আপনার মুঠোফোনটি ল্যান্ডস্কেপে রাখুন।
এ পর্বটিতে যা জানতে পারবেন —
লিখন বোধ হয় পৃথিবীতে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় কর্ম। আজকের পৃথিবীতে মানুষের ইচ্ছায় হোক্, অনিচ্ছায় হোক্ এ কাজ করে যেতেই হচ্ছে - তা তিনি যে-পেশারই হোন না কেন। পাঠশালার শিক্ষক থেকে সীমান্ত-প্রহরী, মুদিখানার মালিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, টেলিভিশন চ্যানেলের পরিচালক, বিজ্ঞাপন সংস্থার কর্মী - কাগজ কলমকে কেউই এড়িয়ে যেতে পারবেন না। তাঁকে লিখতেই হবে, এমনকী প্রযুক্তির বিবর্তনে কাগজ কলমের ব্যাপারটি কমপিউটারের মনিটরে চলে গেলেও লিখন-কর্ম থাকবেই এটুকু পরিবর্তন নিয়েই।
মানুষ লেখে প্রয়োজনের চাপে। ব্যবসা কিংবা চাকরি রক্ষার্থে অবশ্যকৃত্য হিসেবেও মানুষকে লিখতে হয়, লিখতে হয় মুদ্রণ বা বৈদ্যুতিন মাধ্যমের জন্যও; লিখতে হয় প্রশাসনিক কাজের জন্য, লিখতে হয় আইন আদালতের কাজ চালাতে, আর লিখতে হয় প্রাণের তাগিদে, ভেতরের অনুপ্রেরণায়, কাজি নজরুল ইসলামের ভাষায় ‘সৃষ্টিসুখের উল্লাসে।’
প্রত্যেকটি লিখনের মধ্যেই এক একটা পদ্ধতি রয়েছে যা মানুষ আয়ত্ত করে কাজের মাধ্যমে, অবচেতন প্রয়াসে, নিজের অজান্তেই, যেমন পৈতৃক বৃত্তির কুশলতা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে আসে স্বাভাবিকভাবে; করণিক- মুহুরিদের সংস্পর্শে এলে নতুন প্রজন্মের মুসাবিদায় দক্ষতা এসে যায় (যে কাজে ওঁরা অনেক সময় পাশ করা উকিলদেরও হার মানাতে পারেন); শিক্ষক-সাহিত্যিকদের সংস্পর্শে এসে লেখালেখিতে দক্ষ হয়ে যান কেউ কেউ, সংবাদমাধ্যমে কাজ করতে করতে হয়ে যান জনপ্রিয় সাহিত্যিক।
তবে লেখালেখি কর্মটিও যে সচেতন প্রয়াসে আয়ত্ত করা যায়, অর্থাৎ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও পাঠ গ্রহণ করে যে এ বিষয়ে প্রশিক্ষিত হওয়া সম্ভব এটা আজ আর কার অজানা নয়। এ কর্মী সচেতন প্রয়াসে, নির্দিষ্ট পাঠ ও অনুশীলনের মাধ্যমে রপ্ত করা অবশ্যই সম্ভব।
বর্তমান অধ্যায়ে পড়ুয়াদের নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে নিজেদের পথ খুঁজে নেবার কথা মনে রেখে এদিকেই আলোকপাত করা হবে। প্রয়াস থাকবে, পাঠক্রমটি যেন একেবারে সাহিত্য না হয়ে সমাজবিজ্ঞান, বাণিজ্য এবং বিজ্ঞানের পড়ুয়াদের প্রয়োজনের দিকটিও বিবেচনা রাখা হয়। বাংলা ভাষার পাঠক্রমে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য কিছুটা অগ্রাধিকার পেলেও বাংল পাঠক্রম যে কেবলমাত্র বাংলা সাহিত্যের পাঠক্রম নয়, এটাও বিবেচনায় থাকা প্রয়োজন । অর্থনীতি, ইতিহাস, দর্শন, কিংবা পদার্থবিদ্যা, রসায়নশাস্ত্র কিংবা উদ্ভিদ ও জীববিজ্ঞানে পড়ুয়াদেরও যে তাঁদের নিজস্ব বিষয় নিয়ে বাংলাভাষায় লেখালেখির প্রয়োজন ভাষা পাঠক্রম পরিকল্পনায় এদিকে সচেতনতার প্রয়োজন রয়েছে বলেই আমরা মনে করি।
