ধের আঙ্গিকও গুরুত্বপূর্ণ।

প্রবন্ধের কাছে পাঠক বিশেষে চাহিদা ও প্রাপ্তি ভিন্ন রকমের হয়। বিষয়-সন্ধানী পাঠক খুঁজবেন তথ্য, ভাবুক খুঁজবেন তত্ত্ব আর কল্পনাবিলাসীরা খুঁজবেন মানসলোকে বিচরণের উপলক্ষ।

প্রবন্ধ হল পাঠকের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যম। বলা চলে একটি অন্তরঙ্গ সংলাপ। লেখককে সচেতন থাকতে হয়, কতখানি গেলে ‘প্রকাশ’ আর কতখানিতে ‘ভাষণ।’পাঠককে কঠিন বিষয় শিখিয়ে দেওয়া নয়, পাঠককে সঙ্গে নিয়ে কোনও চর্চায় রত হওয়াই এর অভীষ্ট। প্রবন্ধ রচনা আসলে একটি সৃজনকর্মই। লিখতে লিখতেই লেখক বিষয়ের গভীরে চলে যান এবং কাজটি শুরু হয়ে গেলে লেখাটি নিজের গতিতেই এগিয়ে যেতে থাকে। প্রবন্ধ লিখতে হয় না, প্রবন্ধ নিজেই হয়ে ওঠে।

শেষ কথাটি হল কোনও বিষয়ের উপর প্রয়োজনীয় সমস্ত জ্ঞান অর্জন করে, তথ্য সংগ্রহ করে, লেখার কলাকৌশল আয়ত্ত করে প্রবন্ধ লিখতে বসার প্রস্তাবনাটি অবাস্তব। লিখতে লিখতেই লেখার স্টাইল, ভাষা আর প্রকাশক্ষমতা অর্জিত হবে, অর্জিত হবে প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা, জ্ঞান আর তত্ত্বকথা, অর্থাৎ লিখতে লিখতেই আপনার প্রয়াসও সার্থক প্রবন্ধের আকার ধারণ করবে।

আধুনিক মানুষ: যুক্তিপন্থী ও পরমতসহিষ্ণু
হোসেনুর রহমান

আধুনিকতা বলতে টেকনোলজি বোঝায় না। আবার টেকনোলজিকে নিশ্চয়ই অস্বীকার করারও প্রশ্ন ওঠে না। অর্থাৎ, কেবল টেকনোলজি, ধনসম্পদ, সামাজিক প্রতিপত্তি, রাজনৈতিক ক্ষমতা ২০০০-এর পৃথিবীতেও মানুষকে আধুনিকতার চিন্তায় মগ্ন করে না। আজ আমরা চারদিকে দেখতে পাচ্ছি অসহিষ্ণুতা, হিংসা, স্বমত প্রকাশের ও প্রচারের তাণ্ডবলীলা। দেখতে পাচ্ছি সমাজে স্বচ্ছতার প্রতি অনীহা। দেখতে পাচ্ছি আমরা কোথাওই নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি রক্ষা করতে পারছি না। এবং একই সঙ্গে দেখতে পাচ্ছি ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্য এবং অপ্রতিরোধ্য দুর্নীতি। এ সবই আধুনিকতার পরিপন্থী। একজন আধুনিক মানুষকে যুক্তি অবলম্বন করে স্বচ্ছতা, পরমতসহিষ্ণুতা, গ্রহিষ্ণুতা অবলম্বন করে অগ্রসর হতে হয়। আত্মশক্তি, আত্মমর্যাদা, মানুষকে জগৎ ও জীবন সম্বন্ধে উদার দৃষ্টিভঙ্গি চর্চা করতে সাহায্য করে। সেই মানুষ ক্রমশ বহুসাংস্কৃতিক সমাজে বিশ্বাস করে এবং এই বিশ্বাস রাষ্ট্রের মূল প্রাণশক্তি হিসেবে পরিগণিত হয়। এই পদ্ধতির মৌলিক চর্চার বিষয় হল আধুনিকতা, যুক্তিবাদ। বহু মত, বহু পথ বিশিষ্ট সমাজ ও রাষ্ট্র।

