rotateআপনার মুঠোফোনটি ল্যান্ডস্কেপে রাখুন।
পাঠ্যপুস্তক ৩য় পত্র - পাঁচ
বাংলা ভাষা ডিপ্লোমা পাঠক্রম
পাঠ্যপুস্তক
(তৃতীয় পত্র : অধ্যায়-পাঁচ : গণসংযোগ)
দ্বিতীয় ষাণ্মাসিক - তৃতীয় পত্র
বাংলা পাঠের গুরুত্বপূর্ণ স্তর : লিখন, পঠন এবং সৃজন
বাংলা পাঠের গুরুত্বপূর্ণ স্তর :
লিখন, পঠন এবং সৃজন
তৃতীয় পত্র   ❐   অধ্যায় -  পাঁচ
কমিউনিকেটিভ বাংলা
কমিউনিকেটিভ বাংলা
 
৫.০   উদ্দেশ্য   

এ পর্বটিতে যা জানতে পারবেন —

  1. কমিউনিকেশন অর্থাৎ গণসংযোগ সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা
  2. বিভিন্ন ধরনের কমিউনিকেশন বা গণসংযোগ
  3. মৌখিক এবং লিখিত গণসংযোগের বৈশিষ্ট্য
  4. মুদ্রণ এবং বৈদ্যুতিন মাধ্যমের ভাষা ও প্রয়োগ
  5. মৌখিক বচন এবং লিখিত ভাষায় দক্ষতা অর্জনের পন্থা
৫.১   ভূমিকা

বহুল প্রচলিত ইংরেজি শব্দ ‘কমিউনিকেশন’ আজকের দিনে যে অর্থ বহন করে গণসংযোগ বা জনসংযোগ বা যোগাযোগ বললে তা ঠিক বোঝানো যাচ্ছে না। মুদ্রণমাধ্যম বা বৈদ্যুতিন মাধ্যমের পরিপ্রেক্ষিতে এ শব্দটি গণমানসে এমন গ্রহণযোগ্যতা লাভ করেছে যে এ পাঠের শিরোনামটিতে ইংরেজি শব্দটিকে বসাতেই হচ্ছে। অবশ্য আমরা পাশাপাশি গণসংযোগ শব্দটিও রাখব। আর ব্যুৎপত্তিগত দিক দিয়ে গণ এবং কমিউনিটি (যেখান থেকে Communication-এর উৎপত্তি) তো সমার্থকই। আজকের দিনে কমিউনিকেশন বলতে মানুষ চট করে বুঝে নিতে পারছেন মিডিয়ার কথাই বলা হচ্ছে রেল যোগাযোগ, ডাক যোগাযোগ ইত্যাদির নয়। এখানে যা বোঝানো হচ্ছে, এর জন্য বাংলায় ‘প্রকাশ’ শব্দটি খুব অর্থবহ। আমরা সততই নিজেকে প্রকাশ করতে চাই- সেটা মুখোমুখি বসে কথা বলার সময়ই হোক্, সমবেত শ্রোতার সামনেই হোক্, বা হোক না কেন সৃজনশীল সাহিত্য, নাটক, সিনেমা চিত্রকলার মাধ্যমে, কিংবা চিঠিপত্রে।

প্রশ্ন জাগবে, আমরা কী প্রকাশ করতে চাই? আমরা নিজের মনোভাব অন্যের কাছে প্রকাশ করতে চাই, আমরা চাই ভালোবাসা জানাতে, সমর্থন করতে, তথ্য আদান প্রদান করতে, প্রশ্ন করতে, প্রশ্নের উত্তর দিতে, ক্রোধ, বিস্ময় প্রকাশ করতে, উচ্ছ্বাস, আনন্দ, বেদনা, দুঃখ শ করতে। আমরা চাই নিজেকে অপরের কাছে মেলে ধরতে, আমরা চাই নিজেকে আড়াল প্রকাশ করতেও।

যে নির্বাক ভিখিরিটি রাস্তার পাশে বসে থাকে, যে নিঃসঙ্গ পথিক মধ্যহের আকাশের দিকে তাকিয়ে নিশ্চুপ, কিংবা নির্জন মগ্ন ধ্যানস্থ সাধক, কিংবা মাঠের প্রান্তে বাঁশিতে সুরের ঢেউ তোলা বাঁশুরিয়া, বাজারে পসরা সাজিয়ে দুতারা বাজিয়ে ক্রেতাকে আহ্বান জানানো ফেরিওয়ালা- এদের সবারই মনের ভেতর রয়েছে এক ‘ভাষাহারা বিজন বেদনা’ যা সততই প্রকাশের জন্য ব্যাকুল।

এ প্রসঙ্গে আরও একটি ইংরেজি শব্দের কথা স্মরণ করতে হয়- mode। অর্থাৎ প্রকাশটি বা কমিউনিকেশনটি কোন ধারায় হচ্ছে সেটাও বিবেচনায় রাখতে হয়। এটা বাচনিক হতে পারে, লিখিত হতে পারে, আবার নির্বাক ভাষাহীন ভাষায় (ইংরেজিতে বলে non-verbal mode-এ)। ব্যবহারিক জীবনে এ প্রকাশ ক্ষমতাটি একটি পদ্ধতি অনুযায়ী অনুশীলনের মাধ্যমে অর্জন বা বৃদ্ধি করা সম্ভব। ভাষাশিক্ষার উদ্দেশ্যগুলোর অন্যতম হল মৌখিক বচনে বা লিখিত বয়ানে প্রকাশক্ষমতা বৃদ্ধি।

কমিউনিকেশন হচ্ছে একটি দ্বিমাত্রিক প্রক্রিয়া। একটি হল বার্তা জ্ঞাপন, আরেকটি হল বার্তা গ্রহণ। মানুষের যোগাযোগের অন্যতম উপাদান হল শব্দ- মৌখিক বা লিখিত। আর বাক্যবিহীন ভঙ্গিমারও একটা ভূমিকা আছে। তবে সংযোগের জন্য ভাষাজ্ঞানটা জরুরি। এ ভাষাজ্ঞান মানে ব্যাকরণের নিয়মকানুন, কূটকৌশল, খুঁটিনাটি বিষয় নয়, ভাষার প্রায়োগিক দিকটা বিশেষভাবে বুঝে নেওয়া। ব্যাকরণের কথা আসবে পরে। ব্যাকরণ ছাড়াও ভাষা প্রয়োগের ক্ষেত্রে কিছু সামাজিক প্রথা, শিষ্টাচার এবং পদ্ধতি আছে যা ছাড়া কেবলমাত্র ব্যাকরণ মাফিক বাক্যগঠনই ভাব বিনিময় বা গণসংযোগে যথেষ্ট নয়।

কোথায়, কোন প্রেক্ষিতে কী ভাষা ব্যবহার হবে, কোনটা হবে না সেটা না জানলে ভাষার প্রয়োগ বৃথা হবে, অর্থাৎ কমিউনিকেশন ব্যর্থ হবে। এটা তো একটা বিনিময়, উভয়পক্ষের গ্রহণ-উপযোগী শব্দ, প্রকাশভঙ্গি না হলে বিনিময় হবে না। বলা চলে এটা একটা Performing art, উপস্থাপনমূলক শিল্প। কথক বা প্রেরক যত অন্তরঙ্গভাবে পরিস্থিতি অনুযায়ী তাঁর বার্তা প্রেরণ করবেন, শ্রোতা বা গ্রহীতা যত বেশি তাঁর গ্রহণক্ষমতাকে বাড়াবেন ততই সংযোগ বা কমিউনিকেশন সার্থক হবে।

৫.২   কমিউনিকেশন কত প্রকারের

ইতিমধ্যে বলা হয়েছে, কমিউনিকেশন দুই প্রকারের, মৌখিক এবং লিখিত। মৌখিক সংযোগে কথক বা বক্তা শ্রোতা বা গ্রহীতার সামনেই কথা বলবেন, যাকে বলে মুখোমুখি আলাপ। এতে দু’জন খুব অন্তরঙ্গভাবে কথা বলতে পারেন, একাধিক ব্যক্তি শুনতে পারেন একজনের কথা, মাঝে মাঝে মন্তব্য বা প্রশ্নও করতে পারেন, অথবা অদৃশ্য শ্রোতার জন্য রেডিও-টিভির মাধ্যমেও কেউ বলতে পারেন। আজকাল রেডিও-টিভির অনুষ্ঠানেও শ্রোতা/দর্শক ঘরে বসেই, সরাসরি অংশগ্রহণও করতে পারেন তখন আর এসব অনুষ্ঠান একতরফা কথা বলার ব্যাপার না থেকে দু’জনের বা বহুজনের অংশগ্রহণে জমজমাট হয়ে ওঠাতে কোনো বাধা থাকে না।

টেলিফোন, ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমেও স্থানিক ব্যবধান অতিক্রম করে দূরদূরান্তে জনসংযোগের পথ খোলা রয়েছে। এ কথনের প্রত্যেকটিরই এক একটি নিজস্ব ধরন আছে। বিশেষ বিশেষ সংযোগ মাধ্যমের উপযোগী ভাষা, বাক্যগঠন, শব্দপ্রক্ষেপণ এবং সময় সচেতনতা ছাড়াও প্রেক্ষিত-সচেতনতাও গুরুত্বপূর্ণ।

দ্বিতীয় সংযোগটি হল লিখিত মাধ্যমে জনসংযোগ- ব্যক্তিগত চিঠিপত্র থেকে বিজ্ঞপ্তি, বিজ্ঞাপন, দেওয়াল লিপি, পত্রপত্রিকা, নিবন্ধ, প্রবন্ধ, সৃজনশীল সাহিত্য, আন্তর্জালে ব্লগ, ট্যুইটার, ফেসবুক ইত্যাদিতে লেখালেখির মাধ্যমে নিজের ভাবনা চিন্তা, যুক্তি, পরামর্শ, স্বপ্ন-দুঃস্বপ্ন, আশা আকাঙ্ক্ষা অন্যের কাছে পৌঁছে দেওয়া। এ এক ক্রম-বিস্তৃত যোগাযোগ-মাধ্যম, যার আদি থাকলেও অন্ত নেই।

আর তৃতীয় যে একটি কমিউনিকেশন যাকে আমরা উপেক্ষা করতে পারি না, তা হল চোখমুখ, হাতের ভঙ্গিমা, যার মাধ্যমে মৌখিক বচনকে আরও স্পষ্ট করে তোলা। এই না-বলা বাণীকে বলা যেতে পারে অন্য ভাষা।

জনসংযোগ বা কমিউনিকেশনের ভাষায় আরও দুটো বিভাজন রয়েছে: পোশাকি (ফর্ম্যাল), এবং ঘরোয়া (ইনফর্ম্যাল)।

আমাদের পোশাক পরিচ্ছদ নির্বাচনে যেমন প্রেক্ষিত অনুযায়ী ভিন্নতা চাই, ভাষা প্রয়োগেও তাই। প্রাত্যহিক জীবনে একরকম, উৎসবের দিনে আরেক রকম, ঘর গেরস্তালিতে একরকম, কর্মস্থলে আরেক রকম পোশাক ব্যবহারের বিধি, তেমনি এক এক প্রেক্ষিতে এক এক রকমের ভাষা ব্যবহারেরও প্রথা। এ সচেতনতা না থাকলে যা ঘটবে তা হল কমিউনিকেশন গ্যাপ অর্থাৎ প্রকাশ হবে ব্যর্থতায় পর্যবশিত।

আমাদের হাঁটা চলা, মুখভঙ্গিমা, পোশাক পরিচ্ছদেরও একটা বিশেষ ভাষা আছে এখানে গরমিল হলে সংযোগ ছিন্ন হবে। রঙচটা জিনস্ আর ইংরেজি লেখা টি-শার্ট পরে মাল্টারমশাই ছাত্রদের সামনে হাজির হলে বিষয়টি বেমানানই হবে, তা তিনি যত সুন্দরভার বাক্য উচ্চারণই করেন না কেন। মালকোঁচা উড়িয়ে ধুতি পরা সাংবাদিক কোনো বোহেমিয়ান চিত্রশিল্পীর ইন্টারভিউ নিতে গেলে শিল্পীর ভেতরের কথা বের করে আনা তার পক্ষে সম্ভব নাও হতে পারে। বন্ধুবান্ধব মিলে শীতের সন্ধ্যায় একটি ‘গেট টুগেদারে’ কেউ যদি তৎসম শব্দে ঠাঁসা বিশুদ্ধ বাংলায় অর্থাৎ ফর্ম্যাল ভাষায় বলা শুরু করেন, তবে আর যাই হোক্ অন্তরঙ্গ আড্ডা হবে না। নিউ ইয়ার্স অনুষ্ঠানে শ্রোতামণ্ডলীকে ‘হ্যালো ফোক্স’ বলে সম্বোধন করলে উজ্জ্বল যুবক-যুবতীরা উল্লাসে মেতে উঠবে, কিন্তু নববর্ষের বৈঠকে এ সম্বোধনই অশিষ্ট বিবেচিত হবে। এ হল পোশাকি এবং ঘরোয়া ভাষার পার্থক্য। দুটো ভাষার প্রয়োগই স্থান বিশেষে অপরিহার্য। সভাসমিতি, আনুষ্ঠানিক বৈঠকের ভাষা হবে একেবারে মাপাজোখা, আবার অনানুষ্ঠানিক ভাষাও হতে পারে মুক্ত, অন্তরঙ্গ বাধাবন্ধহীন।

মৌখিক বাচনের মতো লিখিত ভাষারও রয়েছে পোশাকি এবং ঘরোয়া ভাষার বিভাজন। সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক চিঠিপত্র, পূজা, বিয়ের নিমন্ত্রণপত্র এসবে ঘরোয়া নয়, পোশাকি ভাষাই প্রযোজ্য। দরখাস্ত, দলিলপত্রাদির বয়ান তো একেবারে গৎ বাঁধা। সেই অষ্টাদশ শতক থেকে সংস্কৃত, আরবি-ফারসি শব্দের মিশেল দেওয়া এসব বাংলা বয়ান আজও চলছে অফিস আদালতে। যেমন : -

(ক)  শ্রীল শ্রীযুক্ত সরকার বাহাদুরের প্রতিনিধি মাননীয় জিলা মেজিস্ট্রেট বরাবরেষু।

(খ)  ইদং কার্যঞ্চ অত্র খরিদনামা লিখিতং ইত্যাদি।

(গ)  বাংলা বিয়ের চিঠির বয়ান যথাবিহিত সম্মান পুরঃসর নিবেদন...।

প্রচারপত্র, নির্দেশিকা, পুস্তিকা সর্বত্রই ভাষা, শব্দ নির্বাচন, বাক্য গঠন একেবারে পূর্ব নির্ধারিত। প্রবন্ধ-নিবন্ধের ভাষাও ওই পোশাকি। এখানে উপমা, অলঙ্কার এসব বাহুল্য হিসেবে বর্জিত। সমাজ-অর্থনীতি-রাজনীতি- ইতিহাস-বিজ্ঞান বিষয়ক রচনার ভাষা সাধারণত পোশাকিই হয়।