তাছাড়াও একটি সংস্কারও আমাদের মধ্যে বদ্ধমূল হয়ে আছে যে, প্রতিভাবানরাই লেখালেখির অধিকারী, লিখন-ক্ষমতা বুঝি একান্তই জন্মসূত্রে প্রাপ্ত ক্ষমতা। ব্যতিক্রমী প্রতিভাবান লেখকদের বাদ দিলে সচেতন প্রয়াস, নিরন্তর অনুশীলনেও যে লিখন-ক্ষমতা অর্জ করা যায়- এ প্রত্যয় নিয়েই বর্তমান পাঠক্রম।
কী লিখব- এ প্রশ্নের উত্তরে যাবার আগে দেখে নিতে হবে লেখা কত প্রকারের হতে পারে। লেখা মানেই যে কেবল কবিতা-গল্প-উপন্যাস নয়, এ কথাটা ইতিমধ্যেই বলা হয়েছে । এর বাইরেও লেখালেখির জগৎ রয়েছে, কবি-গল্পকার ছাড়াও আরও অনেক লেখক আছে যাঁদের ইতিহাসবিদ, সমাজবিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়, সমাজ-অর্থনীতি-রাষ্ট্রবিজ্ঞান ইত্যাদি বিষয়ে যাঁরা চর্চা করেন এদের বুদ্ধিজীবী হিসেবে অভিহিত করতে দ্বিধা হয়, কারণ শব্দটির নিন্দাসূচক, ব্যঙ্গার্থক ব্যবহারই বেশি। (চিন্তাশীল ব্যক্তিরা একটু বিপরীত স্রোতে হাঁটেন এ জন্যেই।) তবে সার্বিকভাবে এদের প্রবন্ধিকও বলা যায়।
স্পষ্টতই লেখাকে দুইটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়- সৃজনশীল, যার আওতায় আমে গল্প-কবিতা ইত্যাদি, দ্বিতীয়টি হল মননশীল লেখা - প্রবন্ধ, নিবন্ধ আর বিষয়ভিত্তিক তথ্যপূর্ণ বা তাত্ত্বিক লেখা। সৃজনশীল রচনা, ইংরেজিতে যাকে বলে Creative writing- এতে কল্পনা আবেগ, প্রকাশশৈলী, নান্দনিকতার দিকটিও বিশেষ প্রাধান্য লাভ করে। তবে, দ্বিতীয় ধারার রচনার মধ্যেও যে কল্পনা, আবেগ বা শৈলীর কোনও স্থান নেই তা নয়। এখানেও ওসব থাকবে তবে থাকবে একেবারে সংহত। এ রচনাকে আমরা মননশীল রচনা বলে চিহ্নিত করছি, Creative writing এর বিপরীতে Non-fictional prose অভিধা দিলে মোটামুটি এর চরিত্রলক্ষণটি বোঝা যায়। সামগ্রিকভাবে দেখলে সৃজনশীল আর মননশীল উভয় ধরনের রচনাই এক একটি সৃষ্টি। সৃজনশীলতা না থাকলে বিজ্ঞান বলুন, ইতিহাস, জীবনী, অর্থনীতিই বলুন কোনও রচনাই সার্থকতায় পৌঁছোতে পারে না। মননশীল রচনাতে যেমন সৃজনশীলতা, তেমনি সৃজনশীল রচনায়ও মননশীলতার প্রচ্ছায়া না থাকলে রচনা সার্থক হতে পারে না।
