আপনার মুঠোফোনটি ল্যান্ডস্কেপে রাখুন।
এ পর্বটিতে যা জানতে পারবেন —
ভাষার স্থায়িত্ব আসে তখনই যখন মুখের বুলি কোনও স্থায়ী কিছুর উপর লিপিবদ্ধ হয়- যে কাজটি শুরু হয়েছিল প্রাচীন কালে পাথরের গায়ে, শুষ্কপত্রে, গাছের বল্কলে, কাপড়ে এবং অবশেষে হাতে তৈরি কাগজে। সেই থেকে শুরু হল বর্ণমালার ইতিহাস।
বাংলা লিপি, অক্ষর বা বর্ণমালার উৎস রহস্য আমাদের কাছে অজ্ঞাত। পণ্ডিতদের অনুমান দ্বাদশ থেকে সপ্তদশ শতকে বিভিন্ন হস্তলিখিত পুথিপত্রে, রাজকীয় সনন্দে, পত্রে বাংলা অক্ষরের আত্মপ্রকাশ এবং বিবর্তন। এরপর ঔপনিবেশিক আমলে আধুনিক মুদ্রণযন্ত্রের প্রয়োগকালে এ লিপি বা অক্ষর একটি শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড়ায়। শ্রীরামপুরের মুদ্রণালয়ের সৌজন্যে ধাতুনির্মিত অক্ষরমালার আশ্রয় লাভ করে বাংলা লিপি। তার একটা সুনির্দিষ্ট অবয়ব গড়ে ওঠে, বর্ণগুলোর গড়নে সমতা আসে, ব-এর নিচে বিন্দু বসে হয় র, যুক্তাক্ষর, আ-কার, ই-কার, উ-কার, উ-কার, র-ফলা, রেফ এবং বিরতি চিহ্ন- এসবের সর্বজনগ্রাহ্য রূপ প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কর্তৃক বর্ণমালা সংস্কারের ফলে বাংলা লিখন, মুদ্রণ এবং পঠনের ক্ষেত্রে প্রাচীন অধ্যায় শেষে শুরু হয় আধুনিক অধ্যায়। অপ্রয়োজনীয় বর্ণ, চিহ্ন বর্জিত হয়, বর্ণমালার ক্রমও নতুন ভাবে নির্ধারিত হয়।
সূত্রাকারে এদিকে আলোকপাতের পর এ অধ্যায়ে আলোচিত হবে বাংলা প্রাথমিক শিক্ষার বই- বর্ণবোধ, প্রাইমার। বিদ্যাসাগর থেকে রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত বাংলা প্রাইমার রচনা পদ্ধতির উপর আলোচনা করে সাম্প্রতিক বাংলা শিশুপাঠ্য বইয়ের সমস্যা এবং উত্তরণের অনুসন্ধান করার প্রয়াসও থাকবে।
পৃথিবীতে ভাষার সংখ্যা সাড়ে তিন হাজারের মতো, কিন্তু লিপির সংখ্যাকে ভাষাবিজ্ঞানীরা শ’খানেকের বেশিতে নিয়ে যেতে পারেননি। এই লিপির মধ্যে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে উদ্ভুত লিপি, যা পশ্চিম দিকে গ্রিক, রোমক ইত্যাদিতে পরিণত হয়েছে, আর, পূর্বদিকে বিস্তার লাভ করেছে খরোষ্টি ও ব্রাহ্মীলিপি হিসেবে। এ ব্রাহ্মীলিপি থেকেই ভারতীয় লিপিগুলো সৃষ্টি বাংলা এর অন্যতম। ব্রাহ্মীলিপি চলে বাম থেকে ডান দিকে। আর খরোষ্টি লিপির গতি হল এর উল্টো, অর্থাৎ ডান থেকে বামে।
আমাদের এটুকু মনে রাখলেই চলবে- বাংলা হল ব্রাহ্মীলিপি; আর মনে রাখতে হবে বাংলা বর্ণমালা গড়ে উঠেছে সংস্কৃত বর্ণমালার আদলে।