আবার সৃজনশীল সাহিত্যের প্রাণই হল এর ঘরোয়া, অন্তরঙ্গ ভাষা। গল্প, উপন্যাসে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষজন, তাদের আচার, আচরণ, সংস্কার, সংস্কৃতি, পোশাক পরিচ্ছদ, উৎসব আনন্দ-এসবের চিত্র তুলে ধরতে হলে ভাষা হতে হবে একান্ত নমনীয়। নাটক, চলচ্চিত্র, রেডিও-টিভি এমনকি আধুনিক বাংলা গানের ভাষাও মানুষের মুখের ভাষার কাছাকাছি হওয়া চাই। কোথায়, কখন, কার সামনে, কোন প্রেক্ষিতে কী ভাষা প্রয়োগ করতে হবে- এই সচেতনতার অভাবেই তথ্য বৈচিত্র্য, বিষয় বৈচিত্র্যে ভরপুর বক্তব্য বা রচনা শ্রোতা/পাঠকের কাছে পৌঁছাতে পারে না, অর্থাৎ কমিউনিকেশন হিসেবে ব্যর্থ হয়ে যায়।

৫.৩   ক্লাসরুম কমিউনিকেশন

জনপ্রিয় শিক্ষক কা’কে বলা যায়? উত্তর, যে শিক্ষকের ক্লাসে পড়ুয়ারা আগ্রহভরে বসে থাকে, পারতপক্ষে তাঁর ক্লাস মিস করতে চায় না। এর কারণ, এই শিক্ষক একজন দক্ষ কমিউনিকেটর। বিদ্যা, বুদ্ধি, জ্ঞান সব কিছুর সঙ্গে তাঁর প্রকাশ ক্ষমতাও প্রখর। তাঁর এ পারদর্শিতা হল ক্লাসরুম কমিউনিকেশন দক্ষতা।

এখন দেখা যাক্, ক্লাসরুম কমিউনিকেশন বলতে কী বোঝায়? সাধারণ্যে এটাই ধারণা, ক্লাসে শিক্ষক পড়াবেন আর পড়ুয়ারা শুনবেন। অর্থাৎ কথা বলার কাজটি শিক্ষকের, আর শুনে যাওয়ার কাজটি পড়ুয়াদের। এ যেন one-way traffic, একপাক্ষিক-কথন। এতে কথা হয় প্রচুর, কিন্তু সে অর্থে কি এটা যথার্থ কমিউনিকেশন? এটাই সমস্যা। শিক্ষক যদি শুরু থেকে শেষ অবধি একাই বলে যান, অবিরাম বলে যান, হোক না তাঁর নির্দিষ্ট বিষয়েই এবং হোক না সেটা তথ্যসমৃদ্ধই, এতে অপরপক্ষের যদি নীরব ভূমিকা ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না, তবে সমস্ত আয়োজনই ব্যর্থ। এক্ষেত্রে শিক্ষককে সচেতন থাকতে হবে তাঁর ক্লাসে সময়সীমার একটা সীমাবদ্ধতা রয়েছে, রয়েছে পড়ুয়াদের ধৈর্যসীমার ব্যাপারও। সার্থক ভাবে এ সময়টি কাজে লাগাতে হলে তাঁকে স্থির করে নিতে হবে, তিনি নিজে কতটুকু বলবেন, আর কতটুকু শুনবেন, কতটুকু সময় নির্দিষ্ট থাকবে নীরব কর্মের জন্য। ক্লাসরুম কমিউনিকেশন তো একাকী-কথন নয়।

এ সঙ্গে এটাও মনে রাখা চাই, কথা বলার সঙ্গে শোনার বিষয়টিও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। শব্দটি হল ‘পড়াশোনা’। এতে পড়া যতটুকু গুরুত্বপূর্ণ, শোনাটিও ততটুকু। শিক্ষককে শুধু বললেই চলবে না, পড়ুয়াদেরও বলাতে হবে, তাঁদের কথাও শুনতে হবে, তবেই সংযোগ সম্পূর্ণ।

একটা সময় ক্লাস ছিল শিক্ষক-কেন্দ্রিক, এ ধারণাটা বদলে ছাত্র-কেন্দ্রিক করে তোলার উপরই গুরুত্ব আরোপ করা হচ্ছে। এতে পড়বে, বলবে, করবে- সবই ছাত্ররা। ভাবুন তো এই দৃশ্যটি শিক্ষকমশাই বই হাতে বলে যাচ্ছেন, আর ছাত্ররা শুনে যাচ্ছে, কেবলই শুনে যাচ্ছে। এই শুনে যাওয়ার মধ্যে যে না-শোনাও রয়েছে এটা আগে সেরকম ভাবে ভাবা হয়নি। আজও কি তাই? আসলে যে-কোনও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েই পড়ুয়াদের এক নাগাড়ে পনেরো মিনিটের বেশি মনোসংযোগ করা সম্ভব হয় না। স্থির বসে থাকলে দৃষ্টি অন্যদিকে সরবেই। হাই উঠবে, চোখে ঘুমও জড়িয়ে আসতে পারে। ইচ্ছে করবে একটু ঘাড় চুলকোই, কাগজে কাটাকুটি করি, কিংবা অনুমতি চেয়ে একটু বাইরে যাই। কারণ এদের যে কোনও অ্যাকটিভিটি নেই। আর, শোনা কর্মটিকে অ্যাকটিভিটিতে রূপান্তরিত করার কৌশলও যে শিক্ষক বা কথকের জানা নেই। এই পেসিভ শ্রোতাকে অ্যাকটিভ শ্রোতায় রূপান্তরিত করার মধ্যেই কমিউনিকেশনের সার্থকতা। এ কাজটি করতে হলে কী করা যায়?

প্রথমত, লেকচার মেথড বা একক বক্তৃতা না হয়ে ক্লাস হওয়া চাই দ্বিরালাপ। পাঠের প্রস্তাবনা পর্বটির সূচনা হতে পারে পড়ুয়াদের দিক থেকে, যদি শিক্ষক সে রকম বাতাবরণ তৈরি করেন।

দ্বিতীয়ত, মৌখিক বাচনের সঙ্গে লিখিত বয়ানের সংস্থান রাখা। বোর্ডে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলো লিখে রাখা এবং এর উপর ভিত্তি করে পড়ুয়াদের আলোচনায় অনুপ্রাণিত করা। টিচিং এইডস্ অর্থাৎ চিত্র, ম্যাপ, সাউন্ড সিস্টেম, পাওয়ার পয়েন্ট এসব নিয়মিতভাবে ব্যবহার করা। (আজকাল গ্রামের স্কুল, কলেজেও এগুলো সহজলভ্য হয়ে গেছে, যদিও এগুলো ব্যবহারে উৎসাহ বাড়ছে না)।

এ তো একটা দিক। এবার আসা যাক্ ক্লাসরুমের ভাষার ক্ষেত্রে। এখানেও রয়েছে পোশাকি এবং ঘরোয়া ভাষার প্রশ্ন। ক্লাসরুম নিশ্চিতভাবেই একটি ফর্ম্যাল ব্যাপার। এতে আনুষ্ঠানিকতা থাকবেই, কিন্তু এটা তো এক দুই দিনের নয়, পুরো একটি বছরের। তাই কিছু কিছু আনুষ্ঠানিকতার ভার তো কমাতেই হবে। একেবারে পোশাকি ভাষায়ই শিক্ষক যদি স্থিত থাকেন তবে প্রকাশ হবে আড়ষ্ট, শ্রোতারাও একাত্ম হতে পারবে না বিষয়ের সঙ্গে। আবার নিতান্ত ঘরোয়া, আটপৌরে ভাষার প্রয়োগ সমস্ত বিষয়টিকে স্কুল করে দিতে পারে। এখানেই প্রয়োজন একটি তৃতীয় পদ্ধতির। মিশ্র আঙ্গিকের ভাষা প্রয়োগের দিকটি নিয়ে ভাবা প্রয়োজন। ক্লাসরুমে শিক্ষক যে-ভাষায় কমিউনিকেশন করবেন সেটা পোশাকি হয়েও হয়ে উঠুক ঘরোয়া, আর ঘরোয়া হয়েও হোক্ পোশাকি। কীভাবে, সেটা স্বতন্ত্র আলোচনার বিষয়, বর্তমানে এর বেশি যাবার অবকাশ নেই।

তবে কয়েকটি দিকে বিশেষ সচেতনতার প্রয়োজন:

  • ক্লাসরুমে ছোট ছোট, সহজ এবং সরল বাক্য প্রয়োগ চাই।
  • কঠিন পরিভাষা, সংস্কৃতবহুল তৎসম, অহেতুক ইংরেজি শব্দ বর্জিত হওয়া চাই।
  • একেবারে ঘরোয়া বা পথচলতি, ইংরেজিতে যাকে বলে শ্ল্যাং, অপভাষা এবং শব্দ সযত্নে এড়িয়ে চলাই উচিত।

আর আঞ্চলিক বা ঔপভাষিক কথনভঙ্গির শব্দের ক্ষেত্রে একটা সুচিন্তিত পন্থা বের করা প্রয়োজন। ঔপভাষিক অঞ্চলের পড়ুয়াদের মধ্যে একটা ধারণা তৈরি হয়ে যায় যে, স্কুলে যে-ভাষা পড়ানো হয়, যে-ভাষায় বইপত্র রচিত হয়, এটা বুঝি তাদের মাতৃভাষা নয়, এ ভাষাটা একটা ভিন্নভাষা। মান্যচলিত ভাষাটি যে তাদের ঘরের ভাষারই একটা সর্বজনগ্রাহ্য বা সম্প্রসারিত, বিবর্তিত ভাষা। অর্থাৎ মায়ের কোলে শেখা ভাষাটা যে মূলস্রোত ভাষার উপ-ভাষা বা ফিডার লেঙ্গুয়েজ এটা তাদের বুঝতে দেওয়া হয় না। অনেক সময় এর ফলে গ্রামীণ পড়ুয়ারা শহরে এলে হীনমন্যতায় ভোগে, এবং এ থেকে সৃষ্ট স্থায়ী সমস্যা তাদের প্রকাশভঙ্গিকে করে ব্যাহত। লিখতে গিয়ে, সভাসমিতিতে, রেডিও-টিভিতে মুখ খুলতে গিয়ে এরা হয়ে পড়ে জড়সড়।

বাংলাদেশ দীর্ঘ পরীক্ষানিরীক্ষা, এবং বৌদ্ধিক সংগ্রামের মধ্যদিয়ে এ সংকট অতিক্রম করেছে। আঞ্চলিক শব্দসম্ভার, অর্থ সম্প্রসারণ, বিভিন্ন প্রকাশভঙ্গি আত্মীকরণে বাংলা ভাষার প্রকাশ সম্ভাবনাকে ওরা বিস্তৃত করেছে। সৃজনশীল সাহিত্য, নাটক, সিনেমা, সংগীতে এর সুফলও ফলেছে। ভাষাতত্ত্বচর্চায়ও উন্মোচিত হয়েছে নতুন দিগন্ত। ঔপভাষিক বৈচিত্র্য যে ভাষার কোনও দুর্ববলতা নয়, শক্তির উৎস- এই সত্যটা ওরা উপলব্ধি করেছেন। আমাদের ঔপভাষিক প্রেক্ষিতের কথাটি মনে রেখে এ দিকে সচেতনতার প্রয়োজন রয়েছে। ক্লাসরুমে উপভাষার প্রয়োগ হবে কি না বা হলে কতটুকু, কিংবা উপভাষার প্রয়োগে ভাষাবিকৃতির সম্ভাবনা আছে কি না, এই আলোচনার অবকাশ এখানে নেই। বর্তমান পাঠক্রমে এর উল্লেখ এ জন্যেই যে ক্লাসরুম সিচ্যুয়েশনে শিক্ষক মান্যচলিত ভাষাকে প্রাধান্য দেবেন নিশ্চয়ই। কিন্তু আঞ্চলিক শব্দ, প্রকাশভঙ্গিকে একেবারে উপেক্ষা করলে কমিউনিকেশন গ্যাপ হতে পারে কি না এ প্রশ্নকে উপেক্ষা করলে ভাষাশিক্ষায় মৌলিক কিছু সমস্যা থেকেই যাবে। (আঞ্চলিক উপভাষা এবং মূলস্রোত ভাষার আন্তঃসম্পর্ক বিষয়টি ১ম ষাণ্মাসিক, ২ নম্বর বইতে আলোচিত হয়েছে)

৫.৪   রেডিও-টিভিতে কমিউনিকেশন

রেডিও-টিভি দুটোকে একসঙ্গে বৈদ্যুতিন মাধ্যম হিসেবে ধরলেও এদের মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। রেডিও তো একেবারে দৃশ্যহীন, কথা-শব্দ-ধ্বনি নির্ভর; আর টিভি একই সঙ্গে কথাবলা এবং চোখে দেখাও। প্রচার মাধ্যম হিসেবে দুটোরই গুরুত্ব এবং অপরিহার্যতা প্রশ্নাতীত। টেলিভিশন এসে গেলেও রেডিওর প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়নি, যেতে পারে না, এটা বিগত দশকগুলোতে ভারতীয় উপমহাদেশে গভীরভাবে অনুভূত হচ্ছে।

প্রকাশের অনেক ক্ষেত্র আছে যেখানে শ্রাব্য-দৃশ্য (audio-visual) উপস্থাপনার চাইতে কেবলমাত্র শ্রাব্য (audio) উপস্থাপনা বিশেষ অর্থবহ, এমনকি বিকল্পহীনও। তেমনি অনেক ক্ষেত্রে শব্দের সঙ্গে চাক্ষুষ উপস্থাপন না হলে কমিউনিকেশন সম্পূর্ণ হয় না। এ অবস্থায় Communicator-কে স্থির করতে হয়, তাঁর প্রকাশিতব্য বিষয়ের জন্য কোন্ মাধ্যমটি উপযুক্ত অডিও না ভিডিও?