এ কথাগুলো মনে রেখে একজন লেখককে এগোতে হবে। তাঁকে স্থির করে নিতে হবে তাঁর নিজস্ব বিষয়, মানসিক প্রবণতা, প্রকাশের উদ্দেশ্য, প্রাথমিক প্রস্তুতিতে কী ধরনের লেখা তাঁর পক্ষে সম্ভব। আর সে সঙ্গে এটাও স্থির করে নিতে হবে কেন লিখব, কাদের জন্য লিখব এবং কোথায় লিখব। এ সবক'টি প্রশ্নের একটি অপরটির সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। এসব বিবেচনা না করে কাগজকলম নিয়ে বসলে চলবে না। প্রকাশমাধ্যম এবং টার্গেট পাঠকই একটি লেখার আঙ্গিক এবং প্রকাশভঙ্গি বা পদ্ধতি নির্ধারণ করে দেবে। দৈনিক পত্রিকার সম্পাদকীয় পৃষ্ঠায় (Edit page), উত্তর সম্পাদকীয় কলামের সঙ্গে সাময়িক পত্রিকা, ম্যাগাজিনের লেখার পার্থক্য থাকবে, এটা হিসেব করেই লিখতে হবে। লিটল ম্যাগাজিন, বিষয় ভিত্তিক পত্রিকা, সংকলিত গ্রন্থ প্রভৃতিতে প্রকাশের জন্য রচনা তৈরির আগে ওই পত্রিকার নিজস্ব বৈশিষ্ট এবং সে সঙ্গে পাঠকদের চাহিদার কথা জেনে নিতে হবে। নইলে রচনাটি ছাপার জন্য মনোনীত হবে না, কিংবা ছাপা হলেও পাঠক এর পৃষ্ঠা উল্টে দেখবেন না। সাহিত্য, ভাষা, সংগীত, চলচ্চিত্র বিষয়ক পত্রিকায় লোকসংস্কৃতি, চিত্রকলা বিষয়ক রচনা কিংবা আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিষয়ক লেখা পাঠানো যেমন নিরর্থক, তেমনি বিজ্ঞান পত্রিকায় লোকসংস্কৃতি, চিত্রকলা বিষয়ক রচনা বা কবিতার কোন সংস্থানও হতে পারে না।
যাঁরা ইতিহাস, সমাজ বিজ্ঞানের ছাত্র তাঁদের এই বিষয়ে প্রকাশিত লেখা পড়ে এর ভাষা, প্রকাশভঙ্গি, গবেষণাপদ্ধতি সম্পর্কে প্রয়োজনীয় জ্ঞান অর্জন করে নিতে হবে। অ্যাকাডেমিক পত্রিকায় লিখতে হলে অ্যাকাডেমিক ভাষায়ই লিখতে হবে, আর জনপ্রিয় পত্রিকায় লিখতে হলে লিখতে হবে ‘পপুলিস্ট’ ভাষায় ।
যাঁরা দর্শন, বিজ্ঞান ইত্যাদি বিষয়ে পাঠ নিয়েছেন এদেরও অনেক কিছু লেখার থাকতে পারে। এরা যদি মনে করেন যে লেখালেখির কাজটা একান্তভাবেই সাহিত্য বা কলাবিভাগের ছাত্রদের কাজ তবে সমাজের চিন্তার জগৎটি হয়ে যাবে নিতান্তই সংকীর্ণ।
আমাদের চারদিকে এমন অসংখ্য ঘটনা ঘটে চলেছে, চোখের সামনে রয়েছে বিশাল প্রকৃতি, মনুষ্য জগৎ। এ জগৎ প্রতিনিয়তই আমাদের চিন্তার, সৃজনের উপাদান জুগিয়ে যাচ্ছে। শুষ্ক পাণ্ডিত্যপূর্ণ বইয়ের পৃষ্ঠা না খুলে সরাসরি এ পৃথিবীর দিকে তাকালেও লেখার বিষয়বস্তু পাওয়া যায়। অবশ্য বইপত্র পড়ে স্বাভাবিক পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা, প্রকাশক্ষমতা বৃদ্ধি করার প্রয়োজনও রয়েছে বই কি। আমাদের মনে রাখা চাই, পথে নামলেই যেমন পথ খুঁজে পাওয়া যায় লিখতে বসলেও তেমনি লেখার বিষয় নিজে থেকে ধরা