rotateআপনার মুঠোফোনটি ল্যান্ডস্কেপে রাখুন।
পাঠ্যপুস্তক ৪র্থ পত্র - দুই
বাংলা ভাষা ডিপ্লোমা পাঠক্রম
পাঠ্যপুস্তক
(চতুর্থ পত্র : অধ্যায়-দুই : কথাসাহিত্য)
দ্বিতীয় ষাণ্মাসিক - চতুর্থ পত্র
বাংলা সাহিত্যের পাঠকৃতি :
গদ্য ও পদ্য সংকলন
বাংলা সাহিত্যের পাঠকৃতি :
গদ্য ও পদ্য সংকলন
চতুর্থ পত্র   ❐   অধ্যায় -  দুই
কথাসাহিত্য : আখ্যান ও ছোটগল্প
কথাসাহিত্য : আখ্যান ও ছোটগল্প
প্রস্তাবনা ও উদ্দেশ্য

এখানে কথাকার বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়, সৈয়দ মুজতবা আলী এবং বনফুলের তিনটি রচনা সন্নিবেশিত হয়েছে। এতে আপনি -

  • বিভূতিভূষণের উপন্যাস ‘পথের পাঁচালী’র শিশু কিশোর সংস্করণ ‘আম আঁটির ভেঁপুর’ নির্বাচিত অংশে তৎকালীন গ্রামীণ পাঠশালা ও শিশুশিক্ষার একটি চিত্র পাবেন কে বিভূতিভূষণের শিশুকিশোর সাহিত্যের পরিচয় লাভ করার সঙ্গে সঙ্গে বাংলা সাহিত্যের ক একটি অনালোচিত দিক সম্পর্কেও অবহিত হবেন।
  • বাংলা সাহিত্যের তৃতীয় ভুবনের কথাকার মুজতবা আলীর গল্পটির মধ্যে ঔপনিবেশিক আমলে প্রাচীন টোল চতুষ্পাঠী-কেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার অবসানকালীন সময়ের করুণ চিত্রের সঙ্গে পরিচিত হবেন।
  • বনফুলের সংক্ষিপ্ত পরিসরের গল্পটির মধ্যে ছোটগল্পের শৈলী এবং আঙ্গিকের পরিচয় পাবেন। গল্পটির সামাজিক ইঙ্গিতগুলোও অনুধাবন করতে সক্ষম হবেন।
 (ক)   গুরুমশায়ের পাঠশালা :
 বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়
 ২.১   লেখক পরিচিতি
 ২.২   মূলপাঠ
 ২.৩   পাঠসূত্র
 ২.৪   বিশেষ পাঠ
       অনুশীলন
 (খ)   পাদটীকা :
 সৈয়দ মুজতবা আলী
 ২.১   লেখক পরিচিতি
 ২.২   মূলপাঠ
 ২.৩   পাঠসূত্র
 ২.৪   বিশেষ পাঠ
       অনুশীলন
 (গ)   নিমগাছ :
 বনফুল
 ২.১   লেখক পরিচিতি
 ২.২   মূলপাঠ
 ২.৩   পাঠসূত্র
 ২.৪   বিশেষ পাঠ
       অনুশীলন
(ক)গুরুমশায়ের পাঠশালা :
 বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়
 ২.১   লেখক পরিচিতি
 ২.২   মূলপাঠ
 ২.৩   পাঠসূত্র
 ২.৪   বিশেষ পাঠ
       অনুশীলন
(খ)পাদটীকা :
 সৈয়দ মুজতবা আলী
 ২.১   লেখক পরিচিতি
 ২.২   মূলপাঠ
 ২.৩   পাঠসূত্র
 ২.৪   বিশেষ পাঠ
       অনুশীলন
(গ)নিমগাছ :
 বনফুল
 ২.১   লেখক পরিচিতি
 ২.২   মূলপাঠ
 ২.৩   পাঠসূত্র
 ২.৪   বিশেষ পাঠ
       অনুশীলন
প্রস্তাবনা ও উদ্দেশ্য

এখানে কথাকার বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়, সৈয়দ মুজতবা আলী এবং বনফুলের তিনটি রচনা সন্নিবেশিত হয়েছে। এতে আপনি -

  • বিভূতিভূষণের উপন্যাস ‘পথের পাঁচালী’র শিশু কিশোর সংস্করণ ‘আম আঁটির ভেঁপুর’ নির্বাচিত অংশে তৎকালীন গ্রামীণ পাঠশালা ও শিশুশিক্ষার একটি চিত্র পাবেন। বিভূতিভূষণের শিশুকিশোর সাহিত্যের পরিচয় লাভ করার সঙ্গে সঙ্গে বাংলা সাহিত্যের একটি অনালোচিত দিক সম্পর্কেও অবহিত হবেন।
  • বাংলা সাহিত্যের তৃতীয় ভুবনের কথাকার মুজতবা আলীর গল্পটির মধ্যে ঔপনিবেশিক আমলে প্রাচীন টোল চতুষ্পাঠী-কেন্দ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার অবসানকালীন সময়ের করুণ চিত্রের সঙ্গে পরিচিত হবেন।
  • বনফুলের সংক্ষিপ্ত পরিসরের গল্পটির মধ্যে ছোটগল্পের শৈলী এবং আঙ্গিকের পরিচয় পাবেন। গল্পটির সামাজিক ইঙ্গিতগুলোও অনুধাবন করতে সক্ষম হবেন।

২.১   লেখক পরিচিতি

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৯৪ - ১৯৫০): জন্ম উত্তর চব্বিশ পরগনার সুরতিপুর অ পিতা মহানন্দ ছিলেন সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিত। অভাব অনটনের মধ্যেই কৃতিত্বের সঙ্গে বি.এ পাশ করে আইন পড়া অসমাপ্ত রেখেই শিক্ষকতায় ঢুকে পড়েন। গো-রক্ষণী সভার প্রচারক হিসেবে আসাম, ত্রিপুরা প্রভৃতি স্থানে ভ্রমণ শুরু হয়। এরপর বিহারের পূর্ণিয়া জেলায় এক জমিদারী চ এস্টেটের ম্যানেজার হিসেবে অরণ্যচারী জীবন। শৈশব থেকে অরণ্য, পল্লিপ্রকৃতির প্রতি ছিল নিবিড় টান। বিহারের ভাগলপুরে বসে বাংলার পল্লিজীবনের নিখুঁত ছিত্র অঙ্কন করা উপন্যাস ‘পথের পাঁচালী’ (১৯২৮) রচনা করেন। পরবর্তী একুশ বছরের সাহিত্য জীবনে ‘অপরাজিত’ ‘দৃষ্টিপ্রদীপ’, ‘আরণ্যক’, ‘ইছামতী’, ‘দেবযান’, ‘আদর্শ হিন্দু হোটেল’, ‘বিপিনের সংসার’ ‘অশনি সংকেত’ ইত্যাদি উপন্যাস রচনা করেন। তাছাড়াও কয়েকটি অসাধারণ কিশোর উপন্যাস ‘চাঁদের পাহাড়’, ‘মরণের ডংকা বাজে’, ‘হীরা মাণিক জ্বলে’ ছাড়াও তিনি ‘কিন্নর দল’, ‘মেঘমল্লার’ ‘মৌরীফুল’ প্রভৃতি গল্প লেখেন। পল্লিপ্রকৃতি এবং অরণ্য প্রকৃতির কথাকার এ লেখক বাংলার কঠিন সমাজবাস্তবতা, মন্বন্তরপীড়িত বাংলার পালাবদলের অন্তরঙ্গ কথাকারও। বিশ্ববিশ্রুত চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় তাঁর কালোজয়ী উপন্যাসটিকে রূপায়িত করার পর (১৯৫৬) বিভূতিভূষণ সারা বিশ্বে চর্চিত হতে থাকেন যে চর্চা অদ্যাবধি সচল। ১৯৫১ সাল তাঁকে ইছামতী উপন্যাসের জন্য মরনোত্তর রবীন্দ্রপুরস্কার প্রদান করা হয়।

২.২   মূলপাঠ
গুরুমশায়ের পাঠশালা
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

গ্রামের প্রসন্ন গুরুমহাশয় বাড়িতে একখানা মুদির দোকান করিতেন এবং দোকানেরই পাশে তাঁহার পাঠশালা ছিল। বেত ছাড়া পাঠশালায় শিক্ষাদানের উপকরণ-বাহুল্য ছিল না।

গ্রামের প্রসন্ন গুরুমহাশয় বাড়িতে একখানা মুদির দোকান করিতেন এবং দোকানেরই পাশে তাঁহার পাঠশালা ছিল। বেত ছাড়া পাঠশালায় শিক্ষাদানের উপকরণ-বাহুল্য ছিল না।

পৌষ মাসের দিন। অপু সকালে লেপ মুড়ি দিয়া রৌদ্র উঠিবার অপেক্ষায় বিছানায় শুইয়া ছিল, মা আসিয়া ডাকিল-- অপু ওঠ শিগগির করে; আজ তুমি যে পাঠশালায় পড়তে যাবে। কেমন সব বই আনা হবে তোমার জন্যে, শেলেট। হ্যাঁ ওঠ, মুখ ধুয়ে নাও, উনি তোমায় সঙ্গে করে নিয়ে পাঠশালায় দিয়ে আসবেন।

পৌষ মাসের দিন। অপু সকালে লেপ মুড়ি দিয়া রৌদ্র উঠিবার অপেক্ষায় বিছানায় শুইয়া ছিল, মা আসিয়া ডাকিল-- অপু ওঠ শিগগির করে; আজ তুমি যে পাঠশালায় পড়তে যাবে। কেমন সব বই আনা হবে তোমার জন্যে, শেলেট। হ্যাঁ ওঠ, মুখ ধুয়ে নাও, উনি তোমায় সঙ্গে করে নিয়ে পাঠশালায় দিয়ে আসবেন।

পাঠশালার নাম শুনিয়া অপু চোখ দুটি তুলিয়া অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে মা’র মুখের দিকে চাহিয়া রহিল। তাহার ধারণা ছিল যে, যাহারা দুষ্ট ছেলে, মা’র কথা শোনে না, ভাই-বোনদের সঙ্গে মারামারি করে, তাহাদেরই শুধু পাঠশালায় পাঠানো হইয়া থাকে। কিন্তু সে তো কোনোদিন ওরূপ করে না, তবে কেন পাঠশালায় যাইবে?

খানিক পরে সর্বজয়া পুনরায় আসিয়া বলিল- ওঠ অপু, মুখ ধুয়ে নাও, তোমায় অনেক করে মুড়ি বেঁধে দেবো এখন, পাঠশালায় বসে বসে খেও এখন, ওঠ লক্ষ্মী মানিক। মায়ের কথার উত্তরে সে অবিশ্বাসের সুরে বলিল- ইঃ !... পরে সে মায়ের দিকে চাহিয়া জিভ বাহির করিয়া চোখ বুজিয়া একপ্রকার মুখভঙ্গী করিয়া রহিল, উঠিবার কোনো লক্ষণ দেখাইল না।

কিন্তু অবশেষে বাবা আসিয়া পড়াতে অপুর বেশি জারিজুরি খাটিল না, যাইতে হইল। মা'র প্রতি অভিমানে তাহার চোখে জল আসিতেছিল। খাবার বাঁধিয়া দিবার সময় বলিল-- আমি কখনো আর বাড়ি আসচিনে দেখো।

- ষাট্-ষাট্ বাড়ি আসবিনে কি। ওকথা বলতে নেই ছিঃ- পরে তাহার চিবুকে হাত দিয়া চুমু খাইয়া বলিল- খুব বিদ্যে হোক, ভালো করে লেখাপড়া শিখো, তখন দেখবে তুমি কত বড় চাকরি করবে, কত টাকা হবে তোমার। কোনো ভয় নেই। ওগো, তুমি গুরুমশায়কে বলে দিও, ওকে কিছু না বলে।

পাঠশালায় পৌঁছাইয়া দিয়া হরিহর বলিল- ছুটির সময় আমি আবার এসে তোকে বাড়ি নিয়ে যাবো অপু। বসে-বসে লেখো, গুরুমশায়ের কথা শুনো, দুষ্টুমি করো না যেন। খানিকটা পরে পিছন ফিরিয়া অপু চাহিয়া দেখিল বাবা ক্রমে পথের বাঁকে অদৃশ্য হইয়া গেল।

অকূল সমুদ্র। সে অনেকক্ষণ মুখ নিচু করিয়া বসিয়া রহিল। পরে ভয়ে মুখ তুলিয়া চাহিয়া দেখিল গুরুমহাশয় দোকানের মাচায় বসিয়া দাঁড়িতে সৈন্ধব লবণ ওজন করিয়া কাহাকে দিতেছেন, কয়েকটি বড়ো-বড়ো ছেলে আপন-আপন চাটায়ে বসিয়া নানারূপ কুস্বর করিয়া কি পড়িতেছে ও ভয়ানক দুলিতেছে। তাহার অপেক্ষা আর একটু ছোটো একটি ছেলে দেয়ালে ঠেস্ দিয়া আপন মনে পাততাড়ির তালপাতা মুখে পুরিয়া চিবাইতেছে। আর একটি বড়ো ছেলে, তাহার গালে একটা বড়ো আঁচিল, সে দোকানের মাচার নিচে চাহিয়া কি লক্ষ করিতেছে। তাহার সামনে দু’জন ছেলে বসিয়া শ্লেটে একটা ঘর আঁকিয়া কি করিতেছিল। একজন চুপি বৃদ্ধি বলিতেছিল, আমি এই ঢ্যারা দিলাম; অন্য ছেলেটি বলিতেছিল, এই আমার গোল্লা - সঙ্গে-সঙ্গে তাহার শ্লেটে আঁক পাড়িতেছিল ও মাঝে-মাঝে আড়চোখে বিক্রয়রত গুরুমহাশয়ের দিবে চাহিয়া দেখিতেছিল।

অপু নিজের শ্লেটে বড়ো-বড়ো করিয়া বানান লিখিতে লাগিল। কতক্ষণ পরে ঠিক জান যায় না, গুরুমহাশয় হঠাৎ বলিলেন- এই ফণে, শেলেটে ওসব কি হচ্ছে রে?... সম্মুখের সেই ছেলে দু’টি অমনি শ্লেটখানা চাপা দিয়া ফেলিল; কিন্তু গুরুমহাশয়ের শ্যানদৃষ্টি এড়ানো বড়ে শক্ত। তিনি বলিলেন, এই সতে, ফণের শেলেটটা নিয়ে আয় তো। তাঁহার মুখের কথা শো হইতে না হইতে বড়ো আঁচিলওয়ালা ছেলেটা ছোঁ মারিয়া শ্লেটখানা উঠাইয়া লইয়া গিয় দোকানের মাচার উপর হাজির করিল।

- হুঁ, এসব কি খেলা হচ্ছে শেলেটে? সতে, ধরে নিয়ে আয় তো দু'জনকে। কানে ধরে নিয়ে আয়।

যেভাবে বড়ো ছেলেটা ছোঁ মারিয়া শ্লেট লইয়া গেল, এবং যেভাবে বিপন্নমুখে সামনের ছেলে দু’টি পায়ে-পায়ে শুরুমহাশয়ের কাছে যাইতেছিল, তাহাতে হঠাৎ অপুর বড়ো হাসি পাইল; সে ফিক করিয়া হাসিয়া ফেলিল। পরে খানিকটা হাসি চাপিয়া রাখিয়া আবার ফিক-ফিক করিয়া হাসিয়া উঠিল। গুরুমহাশয় বলিলেন- হাসে কে রে? হাসচো কেন খোকা, এটা বি নাট্যশালা? অ্যাঁ? এটা নাট্যশালা নাকি?