এরপর বুঝে নিই বর্ণমালা আর লিপি বলতে কী বোঝায়? বর্ণমালা হল প্রথম পাঠের জন্য বর্ণসজ্জা, আর লিপি হল বর্ণের ব্যবহার। ইংরেজিতে বর্ণমালা হল alphabet, আর লিপি হল script। বর্ণমালা হল লিপির প্রাথমিক উপাদানগুলোর অর্থাৎ ভাষায় ব্যবহৃত স্বর ও ব্যঞ্জনের মৌলিক প্রতীক সমাহার। লিপি হল লেখায় এই বর্ণগুলির প্রয়োগপদ্ধতি। ইংরেজিতে এই লিপি-পদ্ধতিকে বলে orthography।
অ থেকে চন্দ্রবিন্দু পর্যন্ত মোট ৫২টি বর্ণকেই একযোগে বলা হয় বর্ণমালা। ভাষাবিজ্ঞানীদের মতে আমাদের বর্ণমালা যুক্তিভিত্তিক, এলোমেলো ভাবে রাখা অবিন্যস্ত কিছু বর্ণের সমাহার নয়। ধ্বনিবিজ্ঞানের সূক্ষ্ম চিন্তা ও যুক্তি রয়েছে এ বিন্যাসের পেছনে। পবিত্র সরকারের মতে, ‘ইংরেজি বা রোমান বর্ণমালা এ রকম যুক্তিবদ্ধ বা সুচিন্তিত নয়’ (বাংলা বানান সংস্কার: সমস্যা ও সম্ভাবনা, কলকাতা, ১৯৮৭, পৃ. ৩০)।
ভাষাশিক্ষার ক্ষেত্রে বর্ণমালার পাঠই জরুরি এবং প্রাথমিক। এটা শৈশবে শেখা হলেও সারাজীবনই এর প্রয়োজন। আমরা প্রায়শই এ প্রশ্নে বিব্রত হই- বাংলা স্বরবর্ণ কতটি আর ব্যঞ্জনবর্ণই বা কতটি? ‘আগে তো জানতাম স্বরবর্ণ ১২টি, এখন নাকি কমে গেছে, ব্যঞ্জনবর্ণেও নাকি পরিবর্তন ঘটেছে। ইংরেজিতে এ সমস্যা নেই, ওখানে abcd থেকে শুরু হয়ে xyz এ এসে শেষ’-এ রকম কথা তো অহরহ শোনা যায়। তবে ইংরেজিতে কী আছে, কী নেই, সেটা দেখে কাজ নেই। আমাদের বর্ণমালার ক্রম মনে রাখার সূত্রও আছে। তবে এর আগে মনে রাখা দরকার- বর্ণমালাটা কণ্ঠস্থ না থাকলে পরিণত বয়সে বেশ সমস্যা হয়, বিশেষ করে যাঁদের কাজ ভাষা নিয়ে। অভিধান দেখতে হলে কোন বর্ণের পর কোন বর্ণ, কোন পৃষ্ঠাটা আগে হবে আর কোনটা পরে, এ সমস্যা সমাধানের জন্য ঝরঝর্ করে অ থেকে ঔ, আর ক থেকে অঁ পর্যন্ত আউড়ে যেতে পারলে কাজটা একেবারে সহজ হয়ে যায়। কিন্তু আমরা পাঠশালার পাঠ শেষ করেই বর্ণমালার বইকে বিদায় দিই। যাঁরা ছাপাখানার সঙ্গে সম্পর্ক রাখেন, প্রুফ দেখেন, ১০৩৪ পৃষ্ঠার (সূচি থেকে পরিশিষ্ট নিয়ে) ‘গীতবিতান’, কিংবা হাজার চারেক গান সম্বলিত নজরুলগীতি সংকলন হারমোনিয়মের উপর রেখে গান করেন, এদের এলোমেলো পাতা ওল্টানো দেখলেই বোঝা যায় বর্ণমালার ক্রমটি তাঁদের শেখা হয়নি।
বর্ণমালার ক্রমটি ঠোঁটে হাজির থাকলে এ রকম বিড়ম্বনা হয় না। ক্রমটি মনে রাখার একটি সূত্র আছে:-
ক-বর্গ, চ-বর্গ, ট-বর্গ-এই ক্রমটি মুখস্ত রাখলেই চলে। সূত্র (mnemonic) বা স্মৃতিসহায়কটি হল কচট-তপযশ।
বর্ণমালার ক্রমটি ঠোঁটে হাজির থাকলে এ রকম বিড়ম্বনা হয় না। ক্রমটি মনে রাখার একটি সূত্র আছে:-
ক-বর্গ, চ-বর্গ, ট-বর্গ-এই ক্রমটি মুখস্ত রাখলেই চলে।