বলাই বাহুল্য, স্বাধীন ভারতবর্ষে আমরা এই আধুনিকতাকে সামাজিক আধুনিকীকরণ পদ্ধতি বলে বুঝেছি। এবং স্বাধীন ভারতবর্ষে গান্ধী, নেহরু, আজাদ প্রমুখ নেতারা এই আধুনিকীকরণকে অপরিহার্য বলে জেনেছিলেন এবং দেশবাসীকে এ তত্ত্ব বুঝতে সাহায্য করেছিলেন। এবার বলা দরকার, দেশ যদি সামগ্রিক ও সার্বিক অর্থে প্রগতিশীল না হয়, যদি দারিদ্র্য ও বেকারত্বমুক্ত না হয়, অন্তত যথেষ্ট দুর্নীতি ও স্বজনপোষণমুক্ত না হয় তাহলে আধুনিকতা, ধর্মনিরপেক্ষতা, স্বচ্ছতা এসব কথার কথাই থেকে যাবে। আমাদের আরম্ভ তো যথার্থই সঠিক পথ ধরেই চলেছিল। আমাদের আধুনিকতা কেবলমাত্র পাশ্চাত্যের বস্তুসর্বস্বতা বোঝায়নি। আমরা অশোক, আকবরের প্রদর্শিত পথ বিস্মৃত হইনি। অশোক যে অহিংসা, মৈত্রী, মানব প্রেমের বাণী প্রচার করেছিলেন দেশবিদেশে সেইসময় কেন পরবর্তীকালেও তার কোন তুলনা ছিল না। আর আকবর দেশ শাসনে ধর্মবিশ্বাসকে দূরে সরিয়ে রেখে যুক্তি ও নিরপেক্ষতার উচ্চমান স্থাপন করতে বদ্ধপরিকর ছিলেন। আপাতদৃষ্টিতে ব্যর্থ হলেও তাঁর নতুন ধর্মচর্চার দীন-ই-এলাহি সর্বধর্ম সমন্বয় প্রচেষ্টা এক অসাধারণ ঐতিহাসিক ঘটনা। দীন-ই-এলাহির আসল কথা সমস্ত ধর্মবিশ্বাসকে মৈত্রী ও যুক্তির বন্ধনে আবদ্ধ করা। আধুনিক মানুষ চায় স্বাধীনতা-- সে তার পথ নির্ণয় করবে, তার অভিরুচি অনুযায়ী, শিক্ষাপ্রাপ্ত হবে স্বাধীনতা রক্ষা করে এবং সর্বোপরি নিজের বিবেক এবং যুক্তির বাইরে যাবে না। এই পদ্ধতিতেই একজন তার পরিচয়কে প্রতিষ্ঠা করতে পারে। মানুষ কেবল প্রাচীন ঐতিহ্যের পথ ধরে চলতে পারে না। আকবর এবং দারা শিকো ঐতিহ্যের পথ ধরে চলেননি। নিজেকে জানার সঙ্গে সঙ্গে অন্যকে জানা এবং জানতে পারাই তো আধুনিকতা। অর্থাৎ সাংস্কৃতিক সীমান্ত মানুষ সবসময় উপেক্ষা করে চলে। সেই মানুষ আধুনিক যুগের অনেক আগে ভারতবর্ষে লোকসংস্কৃতি চর্চা করেছে। বাইরে থেকে এসে কত মানুষ ভারতচর্চার মধ্য দিয়ে নিজেদের সমৃদ্ধ করেছে। আমাদের জীবনকে আলোকিত করেছে। যেমন মধ্য এশিয়া থেকে এসেছিলেন ইরানের অ্যালবিরুনি (জন্ম: 937 AD) ভারতদর্শনে। তাঁর বই তারিখ-আল-হিন্দ ("The History of India")-4 তিনি বলতে পারলেন, এক দেশের মানুষের খুব দরকার জানতে চাওয়া অন্য দেশের মানুষের জীবনযাত্রার ধারা। জানতে পারলেই তো দ্বিধার মেঘ কেটে যায়। জীবনকে জ্ঞান-বিজ্ঞানের মুক্তধারা সংহত করে। সমৃদ্ধ করে। আধুনিক মানুষ যেমন চার্লস ফ্রিয়র অ্যানড্রজ, লোর্ডে এলমহার্স্ট, উইলিয়াম পিয়ারসন, এঁরা সবাই ভারতবর্ষে এসে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মহৎ জীবনাদর্শগুলিকে শ্রদ্ধা করেছিলেন। মানুষকে বুঝিয়েছিলেন, আমরা একটি দেশে জন্মগ্রহণ করি বটে, তারপর নিজেকে উপলব্ধি করবার জন্যে, বিস্তার করবার জন্যে নিখিল বিশ্বে বৃহত্তর মানবলোকে নিজের জীবনসাধনাকে রূপ দিতে চেষ্টা করি। এই তো যুক্তিপন্থী মানবতাবাদী মানুষের প্রাণের কথা। এমন ভাবুক, যুক্তিপন্থী মানুষেরা শ্রদ্ধা, করুণা, সহানুভূতি, সহমর্মিতা এসব মূল্যবান সামাজিক মূলধন বলে জেনেছেন। সেই অর্থে আমাদের দেশে প্রথম আধুনিক মানুষ দারা শিকো, রাজা রামমোহন রায়। রাজা রামমোহন পূর্ব ও পশ্চিমের সমন্বয় সাধন করেছেন। ইংরেজ মিশনের কার্যকলাপ আপত্তিকর ঘোষণা করবার জন্যে প্রেস করেছেন, পত্রিকা প্রকাশ করেছেন, বিতর্কের ঝড় তুলেছেন। কিন্তু বিদ্বেষের হিংসার আগুন ছড়াননি। দেশকালের বাইরেও যে মানুষ আছে তাঁকে শ্রদ্ধা করেছেন। সেই মহামানব বিশ্বসংসার রচনা করেছেন ভাবের ঘোরে নয়, যুক্তির প্রয়োগে। রামমোহন, পরবর্তীকালে স্বামী বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ সবসময় বলেছেন, যুক্তির ব্যবহার করা চাই জীবনের সমস্ত স্তরে এবং বিশ্বাস করা চাই যে মানুষই একমাত্র প্রাণী যে পূর্ণতা অর্জনে সক্ষম। মানুষই স্বয়ংসম্পূর্ণ। আজ এই মানুষ আমাদের চাই। কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি বিপরীত এক ছবি। সংস্কৃতির নামে, পরিচয়ের নামে, এবং ধর্মের নামে মানুষ ধ্বংসলীলায় প্রবৃত্ত হচ্ছে। অবশ্যই এই মানুষ আধুনিক নয়। প্রাগৈতিহাসিক।

আধুনিক মানুষ সার্বভৌমিক। সার্বজনীন। এই তার সবচেয়ে বড় পরিচয়। এই পরিচয় ক্ষুন্ন হলে সে আধুনিক থাকল না। এই মানুষের চাই “a common human home”। এই দাবি বিশিষ্ট খ্রিস্টান বুদ্ধিজীবী MM Thomas করেছেন, তাঁর বই Man and the Universe of Faiths-এ। টমাস বলছেন আধুনিক পৃথিবীতে আমাদের সবার আগে ‘humanisation of existence’ সমস্যাটি মেটানো দরকার। তারপর ‘common religiosity, or common sense of the Divine’। সারকথা হল: আমাদের দরকার, ‘a meeting of faiths at spiritual depth in our time’। দুঃখের কথা: কোথায় সেই গভীরতা, কোথায় সেই অভিন্নতা, কোথায় সেই সত্যম শিবম সুন্দরম-এর জন্যে সর্বস্ব ত্যাগের বাসনা? বহুত্ববাদের প্রধান কথাই হল: আমরা এই একটিমাত্র মনুষ্য জগৎ-কে যত বেশি করে দেখতে পাব, যত বেশি করে আয়ত্ত করতে পারব ততই নিজেকে চিনতে পারব। আর এসব ঘটনা যখন ঘটতে থাকবে তখন বোঝা যাবে মানুষের কোন্ পরিচয়টা বড়? ব্যক্তি পরিচয়? না বিশ্বপরিচয়? দুটোই। আধুনিক মানুষ কেবলমাত্র তার মনের মানুষের সঙ্গে সংসর্গ করতে চায়। অর্থাৎ যার সঙ্গে রুচি ও চিন্তায়, ভাবনায় তার মেলে। অর্থাৎ বিরাট এই পৃথিবীতে সর্বত্র আমার অধিবাস।