আর বর্তমান পাঠক্রমে প্রাসঙ্গিক যে কথাটি তা হল, রেডিও এবং টিভি উভয় মাধ্যমেই যাঁর ভূমিকা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ, অর্থাৎ যিনি স্তম্ভস্বরূপ পেছনে দাঁড়িয়ে থাকেন তাঁর হাতে রেকর্ডার নয়, ক্যামেরাও নয়, থাকে কলম। এ কলমচি বা লেখকের কর্মপদ্ধতি অবশ্যই স্বতন্ত্র, মুদ্রণ মাধ্যমের চাইতে ভিন্ন। রেডিওতে তাঁর কাজ হল শব্দ-ধ্বনির মাধ্যমে শ্রোতাদের দেখার কাজটি করিয়ে নেওয়া, আর টিভিতে তাঁর কাজ হল দেখা আর শোনার মধ্যিখানের ফাঁকটুকু ভরাট করে দেওয়া। বৈদ্যুতিন মাধ্যমের প্রতিটি প্রোগ্রামের পেছনে থাকে একটি লিখিত বয়ান (working script) এ বয়ানই হল কমিউনিকেশনের অন্যতম হাতিয়ার। অনুষ্ঠান উপস্থাপক, ভাষ্যকার বা কথক, শিল্পী, অভিনেতা এবং রেকর্ডিস্ট সবাইকেই কোনও না কোনও ভাবে স্ক্রিপ্টকে মান্য করে চলতে হয়।

আর বর্তমান পাঠক্রমে প্রাসঙ্গিক যে কথাটি তা হল, রেডিও এবং টিভি উভয় মাধ্যমেই যাঁর ভূমিকা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ, অর্থাৎ যিনি স্তম্ভস্বরূপ পেছনে দাঁড়িয়ে থাকেন তাঁর হাতে রেকর্ডার নয়, ক্যামেরাও নয়, থাকে কলম। এ কলমচি বা লেখকের কর্মপদ্ধতি অবশ্যই স্বতন্ত্র, মুদ্রণ মাধ্যমের চাইতে ভিন্ন। রেডিওতে তাঁর কাজ হল শব্দ-ধ্বনির মাধ্যমে শ্রোতাদের দেখার কাজটি করিয়ে নেওয়া, আর টিভিতে তাঁর কাজ হল দেখা আর শোনার মধ্যিখানের ফাঁকটুকু ভরাট করে দেওয়া। বৈদ্যুতিন মাধ্যমের প্রতিটি প্রোগ্রামের পেছনে থাকে একটি লিখিত বয়ান (working script) এ বয়ানই হল কমিউনিকেশনের অন্যতম হাতিয়ার। অনুষ্ঠান উপস্থাপক, ভাষ্যকার বা কথক, শিল্পী, অভিনেতা এবং রেকর্ডিস্ট সবাইকেই কোনও না কোনও ভাবে স্ক্রিপ্টকে মান্য করে চলতে হয়।

এত কাছাকাছি অবস্থান সত্বেও কর্মক্ষেত্র এবং পদ্ধতিগত দিকে রেডিও এবং টিভির অবস্থান পরস্পরের থেকে দূরেও। আগেই বলা হয়েছে, কিছু কিছু বিষয় আছে রেডিওতে গ্রহণযোগ্যতা পাবে না, তেমনি কিছু কিছু বিষয় টিভির পর্দায় মানানসই নয়। চিত্রকলা প্রদর্শনীর ফিচার যতই সুলিখিত, সু-পঠিত হোক না কেন, টিভির সঙ্গে পেরে উঠবে না। আবার যত পরিপাটি করেই সেট সাজানো হোক না কেন, সমাজ-অর্থনীতি-দর্শন-ভাষাবিজ্ঞান-সাহিত্য বিষয়ক চর্চা টিভির চেয়ে রেডিওতে অনেক সহজে, সুন্দরভাবে শ্রোতার কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।

রেডিও এবং টিভি দুটো মাধ্যমেরই ভাষা আলাদা। প্রথমটি একটু বেশি কথাবলা। আর স্পষ্ট অবয়বে, দৃশ্যসুখকর দ্বিতীয়টির মুখে কাটাকাটা, খানখান্ বুলি। তাই একজন সার্থক কমিউনিকেটরকে তাঁর নির্বাচিত মাধ্যমের নিজস্ব ভাষাটি শিখে নিতে হয় - তা তিনি স্ক্রিপ্ট-রাইটার হোন্ কিংবা উপস্থাপকই হোন না কেন।

প্রসঙ্গ রেডিও:

রেডিও হল একটি শ্রুতিমাধ্যম (audio-media)। শব্দ ও ধধ্বনিই এর মুখ্য উপাদান। শ্রোতাদের কাছে কোনও ঘটনা, বক্তব্য, তথ্য, চিন্তা বা তত্ত্ব উপস্থাপনা করতে হয় ওই দুই উপাদান সম্বল করে। মুদ্রণ মাধ্যমের (print media) চাইতে কাজটি যথেষ্ট দুরূহ কারণ এখানে সবকিছুই যে অলীক (abstract)। এতে চোখে দেখার কোনো অক্ষরমালা নেই, ছবি নেই, ফুল নেই, নেই পেছন ফিরে, একটু বিরাম নিয়ে বুঝে নেবার অবকাশ।

বেতারযন্ত্রে উচ্চারিত শব্দ একটিবার মাত্র কানে প্রবেশ করেই শেষ হয়ে যায়, অথ্য আমরা এর অনেক কিছুই মনে ধারণ করে নিই, অনেক কিছু ভুলেও যাই; অনেক জ্ঞাতব্য আমাদের নজর এড়িয়ে যায়, আবার অনেক সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয় আমাদের মনে স্থায়ী হয়েও যায়।

রেডিওর অনুষ্ঠান আমাদের চোখে দেখার কাজটি করিয়ে নেয় চিত্রধর্মী বর্ণনার গুণেই অনুভব করিয়ে দেয় শব্দের সঙ্গে ধ্বনির সামঞ্জস্য ঘটিয়ে, নৈঃশব্দ্যের সঙ্গে শব্দে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেও। সার্থক রেডিও অনুষ্ঠান কানের ভেতর দিয়ে মরমে প্রবেশ করে মনটাকে সৃজনশীল করে তোলে, এবং তখন অদেখা জগৎ হয় দৃশ্যমান, অক্ষরবিন্যাসের শাসন ছাড়াই সঠিক পথে এগিয়ে চলে শ্রোতার চিন্তাস্রোত।

এত সব কথার পরও মনে রাখতে হবে রেডিওর সমস্ত অনুষ্ঠানের পেছনে রয়েছে এক টুকরো কাগজ এবং এর পেছনে একজন লেখক, তা তিনি এফ-এম ব্যান্ডের জকিই (আরজে) হোন্ বা ফুটবল-ক্রিকেটের কমেন্টেটর বা যে কোনও অনুষ্ঠানের উপস্থাপকই হোন না কেন কয়েকটি ব্যতিক্রম বাদ দিলে স্টুডিও-ভিত্তিক অনুষ্ঠান কখনও তাৎক্ষণিক (extempore) না, পূর্বনির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ীই হয়। এখানে একেবারে রেডিমেড স্ক্রিপ্ট না থাকলেও হাতের কাছে একটা নির্দেশনামা, প্রয়োজনীয় বই, পত্রপত্রিকা ইত্যাদি রাখতে কোনও অসুবিধা নেই। রেডিওর কমিউনিকেটরকে সবসময়ই মনে রাখতে হয়, তাঁর টার্গেট হল শ্রোতা, পাঠক নয়। এ শ্রোতার জগৎ সাক্ষর, নিরক্ষর, দৃষ্টিহীন ছাড়াও নানা পেশার, নানা রুচির, নানা সংস্কৃতির নরনারীদের নিয়ে এক অতি বিস্তৃত জগৎ।

এত সব কথার পরও মনে রাখতে হবে রেডিওর সমস্ত অনুষ্ঠানের পেছনে রয়েছে এক টুকরো কাগজ এবং এর পেছনে একজন লেখক, তা তিনি এফ-এম ব্যান্ডের জকিই (আরজে) হোন্ বা ফুটবল-ক্রিকেটের কমেন্টেটর বা যে কোনও অনুষ্ঠানের উপস্থাপকই হোন না কেন কয়েকটি ব্যতিক্রম বাদ দিলে স্টুডিও-ভিত্তিক অনুষ্ঠান কখনও তাৎক্ষণিক (extempore) না, পূর্বনির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ীই হয়। এখানে একেবারে রেডিমেড স্ক্রিপ্ট না থাকলেও হাতের কাছে একটা নির্দেশনামা, প্রয়োজনীয় বই, পত্রপত্রিকা ইত্যাদি রাখতে কোনও অসুবিধা নেই। রেডিওর কমিউনিকেটরকে সবসময়ই মনে রাখতে হয়, তাঁর টার্গেট হল শ্রোতা, পাঠক নয়। এ শ্রোতার জগৎ সাক্ষর, নিরক্ষর, দৃষ্টিহীন ছাড়াও নানা পেশার, নানা রুচির, নানা সংস্কৃতির নরনারীদের নিয়ে এক অতি বিস্তৃত জগৎ।

মুদ্রণ মাধ্যমে পাঠক রয়ে-সয়ে কোনও কিছু বোঝার চেষ্টা করতে পারেন, একাধিকবার পাঠ করতেও পারেন রচনাটি। কিন্তু রেডিওর শ্রোতার সামনে এ সুযোগ নেই। তাই উপস্থাপকের একটু বেশি সচেতনতা প্রয়োজন যাতে শ্রোতারা বুঝতে পারেন অনুষ্ঠানের বিষয়টি কী। বই পত্রপত্রিকার পাঠক নিজেরাই কোনও কিছু বোঝার দায়িত্ব নিতে পারেন, কিন্তু রেডিওর শ্রোতার উপর বার্তা-প্রেরক (কমিউনিকেটর) এতটা দাবি করতে পারেন না।

কয়েকটি রেডিও অনুষ্ঠান:

কথিকা

আকাশবাণীর কেন্দ্রগুলোতে ‘কথিকা’ (রেডিও টক) একটি জনপ্রিয় অনুষ্ঠান। প্রাত্যহিক প্রভাতী অনুষ্ঠান, আজকের প্রসঙ্গ ছাড়াও সাপ্তাহিক বা পাক্ষিক কথিকার নির্দিষ্ট শ্রোতাও আছেন গ্রামে ও শহরে। এ কথিকার বিষয়বস্তুর কোনো স্থিরতাও নেই। গুরুগম্ভীর তত্ত্বকথা, তথ্যপূর্ণ বিষয় থেকে অতি তুচ্ছ, তুচ্ছাতিতুচ্ছ বিষয়বস্তুর উপরও কথিকা হয়। কথক এখানে লিখিত বয়ান মাইক্রোফোনের সামনে রেখে বলেন (পাঠ করেন বলাটা সঙ্গত নয়, কারণ ভঙ্গিটা বলারই, যদিও যা করেন তা পাঠ ছাড়া আর কিছুই নয়)। কথিকার সময় একেবারে পূর্ব নির্ধারিত- ২ মিনিট, ৫ মিনিট, ১০ মিনিট। এর কম হতে পারে, কিন্তু বেশি নৈব নৈব চঃ। কথিকার কয়েকটি চরিত্রলক্ষণ সূত্রাকারে দেওয়া হল :

  • এটা হল একক কথন, এর ভাষা মৌখিক বা চলতি। সাধুভাষায় কথিকা হয় না।
  • দীর্ঘ, জটিল বাক্য নয়, কথিকার বাক্যগুলো সোজা, সরল।
  • একসঙ্গে একাধিক বিষয় নয়, একটি নির্দিষ্ট বিষয়েই আলোচনাটি সীমাবদ্ধ রাখতে হয়।
  • অতিকথন, আলঙ্কারিক ভাষা, পরিভাষা ব্যবহারের প্রয়োজন নেই এখানে।
  • উদ্ধৃতি, রেফারেন্স এসব অপ্রয়োজনীয়।
  • রেডিও শ্রোতাদের মনোরঞ্জন করবে, উজ্জীবিত করবে, বিভিন্ন বিষয়ে কৌতূহলী করে তুলবে।
  • কিন্তু এখানে অতিরিক্ত সিরিয়াস কথা হলে রেডিওর নব ঘুরিয়ে বন্ধ করে দেওয়ার স্বাধীনতা শ্রোতার।
  • আবার একেবারে সাদামাটা ভাষায় কথা বললেও শ্রোতারা প্রত্যাখ্যান করতে পারেন।
  • কথিকায় ‘আমি’ শব্দটি বেমানান, তাই সযত্নে পরিহার করা প্রয়োজন।

রেডিও-ম্যাগাজিন, ফিচার, ডকুমেন্টারি

একটা সময় এসব অনুষ্ঠানে আকাশবাণীর নিজস্ব কর্মীদেরই নিয়োগ করা হত। এখন সবই আউটসোর্সিং। স্ট্রিঞ্জারদের দিয়েই এ কাজ করিয়ে নেওয়া হয়। সম্মেলন, সমারোহ, মেলা, উৎসব, প্রদর্শনী এসব অনুষ্ঠানের প্রতিবেদন, কিংবা বিশেষ কোনও বিষয় নিয়ে তৈরি হয় ফিচার, ডকুমেন্টারি।

এর উপাদানগুলোর মধ্যে রয়েছে স্পট রেকর্ডিং, ইন্টারভিউ, শব্দ-ধ্বনি, আর রয়েছে ধারাবিবরণী।

কীভাবে সমস্ত বিষয়টি শ্রোতার সামনে তুলে ধরা যায়, এর জন্য একটি লিখিত রূপরেখা সামনে রাখতেই হয়, যদিও কাজে নামলে এর অদলবদল ঘটবেই। মৌখিক ধারাবিবরণী তাৎক্ষণিকভাবে দিলেও এর একটা পূর্ব-প্রস্তুতির প্রয়োজন। আর যদি এটা স্টুডিওতে বসে সংযোজন করা হয় তবে একটা লিখিত বয়ানই পাঠ করা হয়, অবশ্য এর ভাষা, প্রকাশভঙ্গি সংযোজন সমস্ত কিছুরই রয়েছে ‘একটি লক্ষ্য’- কমিউনিকেশন। এ প্রকাশ তাই হওয়া চাই চিত্রধর্মী, গতিশীল।

রেডিও-ম্যাগাজিন:

যাঁরা বই পড়তে অনিচ্ছুক বা যাঁদের পড়ার সময় কম, অথচ কিছু একটা পড়া চাই, যেখানে অনেক কিছু জেনে নিতে পারেন, পাঠের আনন্দও লাভ করে নিতে পারেন- এদের জন্য যেমন মুদ্রিত ম্যাগাজিন, ঠিক তেমনি ব্যস্ত মানুষ, যাঁর ঠায় বসে কথিকা, আলোচনা, ভাষা শোনার সময়, ধৈর্য, মানসিকতা নেই, অথচ কিছু একটা বিনোদনমূলক, তথ্যবহুল অনুষ্ঠান শোনা চাই- এদের জন্যই এ রেডিও অনুষ্ঠান। বিবিসি, ভয়েস অব আমেরিকা, জার্মান রেডিওতে শুধু ইংরেজি, জার্মান ভাষায় নয়, বাংলায়ও এরকম ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান রয়েছে। বাংলাদেশের রেডিও-ম্যাগাজিনগুলোর জনপ্রিয়তা খুব বেশি। আকাশবাণীতেও রয়েছে এ অনুষ্ঠান। এ ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানের প্রযোজক, উপস্থাপকদের বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণার ক্ষমতা, সহজবোধ্য অথচ আকর্ষণীয় ভাষায় বার্তা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষমতা একান্তই প্রয়োজন। এখানে কী বলা হয়েছে এর চাইতেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হল কীভাবে বলা হয়েছে।