সূত্র (mnemonic) বা স্মৃতিসহায়কটি হল কচট-তপযশ।
ফিরে আসা যাক্ বর্ণমালার ক্রমে :
অ আ ই ঈ উ উ ঋ এ ঐ ও ঔ = মোট ১১টি স্বরবর্ণ।
আগে ছিল ১২টি (+৪)।
সে অনেক আগে, কিন্তু আমরা তো এদের এখনও ছাড়তে পারছি না। বিশেষ করে ‘লি’, ৯-কে। এর কারণ হল বর্ণবোধের সেই ছড়া —
ঋষিমশাই বসেন পূজায়
৯-কার যেন ডিগবাজি খায়।
পন্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরমশাই সেই ঊনবিংশ শতাব্দীতে একে বর্জনের সুপারিশ করেছেন, তবুও আমরা অভ্যাসবসত বর্ণমালার ক্রমে লি (৯) উচ্চারণ করে যাই। আর স্বয়ং বিদ্যাসাগরমশাইও তাঁর ‘বর্ণপরিচয়’ বইতে অনাবশ্যক জেনেও ৯-কে রেখে দিয়েছেন। অভ্যাসের বালাই বড় বালাই। বরাক উপত্যকার কবি একটি বর্ণপরিচয়ের বইতে লিখেছেন – ‘থেকেও নেই ৯ আসলে এ'ই।’ (অমিতাভ দেবচৌধুরী, হারে রে রে, আগরতলা, ২০০৮)
একটি বিজ্ঞাপনবর্ণপরিচয়ের প্রথমভাগ প্রচারিত হইল। বহুকাল অবধি বর্ণমালা ষোল স্বর ও চৌত্রিশ ব্যঞ্জন এই পঞ্চাশ অক্ষরে পরিগণিত ছিল। কিন্তু বাঙ্গালা ভাষায় দীর্ঘ ৠ (ডাবল) -কার ও দীর্ঘ ৡ -কারের প্রয়োগ নাই, এই নিমিত্ত ঐ দুই বর্ণ পরিত্যক্ত হইয়াছে। আর, সবিশেষ অনুধাবণ করিয়া দেখিলে, অনুস্বর ও বিসর্গ স্বরবর্ণ মধ্যে পরিগণিত হইতে পারে না, এজন্য ঐ দুই বর্ণ ব্যঞ্জনবর্ণের মধ্যে পঠিত হইয়াছে। আর, চন্দ্রবিন্দুকে ব্যঞ্জনবর্ণস্থলে এক স্বতন্ত্র বর্ণ বলিয়া গণনা করা গিয়াছে। ড, ঢ, য এই তিন ব্যঞ্জনবর্ণ, পদের মধ্যে অথবা পদের অন্তে থাকিলে ড়, ঢ়, য় হয়, ইহারা অভিন্ন বর্ণ বলিয়া পরিগৃহীত হইয়া থাকে। কিন্তু যখন আকার ও উচ্চারণ উভয়ের পরম্পর ভেদ আছে, তখন উহাদিগকে স্বতন্ত্র বর্ণ বলিয়াই উল্লেখ করা উচিত; এই নিমিত্ত, উহারাও স্বতন্ত্র ব্যঞ্জনবর্ণ বলিয়া নিন্দিষ্ট হইয়াছে। কও য মিলিয়া ক্ষ হয়, সুতরাং উহা সংযুক্ত বর্ণ, এজন্য, অসংযুক্ত ব্যঞ্জনবর্ণ গণনাস্থলে পরিত্যক্ত হইয়াছে।
কলিকাতা, সংস্কৃত কলেজ
১ লা বৈশাখ, সংবৎ ১৯১২শ্রী ঈশ্বরচন্দ্র শর্মা
এই ৯ এর সঙ্গে ছিল দীর্ঘ ৡ (ডবল করে লেখা), সে সঙ্গে ছিল দীর্ঘ ঋ-কার (ৠ)। বিদ্যাসাগর এগুলো বর্জন করে বাঙালির লিখনপঠন কর্মকে বিড়ম্বনার হাত থেকে বাঁচিয়েছেন। তাছাড়াও, ঈশ্বরচন্দ্র অনুস্বর আর বিসর্গকে স্বরবর্ণ থেকে ব্যঞ্জনবর্ণের তালিকায় নিয়ে গেছেন। আর, সে সঙ্গে ড়, ঢ়, য়–কে স্বতন্ত্র ব্যঞ্জনবর্ণের মর্যাদা দিয়েছেন।
আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, বিদ্যাসাগর বাংলা বর্ণমালা, লিপি, ব্যাকরণ নিয়ে কাজ করার পরবর্তী দিনগুলোতে বাংলা ভাষা, লিখন এবং মুদ্রণ জগতে বিরাট পরিবর্তন ঘটেছে। আর সাম্প্রতিক কালের পরিবর্তনতো অভাবনীয়। বিদ্যাসাগর শুধুমাত্র ভাষাতত্ত্ব, ব্যাকরণচর্চায় নিমগ্ন না থেকে ‘বর্ণপরিচয়’-এর মতো বই তো লিখেছেনই, সে সঙ্গে বইগুলো যথাযথ ভাবে যাতে মুদ্রিত হয়ে মানুষের হাতে পৌঁছায় সে জন্য নিজে ছাপাখানার কাজও শিখেছিলেন, ধাতু দিয়ে টাইপ তৈরির কারিগরির দিকটিও দেখেছেন। বলাবাহুল্য এ কাজে তাঁকে অনেক প্রতিবন্ধকতা এবং অসম্মানও সহ্য করতে হয়েছে।
কাঠখোদাই থেকে ধাতুনির্মিত লেটার, হস্তপদ চালিত ছাপাইযন্ত্র থেকে অফসেট এবং অফসেট থেকে ডিজিটেল প্রিন্টিং - আড়াইশো বছরের বিবর্তনে বাংলা বর্ণমালা এবং লিখনকর্মে যে বিবর্তন ঘটেছে এটা অনুধাবন করলে বই, পত্রপত্রিকা কিংবা হাতের লেখা পাঠে বিভ্রম দূর করা যায়।
র এবং পেটকাটা র এর প্রসঙ্গ ইতিপূর্বে আলোচিত হয়েছে (প্রথম ষান্মাসিক, বই-১); ঋ, এবং ৯ প্রসঙ্গও আলোচিত হল। এবার দেখব ইদানীং যে পরিবর্তনগুলো এসেছে, যা দেখে নতুন প্রজন্মের মনে ভাবনা জাগছে, ‘বাংলাটা বড়ো কঠিন’। পরিবর্তনগুলো নিম্নরূপ:
পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ), পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমির (পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি) প্রয়াসে এগুলো মান্যতাও লাভ করছে। এটা জনপ্রিয়তা লাভ করলে নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলা আর ভয়ের কারণ থাকবে না। আর, সবচেয়ে বড় কথা হল নতুন সফটওয়ারের সাহায্যে এ স্বচ্ছ বানান সর্বজনগ্রাহ্যও হয়ে উঠছে; এ পথ ধরে বাংলা লিখনকর্মে সমতাও আসবে, এটাই স্বাভাবিক এবং কাম্য।
পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর পেয়েছিলেন ১৬টি স্বরবর্ণ, আর ৩৪টি ব্যঞ্জনবর্ণ। তিনি করেছেন ১১টি স্বরবর্ণ এবং ৪০টি ব্যঞ্জনবর্ণ। অনুস্বর, বিসর্গকে ব্যঞ্জনবর্ণের দলে এনেছেন, চন্দ্রবিন্দুকে স্বতন্ত্র বর্ণ হিসেবে ধরেছেন। অর্থাৎ, সংস্কৃত বর্ণবিন্যাসের অন্ধ অনুসরণ না করে সংস্কার করেছেন। বর্তমানে বাংলা বর্ণমালার যে চেনা চেহারা, এটা বিদ্যাসাগর মশাইয়েরই অবদান। তাঁর বর্ণমালার ক্রমটি নিম্নরূপ :
| ~: স্বরবর্ণ :~ | |||
| অ | আ | ই | ঈ |
| উ | ঊ | ঋ | [৯] |
| এ | ঐ | ও | ঔ |
| ~: ব্যঞ্জনবর্ণ :~ | ||||
| ক | খ | গ | ঘ | ঙ |
| চ | ছ | জ | ঝ | ঞ |
| ট | ঠ | ড | ঢ | ণ |
| ত | থ | দ | ধ | ন |
| প | ফ | ব | ভ | ম |
| য | র | ল | ব | |
| শ | ষ | স | হ | |
| ড় | ঢ় | য় | ||
| অং | অৎ | অঃ | অঁ | |