এবার বলা দরকার, আধুনিকতা সম্পূর্ণ এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি। এই দৃষ্টিভঙ্গি অর্জনের জন্য চাই আধুনিক শিক্ষা। এবং অন্যমতের পথের, বিশ্বাসের মানুষকে শ্রদ্ধা করতে পারা। আমার ছোট পরিচয়ের, পরিসরের গণ্ডি ছাড়িয়ে ওঠা চাই। আধুনিক মানুষ আবার গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, স্বচ্ছতা দাবি করে। দাবি করে মানবাধিকার সমাজে, রাষ্ট্রে সার্বিক হবে। আমাদের দেশে আজও শিশু ও নারী কতটা বিপন্ন, নিরাপত্তাশূন্য, এবং অন্নবস্ত্রের প্রশ্নে কতটা দীন, দরিদ্র। এই দেশ কতটা আধুনিকতার পথে দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে পারে? এবং আধুনিকতা কেবল সহিষ্ণুতার কথা বলে না। সবাইকে নিয়ে চলার কথা বলে। সবাইকে তাহলে এসব কথা বুঝতে হবে। অর্থাৎ সহিষ্ণুতা থেকে সমর্থন পর্যন্ত প্রতিটি মানুষকে যেতে হবে। তাই বলা হয়েছে সহিষ্ণুতা। অপরকে সহ্য করতে পারাকে সামাজিক এক চুক্তি অথবা ‘যুদ্ধবিরতি’ বলা যেতে পারে। কোনও নতুন সৃষ্টি বলা যেতে পারে না। তেমনই প্লুরালিজম কেবলই সম্বন্ধবাদ (relativism) নয়, যথার্থ কমিটমেন্ট। অনেকে আবার মুক্ততা এবং সাংস্কৃতিক সম্বন্ধবাদকে এক নতুন ‘Academic dogma’ বলে বিদ্রূপ করতে ভালবাসে। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, সম্বন্ধবাদ আসলে বৈচিত্র্যের এক নতুন ব্যাখ্যা। আধুনিক মানুষ বৈচিত্র্যের বহুতন্ত্রী বীণা হয়ে উঠতে চায়, চায় না বৈরাগ্যের একতারা। আর এক ধাপ এগিয়ে বলতে পারি যা সত্য তা সব সময়ই সত্য। এখন এই সত্যকে দেখবার, ব্যাখ্যা করবার বিভিন্ন মানুষের ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থাকতেই পারে। এবং সেটাই প্রত্যাশিত। এর অর্থ: “Matters of truth and value are relative to our conceptual framework and worldview, even those matters of truth that we speak of as divinely ordained”। হ্যাঁ, আমরা তো সেই জন্যেই বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য চেয়েছি। পেয়েছি ঐক্যের মধ্যে বৈচিত্র্য। মানুষের সংসারে যেখানে যখনই কোথাও কিছু মেনুয়ো ঠেকেছে ভারতবর্ষের সত্যদ্রষ্টা, ঋষি, দূরদর্শিরা বলেছেন সেই পরম এক আসলে এক, ভিন্ন ভিন্ন মানুষ বিভিন্ন পথে সেই একের অন্বেষণে অগ্রসর হচ্ছে। অতএব সবাই চলেছে। কেউ কাউকে মাড়িয়ে, ছাড়িয়ে যাচ্ছে না। এখানে প্রতিটি মত, প্রতিটি পথকে সমান চোখে দেখা হচ্ছে। তাহলে সম্বন্ধবাদ বহুলাংশেই মানুষের কাণ্ডজ্ঞানের, সাধারণ বিচারবুদ্ধির প্রকাশ বলা যেতে পারে। যিনি বহুত্ববাদী তিনি বিশ্বাস করেন অন্যদের সম্প্রদায় থাকতে পারে, ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থাকতে পারে। ভিন্ন ধর্মচেতনা থাকতে পারে। এই বিশ্বাস উৎপন্ন করে এই জীবনদর্শন যে অন্যের উপলব্ধিকে আমি সব সময় শ্রদ্ধা করব, সমর্থন করব। অতএব: স্বামীজির ভাষায়: সম্প্রদায় চাই, চাই না সাম্প্রদায়িকতা; কমিটমেন্ট চাই, চাই না গোঁড়ামি, চাই না অস্পৃশ্যতা। একথা মনে রাখা দরকার, সমস্ত ঐতিহ্যই রিলেটিভ টু হিস্ট্রি অ্যান্ড কালচার। আমরা এক দ্রুত পরিবর্তমান পৃথিবীতে বাস করছি। প্রতিমুহূর্তে আমাদের রূপান্তর ঘটছে। এবার বহুত্ববাদের প্রধান একটি বৈশিষ্ট্যের কথা বলা দরকার। বহুত্ববাদের লক্ষ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। এ এক পন্থা যা আমাদের প্রত্যেককে নিজস্বতায় বিশিষ্টতা অর্জন করতে সাহায্য করবে। বিশ্বজোড়া বিশ্বাসের কোনও এক মন্দির প্রতিষ্ঠা এর উদ্দেশ্যে নয়। তাই তো প্লুরালিজম মুক্ত, উদার মানুষের ও সমাজের বিশেষ আকাঙ্ক্ষার জিনিস। বলাই বাহুল্য, প্লুরালিজম নব নব জীবন লাভ করে বহু ধর্মের বহু সংস্কৃতির সম্মিলনে। পারস্পরিক সম্পর্ক অনিন্দ্যসুন্দর বৈচিত্র্য গড়ে তুলতে পারে। এর জন্যে বিশেষ প্রয়োজন ডায়লগের, অর্থপূর্ণ কথোপকথনের। কথা থেকেই কাব্য, কাহিনী, সাহিত্য, সমৃদ্ধ জীবন। সবসময় কথা বলা চাই, ভাববিনিময় চাই, মতবিনিময় চাই, আলোচনা, সমালোচনা এবং এই জীবনেই প্রতিমুহূর্তে নবজীবনলাভ চাই।

আমার পরম শ্রদ্ধেয় ইসলামবিদ WC Smith-এর কথা দিয়ে শেষ করি: “Our vision and our loyalities, as well as our aircraft, must circle the globe”।

“বিশ্বসাথে যোগে যেথায় বিহারো।”

আধুনিকতা ও ধর্মনিরপেক্ষতা,
মিত্র ও ঘোষ, কলিকাতা, (পৃ.১৮-২১)
আধুনিকতা ও ধর্মনিরপেক্ষতা, মিত্র ও ঘোষ, কলিকাতা, (পৃ.১৮-২১)

সারাংশ ও বিশ্লেষণ :

আধুনিকতা হল যুক্তিবাদের উপর প্রতিষ্ঠিত একটি মানসিকতা। টেকনোলজিতে অগ্রসর হওয়াই নয়, স্বচ্ছ যুক্তি, সহিষ্ণুতা এবং প্রগতিশীলতাই আধুনিকতার চিহ্নায়ক। ভারতবর্ষের এই আধুনিকতার পথ ধরেই চলা শুরু হয়েছিল- ঐতিহাসিক কাল থেকে স্বাধীনতা পর্যন্ত। নিজেকে জানার সঙ্গে সঙ্গে অপরকে জানার মাধ্যমে নিখিল বিশ্বের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করার মধ্যেই আধুনিকতা এবং সে অর্থে দারা শিকো, রাজা রামমোহন রায় এরাই আধুনিক মানুষ। এ পথেই এগিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ যাঁরা সন্ধান করেছেন যুক্তবাদী মানুষের। কিন্তু জাতি-ধর্মের বিবাদে মত্ত মানুষের যাত্রা চলছে উল্টোপথে, প্রাগৈতিহাসিক যুগের দিকে। এই বিপরীতমুখী যাত্রা গতি রুখতে হলে প্রয়োজন ভিন্ন পথের, ভিন্ন মতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া। সহিষ্ণুতার উপর ভিত্তি করে বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হলে জাতীয় ঐতিহ্যের প্রতি অনুগত থেকে শোষণমুক্ত, সাম্প্রদায়িকতা মুক্ত, গোঁড়ামি মুক্ত বহুত্ববাদী আধুনিক ভারতবর্ষ গড়ে উঠতে পারে।

প্রবন্ধের নিবিড় পাঠ :

একবিংশ শতকের শুরুতে ভারতবর্ষে প্রযুক্তির যত বিস্তার ঘটেছে, মানসিক বিস্তৃতি ততটা হয়নি। যুক্তিবাদকে দূরে সরিয়ে ধর্মীয় বিভাজনকে ভিত্তি করে একটি পরমত-অসহিষ্ণুতার বাতাবরণ তৈরি করা হয়েছে। এটা ভারতীয় পরম্পরা বিরোধী। ভারতবর্ষ যে আধুনিকতার সাধনা করেছিল এটা পাশ্চাত্যের প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিকতা নয়। ভারতবর্ষের মৈত্রী, প্রেম এবং সর্বধর্ম-সমন্বয় তত্ত্বের মধ্যে প্রকৃত আধুনিকতা নিহিত।