দেয়, লেখাটা হয়ে ওঠে, অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার পূর্ণ হতে থাকে। এবারে আসা যাক দ্বিতীয় প্রশ্নে, কেন লিখব? প্রশ্নের উত্তর এত সহজ নয়। মানুষ কেন লেখে? যশ, খ্যাতি, অর্থের জন্য? লিখে ওসব হয়, তবে সবার নয়, ভাল লিখলেও নয়। তবু মানুষ হাজার কোটি অক্ষর ফুটিয়ে তোলে সাদা কাগজের বুকে। আসলে মানুষ তো শুধু খেয়ে পরেই বাঁচতে পারে না। বেঁচে থাকার জন্য তাঁর আরও কিছু প্রয়োজন। তাই উদ্ভব হয়েছে শিল্প-সাহিত্যের যার মাধ্যমে মানুষ নিজের কাছে এবং অন্যের কাছে নিজেকে প্রকাশ করে। ‘প্রকাশ’ই হল লেখার অন্যতম অনুপ্রেরণা। লেখা হল এক অপ্রতিরোধ্য তাগিদ, যা মানুষকে ভেতরে ভেতরে আন্দোলিত করে, তাঁকে তাড়না করে এবং এ থেকে মুক্তির জন্যই মানুষ লেখে, নইলে যে তাঁর বাঁচা অসম্ভব। এই অন্তরের তাগিদই লেখার অনুপ্রেরণা। লেখা মানে একটি ভারমুক্তি, লেখা মানে নিজেকে ধ্বংস করা, লেখা মানে নিজেকে পুনর্নির্মাণ করা, লেখা মানে প্রচণ্ড বজ্রনির্ঘোষে ফেটে পড়া, লেখা মানে নিজের সঙ্গে নিজেই অন্তরঙ্গ আলাপনে মগ্ন হওয়া।
এ তো গেল একটা দিক, লেখালেখির আরেকটি দিকও আছে, তা হল ব্যবহারিক দিক। সৃজনশীল বা মননশীল সাহিত্য ছাড়াও মানুষকে বৃত্তি হিসেবেও লেখালেখি করতে হয়। বাণিজ্যিক পত্রপত্রিকা, রেডিও-টিভি-সিনেমার স্ক্রিপ্ট ছাড়া, প্রকাশনা জগৎকে সচল রাখতে মানুষকে অবিরাম লিখে যেতে হয়। এর সঙ্গে তাঁদের রুজি-রোজগারেরও সম্পর্ক। অতএব লিখনকর্মকে কোনও শৌখিন, অবসর বিনোদনের বিষয় নয়, জীবন-জীবিকার জন্য আবশ্যিক কর্ম হিসেবেও দেখা প্রয়োজন। মানুষ অন্তরের অনুপ্রেরণায় যেমন লেখে তেমনি অর্থের জন্যও লেখে, এ কথাটা অতীব সত্যি। কবিতা লিখে, গল্প-উপন্যাস লিখে মানুষ কোটিপতি হয়েছে, বাংলায়ও। নাটক, সিনেমার চিত্রনাট্য, এমনকি গান লিখেও মানুষ বিত্তবান হচ্ছেন, বিত্তবান হচ্ছেন পাঠ্যপুস্তক, দলিলদস্তাবেজ লিখেও। তাই লিখনকর্মের অর্থকরী দিকটিও উপেক্ষণীয় নয়। কেন লিখব এর উত্তরে এ কথাগুলো বিবেচ্য।
শব্দভান্ডার সমৃদ্ধ করার কিছু কৌশল:
(এক) পকেটে রাখা যায় এমন একটি নোটবই সংগ্রহ করুন। নতুন পাওয়া সব শব্দ তাতে লিখুন। যে বাক্যে শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে তাও লিখে রাখুন। এতে কেবল শব্দের অর্থ নয়, শব্দটির প্রয়োগও আপনার জানা হয়ে যাবে। প্রথম সুযোগেই শব্দটা ব্যবহার করবেন। এমনি দেখবেন, যত পড়বেন ততই নতুন শব্দ আপনার সংগ্রহে জমা হবে। দেখবেন লিস্ট বড় হবে। পরে দেখবেন সপ্তাহে তিনটে চারটের বেশি শব্দ আসছে