নাট্যশালা কি অপু তাহা বুঝিতে পারিল না, কিন্তু ভয়ে তাহার মুখ শুকাইয়া গেল।

- সতে, একখানা থান ইট নিয়ে এসো তো তেঁতুলতলা থেকে, বেশ বড়ো বড়ো দেখে। অপু ভয়ে আড়ষ্ট হইয়া উঠিল, তাহার গলা পর্যন্ত কাঠ হইয়া গেল। কিন্তু ইট আনা হইলে সে দেখিল, ইটের ব্যবস্থা তাহার জন্যে নহে, ঐ ছেলে দু'টির জন্য। বয়স অল্প বলিয়া হউক বা নতুন ভর্তি ছাত্র বলিয়াই হউক, গুরুমহাশয় সে যাত্রা তাহাকে রেহাই দিলেন।

গুরুমহাশয় একটা খুঁটি হেলান দিয়া একখানা তালপাতার চাটাই-এর উপর বসিয়া থাকেন। মাথার তেলে বাঁশের খুঁটির হেলান দেওয়ার অংশটা পাকিয়া গিয়াছে। বিকাল বেলা প্রায়ই গ্রামের দীনু পালিত কি রাজু রায় তাঁহার সহিত গল্প করিতে আসেন। পড়াশুনার চেয়ে এই গর শোনা অপুর অনেক বেশি ভালো লাগিত। রাজু রায় মহাশয় প্রথমে কি করিয়া আষাড়ুর হাটে তামাকের দোকান খুলিয়াছিলেন সে গল্প করিতেন। অপু অবাক হইয়া শুনিত। বেশ কেমন নিজের ছোট্ট দোকানের ঝাঁপ তুলিয়া বসিয়া-বসিয়া দা দিয়া তামাক কাটা, তারপর রাত্রে নদীতে যাওয়া, ছোট্ট হাঁড়িতে মাছের ঝোল ভাত রাঁধিয়া খাওয়া, কি সুন্দর। বড়ো হইলে সে তামাকের দোকান করিবে।

এই গল্পগুজব এক-একদিন আবার ভাব ও কল্পনার সর্বোচ্চ স্তরে উঠিত গ্রামের ও-পাড়ার রাজকৃষ্ণ সান্ন্যাল মহাশয় যেদিন আসিতেন। যে কোনো গল্প হউক, যত সামান্যই হউক না কেন, সেটি সাজাইয়া বলিবার ক্ষমতা তাঁহার ছিল অসাধারণ। সান্ন্যাল মহাশয় দেশ-ভ্রমণ-বাতিকগ্রস্ত ছিলেন। কোথায় দ্বারকা, কোথায় সাবিত্রী পাহাড়, কোথায় চন্দ্রনাথ। তাহা আবার একা দেখিয়া তাঁহার তৃপ্তি হইত না, প্রতিবারই স্ত্রীপুত্র লইয়া যাইতেন এবং খরচপত্র করিয়া সর্বস্বান্ত হইয়া ফিরিতেন। দিব্য আরামে নিজের চণ্ডীমণ্ডপে বসিয়া থেলো হুঁকা টানিতেছেন; মনে হইতেছে সান্ন্যাল মহাশয়ের মতন নিতান্ত ঘরোয়া, সেকেলে পাড়াগাঁয়ের প্রচুর অবসরপ্রাপ্ত গৃহস্থ বেশি আর বুঝি নাই, পৈতৃক চন্ডীপণ্ডপে শিকড় গাড়িয়া বসিয়াছেন। হঠাৎ একদিন দেখা গেল সদর দরজায় তালাবন্ধ, বাড়িতে জনপ্রাণীর সাড়া নাই। ব্যাপার কী? সান্ন্যাল মহাশয় সপরিবারে বিন্ধ্যাচল না চন্দ্রনাথ-ভ্রমণে গিয়াছেন। অনেক দিন আর দেখা নাই, হঠাৎ একদিন দুপুর বেলা ঠুকঠাক্ শব্দে লোকে সবিস্ময়ে চাহিয়া দেখিল, দুই গোরুর গাড়ি বোঝাই হইয়া সান্ন্যাল মহাশয় সপরিবারে বিদেশ হইতে প্রত্যাগমন করিয়াছেন ও লোকজন ডাকাইয়া হাঁটু সমান উঁচু জলবিছুটি ও অর্জুন গাছের জঙ্গল কাটিতে-কাটিতে বাড়ি ঢুকিতেছেন।

একটা মোটা লাঠি হাতে তিনি লম্বা-লম্বা পা ফেলিয়া পাঠশালায় আসিয়া উপস্থিত হইতেন- এই যে প্রসন্ন, কি রকম আছো, বেশ জাল পেতে বসেচো যে। ক'টা মাছ পড়লো?

নামতা-মুখস্থ-রত অপুর মুখ অমনি অসীম আহ্লাদে উজ্জ্বল হইয়া উঠিত। সান্ন্যাল মহাশয় যেখানে তালপাতার চাটাই টানিয়া বসিয়াছেন, সেখানে হাতখানেক জমি উৎসাহে সে আগাইয়া বসিত। শ্লেট বই মুড়িয়া একপাশে রাখিয়া দিত- যেন আজ ছুটি হইয়া গিয়াছে, আর পড়াশুনার দরকার নাই; সঙ্গে-সঙ্গে তাহার ডাগর ও উৎসুক চোখ দুটি গল্পের প্রত্যেক কথা যেন দুর্ভিক্ষের ক্ষুধার আগ্রহে গিলিত।

এক-একদিন রেলভ্রমণের গল্প উঠিত। কোথায় সাবিত্রী পাহাড় আছে, তাহাতে উঠিতে তাঁহার স্ত্রীর কি রকম কষ্ট হইয়াছিল, নাভিগয়ায় পিণ্ড দিতে গিয়া পাণ্ডার সঙ্গে হাতাহাতি হইবার উপক্রম। কোথাকার এক জায়গায় একটা খুব ভালো খাবার পাওয়া যায়, সান্ন্যাল মহাশয় নাম বলিলেন- প্যাঁড়া। নামটা শুনিয়া অপুর ভারি হাসি পাইয়াছিল- বড়ো হইলে সে ‘প্যাঁড়া’ কিনিয়া খাইবে। কোন দেশে সান্ন্যাল মহাশয় একজন ফকিরকে দেখিয়াছিলেন, সে এক অশ্বত্থতলায় থাকিত। এক ছিলিম গাঁজা পাইলে সে খুশি হইয়া বলিত- আচ্ছা, কোন ফল তোমরা খাইতে চাও বল। পরে ইপ্সিত ফলের নাম করিলে সে সম্মুখের কোনো একটা গাছ দেখাইয়া বলিত- যাও, ওখান হইতে লইয়া আইস। লোকে গিয়া দেখিত হয়তো আমগাছে বেদানা ফলিয়া আছে, কিংবা পেয়ারা গাছে কলার কাঁদি ঝুলিয়া আছে। রাজু রায় বলিতেন- ও সব মস্তর-তন্তরের খেলা আর কি? সেবার আমার এক মামা-

দীনু পালিত কথা চাপা দিয়া বলিতেন- মন্তরের কথা যখন ওঠালে, তখন একটা গল্প বলি শোনো। গল্প নয়, আমার স্বচক্ষে দেখা। বেলডাঙ্গার বুধো গাড়োয়ানকে তোমরা দেখেচো কেউ? একশো বছর বয়সে মারা যায়, মারাও গিয়াছে আজ পঁচিশ বছরের ওপর। জোয়ান শি বয়সেও আমরা তার সঙ্গে হাতের কব্জির জোরে পেরে উঠতাম না।

একবার- অনেক কালো দে কথা- আমার তখন সবে হয়েছে উনিশ-কুড়ি বয়েস, চান্দা থেকে গঙ্গাচান করে গোরুর গাড়ি। করে ফিরছি। বুধো গাড়োয়ানের গাড়ি- গাড়িতে আমি, আমার খুড়ীমা, আর অনন্ত মুখুয্যের ভাইপো রাম, যে আজকাল উঠে গিয়ে খুলনায় বাস করছে। কানসোনার মাঠের কাছে প্রা বেলা গেল, তখন ওসব দিকে কি রকম ভয়ভীত ছিল, তা রাজকেষ্ট ভায়া জানো নিশ্চয়। এরে মাঠের রাস্তা, সঙ্গে কিছু টাকাকড়িও আছে- বড্ড ভাবনা হল। আজকাল যেখানে নতুন খানা বসেছে- ওই বরাবর এসে হল কি জানো? জন চারেক যণ্ডামাক্কো গোছের মিল্কালে লোক এসে গাড়ির পেছন দিকে বাঁশ দু'দিক থেকে ধল্পে। এদিকে দু'জন, ওদিকে দু'জন। দেখে তো মশাই আমাদের মুখে রা-টা নেই, কোনো রকমে গাড়ির মধ্যে বসে আছি; এদিকে তারাও পা খা বন কে অ গাড়ির বাঁশ ধরে সঙ্গেই আসচে, সঙ্গেই আসচে, সঙ্গেই আসচে। বুধো গাড়োয়ান দেখি পিট-পিঃ না করে পেছন দিকে চাইচে। ইশারা করে আমাদের কথা বলতে বারণ করে দিলে। তারাও বেশ বলি এগিয়ে যাচ্ছে। এদিকে গাড়ি একেবারে নবাবগঞ্জ থানার কাছাকাছি এসে পড়ল, বাজার দেখা যাচ্ছে; তখন সেই লোক ক'জন বললে- ওস্তাদজী, আমাদের ঘাট হয়েছে, আমরা বুঝতে মুখ পারিনি, ছেড়ে দাও। বুধো গাড়োয়ান বললে- সে হবে না ব্যাটারা; আজ সব থানায় নিয়ে গিয়ে বাঁধিয়ে দেব। অনেক কাকুতি-মিনতির পর বুধো বললে- আচ্ছা, যা ছেড়ে দিলাম এবার কল কিন্তু কক্ষনো এরকম আর করিনি। তারা বুধো গাড়োয়ানের পায়ের ধুলো নিয়ে চলে গেল। ধ্ব আমার স্বচক্ষে দেখা। মন্তরের চোটে ওই যে ওরা বাঁশ এসে ধরেছে, অমনি ধরেই রয়েছে আর কল ছাড়াবার সাধ্যি নেই- চলেছে গাড়ির সঙ্গে, একেবারে পেরেক আটা হয়ে গিয়েছে। তা বুঝলে দেন বাপু? মন্তর-অন্তরের কথা....

গল্প বলিতে-বলিতে বেলা যাইত পাঠশালার চারিপাশের বন-জঙ্গলে অপরাহ্নের রাঙা কে রৌদ্র বাঁকাভাবে আসিয়া পড়িত। কাঁঠাল গাছের, জগজুমুরগাছের ডালে ঝোলা গুলঞ্চ লতার গায়ে টুনটুনি পাখি মুখ উঁচু করিয়া দোল খাইত। পাঠশালা ঘরে বনের লতাপাতার গন্ধের সঙ্গে তালপাতার চাটাই, ছেড়াখোঁড়া বই-দপ্তর, পাঠশালার মাটির মেজে, ও কড়া দা-কাটা তামাকের প্রতে ধোঁয়া- সবসুদ্ধ মিলিয়া এক জটিল গন্ধের সৃষ্টি করিত।

সেই গ্রামের ছায়া ভরা মাটির পথে একটি মুগ্ধ গ্রাম্য বালকের ছবি আছে। বই দপ্তর বগলে লইয়া সে তাহার দিদির পিছনে পিছনে সাজি মাটি দিয়া কাচা, সেলাই-করা কাপর । পরিয়া পাঠশালা হইতে ফিরিতেছে। তাহার ছোট্ট মাথাটির অমন রেশমের মতো নরম, চিকন সুখস্পর্শ চুলগুলি তাহার মা যত্ন করিয়া আঁচড়াইয়া দিয়াছে; তাহার ডাগর-ডাগর সুন্দর গে পুঁটিতে কেমন যেন অবাক ধরনের চাহনি- যেন তাহারা এ কোন অদ্ভুত জগতে নতুন দেখ মেলিয়া চাহিয়া দিশাহারা হইয়া উঠিয়াছে। গাছপালায় ঘেরা এইটুকুই কেবল তার পরিচিত দেশ- এখানেই মা রোজ হাতে করিয়া খাওয়ায়, চুল আঁচড়াইয়া দেয়, দিদি কাপড় পরাইয়া দেয়। এই গণ্ডীটুকু ছাড়াইলেই তাহার চারিধার ঘিরিয়া অপরিচয়ের অকূল জলধি- তাহার শিশুমন থৈ পায় না!

ওই যে বাগানের ওদিকে বাঁশবন, ওর পাশ কাটিয়া সে সরু পথটা ওধারে কোথায় চলিয়া গেল, তুমি বরাবর সোজা যদি ওপথটা বাহিয়া চলিয়া যাও, তবে শাঁখারি পুকুরের পাড়ের মধ্যে অজানা গুপ্তধনের দেশে পড়িবে। বড়ো গাছের তলায় সেখানে বৃষ্টির জলে মাটি খসিয়া পড়িয়াছে, কত মোহর-ভরা, হাঁড়ি-কলসীর কানা বাহির হইয়া আছে, অন্ধকার বন-ঝোপের নিচে, কচু ওল বন-কলমীর চকচকে সবুজ পাতার আড়ালে চাপা- কেউ জানে না কোথায়!

একদিন পাঠশালায় এমন একটি ঘটনা ঘটিয়াছিল যাহা তাহার জীবনের একটি নতুন অভিজ্ঞতা। সেদিন বৈকালে পাঠশালায় অন্য কেহ উপস্থিত না থাকায় কোনো গল্পগুজব হইল না, পড়াশুনা হইতেছিল। সে গিয়া বসিয়া পড়িতেছিল 'শিশুবোধক'। এমন সময় গুরুমহাশয় বলিলেন- দেখি, শেলেট নাও শ্রুতিলিখন লেখ।

মুখে-মুখে বলিয়া গেলেও অপু বুঝিয়াছিল, গুরুমহাশয় নিজের কথা বলিতেছেন না- মুখস্থ বলিতেছেন, সে যেমন দাশুরায়ের পাঁচালী হইতে ছাড়া মুখস্থ বলে তেমনি।

শুনিতে-শুনিতে তাহার মনে হইল অনেকগুলো অমন সুন্দর কথা একসঙ্গে পর-পর সে কখনো শোনে নাই। সকল কথার অর্থ সে বুঝিতেছিল না; কিন্তু অজানা শব্দ ও ললিত পদের ধ্বনি, ঝঙ্কার-জড়ানো এই অপরিচিত শব্দ-সংগীত অনভ্যস্ত শিশুকর্ণে অপূর্ব ঠেকিল এবং সব কথার অর্থ না বোঝার দরুনই কুহেলি-ঘেরা অস্পষ্ট শব্দ-সমষ্টির পিছন হইতে একটা অপূর্ব দেশের ছবি বার-বার উঁকি মারিতে লাগিল।

বড়ো হইয়া স্কুলে পড়িবার সময় সে বাহির করিয়াছিল ছেলেবেলাকার এই মুখস্থ শ্রুতিলিখন কোথায় আছে-

'এই সেই জনস্থান-মধ্যবর্তী প্রস্রবণ-গিরি। ইহার শিখরদেশ আকাশপথে সতত-সমীর-সঞ্চরমান-জলধর-পটল-সংযোগে নিরন্তর নিবিড় নীলিমায় অলঙ্কৃত। অধিত্যকা প্রদেশ ঘনসন্নিবিষ্ট বন-পাদপসমূহে সমাচ্ছন্ন থাকাতে স্নিগ্ধ, শীতল ও রমণীয়.... পাদদেশে প্রসন্নসলিলা গোদাবরী তরঙ্গ বিস্তার করিয়া...' ইত্যাদি।

সে ঠিক বলিতে পারে না, বুঝাইতে পারে না, কিন্তু সে জানে- তাহার মনে হয়, অনেক সময়েই মনে হয়, অনেক সময়েই মনে হয়। সেই যে বছর দুই আগে কুঠির মাঠে সরস্বতী পূজার দিন নীলকণ্ঠ পাখি দেখিতে গিয়াছিল, সেদিন মাঠের ধার বাহিয়া একটা পথকে দূরে কোথায় যাইতে দেখিয়াছিল সে। পথটার দুধারে যে কত কি অচেনা পাখি, অচেনা গাছপালা, অচেনা বনঝোপ- অনেকক্ষণ সেদিন সে পথটার দিকে একদৃষ্টে চাহিয়াছিল। মাঠের ওদিকে পথটা কোথায় যে চলিয়া গিয়াছে তাহা ভাবিয়া সে কূল পায় নাই।

তাহার বাবা বলিয়াছিল- ও সোনাডাঙা মাঠের রাস্তা, মাধবপুর দশঘরা হয়ে সেই ধলচিজে খেয়াঘাটে গিয়ে মিশেচে। ধলচিতের খেয়াঘাটে নয়, সে জানিত ও পথটা আরও অনেক দূরে গিয়াছে- রামায়ণ, মহাভারতের দেশে। সেই অশ্বত্থ গাছের সকলের উঁচু ডালটার দিকে চাহিয়া থাকিলে তাহার কথা মনে উঠে- সেই বহুদূরের দেশটা।

শ্রুতিলিখন শুনিতে-শুনিতে সেই দুই বছর আগে দেখা পথটার কথাই তাহার মনে হইয়া গেল।

ওই পথের ওধারে- অনেক দূরে- কোথায় সেই জনস্থান-মধ্যবর্তী প্রস্রবণ-গিরি বনঝোপের স্নিগ্ধ গন্ধে না-জানার ছায়া নামিয়া আসা ঝিকিমিকি সন্ধ্যায়, সেই স্বপ্নলোকের ছলি তাহাকে অবাক করিয়া দিল। কত দূরে সেই প্রস্রবণ-গিরির উন্নত শিখর, আকাশপে সতত-সঞ্চারমান মেঘমালায় যাহার প্রশান্ত, নীল সৌন্দর্য সর্বদা আবৃত থাকে....