সভ্যতার সংকটের স্বরূপ উপলব্ধি থেকে এ নিবন্ধ। প্রাচীন ভারতীয় মৈত্রী দর্শন, মধ্যযুগীয় সমন্বয়ী চিন্তা, দারা শিকো, রামমোহন রায় থেকে রবীন্দ্র-বিবেকানন্দের অনুষঙ্গ নিয়ে প্রবন্ধটি হয়ে উঠেছে বহুমাত্রিক, কিন্তু কাঠামোটির বাঁধন নিটোল। কোনও pedagogic বক্তব্য নয়, সমকালীন রাজনৈতিক পটভূমির কঠোর সমালোচনাও নয়, নয় কোনও শ্লোগানধর্মী উচ্চারণ। প্রবন্ধটি কথা বলে সংগোপনে, একেবারে অন্তরঙ্গ মানুষটির মতোই।

নিজের সঙ্গে নিজে :

  • প্রবন্ধটি কি সুখপাঠ্য? না বড্ড সিরিয়াস মনে হয়েছে?
  • লেখকের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক বিশ্বাস কি এখানে প্রতিফলিত হয়েছে?
  • রচনাটির কোন অংশের সাহিত্যগুণ আপনার ভাল লেগেছে?
  • এখানে লেখক কোন্ কোন্ দিকে বিশেষ আলোকপাত করেছেন?
  • রচনাটির কোনও বিকল্প শিরোনাম মনে আসছে?

একটি মুদ্রিত প্রবন্ধ গ্রহণ করুন এবং নিম্নলিখিত উত্তরগুলো লিখুন : -

  • অতি সংক্ষিপ্ত সারাংশ লিখুন। (১০০ শব্দ)
  • নিবন্ধের মূল প্রতিপাদ্য একটিমাত্র বাক্যে লিখুন।
  • কোন্ কোন্ অংশ বাদ দেওয়া যেতে পারে বলে মনে হয় আপনার?
  • কোন অংশ বা প্রসঙ্গ মূল রচনার sub-theme বলে মনে হয়েছে?
  • প্রবন্ধটি কেন আপনার ভালো লেগেছে?

কয়েকটি নানা ধরনের পত্রপত্রিকা, ম্যাগাজিনে প্রকাশিত প্রবন্ধের শিরোনামগুলো লিখে রাখুন, ওয়েবসাইটেও দেখতে পারেন। সে সঙ্গে দু একটা প্রবন্ধের বইয়ের সূচিপত্র দেখে শিরোনাম সংগ্রহ করুন। এখন এরকমই কয়েকটি বিষয়বস্তুর কথা মনে রেখে শিরোনাম তৈরি করুন (৮/১০টা)। এবং-

  • এ থেকে দুটো বিষয়কে আলাদা করুন আপনার প্রস্তাবিত প্রবন্ধ হিসেবে।
  • ভেবে দেখুন প্রবন্ধের স্টাইল কী হবে- গবেষণাধর্মী, না সাধারণ অভিজ্ঞতা ভিত্তিক? ভাষাটা কি সিরিয়াস হবে, না অন্তরঙ্গ এবং কিছুটা ঘরোয়া হবে?
  • একটি মাত্র বাক্যে প্রবন্ধের মূল কথাটি, অর্থাৎ আপনি কী বলতে চাইছেন লিখে নিন।
  • একটা শিরোনাম দিন।

এটুকু হয়ে গেলে প্রথম লাইনটি লিখে নিন। লাইনটি পছন্দসই হলে প্রথম খসড়া শুরু করুন। দুই বা তিনটি সিটিং দিয়ে শেষ করে নিন, এবং বার বার পড়ুন, কাউকে পড়ে শোনান এবং দ্বিতীয় খসড়ায় যাবার আগে প্রথম খসড়ায় লাল কালিতে কাটাছেঁড়া করে নিন। দ্বিতীয় খসড়াতে যেসব শব্দ বা পঙক্তি বদলে যাবে, যেতে দিন, নতুন সংযোজন করুন, প্রয়োজনে বাদও দিন অংশ বিশেষ।

এরপর যে তৃতীয় খসড়াটি হবে- নিজেই দেখবেন লেখাটি কেমন দাঁড়িয়ে গেল। পরবর্তী স্তরে আছে বানান, বিরতি চিহ্ন ঠিক করা এবং এবং প্রেস-কপি তৈরি করা। এ পর্যায়েও দেখবেন লেখাতে অনিবার্যভাবেই কিছু পরিবর্তন ঘটছে, এবং লেখার এ রূপান্তর দেখে আপনি নিজের লেখাকে নতুনভাবে আবিষ্কার করে চমকিত হবেন।

এরপর? এরপর ছাপাখানায় সম্পাদক, প্রুফ রিডার, পেজ ডিজাইনার এদের স্পর্শ পেয়ে মুদ্রিত লেখাটি পাঠকের হাতে এলে আপনি আবিষ্কার করবেন কোথায় শুরু করেছিলেন আর কোথায় এসে পৌঁছোল।

৬.৪   পাঠপরিকল্পনা
৬.৪   পাঠপরিকল্পনা

শ্রেণীকক্ষে শিক্ষার্থীদের মধ্যে পাঠের বিষয়বস্তু সঠিকভাবে উপস্থাপন করে পাঠের বিষয়বস্তু প্রয়োগের কার্যকর পরিকল্পনাকে পাঠ-পরিকল্পনা বোঝায়। রাডার ছাড়া জাহাজের পথচলা যেমন গন্তব্যহীন, তেমনি শ্রেণীকক্ষে পাঠ-পরিকল্পনাবিহীন পাঠদানও অর্থহীন। শ্রেণীকক্ষে সঠিক পাঠদানের পূর্বশর্ত হচ্ছে নিয়মিত পাঠ-পরিকল্পনা প্রস্তুত করে সেই অনুযায়ী পাঠদান। কোনও বিষয়ে পাঠদান করার পূর্বে নির্দিষ্ট পরিকল্পনা করে পাঠদানের সময়কে উপযুক্ত ভাগে ভাগ করে নিতে হবে যাতে নির্দিষ্ট সময়ে পাঠটি খুব সহজে এবং বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করা যায়।

আদর্শ পাঠ পরিকল্পনার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য : -

  • পাঠের বিষয়বস্তু নির্বাচন করে ঐগুলিকে বিভিন্ন পর্বে বিন্যাস।
  • শিক্ষার্থীদের জানা বিষয় থেকে শুরু করে অজানা বিষয়ের অবতারণা।
  • কোন অংশের জন্য কতটুকু সময় প্রয়োজন তা নির্ধারণ।
  • শিক্ষার্থীদের সক্রিয় অংশ গ্রহণে উৎসাহিত করা।
  • একটি বিষয় সম্পূর্ণ না বুঝিয়ে ছোট ছোট অংশে ভাগ করে বোঝানো।
  • সর্বোপরি পাঠদানকে আনন্দদায়ক এবং ফলপ্রসু করে তোলা।