না। (দুই) এমনি ধারা করতে থাকলে শব্দের জন্য আপনার একটা নেশা হয়ে যাবে। ইংরেজি হোক, বাংলা হোক, নতুন শব্দ পেলেই আপনি মনে মনে বলবেন, আহা কী সুন্দর একটা শব্দ।... (তিন) শব্দের প্রতি মোটামুটি একটা আকর্ষণ জন্মে গেল। এখন একদিনে পুরো নোটবই শব্দ দিয়ে ভরে ফেলা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। আপনি ঠিক করে ফেলুন (সংগৃহীত শব্দ সংখ্যা যেন) দিনে দুইয়ের কম নয়, পাঁচের বেশি নয়। ভেবে দেখুন দিনে যদি আপনি একটি করেও নতুন শব্দ ভাল করে শিখেন, মাসে হবে ত্রিশটা। ত্রিশটা শব্দ মানে অনেক কিছু। - শহীদ আখন্দ, গল্প লেখার কারুকলা, ঢাকা, ২০০২, পৃঃ ৪০
(সম্পাদিত, সংক্ষেপিত)
কী লিখব, কেন লিখব এটা নির্ধারণ করে নিলে কী ক’রে লিখব এটা স্থির করার কাজ অনেকটা এগিয়ে যায়। টার্গেট রিডার অর্থাৎ নির্দিষ্ট পাঠক কে- এ ধারণাটা স্পষ্ট থাকলে লেখার স্টাইল কী হবে এটা আপনা থেকেই ঠিক হয়ে যায়। শিশু-কিশোরদের জন্য লেখার আঙ্গিক, ভাষা, বিষয় নির্বাচন যুবকদের জন্য লেখা থেকে আলাদা হবে; প্রৌঢ় বা বয়স্কদের জন্য লেখার ধরনটা হতে হবে সে অনুযায়ী। আবার লেখাটি যেখানে প্রকাশ হবে- ম্যাগাজিন, পত্রিকা, সংকলিত গ্রন্থ এসব প্রকাশমাধ্যমের নির্দিষ্ট ফর্ম্যাট অনুযায়ীই লিখতে হবে, এবং এ ফর্ম্যাটই নির্ধারণ করবে লেখার ব্যাপ্তি কতটুকু হবে।
সম্পাদকীয় দপ্তরে চিঠি, প্রেসবার্তা নিশ্চয়ই তিন পৃষ্ঠার হলে চলবে না। উত্তর-সম্পাদকীয় আবার চার ইঞ্চি হলে প্রকাশের জন্য বিবেচিতই হবে না। ছোটগল্প যদি হয়ে যায় পঁয়তাল্লিশ পৃষ্ঠার আখ্যান, আর প্রবন্ধ হয় ষাট পৃষ্ঠার তবে তো সমস্যা। অবশ্য ব্যতিক্রমী লেখক একপৃষ্ঠায় সার্থক ছোটগল্প আর পঁচিশ পৃষ্ঠায় উপন্যাস (novella) শেষ করেছেন এরকম দৃষ্টান্ত আছে। গবেষণা পত্রিকা, সেমিনার গ্রন্থ- এসবের জন্য রচনায় পরিসর একেবারে মাপা থাকে, এর আঙ্গিক, ভাষা, শব্দপ্রয়োগও পূর্ব নির্ধারিত। লিখতে হলে এসব দিকে সচেতনতা প্রয়োজন।
লেখার তিনটি স্তর। প্রথম হল প্রাক্-প্রস্তুতি। এ প্রস্তুতির অবশ্য কোনও আদি-অন্ত নেই, তবে একটা পদ্ধতি না মেনে চললে লক্ষ্যে পৌঁছানো অসম্ভব। যে-বিষয় নিয়ে লিখবেন সে-বিষয়ে জ্ঞাতব্য প্রাথমিক তথ্যগুলো সংগ্রহ করা এবং বুঝে নেওয়াটা একান্ত প্রয়োজন। প্রয়োজনীয় বই-পত্র, ওয়েবসাইট দেখা, বিশেষ ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে আলাপ, ফিল্ড স্টাডি বা ক্ষেত্র অনুসন্ধান- এ হল কোনও কাজে নামার প্রাক্-প্রস্তুতি। মনে রাখা প্রয়োজন, কবিতা-গল্প-উপন্যাস