সে বড়ো হইলে যাইয়া দেখিবে।


'আম আঁটির ভেঁপু', বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, কিশোর রচনা সমগ্র
(সম্পা. অশোক কুমার মিত্র), আষাঢ় ১৪১৮, কলকাতা (বানান অপরিবর্তিত)

২.৩   পাঠসূত্র

মূল উপন্যাস 'পথের পাঁচালী'র কিশোর সংস্করণে নিশ্চিন্দিপুর গ্রামের প্রকৃতির পরিবেশে হরিহরের সন্তান দুর্গা- অপুর শৈশব চিত্রিত হয়েছে উপন্যাসের প্রথম পর্বে। ভবঘুরে হরিহর সর্বজয়ার কাছে দুটো সন্তানকে রেখে ভাগ্যান্বেষণে ঘুরে বেড়ায়। সর্বজয়া ঘরের সামান্য সম্প ঘটিবাটি, কাপড়চোপড় বন্ধক দিয়ে, বিক্রী করে, ধানদেনা করে, বাড়ির আশেপাশে জঙ্গে ফুটে ওঠা শাকসব্জি- এর বাগানের কচুটা, ওর বাগানের কুমড়ো, আর সামান্য কিছু চালভা দিয়ে অতিকষ্টে দুটো সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখার যুদ্ধ চালিয়ে যায়। শিশুদুটো প্রকৃতির কোলে মুক্ত বিহঙ্গের মতো দিনমান ঘুরে বেড়ায়। প্রতিবেশি শিশুদের সঙ্গে খেলাধূলা, বন্ধু আমকুড়ানো, বনের ফল অন্বেষণ, মাকে লুকিয়ে ছড়া কেটে বৃষ্টিতে ভেজা, শিবের পূজা দেওন অতিবৃদ্ধা স্নেহপরায়ণা ইন্দিরপিসির কাছে গল্পশোনা, বাঁশবনে চড়ুইভাতি এসব নিয়ে নিস্তর গ্রামজীবনে শিশুদের কাঙালপনা, বড়োদের তুচ্ছ কারণে রেগে ওঠা, পল্লিজীবনের ক্ষুদ্র এবং উষ্ণ সাহচর্য সবকিছু নিয়ে এ গ্রামবাংলার পাঁচালী। নাগরিক জীবনের সমস্ত কোলাহ থেকে অনেক দূরে প্রকৃতির অশেষ কৃপায় ঝড়জল, বন্যা, অন্ধকার, ম্যালেরিয়া, কুসংস্কা বিশালাক্ষী মন্দির শূন্য করে দেবীর গ্রাম ত্যাগের গুজবে সৃষ্ট ভীতি, বিপদে আপদে সর্বরে বিশারদ কবিরাজ নির্ভর করে চলমান অনাদি ভারতবর্ষের এ কথকতা। এখানে সম্পন্ন পরিবা কদাচিৎ অন্নপ্রাসন, বিয়ে হলে গ্রামবাসীরা পেটপুরে ভোজ খায়, শরতের প্রকৃতিতে আগমনী সুর শুনে সবাই সুখদুঃখ ভুলে আনন্দে মগ্ন হয়, যাত্রাগানের আসর বসলে গ্রামসুদ্ধ মুখে গানের প্রসঙ্গ, গাজনের সন্ন্যাসীদের পেছনে শিশুদের ঘুরে বেড়ানো। সন্ধ্যাবেলা তুলসীতলায় প্রদীপ দিয়ে আঁচল গলায় অসহায় মার শিশুদের জন্য করুণ প্রার্থনা, 'দোহাই ঠাকুর ওদের তুমি বাঁচিয়ে বর্তিয়ে রেখো ঠাকুর। ওদের তুমি মঙ্গল করো তুমি ওদের মুখের দিকে চেও, দোহাই ঠাকুর।'

এ আধমরা পৃথিবী থেকে মুক্তির কামনায় সর্বজয়া-হরিহরের সিদ্ধান্ত, শিশুপুত্রটিকে গ্রামের পাঠশালার প্রসন্ন গুরুমহাশয়ের কাছে পাঠানো। এরকম একটি চিত্র রয়েছে সত্যন্দ্রনাথ দত্তর কবিতায়, 'পাল্কীর গান'- 'পাঠশালাটি দোকানঘরে গুরুমশাই দোকান করে, পোড়ো ভিটের পোতার পরে শালিখ নাচে ছাগল চরে'। গুরুমশাই ছাত্রদের পড়ানো, শাসন, শাস্তি প্রদানের ফাঁকে ফাঁকে খদ্দের সামলানোর কাজটাও করে নিচ্ছেন। এরই মাঝে গ্রামের মাতব্বররা গুরুমশায়ের সঙ্গে গল্পগুজব করতে এসে তালপাতার চাটাইতে বসে পড়ছেন। স্লেটে লেখালেখি এবং গুরুমশায়ের দেওয়া পাঠ গভীর মনোযোগের সঙ্গে অধ্যয়নের ফাঁকে ফাঁকে বৃদ্ধদের বিচিত্র অভিজ্ঞতার কাহিনী শুনে অপুর কল্পনার ডানা বিস্তার লাভ করে সুদূর আকাশে, সে স্থির করে ফেলে বড়ো হলে একটা তামাকের দোকানই করবে। আবার কখনও ভাবে রেল ভ্রমণে গিয়ে প্যাঁড়া কিনে খাবে। তামাকের কড়া ধোঁয়ার গন্ধে, চারিদিকের বনে থেকে আসা লতাপাতার গন্ধে ভরা এ আশ্চর্য পরিবেশে অপুর কাছে সমস্তকিছুই কেমন রহস্যময় মনে হয়। এই আমবন, বাঁশবন, গুলঞ্চলতা, টাটকা ভিজে মাটির গন্ধের পথ ধরে যেন এক অজানা রহস্যলোকে যাবার নিশানা পাওয়া যাবে। তাঁর মনের ভেতরে এক ভাবুকসত্তা জেগে উঠতে থাকে ওই গ্রামবাংলার অকিঞ্চিৎকর পরিবেশেই। এই ব্রাত্য বিদ্যালয়ে গুরুমশায়ের কাছে শ্রুতিলিখনের বয়ান শুনতে শুনতে নিশ্চিন্দিপুরের অপুর বিশ্বনাগরিক হয়ে ওঠার প্রাথমিক প্রস্তুতিটি সম্পূর্ণ হয়ে যায়, এটা সেদিন কারও বোঝার কথাও নয়। বৃহৎ পরিসরের এ উপন্যাসের খণ্ডিত অংশে রবীন্দ্র-পরবর্তী কথাসাহিত্যের একটি বিশেষ চরিত্রলক্ষণ খুব স্পষ্টভাবেই প্রকাশিত।

২.৪   বিশেষ পাঠ

বিভূতিভূষণের প্রকাশ মাধ্যম ছিল কথাসাহিত্য, কিন্তু তাঁর প্রাণের গভীরে এক চিরকালীন কবির বাস। তিনি আসলে এক প্রকৃতির কবি। 'স্মৃতির রেখা'য় 'আরণ্যক' উপন্যাসের প্রস্তুতি হিসেবে তিনি বলেন- 'এই জঙ্গলের জীবন নিয়ে একটা কিছু লিখব- একটা কঠিন শৌর্যপূর্ণ, গতিশীল, ব্রাত্য জীবনের ছবি। এই বন, নির্জনতা, ঘোড়ায় চড়া, পথ হারানো অন্ধকার- এই নির্জনে জঙ্গলের মধ্যে খুপড়ি বেঁধে থাকা। মাঝে মাঝে, যেমন আজ গভীর বনের নির্জনতা ভেদ করে যে শুড়ি পথটা ভিটে টোলার বাথানের দিকে চলে গিয়েছে...'। এ যেন এক প্রকৃতিপ্রেমিক কবির স্বীকারোক্তি। বাংলা থেকে বহুদূরে বিহারের পূর্ণিয়া জেলার রুক্ষ, কঠিন বনের ভেতর সুন্দর আর ভয়ানক প্রকৃতির মানুষজন, নিসর্গ বন্যপ্রাণীর কাছাকাছি বসবাসের অভিজ্ঞতা, অরণ্যে ফোটা ফুলের সম্ভার, মনুষ্যদৃষ্টির বাইরে বনভূমি ছেয়ে ফেলা জ্যেৎস্নার শোভা, প্রখর রৌদ্রের দিনে দাবনলের লেলিহান শিখা, অভাব অনটনের মাঝেও হঠাৎ ফাগুয়ার রঙে মন রাঙানো আদিবাসীদের হোলির মত্ততা, দিগন্তলীন মহাখালিরূপের পাহাড়, মোহনপুরা অরণ্যানির সঙ্গে মিশে থাকা আদিম বনদেবতার মুখ প্রত্যক্ষ করা এ কথাকার প্রকৃতির পূজারি। বাংলা থেকে বহুদূরে, একেবারে ভিন্ন প্রেক্ষাপটে, ভিন্ন নিসর্গে বাসকালীন বিভূতিভূষণ রচনা করলেন 'পথের পাঁচালী' (১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে, ভাগলপুরে), বাংলার অন্যতম poetic fic- tion in prose। ভাগলপুর জেলার ইসলামপুর বনকাছারির কক্ষে বসে তিনি মানসপটে এনেছেন ইছামতীর তীরের গ্রামের ছবি, বাংলার 'নদী, নীলকুঠি, ধনচিতে খেয়া, মাধবপুরের উলুখড়ের মাঠ, চড়কতলা মেলা, সলতে-খাগি আমগাছ, সইমাদের বকুল গাছ, মায়ের নিজের হাতে লাগানো সজনে গাছ, এমনকি উনুন-ঢাকা-দেওয়া মায়ের কড়াইখানা পর্যন্ত'। 'গ্রাম বাংলার সোঁদা মাটির গন্ধ, দিগন্ত বিস্তৃত প্রকৃতি, ঋতুবদলের রঙ-বাহার আর নানা চরিত্রের জীবন্ত ছবি' (অশোককুমার মিত্র, ভূমিকা, বিভূতিভূষণের কিশোর রচনা সমগ্র) নিয়ে তাঁর মহাকাব্যোপম উপন্যাস। এই বাংলার প্রকৃতি কাহিনীর প্রায় প্রতিটি ছত্রে উঁকিঝুকি মারছে, তা সে প্রেক্ষাপট বাংলা থেকে দূরেই হোক কিংবা নাগরিক বা আধা নাগরিক জীবনেই হোক্, কিংবা হোক না সুদূর আফ্রিকা বা পশ্চিম এশিয়ার কোনও দেশেই।

কিশোর সংস্করণ 'আম আঁটির ভেঁপু'কে 'পথের পাঁচালী'র যমজ সংস্করণ বলেই উল্লেখ করেছেন অশোককুমার মিত্র। মূল গ্রন্থটির কোন অঙ্গহানি না করে শিশুকিশোরদের জন্য পুনর্লিখিত এ বই বাংলা সাহিত্যে বিরল। ইংরেজিতে বা ইউরোপীয় ক্লাসিক গ্রন্থগুলোর শিশু কিশোরদের জন্য একাধিক সংস্করণ রয়েছে, কিন্তু আমাদের দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গ্রন্থগুলোর রসাস্বাদন থেকে শিশুকিশোরদের বঞ্চিত করেই রাখা হয়েছে। মহাকবি শেক্সপিয়ারের নাটকগুলোকে শিশু কিশোর ছাড়াও সাধারণ পাঠকের কাছেও পৌঁছে দিতে চার্লস ল্যাম্ব, ম্যারি ল্যাম্বের প্রয়াস সর্বকালে বন্দিত। ১৯৪৬ সালে সিগনেট প্রেস প্রকাশিত এ সংস্করণটি এ ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক। এ বইটির অলঙ্করণ করতেই সত্যজিৎ রায়ের মনে এ 'পথের পাঁচালী' নিয়ে সিনেমা তৈরি করার পরিকল্পনাটি আসে এবং ভারতীয় সিনেমা জগতে সূচিত হয় একটি নতুন অধ্যায় (১৯৫৬)। এর পরবর্তী দিনগুলোতে বিভূতিভূষণ শিশুকিশোরদের জন্য লিখতে শুরু করলেন সম্পাদক, প্রকাশকদের অনুরোধেও। বাংলার পাঠকরা পেলেন 'চাঁদের পাহাড়' ইত্যাদি, এবং কয়েকটি অসাধারণ ছোটগল্প যেখানে উদ্দিষ্ট পাঠকরা শিশুকিশোর না হলেও শিশুদের জগৎটিই উঠে এল গল্পের ভেতর, যেমন 'তালনবমী', 'কিন্নর দল' ইত্যাদি। পথের পাঁচালীর মুখ্য চরিত্র তো নিশ্চিন্দিপুরের শিশু অপু, এবং উপন্যাসের সমস্ত ঘটনাবলী ওই শিশুর চোখ দিয়েই দেখা। বড়দের জগৎটি প্রেক্ষাপটে থাকলেও শিশু অপুর অভিজ্ঞতা, দিদি দুর্গার সঙ্গে প্রকৃতির কোলে বড়ো হয়ে ওঠা, গ্রামজীবনের ছোটছোট সুখদুঃখ, প্রকৃতির সংস্পর্শজনিত জীবনের উচ্ছ্বাস, কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া এবং ক্রমে জীবনের অভিজ্ঞতায় এগিয়ে যাওয়া, মরে যাওয়া পিঠোপিঠি দিদিটির স্মৃতিচিহ্নটি নিঃশেষ করে দিয়ে গরুর গাড়িতে চড়ে রেলস্টেশন, এবং রেল চড়ে আরও অনিশ্চিত জীবনের দিকে যাত্রা নিয়ে এ আখ্যানটি যে কেবল শিশুদের কথাই নয়, শিশুদের জন্যেই বলা কথা- এ সংস্করণের উদ্যোগে যেন এটা স্পষ্ট হল। সেকালে বাংলার মেলা থেকে একপয়সা মূল্যের টিনের ভেঁপু বাঁশি কিনে শিশুদের হাতে তুলে দেবার সামর্থ্যও সবার ছিল না। আম খেয়ে মাটিতে ফেলে দেওয়া আটিতে অঙ্কুরোশমের প্রাক্ মুহূর্তে শিশুরা এতেই খুঁজে পেত ভেঁপুর সুরের উৎস, আর ফুঁ দিয়ে এ থেকে বের করত অনাবিল আনন্দ। প্রকৃতির মধ্যেই এ আনন্দের উপাদানের সন্ধানে দীর্ঘযুগ শিশুরা থাকত তৃপ্ত। কাহিনীটির নামকরণে ওই প্রতীকী তাৎপর্য স্পষ্ট।

বর্তমান পাঠের নির্বাচিত অংশে প্রকৃতির কোলের সেই শিশু, তাঁর দারিদ্রপীড়িত মা-বাবা, মুদিখানায় মধ্যেই পাঠশালা খুলে বসা গুরুমশায়, আড্ডা জমাতে আসা বৃদ্ধের দল, পাঠে অমনোযোগী পড়ুয়ার দল, সওদা করতে আসা খব্দের, এদের নিয়ে এ এক বিচিত্র জগৎ, আবহমানের গ্রামবাংলা- এর অভিজ্ঞান কোনও না কোনও ভাবে আজও বাংলা এবং বাংলার রাষ্ট্রসীমা হতে নির্বাসিতা বাংলায় অপরিবর্তিত রয়েছে, ঠিক যেমনটি বলেছেন জীবনানন্দ,- 'তবু জানি কোনদিন পৃথিবীর ভীড়ে হারাব না তারে আমি, সে যে আছে আমার এ বাংলার তীরে'।

বিভূতিভূষণ এবং তাঁর উপন্যাস 'পথের পাঁচালী'র মূল্যায়নে অবশ্য বাংলার সমালোচক ভিন্নধর্মী ধারণাও পোষণ করেছেন। তাঁর প্রকৃতিমুগ্ধতাকে খণ্ডিত দৃষ্টিতে দেখার ফলে বিভূতিভূষণের সৃজনবিশ্ব অনেকের কাছেই একটা romantic idyll হিসেবে প্রতিভাত হয়েছে। তিনি যেন, "দাও ফিরে সে অরণ্য, লও এ নগর'-এর প্রতীক হয়ে দাঁড়ালেন"- এ মন্তব্য করেছেন সুজিৎ চৌধুরী (কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাহিত্য অকাদেমি আয়োজিত একটি জাতীয় সেমিনারে, নিবন্ধটি আকাদেমি প্রকাশিত 'বিভূতিভূষণ ও আধুনিক জিজ্ঞাসা' সংকলন গ্রন্থে মুদ্রিত)। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, সজনীকান্ত দাস আর অশোক চট্টোপাধ্যায় লেখককে সঙ্গে পথের পাঁচালী'র গ্রাম দেখতে গিয়েছিলেন। অনুরূপ মুগ্ধতাবোধ ছিল অমিয় চক্রবর্তীরও। কিন্তু কল্লোলগোষ্ঠীর সমালোচকরা এবং স্বয়ং বুদ্ধদেব বসু সামান্য ভিন্ন মত পোষণ করতেন। বিভূতিভূষণের রচনাকে এই ট্যুরিস্টের দৃষ্টিতে দেখার মধ্যেই সুজিৎ চৌধুরী এ মহৎ রচনার মূল্যায়ন-বিভ্রম দেখতে পেয়েছেন। যে বাংলার চিত্র এখানে উঠে এসেছে, এটা কোনও কল্পনা-বিসালীর সৃজন নয়, এর মধ্যে রয়েছে বাংলার হারিয়ে যাওয়ার, ফুরিয়ে যাওয়ার হাহাকার। বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও সমালোচক প্রমথনাথ বিশীর বিবেচনায় অপু, হরিহর, সর্বজয়া ‘এরা সবাই চিরশিশু এবং নাবালক’, তাঁর মতেও “পথের পাঁচালীর জগতে প্রবেশ করলে ‘দারিদ্র নামক ভয়াবহ জীবনটা বন্ধু হয়ে পড়ে’, তার ‘স্বভাব ভুলে যায়’।” গ্রামীন দারিদ্র্যের উপর মোহময় আবরণ বিছানোর এই যে অভিযোগ বিভূতিভূষণের উপর আরোপ করা হয়েছে এটাকে সুজিৎ চৌধুরী ‘বাঙালি এলিট সমাজের সংহত ভাবনার নির্যাস’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি আরও বলেছেন, ‘তিনি (বিভূতিভূষণ) বা তাঁর রচনার জগৎ যে অতটা সরল নয়, সেটা শেষ পর্যন্ত আবিষ্কার করতে হয় একজন বিদেশীকে.... “but the book is so well-written that to the layman Mr. Banerjee cannot have been that simple” (MG McNay, "Ripe Bengali Writers", Oxford Mail, Oxford, 12.12.68, উদ্ধৃত সুজিৎ চৌধুরীর প্রবন্ধে) যথাযথ সময়ে যথাযথ মূল্যায়ন না হওয়ায়, বিশেষ করে এ উপন্যাসের উপর ভিত্তি করে তৈরী সিনেমার সাফল্যের পরিপ্রেক্ষিতে যখন জাতীয় সংসদে সত্যজিৎ রায়ের উপর দেশের দারিদ্র্য বিপণন করার অভিযোগ ওঠে তখন যে শতবর্ষের উপান্তে পৌঁছানো ‘পথের পাঁচালী’র মূল স্রষ্টাকেও দায়ী করা হয়, এটা রাজ্যসভার সেই অভিনেত্রী-সদস্যার সম্যক উপলব্ধি করা সম্ভব না হওয়া অস্বাভাবিক নয়। জন্মশতবর্ষে প্রান্তিক বাংলার ঐতিহাসিক-সমালোচকের বিভূতিভূষণ মূল্যায়ন তাই অনেক অর্থেই মূল্যবান।