পাঠ পরিকল্পনার গুরুত্ব : -

  • উপযুক্ত পদ্ধতি ও কৌশল অবলম্বন করে পাঠদানের বিষয় সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা পাওয়া যায়।
  • পাঠ পরিকল্পনার মাধ্যমে সুশৃঙ্খল, ধারাবাহিক ও মনোবিজ্ঞান সম্মতভাবে পাঠ উপস্থাপন করা যায়।
  • শিক্ষার্থীদের সক্রিয় অংশ গ্রহণের মাধ্যমে তাদের জ্ঞান, দক্ষতা ও কোন্ কোন্ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের আকর্ষণতা যাচাই করা যায়।
  • শিক্ষার্থীদের দুর্বলতার দিকগুলো চিহ্নিত করে তার নিরাময়ের ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়।
  • পাঠ মূল্যায়নের জন্য যথাযথ প্রশ্ন তৈরি করে পাঠদান প্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন করা যায়।

পাঠ পরিকল্পনার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল শিক্ষা অঙ্গ-উপকরণ। সহজ ও সুন্দরভাবে পাঠদানের জন্য এবং আনন্দ দায়ক ও বিনোদনমূলক পরিবেশ গড়ে তুলতে শিক্ষা উপকরণের কোন বিকল্প নেই। পাঠ পরিকল্পনা এবং শিক্ষা উপকরণের মধ্যে একটি নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। কারণ, পাঠ পরিকল্পনার এবং শিক্ষা উপকরণের ব্যবহার পাঠদানের সাফল্য একশত ভাগ নিশ্চিত করে এবং আনন্দমুখর পরিবেশে পাঠদান করে শিক্ষার পরিবেশ সৃস্টির পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মেধার মানও বাড়ায়।

পাঠ পরিকল্পনার কয়েকটি সম্ভাব্য বিষয় : -

পাঠ পরিকল্পনা - ১

বিষয়
সাধারণ পাঠ
বিশেষ পাঠ
কবি
আজকের পাঠ




বাংলাভাষা ও সাহিত্য
পদ্য
জীবনের হিসাব
সুকুমার রায়
সম্পূর্ণ কবিতা

পাঠ পরিকল্পনা - ২

বিষয়
সাধারণ পাঠ
বিশেষ পাঠ
লেখক
আজকের পাঠ




বাংলাভাষা ও সাহিত্য
গদ্যাংশ
আনন্দমঠ
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
প্রথম ও দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ

পাঠ পরিকল্পনা - ৩

বিষয়
সাধারণ পাঠ
বিশেষ পাঠ
আজকের পাঠ



বাংলা ভাষা ও ব্যাকরণ
বাংলা ব্যাকরণ
রচনা
বসন্তকাল


বিদ্যালয় :- 
শ্রেণী :- অষ্টম
শিক্ষার্থীর বয়স :- ১৩+ বছর
ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা :- ৩০
সময় :- ৪০ মিনিট
তারিখ :-  
শিক্ষকের নাম :-  

বিষয়:- বাংলা ভাষা ও সাহিত্য
সাধারণ পাঠ :- গদ্য
বিশেষ পাঠ :- ‘ভাষা ও আওয়াজ রহস্য’
লেখক :- পবিত্র সরকার
আজকের পাঠ :- গদ্যের প্রথমাংশ
  

সাধারণ উদ্দেশ্য :

  • শিক্ষার্থীরা সরব ও নীরব পাঠে দক্ষতা অর্জন করবে।
  • ছাত্র-ছাত্রী উচ্চারণ ঠিক রেখে শুদ্ধভাবে কথা বলতে শিখবে।
  • শিক্ষার্থীরা গদ্য সাহিত্যের প্রতি অনুরাগী হবে।
  • ছাত্র-ছাত্রী বানান শুদ্ধ করে ভালোভাবে লিখতে শিখবে।
  • শিক্ষার্থীরা ভাষা ব্যবহারের জ্ঞান বৃদ্ধি করবে।
  • শিক্ষার্থীদের চিন্তা, বুদ্ধি ও অনুভূতি-শক্তির বিকাশ ঘটবে।

বিশেষ উদ্দেশ্য :

  • জ্ঞানমূলক :- ‘ভাষা ও আওয়াজ রহস্য’ পাঠটির বিষয়বস্তু শিক্ষার্থীরা জানবে।
  • বোধমূলক :- বাংলা উচ্চারণের নানা রহস্য অর্থাৎ ধ্বনি সৃষ্টির বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়াগুলি শিক্ষার্থীরা উপলব্ধি করবে।
  • আগ্রহমূলক :- লেখকের মূল রচনা 'বাংলা বলো' বই-এর অন্যান্য রচনাগুলি পড়তে ছাত্র-ছাত্রী আগ্রহী হবে।
  • প্রয়োগমূলক :- বাংলা ভাষা উচ্চারণের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিকে যথার্থ প্রয়োগ করে বাংলা ভাষায় সঠিক উচ্চারণে দক্ষ হবে।
  • রসানুভূতিমূলক :- লেখক বাংলা ভাষার বিভিন্ন উপভাষা বা অঞ্চল ভেদে বাংলা ভাষার যে রূপগুলির উল্লেখ করেছেন তা থেকে শিক্ষার্থীরা রসাস্বাদন লাভ করবে।

শিক্ষার উপকরণ :

  • পাঠ্যপুস্তক,
  • চক, ডাস্টার বোর্ড,
  • বাংলা উপভাষার একটি তালিকা।
পর্যায় বিষয় শিক্ষকের ভূমিকা শিক্ষার্থীর ভূমিকা মূল্যায়ন
আয়োজন শ্রেণী বিন্যাস ও পূর্বজ্ঞান পরীক্ষা শ্রেণী কক্ষে প্রবেশ করে প্রথমে প্রয়োজন বোধে শ্রেণী বিন্যাস করে নেব এবং আজকের পাঠে ছাত্র-ছাত্রীদের মনোযোগ ও আগ্রহ সৃষ্টির জন্য নিম্নলিখিত প্রশ্নগুলি করব:    
   
১। আমরা কথা বলি কীসের সাহায্যে?

বাগ্ যন্ত্রের সাহায্যে

জ্ঞান
    ২। আমাদের কণ্ঠস্বরের উচ্চারিত ধ্বনি সমষ্টিকে কী বলা হয়? বা মনের ভাব প্রকাশ করতে আমাদের কণ্ঠ স্বরের মাধ্যমে যে ধ্বনি সমষ্টি ব্যবহার করি তাকে কী বলা হয়? আওয়াজ বা ভাষা জ্ঞান
    ৩। আমাদের মাতৃভাষা কী? বাংলা ভাষা জ্ঞান
    ৪। অঞ্চল ভেদে বাংলা ভাষার বিভিন্ন রূপকে কী বলা হয়? উপভাষা জ্ঞান
পাঠ ঘোষণা : এই ভাবে প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে অগ্রসর হয়ে আজকের পাঠ ঘোষণা করব যে, আজ আমরা ভাষাবিজ্ঞানী পবিত্র সরকার এর ‘ভাষা ও আওয়াজ রহস্য’ প্রবন্ধটির প্রথমাংশ আলোচনা করব।
পর্যায় বিষয় শিক্ষকের ভূমিকা শিক্ষার্থীর ভূমিকা মূল্যায়ন
উপস্থাপন পাঠটির বিষয় বস্তুর সামগ্রিক রূপ সংক্ষেপে তুলে ধরা।