এই ম্যাগাজিনের মতোই আরেকটি ফর্ম্যাট হল ফিচার এটা হল রেডিও ডকুমেন্টারি। এ ফর্ম্যাটে অনেকগুলো বিষয় নয়, একটি ঘটনা, একক ব্যক্তি, জনগোষ্ঠী, পর্যটনকেন্দ্র, প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি নিয়েই ডকুমেন্টারি। এ প্রোগ্রাম উপস্থাপনায় টেকনিক্যাল বুদ্ধি এবং সৃজনশীলতা দুটোরই সংমিশ্রণ চাই। ফিচারের কয়েকটি উপাদান হল:

(ক)  টাইটেল মিউজিক : এ মিউজিকের কাজ হল বিষয়বস্তুকে ‘ইন্ট্রডিউস’ করে দেওয়া। টিভি-ফিচারের টাইটেল মিউজিকে যেমন কণ্ঠসংগীতের প্রয়োগ সুন্দর হয়, রেডিও-ফিচারে তেমনি যন্ত্রসংগীতই হয় যথাযথ। এ মিউজিক পরিকল্পনায় সৃজনশীলতা আর কল্পনাশক্তির প্রয়োজন। সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক অনুষ্ঠানে বাঁশির সুর, সেতারের ঝঙ্কার, জলতরঙ্গের টুংটাং যেমন মানানসই, তেমনি বিজ্ঞান বিষয়ক অনুষ্ঠানে চড়া ইলেকট্রনিক যন্ত্র, ক্রীড়াজগতে তবলার লহরা, ‘জানা অজানার জগতে’ অদ্ভুত সব শব্দ-ধ্বনির ঐকতান (exotic sound) শ্রোতার মন কেড়ে নেয়। চা বাগিচার শ্রমিকদের উপর ফিচারে সাঁওতালি বাঁশি আর মাদলের তাল শ্রোতাদের মুহূর্তে নিয়ে যাবে একটি কুঁড়ি দুটি পাতার জগতে, কারাগারের বন্দিদের জীবনের উপর তৈরি ফিচারের টাইটেল মিউজিক যদি হয় চড়া সুরে বেহালার আর্তনাদ, সঙ্গে ভাষ্যকারের প্রতিধ্বনিযুক্ত (echoed) উচ্চারণ, অমনি শ্রোতার চোখের সামনে ভেসে উঠবে কারাগারের লৌহকপাট।

(খ)  শব্দ ও ধ্বনি : অদেখা মানুষজন, ঘরবস্তি, কারখানা, নির্জন উপত্যকা, পর্যটন কেন্দ্র কিংবা ঐতিহাসিক স্থানকে দুদৃশ্যমান করতে হলে শুধু মৌখিক ভাষাতে কাজ হয় না, তাই সাহায্য নিতে হয় শব্দ ও ধ্বনির অর্থাৎ sound effect-এর।

সাউন্ড-এফেক্ট দু’ধরনের- একটি হল প্রাকৃতিক বা স্বাভাবিক (natural); আরেকটি হল কৃত্রিম (artificial)। রেডিওতে দু’ধরনের শব্দেরই প্রয়োজন। বিষাদের ঘটনা বোঝাতে natural sound অর্থাৎ মানুষের কান্নার চাইতে artificial sound effect, মানে কৃত্রিম শব্দের ব্যঞ্জনা অনেকসময় অসাধারণ ক্রিয়া সৃষ্টি করে। তাছাড়া উদ্ভট ঘটনা, হাসির দৃশ্যে কৃত্রিম শব্দের প্রয়োগ অট্টহাসির চাইতেও অর্থবহ হয়ে ওঠে।

শব্দ ও ধ্বনির প্রয়োজন হয় ‘অ্যাকশন’ বোঝানোর জন্য। উত্তেজনা, অন্তর্কলহ, বিস্ময়- এসব অভিব্যক্তি শব্দ প্রয়োগে (sound effect) যত সহজে মূর্ত হয়, কথা দিয়ে তা হয় না। প্রতিধ্বনি বা echoed voice-এর মাধ্যমে অতিপ্রাকৃত বিষয়, যন্ত্রমানব, ঈশ্বর, ভূতপ্রেত ইত্যাদিকে দৃশ্যমান করা সহজ। Locale colour অর্থাৎ স্থানিক চেতনাকে ফুটিয়ে তুলতে হলে সাউন্ড এফেক্টের জুড়ি মেলা ভার। কর্ণাটকী সংগীতের একটু আভাস দিলেই শ্রোতারা বুঝে নেবেন দক্ষিণ ভারতীয় জীবন বা মানুষজনের প্রসঙ্গ এসে গেছে, তেমনি বিহুর সুরের টুকরো ছড়িয়ে দিলেই শ্রোতারা বুঝে নেবেন ‘লোকেশন আসাম’।

(গ)  ধারাভাষ্য/মৌখিক কথন : এখানে বক্তার ভূমিকা একেবারে সংকুচিত। একসঙ্গে এক মিনিট কথা হলেই শ্রোতার ধৈর্যচ্যুতির সম্ভাবনা। তাই এতে থাকবে বিরতি (pause), এবং এ বিরতিগুলো সাউন্ড এফেক্ট এবং নৈঃশব্দ্য (এটাও সাউন্ড এফেক্ট) দিয়ে ভরে দিতে হবে।

রেডিও ফিচারের স্ক্রিপ্ট লেখককে একই সঙ্গে তত্ত্ব ও প্রয়োগ- দুটো দিকেই সচেতন হতে হবে। স্ক্রিপ্ট লিখেই তাঁর কাজ শেষ নয়- প্রোগ্রামটি যাতে যথাযথ গ্রন্থিত বা রেকর্ডিং হয়, ডাবিং, শব্দমিশ্রণ এবং সমতা রক্ষার (sound mixing and balancing) কাজ ঠিকমতো হয়, এ সমস্ত খুঁটিনাটি টেকনিক্যাল নির্দেশ তাঁর স্ক্রিপ্টে থাকলে ভাল।

প্রসঙ্গ টিভি:

গণমাধ্যম হিসেবে টিভির কাজ হল কোনও কিছুকে দর্শকের চোখের সামনে প্রত্যক্ষভাবে হাজির করা। এ মাধ্যমটি শ্রুতিমাধ্যমের সমস্ত উপাদানও, যেমন কথা, শব্দ ও ধ্বনিকে কাজে লাগায়। টিভির গ্রহীতা (ইংরেজিতে viewer) তো কেবল দর্শক নন, শ্রোতাও। কিন্তু টিভির ভাষা রেডিওর কাছাকাছি হয়েও আলাদা।

টিভি যখন শ্রোতাকে বানিয়েছে ‘দর্শক’, তখন এতে কথা ও শব্দের ভূমিকা কী হবে, কতটুকু হবে এটাও বিবেচনায় রাখতে হয়। যতই দৃশ্যসুখ, স্পষ্ট অবয়ব থাকুক না কেন, শ্রুতিমাধ্যমের সেই ‘কথা-বলা’ গুণটি না থাকলে দৃশ্যসুখ যে বৃথা, অসম্পূর্ণ- যেমনটি ছিল নীরব-চিত্রের (silent movie) অর্থাৎ প্রাক্-টকির যুগে। তখনও অবশ্য নৈঃশব্দ্যকে ভরে তোলা হত আবহসংগীত দিয়ে।

রেডিওতে কতটুকু শোনানো হবে, কীভাবে শোনানো হবে তা স্থির করে মাইক্রোফোন। টিভিতেও তেমনি কী দেখানো হবে, কতটুকু দেখানো হবে তা স্থির করে ক্যামেরা। মাইক্রোফোনের পেছনে যেমন একজন মানুষের চিন্তা-কল্পনা-শ্রবণ, তেমনি সচল ক্যামেরার পেছনেও সতত চোখ মেলে দাঁড়িয়ে থাকেন একজন ব্যক্তি (পরিচালক/ক্যামেরাম্যানও ওই ব্যক্তির দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা প্রভাবিত), এবং এ ব্যক্তিটিই হলেন মূল কমিউনিকেটর, তিনি লেখক-পরিচালক-উপস্থাপকের মধ্যে কোনও একজন বা তিনজনই একত্রে।

একজন সৃজনশীল লেখকের যেমন ভাষা, শব্দ ইত্যাদি বিষয়ে প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও সচেতনতার প্রয়োজন, যেমন প্রয়োজন চিন্তা, কল্পনা, আবেগ, অনুভূতিকে যথাযথ আঙ্গিকে বেঁধে প্রকাশের ক্ষমতা - তেমনি একজন টিভি লেখকেরও ওই সব গুণ থাকা চাই। তবে এর অতিরিক্ত কিছুও তাঁকে জানতে হবে, বুঝতে হবে, শিখতে হবে যা অপরাপর লেখকদের জন্য আবশ্যক নয়। অর্থাৎ লিখন - পদ্ধতি ছাড়াও তাঁকে শিখতে হবে ক্যামেরার ভাষা, আলো-আঁধারির মধ্যে প্রকাশিত কথামালা, নৈঃশব্দ্যের ভাষা।

লিখনশিল্পে যেমন মনের ভাবনা ফুটে ওঠে কাগজের পাতায়, টিভিতে (সামগ্রিক অর্থে চলচ্চিত্রেও) তেমনি কাগজের পাতার অক্ষরগুলো সেলুলয়েডের ফিতার উপর মূর্ত হয়ে ওঠে। এর অবলম্বন হল ক্যামেরা, সাহিত্যে যেমন কাগজ-কলম। স্ক্রিপ্ট এখানে লক্ষ্য নয় উপলক্ষ্য, লক্ষ্য হল ফিল্ম। স্ক্রিপ্টের ভূমিকা হল ক্যামেরাকে সহায়তা করা।

ক্যামেরার ভাষা:

একজন টিভি-লেখকের উপাদান কাগজ কলম নয়। তাঁর ভাবনা, চিন্তা, কল্পনা প্রকাশে ক্যামেরা, রেকর্ডার, আলো, এবং সেট-এর ভূমিকা রয়েছে। এ উপাদানগুলোর মধ্যেই রয়েছে এর নিজস্ব ভাষা, যার পূর্ণ প্রকাশ ঘটে ক্যামেরার মাধ্যমে। অতএব, নিষ্প্রাণ এ যন্ত্রটির নিজস্ব ভাষাটি লেখকের রপ্ত করা চাই।

ক্যামেরার নিজস্ব ভাষাটি কী? লিখিত সাহিত্যে যেমন রয়েছে অলঙ্কার, ছন্দ, উপমা, শব্দের কারিগরি, রূপান্তর, পুনঃসৃজন, যেমন রয়েছে নানা ধরনের চিহ্ন, সংকেত ইত্যাদি- তেমনি চলচ্চিত্রেরও রয়েছে নানা ধরনের শট, মস্তাজ, কাট, ডিজলভ; আর রয়েছে প্যানিং, ফেড ইন ফেড আউট ইত্যাদি। ক্যামেরার ভাষা-সৃজনের অন্যতম উপাদানই এসব, যা একজন স্ক্রিপ্ট-রাইটারের জানা প্রয়োজন। ক্যামেরার শটগুলোর মধ্যেও রয়েছে বৈচিত্র্য: লং শট, ক্লোজ শট, টপ শট, হাই এঙ্গল, লো এঙ্গল ইত্যাদি। এ শটগুলোর মাধ্যমে ছবিতে অনেক কথা, ভাব, ব্যঞ্জনা ফুটিয়ে তোলা যায়। যেমন : -

  • লং শট : জনপূর্ণ রাজপথে একটি মিছিল।
  • মিড শট: মিছিলের জনতার মধ্যে কয়েক জনের অবয়ব এল ক্যামেরার ফোকাসে।
  • ক্লোজ শট : ক্যামেরার ওই ‘কয়েক জনের’ মধ্য থেকে একজনকে আলাদা করে তাঁর চোখ, কপাল আর ভুরুতে ফোকাস্ করার সঙ্গে সঙ্গেই বোঝা গেল এ লোকটি স্বতন্ত্র। তাঁর মনের ক্ষোভ, প্রত্যয় সবই দর্শকের কাছে মূর্ত হল।

এ শটগুলোর মধ্যেই একটি বক্তব্য উঠে এল কোনো মৌখিক বাচনের সাহায্য ছাড়াই, বক্তব্য ক্রমে General থেকে particular হয়ে গেল। এরপর বিভিন্ন এঙ্গল থেকে ওই ক্লোজ-আপে ধরা একক ব্যক্তিটির নানান অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তোলার কাজটি ক্যামেরার কাজ। এছাড়াও ক্যামেরা জুম করা যেতে পারে, ফ্রিজড হতে পারে, হতে পারে স্বাভাবিক থেকে অনেকগুণ বেশি গতিশীল।

  • মুষ্টিবদ্ধ একটি হাত হঠাৎ পর্দাজুড়ে ভেসে উঠলেই দর্শকরা এর ভাষা খুঁজে পাবেন।
  • প্রাণভয়ে ছুটে চলা মানুষ হঠাৎ ফ্রিজড্ হয়ে গেলে তার বিপন্নতা ধরা পড়বে সহজেই।
  • মিছিলে হাঁটা মানুষের চলার গতি দ্বিগুণ, চারগুণ এবং ষলোগুণ কিংবা আরো বেশি করে দিলেই বোঝা যাবে ‘জনসমুদ্রে নেমেছে জোয়ার’, যেমন দেখা গিয়েছিল মৃণাল সেনের ‘কোরাস’ ছবির শেষ দৃশ্যে।

টিভির কমিউনিকেটর অর্থাৎ স্ক্রিপ্ট-লেখককে এসব খুঁটিনাটি বিষয় বুঝে নিতে হবে, নইলে কোথায় কথা বলতে হবে, কোথায় থাকবে নীরবতা- এটা নিরূপণ করা অসম্ভব হবে। তাছাড়াও টিভি-লেখককে যে দিকে যত্নবান হতে হবে তা হল।

আলো-আঁধারি :  আলোর সঙ্গে আসে রঙের প্রসঙ্গ। লেখককে রঙের ভাষাটিও জানতে হবে। দুপুরের রঙ হলদে না লাল, নির্জনতার রঙ নীল না কালো, বিষণ্ণতার রঙ সাদা না অন্যকিছু এ নিয়ে বিস্তর ভাবনাচিন্তার প্রয়োজন। ছবির মুড সৃষ্টিতে, যথাযথ টোন স্থাপন করতে আলো-আঁধারির খেলার বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। আলোর কনট্রাস্ট, রঙের কনট্রাস্ট প্রতিনিয়তই ছবিতে নতুন মাত্রা দেয়। সামগ্রিক ভাবে এদিকে স্ক্রিপ্টলেখক চোখ বন্ধ করে থাকতে পারেন না।