লক্ষণীয়, এখানে ৯ রয়েছে, যদিও অনুশীলনে বিদ্যাসাগরমশাই একে বাদ দিয়েছেন। ‘সহজপাঠ’ বইতে রবীন্দ্রনাথও ৯-রেখেছেন কিন্তু অনুশীলনে বাদ দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ‘ঘন মেঘ বলে ঋ/দিন বড় বিশ্রী’, আর এরপর ৯-কে ডিঙিয়ে চলে গেছেন পরবর্তী দুটি বর্ণে - এ এবং ঐ-তে: ‘বাটি হাতে এ ঐ/হাঁক দেয় দে দৈ।’ অবশ্য ৫ম এবং ৬ষ্ঠ সারিতে ব-দুইবারই আছে- প্রথমটি বর্গীয় ব, দ্বিতীয়টি অন্তস্থ ব। অন্তস্থ ব-এর স্বাধীন প্রয়োগ নেই, অন্য বর্ণের সঙ্গে যুক্ত হয়েই তাঁর অবস্থান, যেমন দ্বার, স্বর ইত্যাদি।
মনে রাখুন :
অভিধানগুলোতে যে বর্ণমালার ক্রম দেওয়া হয়, তা পরিচিত ধারায় নয়, অভিধানের রীতি অনুযায়ী দেওয়া হয়। আর আঞ্চলিক অভিধানের ক্রম থাকে অপরাপর সাধারণ অভিধানের থেকে আলাদা। অনেক বাজার চলতি অভিধানে য়, ৎ, ড় থাকে না। বর্ণমালার বইও সব সময় হাতের কাছে থাকার কথা নয়। অভিধান দেখে তাই বর্ণমালার সংখ্যা নির্ণয় করতে গিয়েও অনেকে বিভ্রান্তিতে পড়েন।
এ কারণেই বাংলা বর্ণমালায় ক'টি অক্ষর জিজ্ঞেস করলে কেউই ঝট্ করে উত্তরও দিতে পারেন না- তবে, আর নয়। এখন আমরা ঝট্ করে উত্তর দিব:- বাংলা বর্ণমালার ১১টি স্বরবর্ণ এবং ৪০টি ব্যঞ্জন বর্ণ আছে।
গত শতকের ষাট-সত্তরের দশক পর্যন্ত গ্রাম এবং শহরের মুদিখানায় পাওয়া যেত দুটো পাঠসামগ্রী-‘বর্ণবোধ’ এবং মাটির স্লেট-পেন্সিল। লাল রঙের কাঠখোদাই ছাঁচে বড়ো হরফে হাল্কা নিউজ-প্রিন্টে ছাপা এই বর্ণবোধে অ-য় অজগর, আ-য় আম, ই-তে ইঁদুর আউড়াতে আউড়াতে বাঙালির পড়াশোনা শুরু হত। মা বাবার কোলে বসে এসব পড়তে পড়তে শিশুরা কত কত বই ছিঁড়ে ফেলেছে এর হিসেব কেউ রাখেনি। ওদের জন্য ফি হপ্তা আসত নতুন বই। বাঙালির বড় প্রিয়, বড় অনাদরের মহামূল্যবান এ আদিগ্রন্থ আজকাল বাজারে দুষ্প্রাপ্য। পুরনো মুদিখানার গুদাম ঝাড়লে দু’একখানা কপি মিললেও মিলতে পারে। সন্তানদের হাতেখড়ির দিনে খোঁজ পড়ে এ বইটির। আজকাল হাটের দিনে চাল, তেল, নুন, চিনির তালিকায় আর বর্ণবোধ থাকে না। সে যাই হোক, তখন এ বইয়ের ছড়াগুলো সকালসন্ধ্যা শিশুদের কণ্ঠে উচ্চারিত হত -
স্মৃতিবাহিত হয়ে এ সুরেলা উচ্চারণ আজও আমাদের কানে ‘লাগে সুধার মত।’ এ পাঠ নিয়ে বাঙালির বেড়ে ওঠা, কথা বলতে শেখা, গান গেয়ে ওঠা। কত শিল্পী এ দিয়ে গান বেঁধেছেন, কত চিত্রকর ছবি এঁকেছেন। এটা বাঙালির প্রাণের গভীরে ঢুকে গেছে।
শুধু কি তাই, এর ঢের আগে মদনমোহন তর্কালঙ্কার (১৮১৭-১৮৫৮), বিদ্যাসাগর, এরপর রবিঠাকুর, যোগিন সরকার উপহার দিলেন শিশুদের জন্য বর্ণপরিচয়ের বই, প্রাথমিক পাঠ। মদনমোহনের ‘শিশু শিক্ষা’র ‘লেখাপড়া করে যে, গাড়ি ঘোড়া চড়ে সে’, এ ছড়া বলতে বলতে বাঙালি জাতি আধুনিক যুগে পৌঁছে গেল। সে সঙ্গে রয়েছে সেই দুটো উজ্জ্বল কলি-