লিখতে হলেও ভূগোল-ইতিহাস-বিজ্ঞানের প্রয়োজন হয়; ইতিহাস লিখতে গেলে ভূগোলের প্রয়োজন তো আছেই, সে সঙ্গে প্রয়োজন হয় সাহিত্য-লোকসংস্কৃতি,ভাষাতত্ত্ব কিংবা অর্থনীতিরও; পরিবেশ-বিজ্ঞান নিয়ে লিখতে হলে কবিতা-চিত্রকলারও প্রয়োজন হয় বই কি, স্কুল-কলেজের পঠন-পাঠন বিষয়ে লিখতে হলে মনস্তত্ত্ব, চিকিৎসা-শাস্ত্র থেকে সংগীত, নাটক, ক্রীড়াকে দূরে সরিয়ে রাখা যায় না। তবে এ কর্মে তথ্যের অরণ্যে পথ হারানোর সম্ভাবনাও বিস্তর, তাই লেখককে যে পদ্ধতিতে এগোতে হবে তা হল selective strategy। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিজ পরিপার্শ্ব থেকে প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করে, প্রয়োজনীয় প্রকাশশৈলী আয়ত্ত করেই কাজটি করে নিতে হয়।
যে কথাটি মনে করিয়ে দেওয়া প্রয়োজন তা হল, লিখতে হলে খুব পাণ্ডিত্যের প্রয়োজন নেই। পাণ্ডিত্যের সঙ্গে লিখন-কর্মের কোনও বিরোধ নেই যদিও, তবু লিখতে হলে সবাইকে যদি পণ্ডিত হতে হয় তবে মুদ্রণ জগৎ স্তব্ধ হয়ে যেত। লেখা আসলে একটি শ্রমসাধ্য কর্ম, এ কাজে নামলে নিজের নিয়মেই কাজটি এগিয়ে যায়। বই পড়ে, জ্ঞান অর্জন করে তবেই কা শুরু করব এ ধারণাটি নেহাৎই অবাস্তব। লিখতে লিখতেই প্রয়োজনীয় জ্ঞান অর্জিত হয়ে যায় ।
আমাদের চারদিকে ছড়িয়ে আছে কত কিছু, এ থেকেই লেখার উপাদান সংগ্রহ করতে হয়। লিখতে হলে বিস্তর রেফারেন্স দিতে হয়, তত্ত্বকথা বলতে হয়, এ ধারণা সর্বৈব ভুল। আল- তত্ত্বকথা, তথ্য, বিভিন্ন প্রসঙ্গ-অনুষঙ্গ এ সব কিছুই লেখা শুরু করলে নিজে হাজির হয়।
একটি কথা প্রচলিত আছে- ‘কালি-কলম-মন লেখে তিনজন’। লেখার জন্য সর্বপ্রথম যা প্রয়োজন তা হল কীসের উপর লেখা হবে, কী দিয়ে লেখা হবে। সাধারণত এদিকে আমরা ফুল একটা যত্ন নিই না। পৃথিবীতে যে কত ধরনের কাগজ রয়েছে, কাগজের কত সাইজ হয়, ক তার নাম রয়েছে, কোন্ কাগজে কী লিখতে হয় - এসব জানার চেষ্টাই আমরা করি না। যে জিনিসটি ছাড়া আমাদের একটি দিনও চলে না সেই কাগজ সম্বন্ধে আমরা কত অজ্ঞ। অথচ ঠিকঠাক কাগজে ঠিক জাতের কলম বসালে লেখা এগিয়ে যায়। এই কলমটিও যথাযথ হওয়া চাই। নিব হ্যান্ডেলের যুগে লেখকরা দোয়াতে কলম ডুবিয়ে কী সুন্দর লিখতেন; এরপর এল ঝরণা কলম, ইংরেজিতে বলে ফাউন্টেন পেন, সর্বশেষ বল-পেনের আত্মপ্রকাশ লিখন-কর্মকে সহজ থেকে সহজতর করেছে বটে, কিন্তু লেখার আভিজাত্য ক্ষুণ্ণও করেছে। আমাদের পূর্বজরা সামান্য উপাচার দিয়ে পরম নিষ্ঠাভরে অপূর্ব সব পুথি তৈরি করে গেছেন, মহাফেজখানা বা জাদুঘরে, লাইব্রেরিতে গেলে দেখা যায়, ওই প্রজন্মের শেষ প্রতিনিধি মুহুরিদের উত্তরসূরীরা আজও কোর্টের বারান্দায় রয়েছেন যাঁদের হাতে অক্ষর মুক্তোর মতো ফুটে ওঠে। এদের কেউ ক্যালিগ্রাফ শেখায়নি, কার্সিভ লেখার পাঠও নেননি ওরা। তুলনায় আমরা অনেক কিছু পেয়েছি, সুন্দর করে লেখার সমস্ত উপাদানই আমাদের হাতের কাছে মজুত।