শব্দার্থ :
আর্তনাদ : কাতর চিৎকার,
অ্যাঙ : এক,
খোক: কোপ,
খ্যাদাইলে : তাড়িয়ে দিলে,
গম্ভীর : ভারী,
কলিগ : সহকর্মী।
এই স্তরে প্রথমেই লেখকের জীবন ও সাহিত্য সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করব। এরপর আজকের পাঠ ‘ভাষা ও আওয়াজ রহস্য’ প্রবন্ধটির বিষয়বস্তু সংক্ষেপে তুলে ধরব যাতে পাঠ আলোচনার সময় তারা সম পাঠের প্রতি আকৃষ্ট হয়। এরপর রচনাটির যতি, উচ্চারণ ও ভাবের প্রতি লক্ষ্য রেখে আবেগ কম্পিত কণ্ঠে গদ্যাংশটির আদর্শ সরব পাঠ করব। তারপর ৩/৪ জন ছাত্র-ছাত্রীকে আলোচ্য অংশটির সরব পাঠ করতে বলব। উচ্চারণে ত্রুটি থাকলে তা সংশোধন করে দেব। এরপর আজকের বিষয়টি ছাত্র-ছাত্রীর সহযোগিতায় প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে আলোচনার অগ্রসর হব। প্রয়োজনবোধে বর্ণনা, ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ পদ্ধতি ব্যবহার করব। কঠিন শব্দের অর্থ বোর্ডে লিখে দেব।
এই স্তরে নিম্নলিখিত প্রশ্ন করব:
৩/৪ জন ছাত্র-ছাত্রী সরব পাঠ করবে এবং অন্যান্য শিক্ষার্থীরা বই খুলে দেখবে।  
 
১।  ‘ভাষা ও আওয়াজ রহস্য’ প্রবন্ধটির লেখক কে?

পবিত্র সরকার।

জ্ঞান
    ২।  লেখকের কোন্ বই থেকে নেওয়া হয়েছে? বাংলা বলো। জ্ঞান
    ৩।  বার্নাড শ-র কোন নাটকে প্রফেসর হিগিনস্ চরিত্রটি আছে? পিগমেলিয়ন। জ্ঞান
    ৪।  রাশিয়ান ভাষায় ‘না’ -কে কী বলে? নিয়েৎ নিয়েৎ। জ্ঞান
পর্যায় বিষয় শিক্ষকের ভূমিকা শিক্ষার্থীর ভূমিকা মূল্যায়ন
অভিযোজন লব্ধ জ্ঞান পরীক্ষা এই স্তরে শিক্ষার্থীদের কিছুক্ষণ নীরব পাঠ করার সময় দেবো এবং আজকের পাঠটি তারা কতটুকু উপলব্ধি করতে পারল তা জানবার জন্য নিম্নের প্রশ্নগুলো করব: ৩/৪ জন ছাত্র-ছাত্রী সরব পাঠ করবে এবং অন্যান্য শিক্ষার্থীরা বই খুলে দেখবে।  
 
১।  রোববার বিকালে হই হই করে হিগিনবাবু কাদের বাসায় এসে হাজির হয়েছিলেন?

ছাত্র-ছাত্রী নির্ভুল ভাবে উত্তরে দিবে।

জ্ঞান
    ২।  হিগিনবাবুর পেশা কী?   জ্ঞান
    ৩।  ‘নানু, দুপইরে খাবি তো এইখানে?
— কে কাকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন?
  বোধ
    ৪।  শব্দার্থ বলো :-
আর্তনাদ, অ্যাঙ, কান, খোপ।
  বোধ
    ৫।  শূন্যস্থানে উপযুক্ত শব্দ বসাও :-
‘ভাষাও আওয়াজ রহস্য’ নিবন্ধটির রচয়িতা ——
  জ্ঞান

বাড়ির কাজ :- পাঠ্য পুস্তক থেকে একটি উপভাষার কয়েকটি উদাহরণ বাড়ি থেকে লিখে আনুন।

কৃতজ্ঞতা : ড. জয়ন্ত দেবরায়

৬.৫   স্ক্রিপ্ট লিখন

রেডিও কথিকা / টিভির স্ক্রিপ্ট
পাঠ এবং বিশ্লেষণ (Analysis and Appreciation)
[এর জন্য এ বইয়ের পাঁচ নং অধ্যায়ের-এর ৫.৪ পাঠটি (রেডিও-টিভিতে কমিউনিকেশন) দেখুন]


একটি কথিকার নমুনা

সহাস্য ব্যবহার

আমাদের সমাজটি বড় অদ্ভুত। এখানে সহাস্য, ঠান্ডা মেজাজের সজ্জন ব্যক্তিটির জন্য কোন প্রশংসা নেই। বরং আছে উপহাস। ঠান্ডা মেজাজের মানুষ সম্বন্ধে বলা হয়, লোকটি একটু ভালোমানুষ, সোজা। ভালমানুষ হওয়াটা যেন দোষের। এখানে কড়া, অর্থাৎ বদমেজাজি লোকের বড় কদর। অফিসে কড়া অফিসার, ইশকুলে কড়া হেড মাস্টার, থানায় কড়া দারোগা, এমনকি বাড়িতে কড়া গার্জেনের প্রতিই আমাদের একটু বেশি সম্ভ্রম। কচিৎ যদি কোন কড়া উচ্চপদস্থ আমলা দু মিনিট আমাদের কথা শোনেন, আমরা কৃতার্থ হয়ে যাই। আসলে এটা ধরেই নিই যে, আমলারা আমাদের কথা শোনার মানুষ নন, ওদের অনেক কাজ আছে। কড়া নেতা মন্ত্রীদের কাছে থেকে দেখার সৌভাগ্য এ সমাজে খুব কম লোকেরই হয়। যারা এ সৌভাগ্য লাভ করেছেন, ওরা বলেন যে, এরাও নাকি মানুষের কুশলমঙ্গলের খবর নেন, ছেলেমেয়েদের পড়াশুনার কথা জিজ্ঞেস করেন, এমনকি খাবার সময় হাত দিয়ে ভাতও মাখেন। যেন, নেতা মন্ত্রীদের মানবিক আচরণ করার কথাই নয়। এ থেকে একটা কথা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, আমাদের সমাজটির গভীর গভীরতর অসুখ এখন।