পাখি সব করে রব রাতি পোহাইল
কাননে কুসুমকলি সকলই ফুটিল।
এ প্রস্ফুটন কেবল কুসুমকলির নয়, বাঙালির চিন্তা-চেতনা, আবেগ, অনুভূতির প্রস্ফুটনই। মনে রাখা প্রয়োজন, বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণপরিচয়’-প্রকাশের আগেই মদনমোহনের 'শিশু শিক্ষা' প্রকাশিত হয়ে গিয়েছিল (৩ খন্ডে, ১৮৪৯-১৮৫৩)।
এরপর বাঙালি শিশুদের মনকে রাঙিয়ে তুলতে আসরে নামলেন যোগীন্দ্রনাথ সরকার (১৮৬৬-১৯৩৯)। তাঁর ‘হাসিখুশি’ (১৮৯৭), ‘খুকুমণির ছড়া’, ‘ছড়া ও ছবি’, ‘রাঙা ছবি’, ‘হাসির গল্প’, ‘পশুপক্ষী’, ‘বনে জঙ্গলে’, আর ‘শিশু চয়নিকা’, ‘হিজিবিজি’ শিশুদের প্রাথমিক পঠনপাঠনে আনন্দের হাট বসিয়ে দিয়েছিল। তাঁর ‘এক যে আছে মজার দেশ’, ‘আতা গাছে তোতা পাখি, ডালিম গাছে মৌ’ এসব তো শিশু-কিশোরদের মুখে মুখে ফিরেছে সেদিনও। আর সংখ্যা শেখার সেই ছড়া, ‘হারাধনের ১০টি ছেলে’ কী করে শূন্যতে নেমে এল-শিশুরা বুঝতেই পারল না ওদের গণিত পড়ানো হয়েছে এমনি করে।

আমরা দেখলাম, বাংলা প্রাথমিক শিক্ষার বই, শিশুপাঠ, বর্ণবোধ, বর্ণপরিচয় বা ইংরেজি পরিভাষায় Primer বা First Book-এর একটা বিশাল ঐতিহ্য রয়েছে। এ ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় প্রচুর প্রাইমার রচিতও হয়েছে যেখানে স্বরবর্ণ, ব্যঞ্জনবর্ণ, মাত্রা, চিহ্ন, সংকেত শেখাতে অপূর্ব সব ছড়া, কবিতা, গদ্যের নমুনা আছে যার মধ্যে রয়েছে বাংলা ভাষা, বাঙালির ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির নির্যাস, রয়েছে আবহমান বাংলার জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। আমাদের দিন-পক্ষ-তিথি-নক্ষত্র-মাস-কাল, চারদিকে ছড়ানো বর্ণ, ছন্দ, ধ্বনি ফুল-ফল-পল্লব, পাখপাখালি, জীবজন্ত, আমাদের উৎসব-আমোদ, খেলাধুলা, পোশাকআশাক, ঘর গেরস্তালি-সব কিছুর সঙ্গে প্রাথমিক পরিচয় তো এ বইগুলোর মাধ্যমেই।
যুগের বিবর্তনে এসব বইতেও পরিবর্তন এসেছে। বিদ্যাসাগর মশাইয়ের গোপাল-রাখাল পথ ছেড়ে দিয়েছে গঞ্জের জমিদার সঞ্জয় সেন, আর কুমোরপাড়ার গরুর গাড়ির গাড়োয়ান বংশীবদনদের। স্টিরিয়টাইপড আদর্শবাদী গুরুমশাই এবং প্রশ্রয়দাত্রী বাবা-মা, মাসি-পিসিদের জগৎ নয়, এবার শিশুপাঠে উঁকি ঝুঁকি দিতে আরম্ভ করল প্রাকৃতিক নিসর্গ- বৈশাখ মাসের শীর্ণ নদী, ফুলে ফুলে সাদা কাশবন, বালিতে খেলা করা শালিখের ঝাঁক। পাঠ্য বইয়ের নতুন নিসর্গকে মুখর করে তুলতে আবার শোনা গেল ‘রাতে ওঠে থেকে থেকে শেয়ালের হাঁক’। বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণপরিচয়’ থেকে কবিগুরুর ‘সহজ পাঠ’ বইতে এ বিবর্তন এসেছিল যুগের মেজাজ অনুযায়ী একেবারে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায়।