শব্দ ও ধ্বনি :  আমাদের বাস্তবতায় ছবির সঙ্গে। শব্দ বা ধ্বনি নিবিড়ভাবে আমরা ডুবে আছি এক অনন্ত শব্দরাজির মাঝে, তাই সব সময় অনুভব করি না যে এ পৃথিবীও সততই বাঙ্ময়, মুক নয়। একটি সচল টিভির ভলিউম মিউট করে দিন, দেখবেন সবকিছু ধার সত্বেও ছবিটি অসম্পূর্ণ, অসহ্যও। ছবিটা পূর্ণ হয় শব্দ-ধ্বনি, সংগীত এবং দৃশ্যের মিশ্রনে।

তবে মনে রাখতে হবে, টিভিতে যেহেতু শব্দের বিচরণ ছবির পাশাপাশি, আড়াআড়ি তাই এখানে শব্দের ভূমিকা রেডিওতে শব্দের ভূমিকা থেকে ভিন্ন। রেডিওতে শব্দ হচ্ছে একমত্র। প্রকাশ মাধ্যম, টিভিতে শব্দ হল দৃশ্যের সহযোগী। তাই এখানে কতটুকু শব্দ, কতটুকু নৈঃশব্দ্য এটা নির্ধারণ জরুরি। টিভি-লেখককে তাই শব্দ- ধ্বনি-সংগীতের বিভিন্ন দিকে সচেতন থাকতে হয়, কারণ ছবির ভিত্তিভূমি যে স্ক্রিপ্ট।

টিভি-স্ক্রিপ্ট রচনার তিনটি স্তর:

সিনেমার চিত্রনাট্য রচনা প্রসঙ্গে বিশিষ্ট চলচ্চিত্রকার ধীমান দাশগুপ্ত (চিত্রনাট্য রচনা ও চিত্রনাট্য বিশ্লেষণ, কলকাতা, ১৯৮৩) লিখেছেন- কনসেপশন, প্ল্যানিং এবং এক্সিকিউশন-এ তিনটি দিকে সমান গুরুত্ব দিয়েই লেখককে স্ক্রিপ্টের কাজ শুরু করতে হয়। চিত্রনাট্যের তিনটি স্তর হল-

সিনপসিস (Synopsis) : বিষয়বস্তুর সংক্ষিপ্ত সারাংশ,

ট্রিটমেন্ট (Treatment) : প্রয়োগের দিকে লক্ষ রেখে বিধৃতি, এবং

শুটিং স্ক্রিপ্ট (Shooting script) : ছবি তোলা সম্পর্কে নির্দেশ।

এটা যদিও বড় পর্দার সিনেমা প্রসঙ্গে, তবুও ছোটপর্দা অর্থাৎ টিভির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কিন্তু মনে রাখতে হবে, বড় পর্দার ছবির সঙ্গে টিভি-ফিল্মের গুণগত, ভাবগত এবং কৌশলগত কিছু পার্থক্য রয়েছে। বড় পর্দার চিত্রনাট্যের কলাকৌশল টিভির অনেক প্রয়োজনে লাগলেও সব সময় কার্যকরী হবে না। কারণ : -

  • বড় পর্দার ব্যাপ্তির মধ্যে বিশাল থিম স্থান করে নিতে পারে, কিন্তু টিভির ছোট পরিসরে তা সম্ভব নয়।
  • বিশাল ফর্ম্যাটে বৈচিত্র্যপূর্ণ বিষয়, পার্শ্বকাহিনি, উপ-কাহিনি, বহু চরিত্র, ঘটনার সমাবেশ সম্ভব, কিন্তু টিভিতে এ সুযোগ সীমিত।
  • সিনেমার (বড় পর্দার) থিম যদি হয় বহুমাত্রিক, টিভি-ফিল্মের থিম একমাত্রিক। কোনও একটি বিষয়ের একটি বিশেষ দিক, একটি বিশেষ চিন্তা, তত্ত্ব- তা’ই টিভি-ফিল্মের উপজীব্য। ব্যাপারটি অনেকটা মুদ্রণ সাহিত্য ‘ছোট গল্পে’র মতো। এবং এ জন্যই টিভি-ফিল্মের কৌশলগত পদ্ধতিও ভিন্ন। মিড-শট, লং-শট এর স্থলে ক্লোজ-শটের প্রয়োগই টিভিতে বেশি। স্থান-কাল পরিবর্তনের সুযোগও টিভিতে সীমিত। তবে ক্যামেরার বিচিত্রগামিতার সঙ্কোচন টিভিতে যদিও একেবারে অতাবশ্যক নয়, তবুও সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ভাব, অনুভূতি, ছোটসুখ, ছোটদুঃখ, স্বপ্ন কিংবা কোনও সূক্ষ্মতত্ত্বের চিত্রায়ণে ক্লোজ-শট অব্যর্থ।

  • আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে এমন ঘটনা অহরহই ঘটে চলে যা বড় মাপের ফ্রেমে চলচ্চিত্রায়ণের দাবি করতে পারে না, কিন্তু টিভির ছোট পর্দায় আশ্চর্য দ্যোতনা নিয়ে উপস্থিত হতে পারে। ছোট-ছোট কথা, অনুভূতি, আবেগ, দুঃখ, গ্লানি, বেদনার পীড়ন কিংবা আশা আকাঙ্ক্ষা, ভালোবাসা নিয়ে মহাকাব্য লেখা যায় না, যায় না উপন্যাসও। কিন্তু এরকম ছোট্ট, নিতান্তই ছোট্ট বিষয়স্ত- পথপাশে অনাদরে ফুটে থাকা ফুল, চৈত্রদিনের শুকনো মাঠ, পোড়ো জমি, দোলমঞ্চের পাশে ধান খুঁটে খাওয়া চারটি চড়ুই, লাঠির ডগায় পুঁটলি বাঁধা লোকটির দূর থেকে দূরে চলে যাওয়া- এসব দৃশ্য, চিত্রকল্প অসাধারণ সব টিভি-ফিল্মের সম্ভাবনায় ভরপুর। সিনেমার বড় পর্দায় এসবের সংস্থান হতে পারে না।

  • নিঃসঙ্গ চিত্রশিল্পী, শব্দসন্ধানী ভাষাবিজ্ঞানী, রাস্তার পাশে দোতারা বাজানো ভিখিরি, অশীতিপর স্বাধীনতা সংগ্রামী, কাগজকুড়ুনিয়া বাস্তহারা উন্মাদিনী, পথশিশু - এদের নিয়ে বড় পর্দায় পূর্ণাঙ্গ সিনেমা তৈরি করা সহজসাধ্য নয়, কিন্তু অসাধারণ টিভি-ফিল্ম সম্ভব। প্রাক্-টিভি যুগে সত্যজিৎ রায় বড় পর্দায়ই রবীন্দ্রনাথ, বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়ের উপর ছবি (Inner Eye) করেছেন। এরকম ছবি করেছেন মৃণাল সেন, ঋত্বিক ঘটক, পূর্ণেন্দু পত্রী, গৌতম ঘোষ, শ্যাম বেনেগাল, গোবিন্দ নিহালনি।

এখন অবশ্য আঞ্চলিক, প্রাদেশিক থেকে আন্তর্জাতিক স্তরে এ রকম অসংখ্য ছবি তৈরি হচ্ছে প্রতিদিন। খোদ মহানগরী থেকে একেবারে মফস্সল শহর কিংবা গ্রামেও। বিষয় ভিত্তিক, তথ্যভিত্তিক, বিনোদনমূলক, শিক্ষামূলক কিংবা প্রচারধর্মী ছোট্ট ফিল্মের একমাত্র অবলম্বনই হল টিভির ছোট পর্দা (সে সঙ্গে আজকাল YouTube ও আছে)।

মনে রাখা প্রয়োজন টিভির আত্মপ্রকাশের আগে ওই দশ-পনেরো মিনিটের ছোট্ট-ফিল্মগুলো (ডকুমেন্টারি) সিনেমা হলে দর্শকের কাছে নির্ধারিত ছবির সঙ্গে ছিল একটি বাড়তি আকর্ষণ। এখন সময় পাল্টেছে, এ ছবি আজ বড় পর্দার সিনেমার লেজুড় হয়ে না থেকে স্বমহিমায় উঠে এসেছে টিভির পর্দায়, প্রদর্শিত হচ্ছে ফিল্ম সোসাইটিতে, প্রদর্শিত হচ্ছে দেশে বিদেশে ফিল্ম ফেস্টিভেলেও।

৫.৫   মুদ্রণ মাধ্যম: সংবাদ লিখন, ফিচার লিখন, সম্পাদনা, প্রুফ রিডিং
৫.৫   মুদ্রণ মাধ্যম:
        সংবাদ লিখন, ফিচার লিখন, সম্পাদনা, প্রুফ রিডিং

সংবাদ লিখন একটি স্বতন্ত্র ধরনের লিখন-পদ্ধতি যা অপরাপর লিখন-কর্মের কাছাকাছি থেকেও দূরে। এখানে বিষয়বস্তু যতটুকু গুরুত্বপূর্ণ ততটুকুই গুরুত্বপূর্ণ হল উপস্থাপনা। সংবাদপত্র তথা সংবাদ-লেখকদের কাজই হল প্রাত্যহিকতা নিয়ে; অতীত কিংবা নিকট-অতীতও নিউজ হয়ে আসতে পারে, তবে সর্বাবস্থায় বর্তমানের সঙ্গে এর প্রাসঙ্গিকতা খুঁজে নিতে হবে। সতত পরিবর্তনশীল মিডিয়া জগতে কোন ঘটনা বা কোন বিষয়কে কোথায়, কীভাবে এবং কত ক্রয় পরিবেশন করা- এটাই গুরুত্বপূর্ণ ।

মুদ্রণ মাধ্যমকে এখন সংগ্রাম করতে হচ্ছে বৈদ্যুতিন মাধ্যমের বিরুদ্ধে। কোনও ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গেই টিভির চ্যানেলে তা প্রচারিত হয়ে যায়, ছড়িয়ে পড়ে ইন্টারনেট-স্মার্টফোনের মাধ্যমে; আর মুদ্রিত হয়ে সেই সংবাদটি পাঠকদের হাতে এসে পৌঁছোতে লাগে বারো থেকে চব্বিশ ঘণ্টা সময়। এ অবস্থায় সংবাদ লেখকের সামনে বড় প্রত্যাহ্বান:

  • কেন পাঠক ইতিমধ্যে জানা-হয়ে-যাওয়া এ সংবাদটি পড়বেন? সাংবাদিক তো সংবাদ তৈরি করতে পারবেন না, নতুন তথ্য আগেই পৌঁছে যাচ্ছে গ্রাহকের কাছে।
  • বৈদ্যুতিন মাধ্যমের সংবাদটি তো ক্ষণকালের স্ফুলিঙ্গ। উড়ে গিয়ে ফুরিয়ে যাওয়াই তার কাজ। কিন্তু প্রিন্ট-মাধ্যমে নিউজ স্টোরিটি পাঠক রয়ে সয়ে পড়বেন। পাঠকের অতিরিক্ত কৌতূহল মেটানো, জানা জিনিসকে আকর্ষণীয় করে পরিবেশন তো করতেই হবে ; এছাড়াও সংরক্ষিত হার্ড-কপি যে কোন্ দিক থেকে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হবে কে জানে।

এখানে এ কথাটি মনে রাখা প্রয়োজন, বৈদ্যুতিন মাধ্যমের আত্মপ্রকাশ মুদ্রণ মাধ্যমের সামনে একটা বড় প্রত্যাহ্বান হিসেবে খাড়া হলেও মুদ্রণ মাধ্যম তার স্বমহিমায়ই অবস্থান করছে। প্রথম দিকে পাঠকসংখ্যার সামান্য হেরফের হলেও নতুন মাধ্যমটি সংবাদপত্রের পাঠক ছিনিয়ে নিতে সক্ষম হয়নি। তবে যা হয়েছে তা হল নিউজ স্টোরির ভাষা, আঙ্গিক, সংবাদ লে-আউট, ডিজাইনিং-এ পরিবর্তন। এসব বাদ দিলে সংবাদ লিখনের মৌল পদ্ধতিটি অপরিবর্তিতই আছে। এ মৌলিক পদ্ধতিটি কী তা একটু দেখে নেওয়া যাক্।

সংবাদ বিশেষজ্ঞরা সংবাদ লিখনের আঙ্গিক বোঝাতে গিয়ে একটি উপমার ব্যবহার করেন- Inverted Pyramid structure অর্থাৎ উল্টো পিরামিড কাঠামো। পিরামিডের স্থপতিরা উঠেছেন নিচ থেকে উপরে, সংবাদ স্থপতিরা প্রথম পদক্ষেপেই শীর্ষবিন্দুতে চড়ে বসেন এবং এরপর স্তরে স্তরে নিচের দিকে নামতে থাকেন, খবরের ব্যাকগ্রাউন্ডে যান। খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি একেবারে প্রথমে, এরপর এক একটি অনুচ্ছেদে অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো উন্মোচিত হতে থাকে। মানে প্রথম স্ট্রোকেই নিউজ, তারপর কী, এরপর আসছে কে, কোথায়, কখন, কেন, কীভাবে। ইংরেজিতে mnemonic, মানে স্মৃতি-সহায়ক হল 5 W, I H (how), বাংলায় ৬টি 'ক'-এ ফরমুলার মধ্যে থেকেই সমস্ত সংবাদ-লিখনের পদ্ধতি।

সাংবাদিকতার বিভাজন :

বিষয়ের উপর ভিত্তি করে সাংবাদিকতার রকমফেরও রয়েছে। এগুলো এরকম হতে পারে-

  • রাজনৈতিক সাংবাদিকতা
  • দুর্যোগ সংবাদিকতা
  • ক্রাইম সাংবাদিকতা
  • বাণিজ্য সাংবাদিকতা
  • বিনোদন সাংবাদিকতা
  • ভ্রমণ সাংবাদিকতা
  • সাংস্কৃতিক সাংবাদিকতা
  • বিজ্ঞান সাংবাদিকতা
  • ক্রীড়া সাংবাদিকতা

প্রত্যেকটি বিষয়ভিত্তিক সাংবাদিকতার এক-একটি নিজস্ব চরিত্রলক্ষণ আছে এবং সাংবাদিককে নিজস্ব ক্ষেত্রটি খুঁজে নিয়ে এ বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করে নিতে হয়। তবে সর্বপ্রথম এ কথাটি মনে রাখা চাই, ঘটনা মাত্রই সংবাদ নয়। একটি ঘটনা সংবাদ হয়ে উঠতে হলে এর কিছু বৈশিষ্ট্য থাকা চাই। অস্বাভাবিকতা, নৈকট্য, সময়, পাঠকের আগ্রহ এবং ঘটনার পরিণতি - এ থেকেই নিউজ সম্ভাবনা তৈরি হয়। সাংবাদিকের কাজ এ সম্ভাবনাগুলো আবিষ্কার করা। রাজনৈতিক ঘটনা, দুর্যোগ, ক্রাইম - এসবের সংবাদমূল্য নিয়ে বিশেষ কিছু বলার নেই, তবে বাণিজ্য, বিজ্ঞান এসব ক্ষেত্রে বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান, অভিজ্ঞতা যতটা প্রয়োজন ঠিক ততটাই প্রয়োজন এতে নিউজ-সম্ভাবনা আবিষ্কার এবং সর্বসাধারণের কাছে আকর্ষণীয়ভাবে পরিবেশনের দক্ষতা।