আনুষঙ্গিক প্রসঙ্গ :

শিশু-কিশোরদের সাহিত্য এবং সংগীতের জন্যেও আলাদা নজর রাখা প্রয়োজন এটা আমরা প্রায়শই ভুলে যাই। অথচ আগামী দিনের সাহিত্যসৃজনের ধারাটা বন্ধ হয়ে যাবে যদি না শিশু-সাহিত্যের সৃষ্টি হয়। প্রাচীন ভারতে পঞ্চতন্ত্র কাহিনী মহিলারণ্যে রাজা সুদর্শনের পুত্রদের শিক্ষার জন্য পণ্ডিত বিষ্ণু শর্মার মুখে উচ্চারিত হয়। অল্পদিন সময়সীমার মধ্যে তিন অমনোযোগী রাজপুত্রকে রাজ্যশাসন, দেশ, সমাজ ইত্যাদি বিষয়ে প্রজ্ঞাবান করে তুলতে প্রথানুগ শিক্ষাপদ্ধতি পরিহার করে এ গল্পবলা পদ্ধতি বিষ্ণু শর্মার অভিনব প্রয়াস। এ ঘটনা অনিরূপিত ঐতিহাসিক কাল খ্রিস্ট্রীয় প্রথম সহস্রাব্দ থেকে খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যবর্তী কোন্ সময়ে, তা সঠিক ভাবে জানা যায় না। সেই মহারাজা, তাঁর রাজ্য কোথায় তাও জানা যায় না, কিন্তু চিত্তাকর্ষক এ কাহিনীগুলো যে ভারতের পশ্চিম-সীমান্ত অতিক্রম করে আরব, ইরান, পারস্যদেশ ছুঁয়ে গ্রিক হয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোতে পৌঁছে যায়, এর ইতিহাস রয়েছে। পশুপক্ষীকে কেন্দ্রে রেখে এ গল্প শিশুবৃদ্ধ সবার কাছেই জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে, এ জনপ্রিয়তা আজও সমান।

অনুরূপ সময়েই বৌদ্ধসংস্কৃতির অন্যতম অবদান জাতকের গল্প ভারতীয় উপমহাদেশের চিত্ত জয় করেছে। তাছাড়াও বিক্রমাদিত্যের সভাভিত্তিক বেতাল পঞ্চবিংশতির কাহিনীর উৎপত্তিস্থলও প্রাচীন এবং মধ্যযুগের ভারতবর্ষ। আর মধ্যযুগের বঙ্গদেশ তো নানা ধরনের রূপকথার কাহিনীতে সমৃদ্ধ।

কিন্তু যতই আধুনিক যুগের দিকে এগোনো যায় দেখা যায় আমাদের সৃজনবিশ্বের আওতা থেকে শিশুকিশোরদের মনোরঞ্জনের উপাদান কমে আসতে থাকে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আক্ষেপ করে বলেছেন যে তাঁদের শৈশবে শিশুদের উপযোগী তেমন কোনও সংগীতও ছিল না। আর সাহিত্য মানেই ছিল বয়স্কদের তত্ত্বকথা, কাহিনী, নাট্যচর্চা, আধ্যাত্মিক সংগীত। নগরায়নের আত্মপ্রকাশে যে-সব জনপ্রিয় মনোরঞ্জনের উপাদানের উন্মেষ, এর প্রায় সিংহভাগই একেবারে আক্ষরিক অর্থেই প্রাপ্ত-বয়স্কদের।

কবিগুরুর প্রয়াসে বাংলার বিদ্বৎজনের দৃষ্টি এদিকে আকর্ষিত হল। জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি, শান্তিনিকেতনের আবাসিক আশ্রমে শিশুদের জন্য নাটক, বৈতালিক, আনন্দ উৎসবের আয়োজন বাঙালির সৃজনভাবনায় শৈশবের হাওয়া বইয়ে দিল। তবু শান্তিনিকেতন বা জোড়াসাঁকোর বাইরে সে অর্থে শিশু কিশোরদের সৃজনশীলতার চর্চার তেমন যে কোন বিশেষ প্রয়াস দেখা গেল না।

উনবিংশ শতকে বিদ্যাসাগর, মদনমোহন তর্কালঙ্কার প্রমুখ শিক্ষাবিদদের মনে শিশুদের উপযোগী রচনার প্রয়োজন অনুভূত হল। তাঁদের শিশুপাঠ্য প্রাথমিক বইগুলোর মধ্যে এর পরিচয় নিহিত আছে। এরপর অবশ্য 'বাংলা ভাষানুবাদ সমাজে'র উদ্যোগে রবিনসন ক্রুশো বা শেক্সপিয়ারের গল্পগুলোর অনুবাদও হল। বিংশ শতাব্দীর কুড়ির দশকে যোগীন্দ্রনাথ সরকার, উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী আর দক্ষিণারঞ্জন মিত্রমজুমদারের প্রয়াসে উল্লেখ্য। উপেন্দ্রকিশোরের 'সন্দেশ', ঠাকুরবাড়ির 'মুকুল', 'বালক', 'সখা', 'সাথী' এ পত্রিকাগুলো নতুন দিগন্ত উন্মোচিত করল শিশু সাহিত্যের। ক্রমে আরও বাণিজ্যিক পত্রপত্রিকার আত্মপ্রকাশ, মুদ্রণ জগতের বিকাশ ও বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে শিশুদের জন্য সাহিত্য রচনা বিশেষ মাত্রা লাভ করল। রবীন্দ্রনাথের জীবিতাবস্থায়ই উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, সুকুমার রায়দের প্রয়াসে 'সন্দেশ' পত্রিকায় বিজ্ঞান, ইতিহাস, ভ্রমণ, প্রকৃতি ইত্যাদি নানা বিষয়ের উপর শিশুদের উপযোগী মনোজ রচনা প্রকাশিত হল। শুধু বিষয় বৈচিত্রে নয়, মুদ্রণ পরিপাট্যেও শিশুসাহিত্য যে আলাদা যত্নের দাবিদার এটাও বোঝা গেল। বাংলায় এল মজার কবিতা, নন্সেন্স রাইমস, শিশুদের আনন্দের আধুনিকতম উপাদান, আর সুকুমার রায় এ আঙ্গিকে রচনা করলের 'আবোলতাবোল' । ১৯২০ সাল থেকে শিশুদের পত্রপত্রিকার জনপ্রিয়তা বাড়ল। 'মৌচাক' আর 'রামধনু', এ দুটো পত্রিকাকে কেন্দ্র করে নতুন লেখকদের আত্মপ্রকাশ ঘটল। 'মৌচাক' সম্পাদক সুধীরচন্দ্র সরকারের অনুরোধেই বিভূতিভূষণের শিশু কিশোর সাহিত্য জগতে প্রবেশ। বিজ্ঞান ভিত্তিক কাহিনী নিয়ে এলেন হেমেন্দ্রকুমার রায়, এরপর এলেন প্রেমেন্দ্র মিত্র, লীলা মজুমদার, সুখলতা রাও এবং প্রস্তুতি পর্বে রইলেন সত্যজিৎ রায়।

গল্প বা গদ্য সাহিত্যে যখন এ প্রবণতা, তখন কবিতা আর সংগীতেও শিশুরা আর উপেক্ষিত রইল না। রবীন্দ্রনাথ তো বটেই, নজরুল ইসলাম ইসলামও শিশুদের উপযোগী গান রচনা করে এদিকে বিশেষ আলোড়ন সৃষ্টি করলেন। সত্যন্দ্রনাথ দত্ত, গোলাম মুস্তাফা, জসিমউদ্দিন, বন্দে আলী মিঞা, কুমুদরঞ্জন মল্লিক, কালিদাস রায়, সুনির্মল বসুরা লিখলেন শিশুদের কবিতা। আর শিশু সাহিত্যের ধারাকে সমৃদ্ধ করার ২ প্রয়াস জারি রাখলেন অখিল নিয়োগী, বিধায়ক ভট্টাচার্য, আশাপূর্ণা দেবী।

এতৎসত্বেও কথাসাহিত্যের প্রবল জোয়ার এলেও আমাদের সাহিত্যিকেরা শিশুদের কথা ভুলে বিচরণ করতে থাকলেন বড়োদের জগতেই। নিতান্ত প্রকাশকদের তাড়নায় মাঝে মাঝে এদিকে নজর দিলেও একান্তভাবে শিশু-কিশোরদের জন্যই লেখালেখি করেছেন এরকম সাহিত্যকের সংখ্যা আবার কমতির দিকে। এ কর্মটি যেন বড়োদের জন্য লেখকদের পার্টটাইম বা অবসর বিনোদনের কর্ম, অবশ্যকৃতা নয়। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ অতি অবশ্যই শিশুকিশোর সাহিত্যে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছেন, তবু এরা তো শিশু-সাহিত্যিক হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছেন না, শিশুদের জগতে ওদের কদাচিৎ-বিচরণ বই তো নয়। উল্লেখ্য যে, বাংলা গানে জপমালা ঘোষ, সনৎ সিংহ যেমন একান্তভাবেই শিশুসংগীতের শিল্পী তেমনি আর কেউ শিশুসংগীতের চর্চাও করেননি, যদিও সলিল চৌধুরীর মতো সংগীতস্রষ্টা এদিকে বিশেষ অবদান রেখেছেন। অবশ্য সত্যজিৎ রায় সিনেমার প্রয়োজনে হলেও কালজয়ী বেশ কিছু শিশুসংগীত উপহার দিয়েছেন বাঙালিদের। মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ও 'জয়জয়ন্তী' সিনেমায় কয়েকটি অপূর্ব শিশুসংগীত তৈরি করে গেছেন।

বাংলা ভাষার অপর ভুবন অর্থাৎ বাংলাদেশে শিশুসাহিত্য এবং শিশুসংগীত, নাট্যচর্চার একটি সমৃদ্ধ ধারার আত্মপ্রকাশ বিশেষ আশার সঞ্চার করেছে। ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দে স্থাপিত বাংলাদেশ শিশু একাডেমী এ ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করে আসছে। তাছাড়া বাংলা একাডেমী নিয়মিত ভাবে শিশুসাহিত্য প্রকাশ এবং প্রচার করে যাচ্ছে। বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি প্রকাশিত 'জুনিয়র বাংলাপিডিয়া' শিশুদের জন্য আরেকটি উজ্জ্বল উপহার।

অনুশীলন - (ক)
১)       সংক্ষিপ্ত উত্তর লিখুন : -
  1. গুরুমশায় আখ্যানে যেসব গ্রামীন শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে এর একটা তালিকা তৈরি করুন। (যেমন শেলেট ইত্যাদি)
  2. প্রসন্ন গুরুমহাশয়ের পাঠশালাটি কোথায় ছিল? এতে পাঠদানের কী উপাদান ছিল।ি
  3. মা অপুকে কেন ডেকে তুলছেন?
  4. সময়টি কী ছিল?
  5. পাঠশালা সম্পর্কে অপুর কী ধারণা ছিল?
২)       উত্তর লিখুন : -
  1. রাজু রায়ের গল্প শুনে অপুর মনে কী ইচ্ছা জেগেছিল?
  2. অপুর বাড়িতে কী কী বই ছিল?
  3. সান্যাল মশাইয়ের কী বৈশিষ্ট্য ছিল? তাঁর আগমন ঘটলে অপুর কী ভাবান্তর হত?
  4. দীনু পালিত কী মন্ত্রের কথা বলেন?
  5. পাঠশালা ফেরৎ বইপত্র হাতে অপুর চেহারা, বেশভূষার বর্ণনা দিন। বাড়িতে গেলে মা আর দিদি কী করতেন?
৩)       উত্তর লিখুন : -
  1. প্রসন্ন গুরুমশায়ের পাঠশালার একটি বর্ণনা দিন। এর সঙ্গে সাম্প্রতিক কালে পাঠশালার কী কোনরূপ সাদৃশ্য পাওয়া যায়?
  2. পাঠশালায় আসা গ্রামীন বৃদ্ধদের উপর একটি সংক্ষিপ্ত টীকা লিখুন।
  3. গুরুমশায়ের মুখে শ্রুতিলিখন শুনতে শুনতে অপুর কী ভাবান্তর হল?
  4. অপুর মনের ভেতর যে একটা ভাবুক সত্তা তৈরী হয়েছে সেটা কোন্ ঘটনায় স্পষ্ট হল?
  5. নির্বাচিত গদ্যাংশটি পড়ে দেখুন তো এর বর্ণনার ভাষা আর সংলাপের ভাষায় ক পার্থক্য রয়েছে।
৪)       উত্তর লিখুন : -
  1. তৎকালীন বঙ্গদেশের সামাজিক জীবনের যে পরিচয় এখানে পাওয়া যায় এর উপর সক্ষেপে লিখুন।
  2. এ নির্বাচিত গদ্যাংশ কেন কিশোর পাঠকদের কাছে আকর্ষণীয় আপনার মনে হয়?
  3. বিভূতিভূষণের কিশোরপাঠ্য কয়েকটি বই এবং গল্পের নাম লিখুন এবং এর সাহিত্যমূল্যের উপর আপনার অভিমত ব্যক্ত করুন।
  4. বাংলা ভাষায় শিশুকিশোর সাহিত্যের একটি সংক্ষিপ্ত পরিচিতি দিন।
  5. একটি ভাষা ও সংস্কৃতির বিকাশে শিশু সাহিত্যের এবং শিশুসংগীতের ভূমিকা কী?
৫)       উত্তর লিখুন : -
  1. বিভূতিভূষণের সাহিত্যকৃতির মূল্যায়নে দুইটি মতবাদের প্রাধান্য রয়েছে। সেটা কী?
  2. বিভূতিভূষণের প্রকৃতিপ্রেমের মধ্যে কি কোনও সমাজবাস্তবতার অভিঘাত নেই আপনার মনে হয়?
  3. পথের পাঁচালীর মধ্যে ভারতে দারিদ্র বিপণনের কোনও আভাস আছে কি?
বিশেষ অনুশীলন : -
 🔾
ইউ টিউবে সত্যজিৎ রায় নির্মিত ‘পথের পাঁচালী’ ছবিটি দেখে নিন। পাঠশালার দৃশ্যটির চিত্রায়নের সঙ্গে মূল রচনার কতটুকু সমতা আর পার্থক্য আছে লিখে রাখুন।