গড়পরতা আশি শতাংশ লোকই কারণে অকারণে খেপে থাকেন। মন্ত্রীরা খেপে থাকেন উচ্চপদস্থ আমলাদের উপর, উচ্চপদস্থ আমলা তাদের অধঃস্তনের উপর। এরা আবার খেপে থাকেন তাদের নিচের কর্মচারীদের উপর। আর কর্মচারীরা খেপে থাকেন জনতার উপর। অপর দিকে শিক্ষকেরা খেপে থাকেন ছাত্রদের উপর, ছাত্ররা খেপে থাকে সব কিছুর উপরই, বাবা খেপে থাকেন মায়ের উপর, মা খেপে থাকেন ঝিয়ের উপর। থানায় গিয়ে দেখুন বড়বাবুর গোঁসা ছোটবাবুর উপর। ছোটবাবু কি তখন আর তস্য ছোট বাবুটির উপর রাগ না করে থাকতে পারেন? গাড়ির ড্রাইভার-কন্ডাকটারদের যত রাগ প্যাসেঞ্জারের উপর। ব্যাঙ্ক, পোস্ট অফিস, এল আই সি, টেক্স, ট্রেজারি, রেলের টিকিট কাউন্টারে গিয়ে দেখুন, ভেতরের দাদা দিদিরা সর্বক্ষণ কী রকম রেগে আছেন। গ্যাস সিলিন্ডারের খোঁজে এজেন্সিতে ফোন করবেন? কয়েকবার রিহার্সেল দিয়ে নিজের কণ্ঠকে সুন্দর করুন। তারপর আবৃত্তির ঢঙে করুণ মিনতি মাখা স্বরে আপনার আবেদন পেশ করুন। নইলে বাবুটি রিসিভার রেখে দেবেন। ডাক্তারের চেম্বারে যাবেন? পেশেন্টের টোকেন দেওয়া পিয়নবাবুটির মেজাজ বুঝে এগোন।

আমাদের সমাজের ভেতর যে কী ধরনের পচন ধরেছে এর আরও কিছু নমুনা শুনবেন?

আপনার প্রতিবেশির ঘরে উৎসব। সকাল সন্ধ্যা উচ্চগ্রামে মাইক্রোফোন বাজবে, আপনি প্রতিবেশীকে বোঝাবেন এত শব্দে, হৈ হট্টগোলে আপনি যে কত আনন্দ লাভ করছেন। আপনার ছেলেমেয়ের পড়াশুনা, ক্লান্তির সময় সামান্য স্বস্তি, রাতের বিশ্রামের কোনও অসুবিধার কথা জানালেই ওদের মুখ ব্যাজার। আর যদি হয় এটা কোন ধর্মীয় অনুষ্ঠান, তবে তো সামান্য অসুবিধার কথা বললে পরিণাম ভাল নাও হতে পারে। এত বড় অনুষ্ঠান আয়োজন করেছেন এরা, এদের মেজাজ ঠিকঠাক থাকবে কী করে?

মেজাজ ঠিক রাখা মানে তো এক ধরনের কাপুরুষতারও লক্ষণ। এই মেজাজ খারাপের প্রবণতা যে এক ধরণের সংক্রামক ব্যাধির মতো সমাজ দেহকে আক্রান্ত করে এর একটি চিত্র তুলে ধরেছেন ইংরেজ প্রাবন্ধিক এ, জি, গার্ডনার। ‘প্লিজ’ বলতে অস্বীকার করায় এক অফিস-বাবুকে লিফটম্যান ধাক্কা মেরে বাইরে ফেলে দেয়। লেখক অনুমান করেছেন ওই অফিসবাবুটি নিশ্চয় সকালবেলা স্ত্রীর মুখঝামটা খেয়ে বেরিয়েছেন। ইতিপূর্বে নিশ্চয় স্ত্রীও বাড়ির কাজের ঝি’র ব্যবহারের বিরক্ত হয়ে স্বামীর প্রতি এহেন ব্যবহার করেছেন। তবে লিফটম্যানের ধাক্কা খেয়ে এ বেচারি যদি আবার তাঁর বস্কে ‘গুডমর্নিং’ বলতে ভুলে যান, তবে বস্ যে সারাদিন কতজনকে বকাঝকা করবেন তারও ঠিক্ ঠিকানা নেই। তবে এটা নিশ্চিত, সন্ধ্যাবেলা অফ-মুডে এই বস্ বাড়িতে পৌঁছে সামান্য কারণেই নিজের গৃহিনীর উপর নির্ঘাৎ খেপে উঠবেন। গার্ডনার একটি ইংরেজি নাটকের এক ঘটনারও উল্লেখ করেছেন। এক বৃদ্ধ পিতা, স্যার অ্যান্থনি অ্যাবলিউট প্রচণ্ড ধমকি দিয়েছিলেন তাঁর পুত্র ক্যাপ্টেন অ্যাবসলিউটকে। ক্যাপ্টেন তো রেগেমেগে লাথি ঝড়লেন তার চাকর ফ্যাগের উপর। ব্যাচারা ফ্যাগের সমস্ত গোঁসা গিয়ে পড়ল ওদের প্রিয় কুকুরটির উপর। কুকুরটি আর কিছু করতে না পেরে রাগের মাথায় বারান্দায় পাপোষটি ছিঁড়ে কুটি কুটি করে তবেই রাগের পরিসমাপ্তি ঘটাল। এটা অবশ্য আমাদের অনুমান। মেজাজ খারাপের এ ঘনঘটায় কোথাকার জল যে কোথায় গড়ায়।

অতএব সহৃদয় শ্রোতা, আপনার দিনটি শুরু করার আগে দেখে নিন আজকে আপনার মেজাজের পারদটি কোথায়।


অনিশ্চিত যাত্রা

VIDEO AUDIO
Caption-1 - অনিশ্চিত যাত্রা
Caption-2 - রচনা ও পরিচালনা
Caption-3 - প্রযোজনা
Title Music
Music Continues-
Title music fades out and replaced by a different instrumental music.

Phone II

O/V
পর্দাজুড়ে শহরের পথে চলা বিচিত্র পেশার, বিচিত্র পোশাকের মানুষের সচল ছবি- আস্তে আস্তে Mid Shot-এ ধরা পড়বে মানুষের জুতাপরা পা-এবং এরপর Close-up একটি রাবারের চপ্পল-পরা পা।
গ্রামে শহরে, হাটে বাজারে এই সচল পায়ে দেখুন- রয়েছে প্লাস্টিক, রাবারের পাদুকা। দেখুন চামড়ার জুতা মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্তের পা থেকে বিদায় নিচ্ছে
। সে সঙ্গে কর্মবিহীনতার দিকে চলেছেন আমাদের জুতা-মিস্ত্রীরা, হরিদাস, রবিদাস, রুইদাসরা।

খবর কাগজের পাতা ‘পুজোয় চাই নতুন জুতা’ বিভিন্ন জুতার বিজ্ঞাপনের পাতাগুলো আসবে।

বিজ্ঞাপনের আওয়াজ।

গ্রামের বাজারে সেলাইর সরঞ্জাম নিয়ে বসে আছেন বৃদ্ধ গোঁফওয়ালা মিস্ত্রী- সামদানের উপর চামড়া, হাতুড়ির ঘা পড়ছে। বৃদ্ধের কাজ চলছে।

Instrumental music.

একটি Spot Interview-এই বৃদ্ধ কর্মীর সঙ্গে

সাপ্তাহিক বাজারের ছবি এবং জুতা-কর্মীর অস্থায়ী আস্তানার চিত্র।

(প্রশ্নকর্তার জবাবে বৃদ্ধ বলছেন)
হামার ঘর তো বাবু আরিকলে। ওই জাটিঙ্গার পাড়ে বাবু।
আগে বাজারে ইখানটায় আমরা আটদশ জন বসতাম।
ফি বাজারে চার-পাঁচ জোড়া জুতা কাটতো বাবু।
আর ছিল দুরস্ত করা।
এর ফিতা টুট গিয়া, বাবুর সোল করতি হবে,
মিটিনে যাবেন জমিদারবাবু, তাঁর জুতায় জেল উঠাটি হবে।

প্রশ্নকর্তা মাইক্রোফোন হাতে-

প্রশ্ন: এখন?