বিনোদন জগতের জন্য প্রত্যেক কাগজেই একটি সংস্থান থাকে। এতে নিজস্ব সাংবাদিক ছাড়াও অপেশাদার, বিশেষজ্ঞদের দিয়েও প্রতিবেদন লিখিয়ে নেওয়া হয় অনেক সময়। সাহিত্য, শিল্প, সংগীত, নাটক, সিনেমার উপর সংবাদপত্রে এক-একটি প্রতিবেদন কতটুকু তথ্যসমৃদ্ধ, নান্দনিক, পাঠযোগ্য হয়ে উঠতে পারে এর পরিচয় পেয়ে আমরা চমকিত হই। পত্রপত্রিকার আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বিনোদন কলাম/পৃষ্ঠার গুরুত্ব অপরিসীম। ওই একই ধারার লিখনকর্মের মধ্যে এসে যায় সাহিত্য-ক্রোড়পত্র, যেখানে গ্রন্থ সমালোচনার সঙ্গে সঙ্গে সৃজনশীল সাহিত্য, মননশীল প্রবন্ধেরও সংস্থান থাকে। আর সিনেমা সাংবাদিকতা, সিনেমা-সমালোচনা আজকাল সাধারণ সাংবাদিকতার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে উঠেছে। সংবাদপত্রে এ’কে সফ্ট নিউজ হিসেবে গণ্য করা হয়।

ভ্রমণ সাংবাদিকতা সাধারণত বাণিজ্যিক ক্রোড়পত্র বা বাণিজ্যিক কলাম হিসেবেই প্রকাশিত হয়। এ কলামের ব্যাপ্তি অনেক বেশি। ইতিহাস-নৃতত্ত্ব-উৎসব-রান্নাবান্না-পোশাকআশাক, নিসর্গ প্রকৃতি ছাড়াও পর্যটন স্থলে আসা-যাওয়া, থাকা-খাওয়ার হদিশ সব কিছুই এতে থাকে। এ কলামের লেখকদের কর্মক্ষেত্র অনেক বিস্তৃত; এ সাংবাদিকতায় আলঙ্কারিক, কাব্যিক ভাষা তো থাকবেই, তবে সব কিছুই হতে হবে কমার্শিয়েল। আর। সে সঙ্গে রয়েছে দৃষ্টিনন্দন ফটোগ্রাফি।

প্রতিটি সংবাদপত্রের শেষ পাতাটি থাকে ক্রীড়া সংবাদের জন্য। কিন্তু সময় বিশেষে শেষ পাতা থেকে প্রথম পাতার শুধু হেড লাইন নয়, পুরো পাতাটিও চলে যায় ক্রীড়া-সাংবাদিকদের হাতে এটা আমরা মাঝে মাঝেই দেখি। ক্রীড়া সাংবাদিকতা যে একেবারে সাহিত্য পদবাচ্য হয়ে ওঠে এর প্রমাণ বাংলা সাহিত্যেই আছে। যতই টিভির পর্দায় খেলার ধারাবিবরণী হোক্ কেন, খবর কাগজের খেলার পাতার দিকে চোখ না বুলিয়ে বাঙালি পাঠকের আজও দিন শুরু করা অসম্ভব। এ সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ সবসময়ই উজ্জ্বল।

সংবাদ-লিখনের ভাষা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। নিরলঙ্কার, স্বাভাবিক গদ্যই সংবাদপত্রের আদশ ভাষা। কাব্যিকতাকে প্রশ্রয় দিলেই সংবাদ গুরুত্বহীন হয়ে যাবে।

বাক্যগুলো হতে হবে সরল, সংক্ষিপ্ত। পরিভাষা এড়িয়ে যাওয়াই উচিত; বিদেশি ব প্রাদেশিক শব্দ, নামের প্রতিবর্ণীকরণ যত্নসহকারে রপ্ত করে নেওয়া প্রয়োজন। আর মনে রাখ চাই সর্বজনগ্রাহ্য বানানকে হঠাৎ করে বদলে নিলে পাঠক গ্রহণ করতে চান না। সংবাদপত্রে মহাত্মা গান্ধীর বানান ‘গান্ধি’ পাঠক গ্রহণ করে ফেলেছেন, কিন্তু ‘গাঁধি’ শব্দটি চোখকে পীড়িতই করে; বালগঙ্গাধর তিলককে ‘টিলক’, গাভাস্কারকে ‘গাওস্কার’ লিখলে পাঠক বিব্রতই হন। তাছাড়া সংবাদ সব সময় প্রমিত বানানেই লিখতে হবে। প্রাচীন (বিকল্প হিসেবে চিহ্নিত হলেও) আর বর্জিত বানানকে পরিহার করা চাই। কঠিন শব্দ পরিহারের সঙ্গে সঙ্গে ক্লিশে হয়ে যাওয়া শব্দ বা শব্দগুচ্ছ, আপ্তবাক্য এড়িয়ে চলা প্রয়োজন। সংবাদ লিখনে ‘আমি’ শব্দের স্থান নেই। নিরপেক্ষতা বজায় না রাখলে সংবাদ গ্রহণযোগ্যতা পাবে না।

আর সংবাদ লিখনে যা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তা হল পরিমিতিবোধ। কতটুকু লিখব আর কখন হাত গুটাবো এটা স্থির করা গুরুত্বপূর্ণ। সংবাদ প্রেরককে বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে, যেখানে পাঁচশো শব্দের ভেতর লেখাটি গুটিয়ে নিতে হবে সেখানে হাজার শব্দের অপব্যবহার সম্পাদককে বিব্রত করবে। কোন্ খবর কোন্ কাগজে কতটুকু স্থান পাবার যোগা সেটা বিবেচনায় রাখতে হয়। যে খবর রাজ্য পর্যায়ের কাগজে প্রথম পাতার/হেডলাইন-নিউজ হবে, জাতীয় কাগজে তার স্থান হতে পারে ভেতরের কোনও একটি কলামে; জেলাস্তরের ঘটনার নিউজ ভ্যালু রাজ্যস্তরে গুরুত্বহীন হতেই পারে, আবার কখনও একেবারে স্থানীয় একটি ঘটনা জাতীয় স্তরের কাগজে প্রথম পাতায় স্থান করে নিতে পারে যদি এর ভেতরের সম্ভাবনার দিকটি সাংবাদিক খুঁজে বের করতে সক্ষম হোন।

সম্পাদককেই স্থির করতে হবে কোন্ খবর প্রথম পৃষ্ঠায় বিশাল হরফের হেডলাইনের যোগ্য বা কোন খবর আট-কলম-জোড়া ব্যানার হেডলাইন পাবে, কিংবা কোন্ খবর পাবে দু কলাম।

সম্পাদকের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাজের অন্যতম হল-

  • এডিট করা
  • কপির শুদ্ধিকরণ, সংক্ষিপ্তকরণ, ভাষা, ব্যাকরণ দেখা
  • প্রুফ দেখা, অক্ষরের সাইজ নির্ধারণ করা
  • ছবি সম্পাদনা, পৃষ্ঠাসজ্জা।

এ সমস্ত কাজের জন্য আলাদা বিভাগ থাকলেও প্রতিটা বিভাগের সঙ্গে কো-অর্ডিনেশন রক্ষা করা এবং লে-আউটে যাবার আগে সম্পাদকের দেখে নেওয়া প্রয়োজন। যে-কোনও পৃষ্ঠায়, যে-কোনও কলামে লাস্ট মোমেন্টস্ টাচ দেবার দায়িত্ব সম্পাদকের।

সাধারণত সংবাদপত্রের জাতীয়, আন্তর্জাতিক খবরগুলো আসে সরকারি, বেসরকারি নিউজ এজেন্সির মাধ্যমে। তাই প্রধান খবরগুলো সবগুলোতে প্রায় একই থাকে। কিন্তু অঞ্চলবিশেষে কিছু বৈচিত্রের সাক্ষাৎ পাওয়া যায়, যা এক একটা কাগজের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। আর আছে ‘স্কুপ নিউজ’। এটা একেবারে লটারির মতো। কখন, কোন্ সময় সম্পাদক বা সাংবাদিক বিশেষ চমসৃষ্টিকারী খবরের সন্ধান পেয়ে যাবেন, এবং অন্য কেউ আঁচ করার আগেই বিষয়টিকে কুক্ষিগত করবেন, এর কোনও পূর্বসিদ্ধান্ত হতে পারে না।

শিরোনাম-লিখন হল সম্পাদনা কর্মের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ। আর আছে ইন্ট্রো, অর্থাৎ মোটা অক্ষরে খবরের প্রথম অনুচ্ছেদ, যেখানে থাকে খবরের মূল প্রতিপাদ্য। এ লিখনটি অনুশীলনের মাধ্যমে রপ্ত করে নিতে হয়।

প্রুফ রিডিং এবং কপি এডিটিং :

একটি কাগজের গ্রহণযোগ্যতা, মান সমস্তকিছু যার উপর। নির্ভরশীল তা হল। এর শুদ্ধাশুদ্ধির দিক। খবর কম হলে, বিষয়বস্তুর ঘাটতি থাকলে, পৃষ্ঠাসজ্জা, ফটোসেটিং নৈপুণ্যে ঘাটতি থাকলেও পাঠক সহ্য করে নিতে পারেন, কিন্তু দশ-পনেরোটি পাতার বিশাল পত্রিকায় একটি মাত্র বানান বিভ্রমই এর গুরুত্ব হ্রাস করে দেয় - সেটা সংবাদ কলামেই হোক্, ফিচারে হোক্, বা বিজ্ঞাপনেই হোক্।

লেটার-প্রেসের যুগ থেকে প্রাক্-কমপিউটার পর্ব পর্যন্ত কপি এডিটিং, প্রুফ রিডিং কাজটি ২০ ছিল কঠোর শ্রমসাধ্য এবং সময়সাপেক্ষ। কম্পোজে দেবার আগে প্রেস্-কপিতে এডিটিং কর্মটি করে নিতে হতো, এবং এরপর গ্যালিক্রফ ওঠানোর পর আরও একদফা সংশোধনী। এ প্রক্রিয়া একবারের বেশি দুইবার সংশোধনীর অবকাশও ছিল সীমিত। আর যে-কাজটি নির্ধারিয় সময়সীমার মধ্যে শেষ করে মেশিনে চড়াতে হবে (এবং ছাপা শেষ করে লেটার ভেঙে নতুন কম্পোজে দিতে হবে) নিখুঁতভাবে সম্পাদনার কাজটি সেখানে ছিল নিতান্তই কষ্টসাধ্য, যা বর্তমানে সহজ হয়ে গেছে। মুদ্রণ জগতে পরিবর্তনের এ বিস্তারিত বিবরণে যাবার প্রয়োজন নেই, আমাদের এ কথাটাই মনে রাখতে হবে, কমপিউটার-প্রিন্টিং এর সুবাদে বানান শুদ্ধিকরণ (Spell check), ব্যাকরণ শুদ্ধিকরণের সুবিধা বাংলা লিখন-কর্মে সহজলভ্য হতে চলেছে অভিযান, শব্দকোষের ব্যবহার কমপিউটারের মাউসে এসে যাচ্ছে। ইংরেজিতে soft proof reading প্রকৌশল অনেক আগেই এসে গেছে। পাঁচটি ভুবনে ছড়ানো বাঙালি এবং বাংলাভাষার ভূগোলে বানান প্রকরণে এখনও সমতা আনা সম্ভব না হওয়ায় ওই software বাংলা লিখন-কর্মে এখনও সহজলভ্য হয়নি। বাংলাদেশ এদিকে এগিয়ে গেলেও বানানে সমতা না আসায় সমস্যা রয়েই গেছে।

তবে এখন composed প্রিন্ট-আউট সম্পাদকের টেবিলে এসে গেলে কপি-এডিটিং এবং প্রুফ রিডিং একই সঙ্গে চলতে পারে। বলার কথা হল, এখন একাধিক প্রুফ রিডিং-এর সুযোগ রয়েছে।

বাংলা মুদ্রণ জগতে- পত্রপত্রিকা, ম্যাগাজিন, বইপত্র প্রকাশনার ক্ষেত্রে হার্ড-কপি প্রুফ রিডিং এখনও চালু রয়েছে, এবং এ কাজটি মোটামুটি সেই একই ধারায় প্রবহমান।

প্রুফ দেখে প্রেসকর্মীরা যখন সংশোধন করেন, এরা দেখেন শুধু চিহ্ন বা অক্ষর, এবং প্রফ-শিটের ডানে-বাঁয়ে দেওয়া নির্দেশগুলো, আর কিছুই নয়। টেক্সট পড়ায় দায় তাঁদের নয়। প্রফ-রিডার হ্রস্ব-ই, দীর্ঘ-ই ইত্যাদি সংশোধনীতে গোটা অক্ষরটি অবিকৃত রেখে কেবল মাত্র -িকার, কিংবা-কার এর উপরই লাল কালির দাগ দিয়ে শুদ্ধ চিহ্নটি মার্জিনে লিখে দেন, এতেই কাজ চলে যায়। কোনও লাইন যদি বাদ পড়ে (মিসিং হয়), তবে কী করতে হয়? না, পুরো লাইনগুলো লেখার প্রয়োজন নেই, মার্জিনে এর স্থান সংকুলানও হবে না। যা করতে হয় তা হল, এ স্থলে See copy বা Line missing লিখে মূল পাণ্ডুলিপিতে বাদ পড়া অংশটিতে আন্ডারলাইন করে দেওয়া। এসব খুঁটিনাটি বিষয় বুঝে নিতে কোনও প্রেস থেকে কয়েকটি প্রুফ-শিট চেয়ে এনে দেখে নিন। কয়েকদিনের অনুশীলনেই বিষয়টি রপ্ত হয়ে যাবে।

সে সঙ্গে অক্ষরের সাইজ (Point) জেনে নিতে প্রেস থেকে একটি অক্ষরের তালিকাও সংগ্রহ করে নিতে পারেন, নয়তো নেট থেকে ডাউনলোড করেও নিতে পারেন। এটা শুধু প্রুফ-রিডিং নয়, লেখালেখি এবং প্রকাশন সংক্রান্ত কাজের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গও।