২.১   লেখক পরিচিতি

সৈয়দ মুজতবা আলী (১৯০৪ - ১৯৭৪): অবিভক্ত আসাম প্রদেশের সিলেটের করিমগঞ্জ মহকুমার জেলা সদরে জন্ম। পিতা সৈয়দ সিকন্দর কাজি। ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে সিলেট মুরারীচাঁদ কলেজে রবীন্দ্রনাথের ভাষণ শুনতে যান বাবার সঙ্গে (৭ নভেম্বর), এ সূত্রে কবিগুরুর সঙ্গে পত্রালাপ এবং পরবর্তী সময়ে শান্তিনিকেতনে গমন এবং শিক্ষালাভ। শিক্ষা শেষে কাবুল দূতাবাসে চাকরিতে যোগদান, অতঃপর জার্মানির বন বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা। ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্যের বহুদেশ ভ্রমণ শেষে এ ব্যক্তি বরোদা রাজ্যে অধ্যাপনায় বৃত হন (১৯৩০)। কিছুদিন বগুড়া কলেজে অধ্যক্ষ হিসেবে কাজ করার পর ১৯৫০ সালে আকাশবাণীর কেন্দ্র-অধিকর্তা হিসেবে কাজ করেন। কিছুদিন আবার বিশ্বভারতীর ইসলামী সংস্কৃতির প্রধান অধ্যাপক হিসেবেও কাজ করেন। বহুভাষাবিদ মুজতবা আলী রবীন্দ্রনাথের অন্তরঙ্গ সাহচর্যলাভে ধন্য। রবীন্দ্রনাথের আদর্শ ও প্রভাব সারাজীবন তাঁর জীবনে চালিকাশক্তি হিসেবে সক্রিয় ছিল। নানা প্রসঙ্গ, নানা অনুষঙ্গে তাঁর বিশাল রচনাসম্ভারের সিংহভাগ জুড়ে আছে রবীন্দ্রপ্রসঙ্গ। প্রকৃত অর্থেই জীবনরসিক মুজতবা আলী বিরচণ করেছেন ভাষাতত্ত্ব থেকে ধর্মতত্ত্ব, সুফিবাদ থেকে বৈষ্ণব দর্শন, রবীন্দ্রসংগীত থেকে কাইরোর কাঁফে, সিলেটের খালাসি থেকে জার্মান বৈজ্ঞানিক প্রসঙ্গে। তাঁর রচনার সিংহভাগ জুড়ে আছে অন্তরঙ্গ কথন, যাকে আড্ডা সাহিত্যও বলা যায়। গুরুগম্ভীর তথ্য এবং তত্ত্ব তাঁর লিখনশৈলিতে হয়ে ওঠে অতীব সুখপাঠ, সহজ। আগাধ পাণ্ডিত্যের অধিকারী এ লেখক সততই তাঁর বিদ্যাকে ঢেকে রাখতে প্রয়াসী ছিলেন। প্রবন্ধ, নিবন্ধ, রম্য রচনা, গল্প, উপন্যাসের বিভিন্ন শাখায় ছিল তাঁর বিচরণ। প্রবল ধর্মবিশ্বাসী মুজতবা আলী ধর্মের ব্যাপারে ছিলেন একেবারে উদার। হিন্দু ধর্মের আচার আচরণ থেকে খ্রিস্ট-জরথুস্ত্র-বৌদ্ধ-ইসলাম সব ধর্মেই তাঁর সমান জ্ঞান ও আগ্রহ। বাহান্নর ভাষা আন্দোলনের মুহূর্তে পূর্ববঙ্গে বাংলা ভাষার স্বপক্ষে জোরালো এক তাত্ত্বিক নিবন্ধ লিখে পাকিস্তান সরকারের বিরাগভাজন হন। সীমান্তের ওপারে সরকারি আধিকারিক তাঁর স্ত্রী এবং সন্তানদের সঙ্গে সংযোগ রক্ষা করাও মাঝে মাঝে অসম্ভব হয়ে ওঠে। আসামে ভাষাসমস্যা, একষট্টি পরবর্তীতে কাছাড়ের ভাষিক পরিস্থিতি পর্যালোচনায় তিনি ‘হতভাগ্য কাছাড়’ শীর্ষক একটি গুরুত্বপূর্ণ নিবন্ধ রচনা করেন। তাছাড়াও অবিভক্ত আসামের উপজাতি, বিশেষ করে মিজো জনগোষ্ঠীর সমাজ এবং আচরণ নিয়েও তিনি লেখালেখি করেন।

তাঁর রচিত প্রবন্ধ, ভ্রমণকাহিনী, উপন্যাস ও রম্যরচনার মধ্যে অন্যতম হল, ‘দেশে বিদেশে’, ‘পঞ্চতন্ত্র’, ‘চাচা কাহিনী’, ‘ময়ূরকণ্ঠী’, ‘শবনম’, ‘ধূপছায়া’, ‘অবিশ্বাস্য’, ‘টুনি মেম’, ‘শহর ইয়ার’, ‘হিটলার’, ‘পূর্ব-পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’ ইত্যাদি।

২.২   মূলপাঠ 
পাদটীকা
সৈয়দ মুজতবা আলী
পাদটীকা
সৈয়দ মুজতবা আলী

ত শতকের শেষ আর এই শতকের গোড়ার দিকে আমাদের দেশের টোলগুলো মড়ক লেগে প্রায় সম্পূর্ণ উজাড় হয়ে যায়। পাঠান-মোগল আমলে যে দুর্দৈব ঘটেনি ইংরাজ রাজত্বে সেটা প্রায় আমাদেরই চোখের সামনে ঘটল। অর্থনৈতিক চাপে পড়ে দেশের কর্তাব্যক্তিরা ছেলেভাইপোকে টোলে না পাঠিয়ে ইংরেজি ইস্কুলে পাঠাতে আরম্ভ করলেন। চতুর্দিকে ইংরেজি শিক্ষার জয়-জয়কার পড়ে গেল- সেই ডামাডোলে বিস্তর টোল মরল, আর বিস্তর কাব্যতীর্থ বেদান্তবাগীশ না খেয়ে মারা গেলেন।

ত শতকের শেষ আর এই শতকের গোড়ার দিকে আমাদের দেশের টোলগুলো মড়ক লেগে প্রায় সম্পূর্ণ উজাড় হয়ে যায়। পাঠান-মোগল আমলে যে দুর্দৈব ঘটেনি ইংরাজ রাজত্বে সেটা প্রায় আমাদেরই চোখের সামনে ঘটল। অর্থনৈতিক চাপে পড়ে দেশের কর্তাব্যক্তিরা ছেলেভাইপোকে টোলে না পাঠিয়ে ইংরেজি ইস্কুলে পাঠাতে আরম্ভ করলেন। চতুর্দিকে ইংরেজি শিক্ষার জয়-জয়কার পড়ে গেল- সেই ডামাডোলে বিস্তর টোল মরল, আর বিস্তর কাব্যতীর্থ বেদান্তবাগীশ না খেয়ে মারা গেলেন।

এবং তার চেয়েও হৃদয়বিদারক হল তাঁদের অবস্থা, যাঁরা কোনোগতিকে সংস্কৃত বা বাংলার শিক্ষক হয়ে হাই-স্কুলগুলোতে স্থান পেলেন। এঁদের আপন আপন বিষয়ে অর্থাৎ কাব্য, অলঙ্কার, দর্শন ইত্যাদিতে পাণ্ডিত্য ছিল অন্যান্য শিক্ষকদের তুলনায় অনেক বেশি কিন্তু সম্মান এবং পারিশ্রমিক এঁরা পেতেন সবচেয়ে কম। শুনেছি কোনো কোনো ইস্কুলে পণ্ডিতের মাইনে চাপরাশীর চেয়েও কম ছিল।

এবং তার চেয়েও হৃদয়বিদারক হল তাঁদের অবস্থা, যাঁরা কোনোগতিকে সংস্কৃত বা বাংলার শিক্ষক হয়ে হাই-স্কুলগুলোতে স্থান পেলেন। এঁদের আপন আপন বিষয়ে অর্থাৎ কাব্য, অলঙ্কার, দর্শন ইত্যাদিতে পাণ্ডিত্য ছিল অন্যান্য শিক্ষকদের তুলনায় অনেক বেশি কিন্তু সম্মান এবং পারিশ্রমিক এঁরা পেতেন সবচেয়ে কম। শুনেছি কোনো কোনো ইস্কুলে পণ্ডিতের মাইনে চাপরাশীর চেয়েও কম ছিল।

আমাদের পণ্ডিতমশাই তর্কালঙ্কার না কাব্যবিশারদ ছিলেন আমার আর ঠিক মনে নেই কিন্তু একথা মনে আছে যে পণ্ডিতসমাজে তাঁর খ্যাতি ছিল প্রচুর এবং তাঁর পিতৃপিতামহ চতুর্দশ পুরুষ শুধু যে ভারতীয় সংস্কৃতির একনিষ্ঠ সাধক ছিলেন তা নয়, তাঁরা কখনো পরান্ন ভক্ষণ করেননি- পালপরব শ্রাদ্ধনিমন্ত্রণে পাত পাড়ার তো কথাই ওঠে না।

বাংলা ভাষার প্রতি পণ্ডিতমশাইয়ের ছিল অবিচল, অকৃত্রিম অশ্রদ্ধা- ঘৃণা বললেও হয়তো বাড়িয়ে বলা হয় না। বাংলাতে যেটুকু খাঁটি সংস্কৃত বস্তু আছে তিনি মাত্র সেইটুকু পড়াতে রাজী হতেন- অর্থাৎ কৃৎ, তদ্ধিত, সন্ধি এবং সমাস। তাও বাংলা সমাস না। আমি একদিন বাংলা রচনায় 'দোলা-লাগা', 'পাখি-জাগা' উদ্ধৃত করেছিলুম বলে তিনি আমার দিকে দোয়াত ছুঁড়ে। মেরেছিলেন। ক্রিকেট ভাল খেলা- সে দিন কাজে লেগে গিয়েছিল। এবং তার পরমুহূর্তেই বি পূর্বক, আ পূর্বক, ঘ্রা ধাতু ক উত্তর দিয়ে সংস্কৃত ব্যাঘ্রকে ঘায়েল করতে পেরেছিলুম বলে তিনি আশীর্বাদ করে বলেছিলেন, 'এই দণ্ডেই তুই স্কুল ছেড়ে চতুষ্পাঠীতে যা। সেখানে তোর সত্য বিদ্যা হবে।'

কিন্তু পণ্ডিতমশাই যত না পড়াতেন, তার চেয়ে বকতেন ঢের বেশি, এবং টেবিলের উপর পা দু'খানা তুলে দিয়ে ঘুমুতেন সবচেয়ে বেশি। বেশ নাক ডাকিয়ে, এবং হেডমাস্টারকে একদম। পরোয়া না করে। কারণ হেডমাস্টার তাঁর কাছে ছেলেবেলায় সংস্কৃত পড়েছিলেন এবং তিনি যে লেখাপড়ায় সর্বাঙ্গনিন্দনীয় হস্তীমূর্খ ছিলেন সে কথাটি পণ্ডিতমশাই বারম্বার অহরহ সর্বত্র উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করতেন। আমরা সে কাহিনী শুনে বিমলানন্দ উপভোগ করতুম, আর পণ্ডিতমশাইকে খুশি করবার পন্থা বাড়ন্ত হলে ঐ বিষয়টি নূতন করে উত্থাপনা করতুম।

আমাকে পণ্ডিতমশাই একটু বেশি স্নেহ করতেন। তার কারণ বিদ্যাসাগরী বাংলা লেখা ছিল আমার বাই; ঐ ‘দোলা-লাগা’, ‘পাখি-জাগা’ই আমার বর্ণাশ্রম ধর্ম পালনে একমাত্র গোমাংস ভক্ষণ। পণ্ডিতমশাই যে আমাকে সবচেয়ে বেশি স্নেহ করতেন তার প্রমাণ তিনি দিতেন আমার উপর অহরহ নানা প্রকার কটুকাটব্য বর্ষণ করে। ‘অনার্য’, ‘শাখা-মৃগ’, ‘দ্রাবিড়সম্ভূত’ কথাগুলো ব্যবহার না করে তিনি আমাকে সাধারণত সম্বোধন করতেন না; তাছাড়া এমন সব অশ্লীল কথা বলতেন যে তার সঙ্গে তুলনা দেবার মতো জিনিস আমি দেশবিদেশে কোথাও শুনিনি। তবে একথাও স্বীকার করতে হবে যে পণ্ডিতমশাই শ্লীল অশ্লীল উভয় বস্তুই একই সুরে একই পরিমাণে ঝেড়ে যেতেন, সম্পূর্ণ অচেতন, বীতরাগ এবং লাভালাভের আশা বা ভয় না করে। এবং অশ্লীলতা মার্জিত না হলেও অত্যন্ত বিদগ্ধরূপেই দেখা দিত বলে আমি বহু অভিজ্ঞতার পর এখনো মনস্থির করতে পারিনি যে সেগুলো শুনতে পেয়ে আমার লাভ না ক্ষতি, কোনটা বেশি হয়েছে।

পণ্ডিতমহাশয়ের বর্ণ ছিল শ্যাম, তিনি মাসে একদিন দাড়ি গোঁফ কামাতেন এবং পরতেন হাঁটু-জোকা ধুতি। দেহের উত্তমার্ধে একখানা দড়ি প্যাঁচানো থাকত -- অজ্ঞেরা বলত সেটা নাকি দড়ি নয়, চাদর। ক্লাসে ঢুকেই তিনি সেই দড়িখানা টেবিলের উপর রাখতেন, আমাদের দিকে রোষকষায়িত লোচনে তাকাতেন, আমাদের বিদ্যালয়ে না এসে যে চাষ করতে যাওয়াটা সমধিক সমীচীন সে কথাটা দ্বিসহস্র বারের মতো স্মরণ করিয়ে দিতে দিতে পা দু'খানা টেবিলের উপর লম্বমান করতেন। তারপর যে কোনো একটা অজুহাত ধরে আমাদের এক চোট বকে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়তেন। নিতান্ত যে-দিন কোনো অজুহাতই পেতেন না-ধর্মসাক্ষী সে-কসুর আমাদের নয়- সেদিন দু'চারটে কৃৎ-তদ্ধিত সম্বন্ধে আপন মনে- কিন্তু বেশ জোর গলায়- আলোচনা করে উপসংহারে বলতেন, কিন্তু এই মূর্খদের বিদ্যাদান করার প্রচেষ্টা বন্ধ্যাগমনের মতো নিষ্ফল নয় কি?' তারপর কখনো আপন গতাসু চতুষ্পাঠীর কথা স্মরণ করে বিড়বিড় করে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে অভিশাপ দিতেন, কখনো দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে টানা-পাখার দিকে একদৃষ্টে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে ঘুমিয়ে পড়তেন।

শুনেছি ঋগ্বেদে আছে যমপত্নী যমী যখন যমের মৃত্যুতে অত্যন্ত শোকাতুরা হয়ে পড়েন তখন দেবতারা তাঁকে কোনো প্রকারে সান্ত্বনা না দিতে পেরে শেষটায় তাঁকে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছিলেন। তাই আমার বিশ্বাস, পণ্ডিতমশায়ের টোল কেঁড়ে নিয়ে দেবতারা তাঁকে সান্ত্বনা দেবার জন্য অহরহ ঘুম পাড়িয়ে দিতেন। কারণ এরকম দিনযামিনী সায়ংপ্রাতঃ শিশিরবসন্তে বেঞ্চি-চৌকিতে যত্রতত্র অকাতরে ঘুমিয়ে পড়তে পড়াটা দেবতার দান- একথা অস্বীকার করার জো নেই।

বহু বৎসর হয়ে গিয়েছে, সেই ইস্কুলের সামনে সুরমা নদী দিয়ে অনেক জল বয়ে গিয়েছে কিন্তু আজো যখন তাঁর কথা ব্যাকরণ সম্পর্কে মনে পড়ে তখন তাঁর যে ছবিটি আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেটি তাঁর জাগ্রত অবস্থায় নয়; সে ছবিতে দেখি, টেবিলের উপর দু'পা-তোলা, মাথা একদিকে ঝুলে-পড়া, টিকিতে দোলা-লাগা কাষ্ঠাসন শরশয্যায় শায়িত ভারতীয় ঐতিহ্যের শেষ কুমার ভীষ্মদেব। কিন্তু ছিঃ, আবার ‘দোলা-লাগা’ সমাস ব্যবহার করতে পণ্ডিতমশায়ের প্রেতাত্মাকে ব্যথিত করি কেন?

সে-সময়ে আসামের চীফ-কমিশনার ছিলেন এন. ডি. বীটসন বেল্। সায়েবটির মাথায় একটু ছিট ছিল। প্রথম পরিচয়ে তিনি সবাইকে বুঝিয়ে বলতেন যে তাঁর নাম, আসলে ‘নন্দদুলাঙ্গ বাজায় ঘণ্টা’। ‘এন. ডি’তে হয় ‘নন্দদুলাল’ আর বীটসন বেল্ অর্থ ‘বাজায় ঘণ্টা’- দুয়ে মিলে হয় ‘নন্দদুলাল বাজায় ঘণ্টা’।

সেই নন্দদুলাল এসে উপস্থিত হলেন আমাদের শহরে।

ক্লাসের জ্যাঠা ছেলে ছিল পদ্মলোচন। সে-ই একদিন খবর দিল লাটসাহেব আসছেন স্কুল পরিদর্শন করেত- পদ্মর ভগ্নিপতি লাটের টুর ক্লার্ক না কি, সে তাঁর কাছ থেকে পাকা খবর পেয়েছে।

লাটের ইস্কুল আগমন অবিমিশ্র আনন্দদায়ক অভিজ্ঞতা নয়। একদিক দিয়ে যেমন বলা নেই, কওয়া নেই হঠাৎ বিন-কসুরে লাট আসার উত্তেজনায় খিটখিটে মাস্টারদের কাছ থেকে কপালে কিলটা চড়টা আছে, অন্যদিকে তেমনি লাট চলে যাওয়ার পর তিন দিনের ছুটি।

হেডমাস্টারমশায়ের মেজাজ যখন সক্কলের প্রাণ ভাজা ভাজা করে ছাই বানিয়ে ফেলার উপক্রম করেছে এমন সময়ে খবর পাওয়া গেল, শুক্কুরবার দিন হুজুর আসবেন।

ইস্কুল শুরু হওয়ার এক ঘন্টা আগে আমরা সেদিন হাজিরা দিলুম। হেডমাস্টার ইস্কুলের সর্বত্র চর্কিবাজীর মতন তুর্কীনাচন নাচছেন। যে দিকে তাকাই সেদিকেই হেড মাস্টার- নিশ্চয়ই তাঁর অনেকগুলো যমজ ভাই আছেন, আর ইস্কুল সামলাবার জন্য সেদিন সব ক'জনকে রিকুইজিশন করে নিয়ে এসেছেন।

পদ্মলোচন বলল, ‘কমন-রুমে গিয়ে মজাটা দেখে আয়।’

‘কেন কি হয়েছে?’