ফুটবল খেলছে একদঙ্গল বাচ্চারা-
Flash Back

উত্তর: আরে বাবু, কী বলবো, আগে ফুটবল খেলতো বাচ্চারা। তো উহাদের বায়না- ‘হামার ব্লাডারে তালি মারো বাবা, হামার চামড়া টুট গিয়া, কুচ করো খেলতি হবে।’ দুপুর থেকে আমার ঘরে মহা হাঙ্গামা।
মর্জি হলে পয়সা, নেহি তো নেহি।
যা বাবা খুস্ রহো।
আজকাল ফুটবলের কাম ভি নাই।

প্রশ্নকর্তা

প্রশ্ন: আপনাদের দেশের কথা বলুন-
উত্তর: সে কি আমি দেখেছি ? হামার দাদা, তার ভি বাপ ইদিকে এসেছিল সাহেবদের বাগানে, তখন রেল ভি ছিল না।

প্রশ্ন: দেশবাড়ি কোথায় ছিল?

জুতা মিস্ত্রীর বাড়িতে কথা হচ্ছে- ক্যামেরায় ঘর-বাড়ি, পুকুর, গাছপালা সব আসছে।
উত্তর: দেশ তো বাপু আজমগড়, ইউপি মুলুকে। হামরা রবিদাস, রুইদাস, হরিজন। হামদের বিরাদরি আছে শিলচর, কাশিপুর, লক্ষীপুর-।
করিমগঞ্জ-হাইলাকান্দিতেও আছে ।

প্রশ্ন: আর কোনও কাম ধান্ধা?
উত্তর: ইখানের জমিদার খেতি করবার জমিও দিল। লেকিন রাখতে নাই পারলাম।
বাদ্যকরের আস্তানায় কর্মরত ব্যক্তি-

টাঙানো রয়েছে চামড়া, ছানি হচ্ছে ঢোলকের, কয়েকটি খোল, তবলা।
আরও কামধান্ধ ছিল- ভাগাড়ে চামড়া তোলা, শুকানো।
ডপকি, ঢাক, ঢোল, তবলা, মিরদত্তের ছানির চামড়া-
sounds of these instruments
(ঢাকের বাদ্যি)

নিবিষ্ট মনে চর্মকার বাদ্যযন্ত্রের কাজ করছে।

Sound-
বাটালি দিয়ে তবলায় চামড়ায় আঘাত করলে টুং টাং শব্দ হচ্ছে-
(লোকটি বলছে) :
হামরা বাদ্যকর। আগে চামড়ার কাজও করতাম। এখন জুতার কারবারে লাভ নাই।

প্রশ্নকর্তা মাইক্রোফোন এগিয়ে-

এই দেখুন তবলায় গাব দিই। কী দিয়ে হয় জানেন?

পুকুরের তলা থিকে কাদামাটি উঠাই। ভাতের সঙ্গে পিষে তৈরি করি গাব। সঙ্গে চর্বি, তেল। চামড়া যন্ত্রে সুর উঠে এতে। ডপকিতেও লাগে, পাখাজেও লাগে। গুরমি উঝারা বায়না দেয়।

পদ্মাপুরাণের আসরে নৃত্যরত গুরমি (Eunuch)।
সঙ্গে পাখাজ বাজাচ্ছেন আরেকজন।

এক ঝলক গানের আভাস- পাখাজের বোল।

প্রশ্নকর্তা

(River Dolfin) পু-মাছের ছবি।

বাবু, আগে আমরা পাখি মারতাম। পু-মাছও। এখন আর ভাসে না। ইয় বড়া পু-মাছের তেল দিয়ে বাতি করতাম, সুতায় মাঞ্জা দিতাম, দাবাই করতাম।

কচ্ছপের খোলস বারান্দায়।

বাবু, কাঠুয়াভি আজকাল নাই।
পুলিশ নিষেধ করছে।

Turn back to the first scene.
বৃদ্ধলোকটি হাসছে

হ্যাঁ বাবু, হামি ঢাক বাজাই।
বাঁশি ভি: (Accompanying Sound)
লেকিন হামার লেড়কা টাউনে গাড়ি চালায়, ডায়বর, ঔর এক বেটা চা-বাগানের চকিদার। ই কাম নাই করে।

কাজ করতে করতে লোকটি বলছে

এই হল হামদের সুই। বাজারে নাই পাবেন। নিজে বনাই। সুতা আর বালি দিয়ে দিনমান ঘসতে ঘসতে ঘসতে এই ফুটা হয়।

না বাবু, ই কাম আর নাই হবে। সবকাই এখন টাউনের জুতা পিন্ধে।সিলাই নাই, দুরস্ত নাই। পালিস ভি নাই লাগে। হামদের কাম খতম।

দৃশ্যপট পরিবর্তিত হয়ে এসেছে

O/V

রবিদাসদের গ্রামে। বাচ্চা কোলে মহিলা, ছেলে ছোকরারা এদিক- ওদিক হাঁটছে। উঠোনে মুরগি।

এই রবিদাস, রুইদাসদের বৌরা, মা, মাসি, পিসিরা, দিদিরা আগে কাজ করতেন ধাত্রীর। শহরতলি এমনকি শহরেও ওদের বিচরণ ছিল।নবজাতকের যত্ন, প্রসূতিকে যত্নআত্তি, আঁতুড়ঘর থেকে বের হওয়ার পর বসতে পারা তক্ বাচ্চাগুলোকে চান করানো, তেল মালিস, কান, নাক, নাভির যত্ন- এসবে ওরা ছিলেন পারদর্শী।


O/V


এদের আদর-যত্নেই বড় হয়েছে প্রজন্মের পর প্রজন্মের শিশুরা। তখন না ছিল হাসপাতাল, না ছিল ডাক্তার, নার্স।

হাসপাতালের ছবি- ড্রেস পরা নার্স।

এ ধাইদের বুকে ছিল অনাবিল ভালোবাসা, মনে অসীম ধৈর্য। এরা ছিলেন মায়েদের পরম নির্ভর।

আজকের সমাজে এদের কোনও স্থান নেই।



কাঁধে জুতোর সরঞ্জাম নিয়ে হাতে লাঠি বৃদ্ধ লোকটি সন্ধ্যার আবছা আলোয় বাড়ি যাচ্ছে

O/V

পায়ে পায়ে চলার আনন্দ বেড়েছে। বাহারি ফ্যাসনের বিপণন বেড়েছে। গ্রাম, গঞ্জ, শহরে, শহরতলি এমনকি চা-বাগিচারও জুতা - মিস্ত্রীদের ছুটি। অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে চলেছে গত শতকের শেষ প্রতিনিধি। কাধে তাঁর সেলাই সরঞ্জাম, ঠোঁটের উপর মস্ত একজোড়া গোঁফ-

Title Card:
• কৃতজ্ঞতা -
• গবেষণা
• ভাষ্য-
• ক্যামেরা-
• শব্দ ও ধ্বনি-
• সংগীত-
• সম্পাদনা-
• রচনা ও পরিচালনা-
• প্রযোজনা-


তৃতীয় পত্র
অধ্যায় - 
প্রকল্প