ছাপার একটা নিজস্ব ভাষা আছে। অক্ষরের সাইজ, বোল্ড লেটার, বক্রাক্ষর (ইটালিক (লেটার), বিরতি চিহ্ন, দুটো শব্দের মধ্যবর্তী গ্যাপ রাখার নিয়ম সব কিছুরই একটা নিজস্ব ভাষা রয়েছে। ছাপাকর্মটি তো কেবলমাত্র সাদা কাগজের উপর কালো কালির ছোপ দেওয়া নয়। এ কাজটি করতে হয় নানা বয়সের, নানা পেশার টার্গেট রিডারের প্রয়োজন, প্রত্যাশা এবং গ্রহণক্ষমতা অনুযায়ী। এতে প্রুফ-রিডারের সঙ্গে লেখক এবং যিনি পান্ডুলিপি তৈরি করেন, প্রেস-কপি লিখে দেন তাঁদেরও দায়িত্ব রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে এটাও বলা প্রয়োজন, কোনও কিছু লিখে দিলেই লেখকের কাজ শেষ হয় না, লেখাটি যথাযথ ভাবে পাঠকদের হাতে তুলে দিতে প্রকাশক-মুদ্রককে সহযোগিতা করাও লেখকের দায়িত্ব। যে-লেখকের মুদ্রণজগৎ সম্পর্কে কোনও ধারণা নেই, তাঁর পক্ষে প্রিন্টার্স-ফ্রেন্ডলি প্রেস্-কপি তৈরি করে দেওয়া সব সময় সম্ভবও হয় না, ফলে মুদ্রিত বইয়ের ভুল ভ্রান্তির দায়ভার পড়ে প্রুফ-রিডার এবং অন্যান্য প্রেস্ কর্মীদের উপর, নয়তো ছাপাখানার ভূত (Printer's Devil) নামক একটি অলীক প্রাণীর (যাকে scapegoat-ও বলা যায়) উপর।

৫.৬   বিজ্ঞাপনের ভাষা

বিজ্ঞাপন হল ‘কমিউনিকেশন’-এর একটি ফর্ম যেখানে কোনও উৎপাদিত দ্রব্য টার্গেট। ক্রেতা বা খাদক সমাজের কাছে লিখিত ভাবে, মৌখিক ভাবে, দৃশ্য-শ্রুতি (audio-visual) মাধ্যমে তুলে ধরা হয়। এ বিজ্ঞাপন কোনও আহরণযোগ্য জিনিস হতে পারে, কোনও তত্ত্বও হতে পারে, এর উপস্থাপক কোনও একক ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা সরকারও হতে পারে। তবে বিজ্ঞাপন মূলত একটি মার্কেটিং কমিউনিকেশন, ব্যবসাই এর প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ চালিকা শক্তি।

বিজ্ঞাপনের অবলম্বন হতে পারে রেডিও-টিভি-ফিল্ম, সংবাদপত্র সহ অপরাপর মুদ্রণ মাধ্যম, দেওয়াল লিপি, ডাক এবং সাম্প্রতিক কালের সোস্যাল মিডিয়া, ওয়েবসাইট, ব্লগ, মোবাইল এস-এম-এস, কিংবা সরাসরি ফোনকল। আর শহর, শহরতলি, গ্রামগঞ্জে নান বেশে, নানা সাজে, নানা ভাষা, শব্দ ও ধ্বনি সম্ভারে বিচরণশীল মূর্তিমান বিজ্ঞাপন, অর্থাৎ ফেরিওয়ালার দল তো রয়েছেনই। সভ্যতা বিকাশের করে আদিপর্ব থেকে মধ্যযুগ হয়ে শিল্পায়ন বা নগরায়নের যুগে প্রায় একই ভাবে রাজত্ব করে যাচ্ছে বিজ্ঞাপন।  যুগের প্রয়োজনে এর আঙ্গিকের পরিবর্তন বা রূপান্তর ঘটেছে এই যা।  প্রাচীন

সাহিত্য, মহাকাব্য, পুরাণে পৃথিবীর নানা দেশে ফেরিওয়ালাদের সাক্ষাৎ পাওয়া যায়। জাতকের কাহিনিতে বোধিসত্ত্বকে ফেরিওয়ালার বেশে (রাধাপ্রসাদ গুপ্ত, কলকাতার ফিরিওয়ালার ডাক, ২০০৭, পৃ.১), আরব্য রজনীতে দুষ্ট জাদুকরকে পুরানো প্রদীপের বদলে নতুন প্রদীপের বিজ্ঞাপন করতে, পদ্মাপুরাণে ছদ্মবেশি নেতা ধুপুনীর সঙ্গে বেহুলাকেও চাঁদ সওদাগরের বাড়িতে তৈরি ‘খাড়ি আর ব্যাজনি’ ফেরি করতে দেখা গেছে। মুকুন্দরামের ‘চন্ডীমঙ্গল’-এ মাংসের পসরা নিয়ে ঘরে ঘরে ফিরতে দেখা গেছে অভাগী ফুল্পরাকে সেই ষোড়শ শতকেই। আর ঔপনিবেশিক আমলে কলকাতার রাস্তায় ইংরেজ পাদরিকে পাপী তাপীদের উদ্ধারের জন্য ধর্ম ফেরি করতেও দেখা গেছে। উনবিংশ শতকে ইউরোগ এশিয়া, মার্কিন মুলুকে ফেরিওয়ালাদের মিছিল বিজ্ঞাপন জগতে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা করেছে। আর পরবর্তী দুইটি শতকে বিজ্ঞাপন একেবারে প্রতিষ্ঠানিক রূপ নিয়ে বিশ্বের দেশে দেশে রাজত্ব করছে।

বিজ্ঞাপনের অবলম্বন হতে পারে রেডিও-টিভি-ফিল্ম, সংবাদপত্র সহ অপরাপর মুদ্রণ মাধ্যম, দেওয়াল লিপি, ডাক এবং সাম্প্রতিক কালের সোস্যাল মিডিয়া, ওয়েবসাইট, ব্লগ, মোবাইল এস-এম-এস, কিংবা সরাসরি ফোনকল। আর শহর, শহরতলি, গ্রামগঞ্জে নান বেশে, নানা সাজে, নানা ভাষা, শব্দ ও ধ্বনি সম্ভারে বিচরণশীল মূর্তিমান বিজ্ঞাপন, অর্থাৎ ফেরিওয়ালার দল তো রয়েছেনই। সভ্যতা বিকাশের করে আদিপর্ব থেকে মধ্যযুগ হয়ে শিল্পায়ন বা নগরায়নের যুগে প্রায় একই ভাবে রাজত্ব করে যাচ্ছে বিজ্ঞাপন। যুগের প্রয়োজনে এর আঙ্গিকের পরিবর্তন বা রূপান্তর ঘটেছে এই যা। প্রাচীন সাহিত্য, মহাকাব্য, পুরাণে পৃথিবীর নানা দেশে ফেরিওয়ালাদের সাক্ষাৎ পাওয়া যায়।

জাতকের কাহিনিতে বোধিসত্ত্বকে ফেরিওয়ালার বেশে (রাধাপ্রসাদ গুপ্ত, কলকাতার ফিরিওয়ালার ডাক, ২০০৭, পৃ.১), আরব্য রজনীতে দুষ্ট জাদুকরকে পুরানো প্রদীপের বদলে নতুন প্রদীপের বিজ্ঞাপন করতে, পদ্মাপুরাণে ছদ্মবেশি নেতা ধুপুনীর সঙ্গে বেহুলাকেও চাঁদ সওদাগরের বাড়িতে তৈরি ‘খাড়ি আর ব্যাজনি’ ফেরি করতে দেখা গেছে। মুকুন্দরামের ‘চন্ডীমঙ্গল’-এ মাংসের পসরা নিয়ে ঘরে ঘরে ফিরতে দেখা গেছে অভাগী ফুল্পরাকে সেই ষোড়শ শতকেই। আর ঔপনিবেশিক আমলে কলকাতার রাস্তায় ইংরেজ পাদরিকে পাপী তাপীদের উদ্ধারের জন্য ধর্ম ফেরি করতেও দেখা গেছে। উনবিংশ শতকে ইউরোগ এশিয়া, মার্কিন মুলুকে ফেরিওয়ালাদের মিছিল বিজ্ঞাপন জগতে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা করেছে। আর পরবর্তী দুইটি শতকে বিজ্ঞাপন একেবারে প্রতিষ্ঠানিক রূপ নিয়ে বিশ্বের দেশে দেশে রাজত্ব করছে।


বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপনের উদ্দেশ্য হল মানুষের মনোজগৎকে নিয়ন্ত্রণে এনে নাগরিক সমাজকে ক্রেতা বা খাদক সমাজে রূপান্তরিত করা। ইংরেজিতে যাকে বলে কনজিউমার সোসাইটি বা যে সংস্কৃতিকে বলে কনজিউমারিজম, এটা একান্তই বিজ্ঞাপন-সৃষ্ট ব্যাপার। এ বিজ্ঞাপনের উদ্দেশ্য মানুষের মনের ভেতর একটা অদম্য চাহিদা তৈরি করে বাজারের নিয়ন্ত্রণ ক্রেতার হাত থেকে বিক্রেতার হাতে তুলে (transforming the buyer's market into seller's market) দেওয়া। লক্ষণীয়, অত্যাবশ্যক জিনিসপত্র নয়, অনাবশ্যক ভোগ্যপণ্যেরই বিজ্ঞাপন প্রয়োজন। [বিস্তারিত ব্যাখ্যার জন্য দেখুন The Affluent Society by John Kenneth Galbraith, U S. 1958]

আকর্ষণীয় মোড়কে, চিত্রে, আকর্ষণীয় ভাষায়, নবতর প্রকৌশলের ব্যবহারে ক্রেতার মনের গভীরে গাড়ি-বাড়ি-ফ্রিজ-টিভি-সফট্ ড্রিংকস, বাহারি পোশাকের টার্গেট প্রতি তীব্র আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তোলার ফলে মানুষের মনের ভেতর নিজের ক্রয় ক্ষমতার কথা না ভেবেই (without the support of purchasing capacity) ওইসব জিনিস আহরণের ইচ্ছা প্রবল হয় । এটাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে এল হায়ার-পারচেজ ব্যবস্থা, ব্যাঙ্ক লোন, কিস্তিতে কিস্তিতে ঋণশোধ করে বিলাসদ্রব্যে ঘর ভর্তি করার প্রবণতা।

আধুনিক পৃথিবীটা মূলত বিজ্ঞাপনের পৃথিবীই। মানুষের আশা আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন, কল্পনাকে এখন নিয়ন্ত্রণ করে বিজ্ঞাপন। বর্তমান Consumer society অর্থাৎ খাদক-সমাজ এ বিজ্ঞাপনেরই সৃষ্টি, এবং বিজ্ঞাপন এ সমাজে সৃজনশীল শিল্পেরই মর্যাদায় আসীন। বিজ্ঞাপনের জগৎ এখন পৃথিবীর প্রতিভাবান লেখক-শিল্পী-কলাকুশলী এবং প্রকৌশলীদের কাঙ্ক্ষিত জগৎ। এদের প্রয়াসে বিজ্ঞাপনে বাণিজ্যের সঙ্গে মিশেছে নান্দনিকতা, প্রকৌশলের সঙ্গে কবিতা। ইংরেজিতে ‘ক্রিয়েটিভ আর্ট’, বা ‘ফাইন আর্টে’র সমান্তরাল ভাবে চালু হয়েছে আরেকটি শব্দগুচ্ছ, ‘কমার্শিয়েল আর্ট।’ এখানে বিজ্ঞাপন মূলত বিপণন হলেও স্বীকৃতি পায় আর্টের। চিত্রকলা, সংগীত, চলচ্চিত্র সর্বত্রই প্রচ্ছন্ন রয়েছে বিজ্ঞাপন। এমনকী পিওর আর্ট বা বিশুদ্ধ শিল্প বলে স্বীকৃত সৃজনশীল সাহিত্য-গল্প-উপন্যাস-কবিতার স্তরে স্তরে লেখকের জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতসারে বিজ্ঞাপন। বিজ্ঞাপন শাসিত, বিজ্ঞাপন তাড়িত আজকের সমাজ এতে কোন অস্বাভাবিকতাও দেখে না। তবে আজকের দিন কেন, বাংলা সাহিত্যের গৌরবের দিনেও ছিল বিজ্ঞাপনের রাজত্ব। বিংশ শতকের প্রথম পর্বে সাহিত্য পুরস্কার প্রচলন করে কুন্তলীন কোম্পানি বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন- “গল্পের সৌন্দর্য কিছুমাত্র নষ্ট না করিয়া কুন্তলীন এবং এসেন্স দেলখোশের অবতারণা করিতে হইবে।” (কলকাতা, ১৯০৩) তবে সঙ্গে এ সাবধানবাণীও ছিল, লেখকরা যেন সচেতন থাকেন এ অবতারণা যেন বিজ্ঞাপন বলে বোঝা না যায়।

বিজ্ঞাপন এখন একটি অন্যতম বৃত্তি, একেবারে প্রাতিষ্ঠানিক বৃত্তিও। তাই আজকের দিনে প্রাতিষ্ঠানিক এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক পাঠক্রমেও এর সংস্থান। বিজ্ঞাপন শিল্পের নানা রকমফের, কর্মবিভাজন, বিজ্ঞাপনের তাত্ত্বিক এবং প্রায়োগিক দিক- এ সবই এখন প্রণালীবদ্ধ পাঠক্রমের আওতায়। নির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণে এ পাঠ বিজ্ঞাপন জগতে প্রবেশিচ্ছুদের বিশেষ সহয়তাও করছে। বর্তমান পাঠক্রমে বাংলা প্রচারমাধ্যমে বিজ্ঞাপন শিল্পের উপর প্রাথমিক একটা ধারণা দেবার প্রয়াস থাকবে।

বিভিন্ন মানসিকতার, বিভিন্ন বিষয়ের পড়ুয়াদের নিজস্ব ইচ্ছা, মানসিক প্রবণতা অনুযায়ী বিজ্ঞাপন জগতে নিজের স্থান নেবার সুযোগও রয়েছে। যাঁরা লেখালেখি করতে পছন্দ করেন তাঁরা পারবেন বিজ্ঞাপনের কপিরাইটিং করতে, বিজ্ঞাপনের বয়ান তৈরি করতে, শ্লোগান, পদ্য-গদ্য টেক্সট, প্রমোশনেল লিটারেচারকে বৃত্তি করতে। তাছাড়াও চিত্রকলা, ডিজাইনিং, ফটোগ্রাফি, ফিল্ম কিংবা কমার্শিয়েল অ্যাক্টিং, মডেলিং-এ যাঁদের আগ্রহ তাঁরা নিজেদের পছন্দমত অ্যাড এজেন্সির সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করতে পারেন। এবং এ সমস্ত কিছুর জন্যই প্রণালীবদ্ধ ভাবে বিজ্ঞাপনের পাঠ নেওয়া প্রয়োজন এবং প্রাসঙ্গিক।