‘দেখেই আয় না ছাই।’

পদ্ম আর যা করে করুক কখনো বাসি খবর বিলোয় না। হেডমাস্টারের চড়ের ভয় না মেনে কমন-রুমের কাছে গিয়ে জানালা দিয়ে দেখি, অবাক কাণ্ড। আমাদের পণ্ডিতমশাই একটা লম্বা-হাতা আনকোরা নূতন হলদে রঙের গেঞ্জি পরে বসে আছেন আর বাদবাকি মাস্টাররা কলরব করে সে-গেঞ্জিটার প্রশংসা করছেন। নানা মুনি নানা গুণ কীর্তন করছেন: কেউ বলছেন পণ্ডিতমশাই কী বিচক্ষণ লোক, বেজায় সস্তায় দাঁও মেরেছেন (গাঁজা, পণ্ডিতমশাইয়ের সাংসারিক বুদ্ধি একরত্তিও ছিল না), কেউ বলছেন আহা, যা মানিয়েছে (হাতি, পণ্ডিতমশাইকে সার্কাসের সঙের মতো দেখাচ্ছিল) কেউ বললেন, যা ফিট করেছে (মরে যাই, গেঞ্জির আবার ফিট-অফিট কি?)। শেষটায় পণ্ডিতমশায়ের ইয়ার মৌলবী সায়েব দাড়ি দুলিয়ে বললেন, ‘বুঝলে ভাশচার্য, এরকম উম্দা গেঞ্জি দু’খান তৈরি হয়েছিল, তার-ই একটা কিনেছিল পঞ্চম জর্জ, আর দুসরাটা কিনলে তুমি, এ দুটো বানাতে গিয়ে কোম্পানি দেউলে হয়ে গিয়েছে, আর কারো কপালে এরকম গেঞ্জি নেই।’

চাপরাসী নিত্যানন্দ দূর থেকে ইশারায় জানাল, ‘বাবু আসছেন।’

তিন লম্ফে ক্লাসে ফিরে গেলুম।

সেকেন্ড পিরিয়ডে বাংলা। পণ্ডিতমশাই আসতেই আমরা সবাই ত্রিশ গাল হেসে গেঞ্জিটার দিকে তাকিয়ে রইলুম। ইতিমধ্যে রেবতী খবর দিল যে শাস্ত্রে সেলাই করা কাপড় পরা বারণ বলে পণ্ডিতমশাই পাঞ্জাবি শার্ট পরেন না, কিন্তু লাট সায়েব আসছেন, শুধু গায়ে ইস্কুলে আসা চলবে না তাই গেঞ্জি পরে এসেছেন। গেঞ্জি বোনা জিনিস, সেলাই-করা কাপড়ের পাপ থেকে পণ্ডিতমশাই এই কৌশলে নিষ্কৃতি পেয়েছেন।

গেঞ্জি দেখে আমরা এতই মুগ্ধ যে পণ্ডিতমশায়ের গালাগাল, বোয়াল-চোখ সব কিছুর জন্যই আমরা তখন তৈরি কিন্তু কেন জানিনে তিনি তাঁর রুটিন মাফিক কিছুই করলেন না। বকলেন না, চোখ লাল করলেন না, লাট আসছেন কাজেই টেবিলে ঠ্যাং তোলার কথাও উঠতে পারে না। তিনি চেয়ারের উপর অত্যন্ত বিরস বদনে বসে রইলেন।

পদ্মলোচনের ডর ভয় কম। আহ্লাদে ফেটে গিয়ে বলল, ‘পণ্ডিতমশাই, গেঞ্জিটা কদ্দিয়ে কিনলেন?’

আশ্চর্য, পণ্ডিত-মশাই খ্যাঁক খ্যাঁক করে উঠলেন না, নির্জীব কণ্ঠে বললেন, ‘পাঁচ সিকে।’ আধ মিনিট যেতে না যেতেই পণ্ডিতমশাই দুহাত দিয়ে ক্ষণে হেথায় চুলকান ক্ষণে হোথায় চুলকান। পিঠের অসম্ভব অসম্ভব জায়গায় কখনো ডান হাত, কখনো বাঁ হাত দিয়ে চুলকানোর চেষ্টা করেন, কখনো মুখ বিকৃত করে গেঞ্জির ভিতর হাত চালান করে পাগলের মতো এখানে ওখানে খ্যাঁস খ্যাঁস করে খামচান।

একে তো জীবন-ভর উত্তমাঙ্গে কিছু পরেননি, তার উপর গেঞ্জি, সেও আবার একদম নূতন কোরা গেঞ্জি।

বাচ্চা ঘোড়ার পিঠে পয়লা জিন লাগালে সে যে-রকম আকাশের দিকে দু'পা তুলে তড়পায় শেষটায় পণ্ডিতমশায়ের সেই অবস্থা হল। কখনো করুণ কন্ঠে অস্ফুট আর্তনাদ করেন, 'রাধামাধব, এ কী গব্ব-যন্ত্রণা', কখনো এক হাত দিয়ে আরেক হাত চেপে ধরে, দাঁত কিড়িমিড়ি খেয়ে আত্মসম্বরণ করার চেষ্টা করেন- লাট সায়েবের সামনে তো সর্ব্বাঙ্গ আঁচড়ানো যাবে না।

শেষটায় থাকতে না পেরে আমি উঠে বললুম, 'পণ্ডিতমশাই, আপনি গেঞ্জিটা খুলে ফেলুন। লাট সায়েব এলে আমি জানালা দিয়ে দেখতে পাব। তখন না হয় ফের পরে নেবেন।'

বললেন, 'ওরে জড়ভরত, গব্ব-যন্ত্রণাটা খুলছি নে, পরার অভ্যেস হয়ে যাবার জন্য।' আমি হাত জোড় করে বললুম, 'একদিনে অভ্যেস হবে না পণ্ডিতমশাই, ওটা আপনি খুলে ফেলুন।'

আসলে পণ্ডিতমশাইয়ের মতলব ছিল গেঞ্জিটা খুলে ফেলারই; শুধু আমাদের কারে কাছ থেকে একটু মরাল সাপোর্টের অপেক্ষায় এতক্ষণ বসেছিলেন। তবু সন্দেহ-ভরা চোখে বললেন, 'তুই তো একটা আস্ত মর্কট- শেষটায় আমাকে ডোবাবি না তো? তুই যদি হুঁশিয়ার করিস আর লাট যদি এসে পড়েন?'

আমি ইহলোক পরলোক সর্বলোক তুলে দিব্যি, কিরে কসম খেলুম।

পণ্ডিতমশাই গেঞ্জিটা খুলে টেবিলের উপর রেখে সেটায় দিকে যে দৃষ্টি হানলেন, তাঁর টিকিটি কেউ কেটে ফেললেও তিনি তার দিকে এর চেয়ে বেশি ঘৃণা মাখিয়ে তাকাতে পারতেন। না। তারপর লুপ্ত দেহটা ফিরে পাওয়ার আনন্দে প্রাণভরে সর্বাঙ্গ খামচালেন। বুক পিঠ ততক্ষণে লাল লাল আঁজিতে ভর্তি হয়ে গিয়েছে।

এরপর আর কোনো বিপদ ঘটল না। পণ্ডিতমশাই থেকে থেকে রাধামাধবকে স্মরণ করলেন, আমি জানালা দিয়ে তাকিয়ে রইলুম, আর সবাই গেঞ্জিটার নাম, ধাম, কোন্ দোকানে কেনা, সস্তা না আক্রা, তাই নিয়ে আলোচনা করল।

আমি সময়মতো ওয়ার্নিং দিলুম। পণ্ডিতমশাই আবার তাঁর 'গব্ব-যন্ত্রণাটা' উত্তমাঙ্গে মেখে নিলেন।

লাট এলেন; সঙ্গে ডেপুটি কমিশনার, ডাইরেকটর, ইনস্পেকটর, হেডমাস্টার, নিত্যানন্দ- আর লাট সায়েবের এডিসি ফেডিসি না কি সব বারান্দায় জটলা পাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। 'হ্যালো পাণ্ডিট্' বলে সায়েব হাত বাড়ালেন। রাজসম্মান পেয়ে পণ্ডিতমশায়ের সব যন্ত্রণা লাঘব হল। বার বার ঝুঁকে ঝুঁকে সায়েবকে সেলাম করলেন- এই অনাদৃত পণ্ডিত শ্রেণি সামান্যতম গতানুগতিক সম্মান পেয়েও যে কি রকম বিগলিত হতেন তা তাঁদের সে-সময়কার চেহারা না দেখলে অনুমান করার উপায় নেই।

হেডমাস্টার পণ্ডিতমশায়ের কৃৎ-তদ্ধিতের বাই জানতেন; তাই নির্ভয়ে ব্যাকরণের সর্বোচ্চ। নভঃস্থলে উড্ডীয়মান হয়ে 'বিহঙ্গ' শব্দের তত্ত্বানুসন্ধান করলেন। আমরা জন দশেক একসঙ্গে চেঁচিয়ে বললুম, 'বিহায়স পূর্বক গম ধাতু খ', লাট সায়েব হেসে বললেন, 'ওয়ান এ্যাট এ টাইম, প্লীজ'। লাট সায়েব আমাদের বলল, 'প্লীজ', এ কী কাণ্ড! তখন আবার আর কেউ রা কাড়ে না। হেডমাস্টার শুধালেন 'বিহঙ্গ', আমরা চুপ, তখনো প্লীজের ধকল কাটেনি। শেষটায় ব্যাকরণে নিরেট পাঁঠা যতটা আমাদের উত্তর আগে শুনে নিয়েছিল বলে ক্লাসে নয় দেশে নাম করে ফেললে- আমরা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলুম।

লাট সায়েব ততক্ষণ হেডমাস্টারের সঙ্গে ‘পণ্ডিত’ শব্দের মূল নিয়ে ইংরেজিতে আলোচনা জুড়ে দিয়েছেন, হেডমাস্টার কি বলেছিলেন জানিনে তবে রবীন্দ্রনাথ নাকি পণ্ডিতদের ধর্মে জড়শীলতার প্রতি বিদ্রপ করে বলেছিলেন, যার সবকিছু পণ্ড হয়ে গিয়েছে সেই পণ্ডিত।

ইংরেজ শাসনের ফলে আমাদের পণ্ডিতদের সর্বনাশ, সর্বস্ব পণ্ডের ইতিহাস হয়তো রবীন্দ্রনাথ জানতেন না, না হলে ব্যঙ্গ করার পূর্বে হয়তো একটু ভেবে দেখতেন।

সে কথা থাক। লাট সায়েব চলে গিয়েছেন, যাবার পূর্বে পণ্ডিতমশায়ের দিকে একখানা মোলায়েম নড় করাতে তিনি গর্বে চৌচির হয়ে ফেটে যাবার উপক্রম। আনন্দের আতিশয্যে নূতন গেঞ্জির চুলকুনির কথা পর্যন্ত ভুলে গিয়েছেন। আমরা দু’তিনবার স্মরণ করিয়ে দেবার পর গেঞ্জিটা তাঁর শ্রীঅঙ্গ থেকে ডিগ্রেডেড্ হল।

তিন দিন ছুটির পর ফের বাংলা ক্লাস বসেছে। পণ্ডিতমশাই টেবিলের উপর পা তুলে দিয়ে ঘুমুচ্ছেন, না শুধু চোখ বন্ধ করে আছেন ঠিক ঠাহর হয়নি বলে তখনো গোলমাল আরম্ভ হয়নি।

কারো দিকে না তাকিয়েই পণ্ডিতমশাই হঠাৎ ভরা মেঘের ডাক ছেড়ে বললেন, ‘ওরে ও শাখামৃগ।’

নীল যাঁহার কণ্ঠ তিনি নীলকণ্ঠ- যোগারূঢ়ার্থে শিব। শাখাতে যে মৃগ বিচরণ করে সে শাখামৃগ, অর্থাৎ বাঁদর- ক্লাসরূঢ়ার্থে আমি উত্তর দিলুম, ‘আজ্ঞে’।

পণ্ডিতমশাই শুধালেন, ‘লাট সায়েবের সঙ্গে কে কে এসেছিল বল তো রে।’

আমি সম্পূর্ণ ফিরিস্তি দিলুম। চাপরাসী নিত্যানন্দকেও বাদ দিলুম না। বললেন,'হল না। আর কে ছিল?'

বললুম, 'ঐ যে বললুম, একগাদা, এডিসি না প্রাইভেট সেক্রেটারি না আর কিছু সঙ্গে ছিলেন। তাঁরা তো ক্লাসে ঢোকেননি।'

পণ্ডিতমশাই ভরা মেঘের গুরু গুরু ডাক আরো গম্ভীর করে শুধালেন, 'এক কথা বাহান্ন বার বলছিস কেন রে মুঢ়? আমি কালা না তোর মতো অলম্বুষ?'

আমি কাতর হয়ে বললুম, 'আর তো কেউ ছিল না পণ্ডিতমশাই, জিজ্ঞেস করুন না পদ্মলোচনকে, সে তো সবাইকে চেনে।'

পণ্ডিতমশাই হঠাৎ চোখ মেলে আমার দিকে দাঁতমুখ খিঁচিয়ে বললেন, 'ওঃ উনি আবার লেখক হবেন। চোখে দেখতে পাসনে, কানা, দিবান্ধ- রাত্র্যন্ধ হলেও না হয় বুঝতুম। কেন? লাট সায়েবের কুকুরটাকে দেখতে পাসনি? এই পর্যবেক্ষণ শক্তি নিয়ে-'

আমি তাড়াতাড়ি বললুম, 'হাঁ, হাঁ, দেখেছি। ও তো এক সেকেন্ডের তরে ক্লাসে ঢুকেছিল।'

পণ্ডিতমশাই বললেন, 'মর্কট এবং সারমেয় কদাচ একগৃহে অবস্থান করে না। সে কথা যাক। কুকুরটার কি বৈশিষ্ট্য ছিল বল তো।'ভাগ্যিস মনে পড়ল। বললুম, 'আজ্ঞে, একটা ঠ্যাং কম ছিল বলে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছিল।' 'হু' বলে পণ্ডিতমশাই আবার চোখ বন্ধ করলেন।

অনেকক্ষণ পর বললেন, ‘শোন। শুক্রবার দিন ছুটির পর কাজ ছিল বলে অনেক দেরিতে ঘাটে গিয়ে দেখি নৌকোর মাঝি এক অপরিচিতের সঙ্গে আলাপ করছে। লোকটা মুসলমান, মাথায় কিস্তিটুপী। আমাকে অনেক সেলাম-টেলাম করে পরিচয় দিল, সে আমাদের গ্রামের মিম্বর উল্লার শালা, লাট সায়েবের আরদালি, সায়েবের সঙ্গে এখানে এসেছে, আজকের দিনটা ছুটি নিয়েছে তার দিদিকে দেখতে যাবে বলে। ঘাটে আর নৌকা নেই। আমি যদি মেহেরবানি করে একটু স্থান দিই।’

পণ্ডিতমশায়ের বাড়ি নদীর ওপারে, বেশ খানিকটে উজিয়ে। তাই তিনি বর্ষাকালে নৌকোয় যাতায়াত করতেন আর সকলকে অকাতরে লিফ্ট দিতেন।

পণ্ডিতমশায় বললেন, 'লোকটার সঙ্গে কথাবার্তা হল। লাট সায়েবের সব খবর জানে, তোর মতো কানা নয়, সব জিনিস দেখে, সব কথা মনে রাখে। লাট সাহেবের কুকুরটার একটা ঠ্যাং কি করে ট্রেনের চাকায় কাটা যায় সে-খবরটা ও বেশ গুছিয়ে বলল।'

তারপর পণ্ডিতমশাই ফের অনেকক্ষণ চুপ করে থাকার পর আপন মনে আস্তে আস্তে বললেন, 'আমি, ব্রাহ্মণী, বৃদ্ধা মাতা, তিন কন্যা, বিধবা পিসি, দাসী একুনে আমরা আটজনা।

তারপর হঠাৎ কথা ঘুরিয়ে ফেলে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'মদনমোহন কি রকম আঁক শেখায় রে?'

মদনমোহনবাবু আমাদের অঙ্কের মাস্টার- পণ্ডিতমশায়ের ছাত্র। বললুম, 'ভালই পড়ান।'

পণ্ডিতমশাই বললেন, 'বেশ বেশ। তবে শোন। মিম্বর উল্লার শালা বলল, লাট সায়েবের কুত্তাটার পিছনে মাসে পঁচাত্তর টাকা খরচ হয়। এইবার দেখি, তুই কি রকম আঁক শিখেছিস। বল তো দেখি, যদি একটা কুকুরের পেছনে মাসে পঁচাত্তর টাকা খরচা হয়, আর সে কুকুরের তিনটে ঠ্যাং হয় তবে ফি ঠ্যাঙের জন্য কত খরচ হয়?'

আমি ভয় করেছিলুম পণ্ডিতমশাই একটা মারাত্মক রকমের আঁক কষতে দেবেন। আরাম বোধকরে তাড়াতাড়ি বললুম, 'আজ্ঞে, পঁচিশ টাকা।'

পণ্ডিতমশাই বললেন, 'সাধু, সাধু!'