ক্রমে নানা ধরনের মতবাদ, সমাজতাত্ত্বিক-রাজনৈতিক বিশ্লেষণ এসে গেল এখানেও। ‘সহজ পাঠ’ এর পক্ষে-বিপক্ষে বিস্তর যুক্তিতর্ক শোনা গেল। ফলত এ ধরনের বই দূরে সরে গেল শিশুদের থেকে। বাংলা প্রাথমিক শিক্ষার বই এরপর থেকে সরকারি নির্দেশমতো হয়ে উঠল যৌথ প্রয়াসের ফল। সৃজনশীল একক ব্যক্তির নির্জন সাধনা নয়, বহুজনের, বহুমতের সমন্বিত ফরমায়েসি প্রাইমার এল বাজারে। বাংলা পঠনপাঠনে এর কী সদর্থক ভূমিকা সেটা বিচারের অবকাশ অবশ্য এখানে নেই।
পূর্ববাংলা এবং অতঃপর স্বাধীন বাংলাদেশ তাঁদের মতো করে প্রাইমার রচনা করল, আর বাংলা ভাষার তৃতীয় ভুবন, অর্থাৎ আসামে পশ্চিমবঙ্গের মুখাপেক্ষী না থেকে শিক্ষাপর্ষদ নিজের হাতেই বাংলা পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নের দায়িত্ব নিলেন। আসামে প্রায় ১ কোটি ১০ লক্ষ বঙ্গভাষীর সন্তানসন্ততির শতকরা ৯৫ জনই প্রাথমিক তো বটেই উচ্চতর মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত বাংলা মাধ্যমে পড়ে, এখন সংখ্যাটা সামান্য কমতে পারে ইংরেজি মাধ্যমের দাপটে। অন্য বিষয় বাদ দিলেও বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের জন্য বছরে গোটা কুড়ি টেক্সট বইয়ের তো প্রয়োজন। আর বিষয়-ভিত্তিক পাঠ্য বইয়ের সংখ্যা শতাধিক (দ্রষ্টব্য, সুজিৎ চৌধুরী, ‘প্রসঙ্গ বাংলা বানান সংস্কার’ব , আকাদেমি পত্রিকা, ষষ্ঠ বর্ষ, ৬নং সংখ্যা, ২০১৬ বরাক উপত্যকা বঙ্গসাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলন, শিলচর)। এ সব বইতে অনিবার্য কারণে সংকলন, সম্পাদনা, তত্ত্বাবধান এবং অনুবাদ ও বানান প্রকরণে বিস্তর বিভ্রম থাকে, সরকারি এবং ফরময়েসি কাজে যা হওয়াটা অস্বাভাবিকও নয়। কিন্তু যা আমাদের বিস্মিতই করে তা হল অনূদিত প্রাইমারের সংস্থান। অনূদিত প্রাইমারের মতো একটি অবাস্তব ধারণা নিয়ে তৈরি শিশুপাঠ যে খুব একটা সুচিন্তিত কিছু নয় তা বলাই বাহুল্য। বর্তমান সময়ের প্রবণতা, মাতৃভাষা-বিহীনতার সূত্র অন্বেষণে এ তথ্য অতি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়টি প্রাতিষ্ঠানিক পাঠক্রমে এলে আদর্শ শিশুপাঠ বা প্রাইমার রচনার পদ্ধতি ও আদর্শ সম্পর্কে বৌদ্ধিক সচেতনতা জাগবে এবং আগামী দিনে সামাজিক ভাবে প্রাসঙ্গিক, শৈল্পিক দিকে সার্থক প্রাইমার রচিত হবে।