পত্রিকার পাতা খুললেই বা টেলিভিশনের পর্দায় চোখ মেললেই দেখবেন বিজ্ঞাপন। যার অনেক কিছুই শৈল্পিক দিকে সার্থক, চিত্তাকর্ষক, আবার অনেক কিছু বিরক্তিকরও। ঊনবিংশ মাস্তাহ্মার শেষ আর বিংশ শতাব্দীর প্রথম পর্ব থেকেই মুদ্রণ জগতে বিজ্ঞাপন নিজস্ব স্থান করে নিয়েছিল। পুরনো পত্রিকার ফাইল ওল্টালে দেখা যাবে সেখানে বিজ্ঞাপন কী করে শিং (বাণিজ্যিক শিল্প) হয়ে উঠেছিল। দেশবরেণ্য ব্যক্তিরাও কোনও ব্রান্ডের প্রশংসা করছেন। প্রশস্তি লিখছেন; কোথাও বা তাঁদের অনুমোদন বা উচ্ছ্বাস বিজ্ঞাপনদাতারা করেছেন বাজারজাত। এতে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটা ভূমিকা ছিল। কালি-কলম থেকে শুরু করে মাথার তেল, ক্রিম, সাবান, মেশিনারি, গ্রামোফোন রেকর্ড- এসবের বিজ্ঞাপনে কবির উপস্থিতি ছিল।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত একটি বিজ্ঞাপন-পদ্য:

কেশে মাখ ‘কুন্তলীন’।
রুমালেতে ‘দেলখোস’॥        
পানে খাও ‘তাম্বুলীন’।
ধন্য হোক্ এইচ বোস॥        
- প্রবাসী, ১৩৫২ বঙ্গাব্দ, কলিকাতা
কেশে মাখ ‘কুন্তলীন’।
রুমালেতে ‘দেলখোস’॥
পানে খাও ‘তাম্বুলীন’।
ধন্য হোক্ এইচ বোস॥
- প্রবাসী, ১৩৫২ বঙ্গাব্দ, কলিকাতা

বিশ্ববিখ্যাত চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ও জীবন শুরু করেছিলেন বিজ্ঞাপন সংস্থা কাজ করে এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন, বই, পত্রপত্রিকার প্রচ্ছদ (সিগনেট, সন্দেশ) দৈনিক পত্রিকার নামলিপি (আজকাল) ছাড়াও তাঁর নিজস্ব সিনেমার সমস্ত পোস্টার ইত্যাদি নিজের হাতে করে গেছেন।

বিংশ শতকের তিন, চার দশকের ‘বিচিত্রা’, ‘ভারতবর্ষ’, ‘বঙ্গশ্রী’, ‘প্রবাসী’ ইত্যাদি পত্রিকায় প্রকাশিত বিজ্ঞাপনগুলো ছিল চিত্তাকর্ষক। এসবের মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য বিজ্ঞাপনটি আজও স্মৃতি থেকে মুছে যায়নি-‘সুখী গৃহকোণ, শোভে গ্রামোফোন’। সেকালের কুকুর-শোনা কলের গানের এ বিজ্ঞাপন আজও অনেককে স্মৃতিভারাতুর করে তোলে।

পঞ্চাশ-ষাটের দশকে রেডিওর বিজ্ঞাপনগুলো ছিল বিশেষ আকর্ষণীয়। আকাশবাণীর বিবিধ ভারতীর সেই সুরেলা উচ্চারণ, ‘খুসবুদার অ্যান্টিসেপ্টিক ক্রিম বরোলীন’, আর উদাও কন্ঠে উচ্চারণ ‘আলোর জগতে এল নতুন রাজা বেঙ্গল ফ্লুরসেন্ট টিউব’, সঙ্গে গান, ‘টিপ দিলেই জ্বলে ওঠে, বেঙ্গল ফ্লুরসেন্ট টিউব, দামও কম পড়ে খরচও কম, বেঙ্গল ফ্লুরসেন্ট টিউব।’ এ দিয়েই আমাদের শ্রুতি-বিজ্ঞাপনের প্রথম অধ্যায়।

এ ধারারই সম্প্রসারণ ঘটল দূরদর্শনের পর্দায়, ‘ওয়াশিং পাউডার নির্মা’। এরপর সহস্র চ্যানেলে যখন টেলিভিশনের প্রচার শুরু হল, বিজ্ঞাপনের জঙ্গলে মানুষ হল দিশাহারা। তবে এর মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞাপন, বলা চলে ‘বিজ্ঞাপনের বিজ্ঞাপন’ দর্শকের কাছে চিরসত্য হয়ে আছে- ‘ফিরে আসছি একটি বিজ্ঞাপনের বিরতির পর, অন্য কোথাও যাবেন না প্লিজ।’ অন্যকোথাও গিয়ে নিস্তারও নেই, সেখানেও বিজ্ঞাপন। এ বিজ্ঞাপন আপনার লগ-ইন করা ওয়েবসাইটে, পকেটের ভেতর মোবাইল সেটে, রাস্তাঘাটে যেদিকে চোখ মেলবেন সর্বত্র হাসপাতালের প্রসূতিগার থেকে শ্মশানঘাট, বিয়ের বাসরসজ্জা থেকে মন্দিরের গর্ভগৃহ অবধি।

পঞ্চাশ-ষাটের দশকে রেডিওর বিজ্ঞাপনগুলো ছিল বিশেষ আকর্ষণীয়। আকাশবাণীর বিবিধ ভারতীর সেই সুরেলা উচ্চারণ, ‘খুসবুদার অ্যান্টিসেপ্টিক ক্রিম বরোলীন’, আর উদাও কন্ঠে উচ্চারণ ‘আলোর জগতে এল নতুন রাজা বেঙ্গল ফ্লুরসেন্ট টিউব’, সঙ্গে গান, ‘টিপ দিলেই জ্বলে ওঠে, বেঙ্গল ফ্লুরসেন্ট টিউব, দামও কম পড়ে খরচও কম, বেঙ্গল ফ্লুরসেন্ট টিউব।’ এ দিয়েই আমাদের শ্রুতি-বিজ্ঞাপনের প্রথম অধ্যায়।

এ ধারারই সম্প্রসারণ ঘটল দূরদর্শনের পর্দায়, ‘ওয়াশিং পাউডার নির্মা’। এরপর সহস্র চ্যানেলে যখন টেলিভিশনের প্রচার শুরু হল, বিজ্ঞাপনের জঙ্গলে মানুষ হল দিশাহারা। তবে এর মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞাপন, বলা চলে ‘বিজ্ঞাপনের বিজ্ঞাপন’ দর্শকের কাছে চিরসত্য হয়ে আছে- ‘ফিরে আসছি একটি বিজ্ঞাপনের বিরতির পর, অন্য কোথাও যাবেন না প্লিজ।’ অন্যকোথাও গিয়ে নিস্তারও নেই, সেখানেও বিজ্ঞাপন। এ বিজ্ঞাপন আপনার লগ-ইন করা ওয়েবসাইটে, পকেটের ভেতর মোবাইল সেটে, রাস্তাঘাটে যেদিকে চোখ মেলবেন সর্বত্র হাসপাতালের প্রসূতিগার থেকে শ্মশানঘাট, বিয়ের বাসরসজ্জা থেকে মন্দিরের গর্ভগৃহ অবধি।

সমাজ জীবনের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্টে বাঁধা এ বিজ্ঞাপনের ভাষার সঠিক পাঠ, এর ব্যবহারিক এবং শৈল্পিক বিষয়কে পাঠক্রমের অন্তর্ভুক্ত করার ফলে বিজ্ঞাপন-শিল্প ইতিমধ্যেই কর্মনিযুক্তির নতুন সব দিক উন্মোচিত করছে। বাংলা ভাষাশিক্ষার সঙ্গে বিজ্ঞাপন-শিল্পের সংযোগ এ ভাষাকে কবিতা-সংগীত-গল্প-উপন্যাসের জগৎ অতিক্রম করে উৎপাদনের মাধ্যমে রূপান্তরিত করতে সহায়তা করবে নিশ্চিত।

অনুশীলনী
(১)
  • কমিউনিকেশন শব্দটির বাংলা প্রতিশব্দ কী?
  • কমিউনিকেশন কত প্রকারের এবং কী কী?
  • পোশাকী ভাষা এবং ঘরোয়া ভাষার তফাৎ কী?
  • বৈদ্যুতিন মাধ্যম বলতে কী বোঝায়?
  • শ্রুতিমাধ্যম হিসেবে রেডিওর প্রধান উপাদান কী?
(২)
  • আমরা সততই কী প্রকাশ করতে চাই?
  • মৌখিক বচন ছাড়া আর কী ভাবে মানুষ মনের ভাব প্রকাশ করতে পারে?
  • ‘কমিউনিকেশন একটি দ্বিমাত্রিক প্রক্রিয়া’-উদাহরণ দিয়ে বিশ্লেষণ করুন।
  • শুধু ব্যাকরণ-মাফিক বাক্য গঠন ছাড়াও ভাব বিনিময় সার্থক হতে হলে আর কীসের প্রয়োজন?
  • মৌখিক এবং লিখিত ছাড়াও কমিউনিকেশন বা ভাব বিনিময়ের আরেকটি তৃতীয় দিকও রয়েছে, সেটা কী?
(৩)
  • ক্লাসরুম কমিউনিকেশনের ভাষা কী হওয়া চাই? পোষাকি না ঘরোয়া? আপনার যুক্তিপূর্ণ মন্তব্য দিন।
  • ক্লাসরুমে একান্তভাবে মান্যচলতি ভাষা ব্যবহারের কী কী সুফল হতে পারে?
  • ক্লাসরুমে মান্যচলিত ভাষার সঙ্গে আঞ্চলিক উপভাষার সংস্থান রাখা কি উচিত?
  • ক্লাসরুম কমিউনিকেশনে সাফল্য লাভের কয়েকটি পন্থা বলুন।
(৪)
  • তিনটি প্রচার মাধ্যম কী কী? এর মধ্যে কোন্ দুইটি পরস্পরের কাছাকাছি?
  • রেডিও আর টিভির মধ্যে পার্থক্য এবং নৈকট্য কী কী?
  • রেডিও-টিভিতে লেখকের ভূমিকা কতটুকু?
  • কয়েকটি বিশেষ রেডিও অনুষ্ঠানের নাম করুন।
  • রেডিওর কথিকা কী? কথিকা লেখার কয়েকটি নিয়ম বলুন।
(৫)
  • রেডিও-ম্যাগাজিনের আঙ্গিক ও বিষয়বস্তু সম্বন্ধে সংক্ষেপে লিখুন।
  • রেডিওতে মৌখিক বাক্য ছাড়া আর কী কী উপাদান রয়েছে?
  • টাইটেল মিউজিক কী? রেডিও এবং টিভিতে মিউজিকের ভূমিকা কী?
  • রেডিওতে যেমন কাগজ-কলম, তেমনি টিভিতে কী?
  • ক্যামেরায় ভাষা বলতে কী বোঝায়? টিভির পর্দাতে ক্যামেরা কী ভাবে কথা, ভাব, ব্যঞ্জনাকে ফুটিয়ে তোলে?
(৬)
  • রেডিও-স্ক্রিপ্ট লেখার প্রাথমিক নিয়মগুলো কী?
  • টিভি-স্ক্রিপ্ট লেখার তিনটি স্তর কী?
  • রেডিও কি কেবলই কথা-সর্বস্ব মাধ্যম? যুক্তিসহ উত্তর দিন।
  • টিভিতে কথার ভূমিকা কতটুকু?
  • রেডিওর শ্রোতা-সমাজ আর টিভির দর্শকের মধ্যে কি কোন পার্থক্য আছে?
(৭)
  • মুদ্রণ মাধ্যমকে বৈদ্যুতিন মাধ্যমের সঙ্গে কোন্ কোন্ দিকে লড়তে হচ্ছে?
  • টিভি-সংবাদ কি মুদ্রিত সংবাদপত্রের সামনে একটি অপ্রতিরোধ্য প্রত্যাহ্বান?
  • উল্টোপিরামিড বলতে কী বোঝায়? সংবাদ-লিখনের প্রচলিত স্মৃতি-সহায়কটি কী?
  • যে-কোনও ঘটনাই কি সংবাদ? সংবাদ হয়ে উঠতে হলে ঘটনার কী বৈশিষ্টা থাকা চাই?
  • সংবাদের ভাষা কী রকম হওয়া উচিত? সংবাদ লিখতে কী কী বর্জনীয়?
(৮)
  • বৈদ্যুতিন মাধ্যমের (রেডিও-টিভি) সংবাদ-লিখনের সঙ্গে মুদ্রণ মাধ্যমের কি কোনও পার্থক্য থাকে বা থাকতে পারে?
  • সম্পাদকীয়র ভাষা এবং আঙ্গিক সম্বন্ধে সংক্ষেপে লিখুন।
  • সম্পাদনাকর্মের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো কী?
  • মুদ্রণের বা ছাপার ভাষা বলতে কী বোঝায়? এর সঙ্গে আর কী কী জড়িত।
  • প্রুফ রিডিং কী? বানান শুদ্ধিকরণ ছাড়াও এর সঙ্গে আর কী কী কর্ম জড়িত ?
(৯)
  • বিজ্ঞাপন বলতে কী বোঝায়? এর লক্ষ্য কী?
  • বিজ্ঞাপন কী কেবল উৎপাদিত জিনিস ফেরি করা, না আরও অন্যকিছু?
  • আপনার দেখা একজন ফেরিওয়ালার উপর সংক্ষিপ্ত টীকা লিখুন।
  • বিজ্ঞাপন কি একটি সৃজনশীল কর্ম? সাহিত্য-সংগীত-চিত্রকলায় কী ভাবে বিজ্ঞাপনের অনুপ্রবেশ ঘটেছে?
  • বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে কীভাবে ক্রেতার হাত থেকে বাজারের নিয়ন্ত্রণ বিক্রেতার হাতে সরে যায়?
(১০)
  • রাস্তায় প্রদর্শিত বিজ্ঞাপন থেকে দুটো বিজ্ঞাপনের বয়ান সংগ্রহ করুন। কোনটি আপনার পছন্দের এবং কেন?
  • কয়েকটি সাহিত্যগুণ সম্পন্ন বিজ্ঞাপনের নমুনা খুঁজে এর মধ্যে যে কোনও একটির উপর সংক্ষিপ্ত টীকা লিখুন।
  • কলের গান কী? এর বিখ্যাত বিজ্ঞাপনের উপর একটি সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ করুন।
  • রেডিও এবং টিভি বিজ্ঞাপনে গানের ভূমিকা কতটুকু? উদাহরণ সহ লিখুন।
  • একটি রেডিও বিজ্ঞাপনের বয়ান সংগ্রহ করুন এবং এর শিল্পশৈলীর উপর আলোচনা করুন।

তৃতীয় পত্র
অধ্যায় - 
গণসংযোগ