তারপর বললেন, উত্তম প্রস্তাব। অপিচ আমি, ব্রাহ্মণী, বৃদ্ধা মাতা, তিন কন্যা, বিধবা পিসি, দাসী একুনে আটজন, আমাদের সকলের জীবন ধারণের জন্য আমি মাসে পাই পঁচিশ টাকা। এখন বলতো দেখি, তবে বুঝি তোর পেটে কত বিদ্যে, এই ব্রাহ্মণ পরিবার লাট সায়েবের কুকুরের ক'টা ঠ্যাঙের সমান?'

আমি হতবাক্।

'বল না।'

আম মাথা নীচু করে বসে রইলুম। শুধু আমি না, সমস্ত ক্লাস নিস্তব্ধ।

পণ্ডিতমশাই হুঙ্কার দিয়ে বললেন, 'উত্তর দে।'

মূর্খের মতো একবার পণ্ডিতমশায়ের মুখের দিকে মিটমিটিয়ে তাকিয়েছিলুম। দেখি সে মুখ লজ্জা, তিক্ততা, ঘৃণায় বিকৃত হয়ে গিয়েছে।

ক্লাসের সব ছেলে বুঝতে পেরেছে- কেউ বাদ যায়নি- পণ্ডিতমশাই আত্ম-অবমাননার কি নির্মম পরিহাস সর্বাঙ্গে মাখছেন, আমাদের সাক্ষী রেখে।

পণ্ডিতমশাই যেন উত্তরের প্রতীক্ষায় বসেই আছেন। সেই জগদ্দল নিস্তব্ধতা ভেঙে কতক্ষণ পরে ক্লাস শেষের ঘন্টা বেজেছিল আমার হিসেব নেই।

এই নিস্তব্ধতার নিপীড়ন স্মৃতি আমার মন থেকে কখনো মুখে যাবে না।

'নিস্তব্ধতা হিরণ্ময়', 'Silence is golden' যে মূর্খ বলেছে তাকে যেন মরার পূর্বে একবার কলা-একলি পাই।

২.৩   পাঠসূত্র

‘চাচা কাহিনী’র দ্বিতীয় পর্বে অনেকগুলো সংকলিত রচনার অন্যতম রচনা 'পাদটীকা'। চিফ কমিশনার শাসিত অবিভক্ত আসাম প্রদেশের সিলেট জেলায় ঔপনিবেশিক শাসন পুরোপুরি কায়েম হয়ে যাওয়ার ফলশ্রুতি হিসেবে ভারতীয় উপমহাদেশের এ প্রান্তিক জেলার ঐতিহ্যমণ্ডিত টোল, চতুষ্পাঠীসমূহের প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থা যেমন নড়বড়ে হয়ে যায় তেমনি এতে নিয়োজিত পণ্ডিতদের পেশায় ঘনিয়ে আসে চরম দুর্দিন। যুগের হাওয়ায় একদিকে ইংরেজি ইস্কুলের জয়জয়কার, এবং অপরদিকে টোল চতুষ্পাঠী হতে লাগল জনশূন্য।

সিলেট জেলা একসময় সংস্কৃত পঠনপাঠনে বিশেষ সম্মানের জায়গায় অধিষ্ঠিত ছিল এ তো সর্বজন বিদিত। সেকালে একটা আপ্তবাক্য ছিল, 'শ্রীহট্টে মধ্যমা নাস্তি'। অর্থাৎ সিলেটে নিম্নমেধা তো দূর, মধ্যমেধারও কোন স্থান ছিল না। এ হেন গৌরবের উত্তরাধিকারী এক তর্কালঙ্কার কিংবা কাব্যবিশারদ বিংশ শতকের দুইয়ের দশকে কোনও এক চতুষ্পাঠী থেকে ছিটকে পড়লেন একটি সরকারি স্কুলে এবং সরকার বাহাদুরের দাক্ষিণ্য পঁচিশ টাকা মাইনেতে বাংলার শিক্ষক পদে বহাল হলেন। কোনও ক্রমে দিন যাপনের ক্লেশ স্বীকারই এখন তাঁর ভবিতব্য। গল্পের কেন্দ্রে এ বৃদ্ধ সাত্বিক পণ্ডিত একদিন লাট সাহেবের (চিফ কমিশনার) আগমন উপলক্ষে গায়ে একটি পাঁচসিকে মূল্যের পোশাক চাপিয়ে আসতে বাধ্য হলেন। শাস্ত্রীয় আচার বাঁচাতে সেলাই করা বস্ত্র পরিধানের চেয়ে মেশিনে বোনা আনকোরা এ গেঞ্জি গায়ে চাপানো ছাড়া তো ধর্মরক্ষা অসম্ভব।

দেবভাষার প্রতি প্রবল অনুরাগবশত যিনি পঠনপাঠন, বাক্যালাপেও যথাক্রমে তদ্ভবজাতীয় শব্দ এবং প্রাকৃত বাক্যরীতি এড়িয়ে চলেন, কৌলিক পেশার গৌরবজনক অবস্থান থেকে এ স্খলনে তিনি স্বাভাবিক ভাবেই চিরকালীন বিষাদময় থাকবেন এতে কোন সন্দেহ নেই। স্কুলে প্রাকৃত ভাষার ছোঁওয়া বাঁচিয়ে, ছাত্রদের উদ্দেশে যুৎসই সব সংস্কৃত ভর্ৎসনা বাক্য ঝেড়ে যতটুকু সম্ভব ঝিমিয়ে ঘুমিয়ে কাটিয়ে দেওয়াই তাঁর দৈনিককৃত্য। নিখিল বিশ্বের প্রতি তাঁর নীরব অভিমান, রাগ। ছাত্রজীবনে সংস্কৃতে নিরতিশয় অজ্ঞ, তাঁরই অধম প্রাক্তন ছাত্র, বর্তমানে প্রধান শিক্ষকের কিচ্ছুটি বলার এক্তেয়ার নেই, একমাত্র লাট সাহেবের সম্মানার্থে উত্তমাঙ্গে একটি আচ্ছাদনের অনুরোধ করা ছাড়া। লাট সাহেবের দলবল নিয়ে নির্ধারিত দিনে এলেন। এ হেন কর্তাব্যক্তির সহাস্য সম্ভাষণে পণ্ডিতমশায়ের একেবারে বেসামাল দশা।

পণ্ডিতমশাইয়ের পূর্বপর নাজেহাল হওয়া, উদ্ভট পোশাক নিয়ে সহকর্মীদের হাসি ঠাট্টা মস্করা, খসখসে বস্ত্রটি গায়ে চাপিয়ে তাঁর গব্ব যন্ত্রণা ইত্যাদির সমস্ত বর্ণনাই তাঁরই স্নেহধন্য। একটি ছাত্রের বয়ানে- যে ছাত্রটিকে তিনি বাঁদরের পরিবর্তে ‘শাখামৃগ’, ‘দ্রাবিড়সম্ভূত’ বচে সম্বোধন করতেন। প্রচুর হাস্যকর ঘটনার মিশ্রণে আখ্যানটির প্রথম পর্ব শেষ হলে তিনদিন ছুটির পর প্রথম যেদিন স্কুল বসল পণ্ডিতমশাই ছাত্রদের লাট-চর্চার খেই ধরে তাঁর সঙ্গে নিয়ে। আসা তিন পা’ওয়ালা সারমেয়টির প্রসঙ্গ উত্থাপন করে জানালেন তাঁর কাছে খবর আছে। জন্তুটির পেছনে মাসিক খরচা পঁচাত্তর টাকা। নির্ভরযোগ্যসূত্রে প্রাপ্ত এ তথ্যটি পরিবেশন করে পণ্ডিতমশাই প্রশ্ন রাখলেন আটজনের সংসার চালাতে তাঁর মাসিক মাইনে যদি হয় পঁচিশ টাক তবে তিন ঠ্যাঙের এ সারমেয়র তুলনায় তাঁর অবস্থানটি কোথায়? অর্থাৎ তাঁর পুরো পরিবার লাটসাহেবের কুকুরের ক'টি ঠ্যাঙের সমান? উত্তর না পেয়ে পণ্ডিতের লজ্জা, ঘৃণায় মিশ্রিত হুঙ্কার, ‘উত্তর দে’, এবং সারা ক্লাস জুড়ে অসীম নৈঃশব্দ্য। এ নিস্তব্ধার পীড়ন বুঝি কখনওই ঘুচবার নয়।

২.৪   বিশেষ পাঠ

ঔপনিবেশিক ইতিহাসের বাস্তব প্রেক্ষাপটে এ গল্পটির কথক অর্থাৎ first person nar rator-এর মধ্যে লেখক সৈয়দ মুজতবা আলীকেও খুঁজে পাওয়া অসম্ভব নয়। যে পণ্ডিতমশাইয়ের চিত্র এখানে অঙ্কিত হয়েছে এর মধ্যে হারিয়ে যাওয়া একটা ঐতিহ্যের শেষ প্রতিনিধিকে আবিষ্কার করা সহজ। বিংশ শতকের চল্লিশ-পঞ্চাশের দশক পর্যন্ত সরকারি ইসকুল কমনরুমের একটি নিভৃত প্রান্তে এদের প্রতিনিধিদের সাক্ষাৎ পাওয়া যেত। অভাব, অনটন সামাজিক উপেক্ষা সহ্য করেও সনাতন ধর্মের প্রতি গভীর আস্থা, দেবভাষার এবং শাস্ত্রীয় বিধানের প্রতি নিষ্ঠা, ব্যাকরণের উপর অগাধ জ্ঞান, এবং সে সঙ্গে এক একজনের নিজস্ব খ্যাপামো, পাগলামো নিয়ে ওদের দিনযাপনের গ্লানি আজ ইতিহাস। এই সামাজিক পালাদলের নির্মম শিকার মাস্টারমশাইয়ের অবস্থা প্রত্যক্ষ করেছে স্কুলের এক খুদে পড়ুয়া। তাঁর বর্ণনার সঙ্গে ফরাসি গল্পকারের সেই কথক ফ্রান্সের (The Last Lesson গল্পের) সঙ্গে কোথায় যেন একটা মিল রয়েছে। অসহায় শিক্ষাব্রতীর করুণ পরিণতি দু'জনকেই বিচলিত করেছে, যদিও পরিপ্রেক্ষিতে বিস্তর তফাৎ।

এ পড়ুয়া-কথক শিশুর সারল্যে লক্ষ করেছে যে বাংলাভাষার প্রতি পণ্ডিতমশায়ের অকৃত্রিম অশ্রদ্ধা, ঘৃণা; তাঁরই ছাত্র বর্তমান হেডমাস্টার যে লেখাপড়ায় ছিলেন ‘হস্তিমূর্খ’, এ কথাটি তিনি রাখঢাক না করেই বলতেন এবং ছাত্ররা তাঁকে খুশমেজাজে রাখতে প্রয়োজনে এ প্রসঙ্গটি উত্থাপন করত, ঠিক যেমনটি করত অলিভার গোল্ডস্মিথের 'ভিলেজ স্কুলমাস্টার' কবিতার ছেলেরা। ছাত্রদের উদ্দেশ্যে বিদ্যালয়ে না এসে চাষবাসে চলে যাবার উপদেশবাক্যটি দ্বি-সহস্রবারের জন্য উচ্চারণ সমাপনান্তে তাঁর দিবানিদ্রা, অথবা কৃপাপরবশ হয়ে দুচার ছত্র ব্যাকরণ পড়িয়ে মুর্খদের কাছে এসব বিদ্যাদান যে নিস্ফল প্রয়াস তা জানিয়ে ক্ষান্ত দিতেন। পণ্ডিতমশাইয়ের গাঢ় ঘুম নাকি টোল হারানোর অসহ্য যন্ত্রণার উপসম হিসেবে ঈশ্বরেরই ব্যবস্থা।

প্রাদেশিক বড়কর্তা এন.ডি. (নন্দদুলাল নয় মোটেই, সাহেবের নাম নিকোলাস ডড) বিটসন বেল যে একজন অতিশয় সজ্জন ইংরেজ সিভিলিয়ান ছিলেন এটা ইতিহাসই। তিনি ১৯১৮ সালে প্রথমে আসামের চিফ কমিশনার এবং ১৯২১ সালে আসামের গভর্নরেরও দায়িত্ব পালন করেন। তবে তাঁর মাথার 'একটু ছিট'-এর ব্যাপারটি সম্ভবত গল্প। (না হলে তো এটা হত নিছক একটি প্রতিবেদন, আর ঘণ্টা বাজানোর ব্যাপারটি বড়ো সুন্দর মিলে গেছে ঘটনার সঙ্গে)। সারমেয় উপাখ্যানটির সংযোজনে প্রতিবেদনটির গল্পে উত্তরণ সম্ভব হল। এরপর সেই চরম ক্লাইমেক্স। ক্লাস শেষের ঘণ্টা বাজা তক্ অসহ্য নিস্তব্ধতা বুকের মধ্যে যেন পাথর চাপা হয়ে রইল। ডকুমেন্টেশনের স্তর থেকে সার্থক একটি ছোটগল্পে এ উত্তরণ শৈল্পিক দিকে সার্থক হয়ে উঠেছে। আর শেষ উক্তটি, ‘নিস্তব্ধতা হিরণ্ময়... যে মূর্খ বলেছে...’ ইত্যাদি তো একটি চমৎকার অ্যান্টি ক্লাইম্যাক্স।

মুজতবা আলীর রচনার বৈশিষ্ট্য হল এর প্রসাদগুণ। আমাদের আশপাশের ঘটনা থেকে দূর বিদেশের ঘটনা, প্রাত্যহিক অভিজ্ঞতালব্ধ বিষয়বস্তু থেকে গভীর অন্বেষণলব্ধ তথ্য, তত্ত্ব তাঁর লেখার বিষয় হয়ে ওঠে। তাঁর গল্প উপন্যাসে মিশে থাকে তত্ত্ব, আর তত্ত্বকথায় লেগে থাকে গল্পের ছোঁয়া। অবশ্য প্রাবন্ধিক মুজতবা আলী মাঝে মাঝে (নাকি প্রায়শই) কথাকার-মুজতবাকে ছাপিয়ে যান। তাঁর প্রতিবেদনগুলোতে যেমন থাকে গল্পের আদল, তেমনি আবার গল্পে থাকে প্রতিবেদনের চরিত্রলক্ষণ। এ ক্ষেত্রে ‘পাদটীকা’ও ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু প্রতিবেদনের ঢঙে শুরু হওয়া এ গল্পটি সমাপ্তিতে এমন মাত্রায় পৌঁছায় যে এটা হয়ে ওঠে এক করুণ মানবিক দলিল। নামগোত্র বিহীন পণ্ডিতমশাইয়ের হাহাকার সামাজিক বিবর্তনে বিপন্ন একটি যুগ, একটি প্রান্তিকায়িত প্রজন্মের মূক প্রতিবাদে মুখর হয়ে ওঠে।

ইতিহাসের মূল পরিসরে নয়, প্রান্তবর্তী অবস্থান, অর্থাৎ পাদটীকা থেকে এ পণ্ডিতমশাইকে মুখ্যভূমিকায় তুলে এনেছেন লেখক। এত চমৎকার ডকুমেন্টারি-ফিকশনের নিদর্শন এ গল্পটি বাংলা সাহিত্যে অভিনব না হলেও সহজলভ্য নয়।

অনুশীলন - (খ)
১)       সংক্ষিপ্ত উত্তর লিখুন : -
  1. ‘পাদটীকা’ গল্পে পণ্ডিতমশায়ের মুখে যে সব সংস্কৃত ভর্ৎসনার শব্দ শোনা গেছে এর একটা তালিকা তৈরি করুন।
  2. স্কুলটির অবস্থান কোথায় ছিল? এতে কোন সময়ের কথা বলা হয়েছে?
  3. তৎকালীন সময়ের পণ্ডিতদের কী কী উপাধি ছিল?
  4. যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মড়ক লেগেছিল এগুলো কী?
  5. টোল, চতুষ্পাঠীগুলোর অবক্ষয় কেন শুরু হল?
২)       উত্তর লিখুন : -
  1. সংস্কৃত বা বাংলার শিক্ষকতায় নিযুক্ত পণ্ডিতদের পারিশ্রমিক কী রকম ছিল?
  2. পণ্ডিতদের কোন বিশেষ স্বাভিমানের কথা এখানে বর্ণিত হয়েছে?
  3. পণ্ডিতমশাই বাংলা ব্যাকরণের ঠিক কোন্ বিষয়টির বাইরে পড়াতেনই না?
  4. ক্লাসে কী ভাবে বসতেন পণ্ডিতমশাই, এবং অধিক সময়টি কী ভাবে কাটাতেন।
  5. গল্পের কথক ছাত্রটিকে পণ্ডিতমশাই কীসের জন্য বিশেষ স্নেহ করতেন?
৩)       উত্তর লিখুন : -
  1. গল্পে বর্ণিত পণ্ডিতমশাইয়ের চেহারা, বেশভূষার একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিন।
  2. হেড মাস্টারের প্রতি তিনি কী ধারণা পোষণ করতেন? এর কারণ কী?
  3. ছাত্ররা পণ্ডিতমশাইকে খুশি করার জন্য কী প্রসঙ্গ উত্থাপন করত?
  4. বিদ্যাদান করার আগে ও পরে পণ্ডিতমশাই ছাত্রদের কী উপদেশ ও পরামর্শ দিতেন।
  5. পণ্ডিতমশাইয়ের গালাগালির ভাষা সম্বন্ধে লেখক কী অভিমত পোষণ করেন?
৪)       উত্তর লিখুন : -
  1. বিটসন বেল সম্বন্ধে একটি সংক্ষিপ্ত পরিচিতি লিখুন। তাঁর ঐতিহাসিকতা কতটুকু বাস্তবসম্মত আপনার মনে হয়?
  2. গল্পে যম এবং যমপত্নী প্রসঙ্গটি কী? এখানে কতটুকু যথাযথ এ প্রসঙ্গ?
  3. শাখামৃগ, দাবিড়সম্ভূত শব্দের অর্থ কী?
  4. বাংলা ভাষার প্রতি পণ্ডিতমশাইয়ের মনোভাব নিয়ে কথকের পর্যবেক্ষণ কী?
  5. ক্লাসের জ্যেঠাছাত্রটির নাম কী? তার উপর একটি সংক্ষিপ্ত টিকা লিখুন।
৫)       উত্তর লিখুন : -
  1. কথাকার মুজতবা আলীর প্রধান সাহিত্যকৃতির চরিত্রলক্ষণ কী?
  2. গল্পটির নামকরণের তাৎপর্য কী?
  3. ‘পাদটীকা’ গল্পটি তৎকালীন সমাজবাস্তবতার একটি করুণ দলিল- এর যথার্থ্য প্রমাণ করুন।
  4. ডকুমেন্টারি গল্প বলতে কী বোঝয়? কোন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে গল্পটি একটি প্রতিবেদনের স্তর অতিক্রম করে গল্প হয়ে উঠেছে।
৬)       উত্তর লিখুন : -
  1. ‘পাদটীকা’ গল্পটি ‘ছোটগল্প’ হিসেবে কি সার্থক? গল্পটির তথ্যগত মূল্য কি এর শৈল্পিক মানকে ক্ষুণ্ণ করেছে?
  2. গল্পটির আত্মজৈবনিক উপাদানের কী কী সংকেত এখানে স্পষ্ট?
  3. গল্পটির সাম্প্রতিককালীন কোনও প্রাসঙ্গিকতা এখানে আছে কি?
  4. বাংলা ভাষায় তৃতীয় ভুবনের কোন বিশেষ চরিত্রলক্ষণ এখানে পরিস্ফুট?।


২.১   লেখক পরিচিতি

বনফুল (১৮৯৯ - ১৯৭৯): বিহারের পূর্ণিয়া জেলায় চিকিৎসক পিতার (ডা. সত্যচরণ মুখোপাধ্যায়) কর্মস্থল মনিহারিতে জন্ম। ভাগলপুরে আজীবন চিকিৎসা বিভাগে কাজ করার পর শেষ জীবনে কলকাতার স্থায়ী বাসিন্দা হন। তবে ইতিমধ্যে বাংলার বাইরে থেকেই বনফুল ছদ্মনামে গল্প, উপন্যাস, কবিতা নাটক লিখে বাংলা সাহিত্যে বিশেষ প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। ‘স্থাবর’, ‘জঙ্গম’, ‘মন্ত্রমুগ্ধ’, ‘হাটেবাজারে’, ‘কিছুক্ষণ’, ‘বিন্দুবিসর্গ’, ‘দ্বৈরথ’ ‘ভীমপলশ্রী’, ‘ভুবন সোম’ প্রভৃতি উপন্যাস ছাড়াও অসংখ্য ছোটগল্প লিখেছেন। রবীন্দ্র পুরস্কার। জগত্তারিনী পদক প্রাপ্ত বনফুল ভাগলপুর এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডি, লিট উপাধিতের ভূষিত হন। স্বল্প পরিসরে গভীর তত্ত্ববহুল, অতীব সুখপাঠ্য গল্প লিখে ইতিহাস সৃষ্টি করেন। এক পৃষ্ঠা, এমনকি একটি পোস্টকার্ডের কয়েক ইঞ্চি পরিসরেই তিনি সার্থক গল্প লিখে নিতে পেরেছেন। তাঁর গল্প অবলম্বনে মৃণাল সেন, তপন সিনহা, হৃষীকেশ মুখোপাধ্যায়ের মতো নির্মাতারা সার্থক চলচ্চিত্র তৈরি করেছেন। মৃণাল সেনের ‘ভুবন সোম’ ছবির খ্যাতি দেশ বিদেশেও ছড়িয়েছে। ‘বনফুল’-এর আসল নাম হল বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়।

২.২   মূলপাঠ
নিমগাছ
বনফুল
নিমগাছ
বনফুল

কেউ ছালটা ছাড়িয়ে নিয়ে সিদ্ধ করছে। পাতাগুলো ছিঁড়ে শিলে পিষছে কেউ। কেউ বা ভাজছে গরম তেলে। খোস দাদ হাজা চুলকানিতে লাগাবে। চর্মরোগের অব্যর্থ মহৌষধ। কচি পাতাগুলো খায়ও অনেক। এমনি কাঁচাই.... কিংবা ভেজে বেগুন-সহযোগে। যকৃতের পক্ষে ভারি উপকার। কচি ডালগুলো ভেঙে চিবোয় কত লোক..... দাঁত ভাল থাকে। কবিরাজরা প্রশংসায় পঞ্চমুখ। বাড়ির পাশে গজালে বিজ্ঞরা খুশি হ’ন। বলে নিমের হাওয়া ভাল, থাক, কেটো না। কাটে না, কিন্তু যত্নও করে না। আবর্জনা জমে এসে চারিদিকে। শান দিয়ে বাঁধিয়েও দেয় কেউ -- সে আর এক আবর্জনা। হঠাৎ একদিন একটা নূতন ধরনের লোক এল। মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে রইল নিমগাছের দিকে। ছাল তুললে না, পাতা ছিঁড়লে না, ডাল ভাঙলে না, মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে রইল শুধু। বলে উঠল, বাঃ, কি সুন্দর পাতাগুলি.... কি রূপ!।

কেউ ছালটা ছাড়িয়ে নিয়ে সিদ্ধ করছে। পাতাগুলো ছিঁড়ে শিলে পিষছে কেউ। কেউ বা ভাজছে গরম তেলে। খোস দাদ হাজা চুলকানিতে লাগাবে। চর্মরোগের অব্যর্থ মহৌষধ। কচি পাতাগুলো খায়ও অনেক। এমনি কাঁচাই.... কিংবা ভেজে বেগুন-সহযোগে। যকৃতের পক্ষে ভারি উপকার। কচি ডালগুলো ভেঙে চিবোয় কত লোক..... দাঁত ভাল থাকে। কবিরাজরা প্রশংসায় পঞ্চমুখ। বাড়ির পাশে গজালে বিজ্ঞরা খুশি হ’ন। বলে নিমের হাওয়া ভাল, থাক, কেটো না। কাটে না, কিন্তু যত্নও করে না। আবর্জনা জমে এসে চারিদিকে। শান দিয়ে বাঁধিয়েও দেয় কেউ -- সে আর এক আবর্জনা। হঠাৎ একদিন একটা নূতন ধরনের লোক এল। মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে রইল নিমগাছের দিকে। ছাল তুললে না, পাতা ছিঁড়লে না, ডাল ভাঙলে না, মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে রইল শুধু। বলে উঠল, বাঃ, কি সুন্দর পাতাগুলি.... কি রূপ!

থোকা থোকা ফুলেরই বা কী বাহার.... এক ঝাঁক নক্ষত্র নেমে এসেছে যেন নীল আকাশ থেকে সবুজ সায়রে। বাঃ-

খানিকক্ষণ চেয়ে থেকে চলে গেল।

কবিরাজ নয়, কবি।

নিমগাছটার ইচ্ছে করতে লাগল লোকটার সঙ্গে চলে যায়। কিন্তু পারলে না। মাটির ভিতরে শিকড় অনেক দূরে চলে গেছে। বাড়ির পিছনে আবর্জনার স্তূপের মধ্যেই দাঁড়িয়ে রইল সে।

ওদের বাড়ির গৃহকর্ম-নিপুণা লক্ষ্মী বউটার ঠিক এক দশা।

থোকা থোকা ফুলেরই বা কী বাহার.... এক ঝাঁক নক্ষত্র নেমে এসেছে যেন নীল আকাশ থেকে সবুজ সায়রে। বাঃ-

খানিকক্ষণ চেয়ে থেকে চলে গেল।

কবিরাজ নয়, কবি।

নিমগাছটার ইচ্ছে করতে লাগল লোকটার সঙ্গে চলে যায়। কিন্তু পারলে না। মাটির ভিতরে শিকড় অনেক দূরে চলে গেছে। বাড়ির পিছনে আবর্জনার স্তূপের মধ্যেই দাঁড়িয়ে রইল সে।

ওদের বাড়ির গৃহকর্ম-নিপুণা লক্ষ্মী বউটার ঠিক এক দশা।

২.৩    পাঠসূত্র

এটা আক্ষরিক অর্থেই ছোটগল্প। অনেকে অণুগল্পও বলতে চান। এর পরিসর নিতান্তই সংকীর্ণ, ব্যাপ্তি ও গভীরতা বহুদুর বিস্তৃত। অবহেলিত এক গৃহবধুর বৃক্ষ হয়ে ওঠার এ প্রতীকী কাহিনির মধ্যে আধুনিক ছোটগল্পের সমস্ত চরিত্রলক্ষণ পরিস্ফুট। মানবী প্রতীকী এ ঔষধিবৃক্ষটির ডালপালা, গায়ের ছাল, পাতা এমনকি বৃক্ষের হাওয়া সমস্ত কিছুই মানুষের অতিপ্রয়োজনীয়, তাই এর গোড়ায় কুঠার লাগানো নিষেধ, কিন্তু যখনখুশি ছাল ছাড়িয়ে নিয়ে যাও, ডাল ভেঙে নিয়ে যাও মাজনের জন্য, পাতা নিয়ে যাও ভেজে খাবার জন্য, রোগের নিরাময়ের জন্য- কিন্তু গাছের তলাটি আবর্জনামুক্ত করে রাখা, গোড়ায় একটু জল দেওয়া, গাছের সৌন্দর্যের দিকে একটু তাকানো- নৈব নৈব চঃ। গাছটির নিজস্বতা নয়, মানুষের প্রয়োজনীতাই এখানে গণ্য। গাছটির চারপাশে কেবলই স্বার্থপরদের আনাগোনা। এরই মাঝে এক ব্যক্তির আত্মপ্রকাশ গল্পটির মাত্রা ঘুরিয়ে দিল। ইনি কবি, কবি-রাজ নন, তিনিই আবিষ্কার করলেন নিমগাছটির প্রাণ, মুগ্ধ হলেন গাছটির অপরূপ সৌন্দর্যে। তাঁর চোখের চাউনিতে গাছটিতে হল প্রাণ প্রতিষ্ঠা। আমরা জানলাম এ গাছ আসলে পরিবারের লক্ষ্মী বধুটিই। প্রেমিক কবির উষ্ণতার আহ্বান শুনলেও, চারদিকে শান বাঁধানো সীমারেখা অতিক্রম করে বেরিয়ে আসা তাঁর পক্ষে অসম্ভব। তাঁর শিকড় অনেক গভীরে প্রবেশ করে ফেলেছে।

২.৪    বিশেষ পাঠ

দুই পৃষ্ঠা নয়, একটি পৃষ্ঠার মাত্র দুটো প্যারাগ্রাফে বিশাল একটা থিমকে ধারণ করা এ গল্পটি বার বার পাঠ করে প্রতিবারই নতুন ভাবনায় ডুবে যাওয়ার আহ্বান। আমাদের আত্মকেন্দ্রিক এ সমাজে স্বার্থপরতায় ঘেরা পারিবারিক প্রেক্ষিতে অবহেলিত বধুটি সামাজিক-পারিবারিক নিষ্পেষণে একটি নিশ্চল বৃক্ষে রূপান্তরিত হয়ে গেছে। তাঁর জাগতিক মূল্য অপরিসীম, কিন্তু তাঁর মনোজগতের খবর রাখার প্রয়োজন কেউই মনে করে না। রোগেসুখে অপরিহার্য এ নারীটি শুধু দিয়ে যাবে, তাঁর পাবার কিছুই নেই, তাঁর শরীরের প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গে সবার অধিকার সামাজিক ক্লেদ, আবর্জনার স্তুপের মধ্যিখানে দাঁড়িয়ে থাকা এ নারীটির দিকে (না বৃক্ষটির কেউই চোখ তুলে তাকালো না। আর অবশেষে যখন তাঁর কাছে প্রেমের আহ্বান এল, তখন বড্ড দেরী হয়ে গেছে। মায়ার বাঁধন, না শিকড়রূপী শৃঙ্খলের বাঁধন কেটে বেরিয়ে আসা তাঁর একেবারেই অসম্ভব। চিরকালীন নির্বাসনই তাঁর ভবিতব্য।

বৃহৎ পরিসরের একটি একটি উপন্যাস, কিংবা নাতিদীর্ঘ একটি গল্পের প্রশস্থ পরিসর যেখানে কাঙ্ক্ষিত সেখানে বনফুল নিপুণ তুলির একটি আঁচড়েই কাজটি সংকুলান করে নিলেন তিনি দীর্ঘ কাহিনি বলতে বসেন নি, কিন্তু পাঠকের মনের ভেতর কাহিনি তৈরি হয়ে ওঠা ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। তিনি তো পাঠকের মনটাকে সৃজনশীল করে তুলেছেন, তাই পাঠকের মনের ভেতরই এ গল্পের বিস্তার। নির্মাণের ভার লেখক নিজের উপর নেন নি। পাঠককে স্রষ্টা বানিয়ে তোলাতেই তাঁর কৃতিত্ব।

গল্পলেখার প্রচলিত ধারণাকে বনফুল ভেঙে দিয়েছেন। রাবীন্দ্রিক গদ্যে অভ্যস্থ পাঠক যখন ভিন্ন ধারায় অভ্যস্ত হতে শেখেনি, বনফুলের প্রয়াস তখন একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপই বটে। কখনও পুকুর, কখনও গঙ্গা, কখনও তাজমহল, কখনও অর্জুন মন্ডল বা আর কেউ এসব নিয়ে ছোটগল্পে রীতিমত অতলান্তিক সমুদ্রের গভীরতা, মেদহীন ঝরঝরে ভাষায় তুলে আনায় তিনি সার্থক।

সীমিত পরিসরে, অল্প কথার বুননে একটা বিরাট কথার প্রকাশ। বাঙালি মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্তের সুখদুঃখ, আশা নিরাশার দোলাচলে এসব গল্পে সময়, স্থানের পার্থক্য দূরে সরে যায় এবং কাহিনিটিই পাঠকদের কখন যে সঙ্গী করে নেয় বোঝা যায় না।

বনফুলের গল্পগুলোর আকর্ষণীয় দিক হল এর অপ্রত্যাশিত মোচড়। শেষ পর্যন্ত না এলে বোঝা যায় না ঘটনা কোন দিকে যাচ্ছে। গল্পগুলোর একটা প্যাটার্ন থাকে, যা হল আন-পেডিক্টেবিলিটি। শুরু থেকেই নাটকীয়তা সৃষ্টির জন্য কাহিনির সঙ্গে সম্পর্কিত তথ্যগুলে আড়াল করে ক্লাইম্যাক্সে নিয়ে যাওয়া, এবং চমক লাগানো সমাপ্তি।

উল্লেখ রাখা প্রয়োজন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও গল্পের বর্ণনা শেষ করে সিদ্ধান্তটি পাঠকের উপর ছেড়ে দিতেন এবং এ জন্যেই গল্পগুলো মনে হত ‘শেষ হইয়াও হইল না শেষ’। ‘ছুটি’ গল্পে ফটিকের শেষ সংলাপ '’মা আমার ছুটি হয়েছে, আমি বাড়ি যাচ্ছি’। এরপর পাঠকের ভাবনার শুরু, লেখক নীরব। ‘ক্ষুধিত পাষাণ’ গল্পের কথক (First person narraror) কথা অসমাপ্ত রেখে ট্রেনের বাঁশি শুনে দৌড়ে গিয়ে গাড়িতে উঠে চলে গেলেন। রহস্যের যে জাল তিনি বুনেছিলেন এর সমাধান তো একমাত্র তাঁর কাছে। কিন্তু তিনি তো আর বসে নেই। অসমাধিত এ প্রশ্ন নিয়ে পাঠকদের ভাবনারও আর শেষ নেই।

অনুশীলন - (গ)
 (১)
গল্পটির থিম কী? এর প্লট নির্মাণের উপর আপনার নিজস্ব মন্তব্য লিখুন।
(১ম ষাণ্মাসিক, ১২ বইয়ের ৬৯-৭০ পৃ-দেখুন)
 (২)
বাংলা ছোটগল্পে বনফুলের ঠিক কী বৈশিষ্ট্য এখানে প্রতিফলিত হয়েছে?
 (৩)
ছোটগল্পের সংজ্ঞাটি কী, এবং এর সঙ্গে ‘নিমগাছ’ গল্পটির আঙ্গিক নিয়ে আপনান মন্তব্য লিখুন।
 (৪)
গল্পটির মুখ্য চরিত্র কে ? গাছ না কবি, না আর কেউ?
 (৫)
গল্পটিকে কি একটি ব্যর্থ প্রেমের কাহিনি হিসেবে দেখা যায়?

চতুর্থ পত্র
অধ্যায় - 
কথাসাহিত্য