হাতের লেখার প্রতি আপনি যত যত্নবান হবেন ততই আপনার চিন্তায় স্বচ্ছতা আসবে, বিকাশ ঘটবে আপনার চিন্তাশক্তি, কল্পনাশক্তি, সৃজনশীলতা এবং মননশীলতারও। লিখন কর্মে আপনার উৎসাহ বাড়বে দ্বিগুণ। হস্তাক্ষর তো ব্যক্তির মনের দর্পণ। মনোজগতের যত বিস্তার ঘটবে লেখাও হয়ে উঠবে স্পষ্ট, ঝরঝরে। লিখতে লিখতেই ক্রমে আপনি নিজের বর্ণের আকার, বিস্তার, ঢালু, দুই বর্ণের মধ্যিখানের ফাঁকা, দাঁড়ি-কমা-মাত্রা দেবার ধরন, অক্ষরের কৌণিকতা নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষায় মগ্ন হবেন, এবং এমনি করেই নিজের হস্তাক্ষরকে নিজেই নতুন করে আবিষ্কার করতে সক্ষম হবেন। আপনি নিজেই বুঝবেন কোন্ হস্তাক্ষর পাঠক বা সম্পাদককে শাসায়, কোন্ হস্তাক্ষর ভ্যাঙচি কাটে, কোনটা মুচকি হাসে, কোন লেখায় ভেসে ওঠে চাঞ্চল্য, কোনটা বৈদন্ধ্যের ভারে ন্যুজ, আর কোন্ লেখায় ভালোবাসার উষ্ণ আহ্বান।
লিখন-কর্ম হল একটি সৃজনশীল প্রক্রিয়া। লেখক এক জায়গায় শুরু করেন সত্যি, কিন্তু সমাপ্তিতে এসে নিজেই আবিষ্কার করেন কোথায় শুরু করলাম আর কোথায় এলাম। প্রাথমিক পাঠ, তথ্য সংগ্রহ, প্রয়োজনীয় নোটস্ ইত্যাদি নেওয়ার কাজ শেষ করে তখনই লিখতে বসা। দেখবেন কী করে শুরু করব এ ভাবনা আপনাকে পীড়িত করবে। সব দ্বিধাদ্বন্দ ঝেড়ে ফেলে বিষয়টি যেভাবে আপনার মাথায় আসছে ঠিক সেভাবে লেখা শুরু করুন। মনঃপুত না হলে ছিঁড়ে ফেলে দেবার পথ তো খোলাই আছে। প্রথম পঙক্তিটি যদি ঠিকমত দাঁড়িয়ে যায় আপনার লেখা আর আটকাবে না। লিখব - লিখব করে অহেতুক সময় নষ্ট করার চেয়ে লিখে সংশোধন, পরিবর্তন, পরিমার্জন করে এগোনোই কাজের কাজ।
লেখা শুরু করার আগে আপনার মূল কথাটি কী মনে মনে নিজেকেই সেটা বলার চেষ্টা করুন। যে-কোন লেখারই মূলে থাকে ‘একটি বক্তব্য’, তা সেটা অর্থনীতি, রাজনীতি, বিজ্ঞান, সাহিত্য, ইতিহাস যা’ই হোক না কেন। অবশ্য ওই ‘একটি’ প্রধান বক্তব্যের support-এ অ-প্রধান বক্তব্য থাকতে পারে, তবে সমস্ত আয়োজনের অভিমুখ ওই ‘একটি’ দিকেই, তা সেটা সংকীর্ণ পরিসরের প্রবন্ধ বা দীর্ঘ নিবন্ধ, অথবা একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থই হোক না কেন।
এ তো গেল মননশীল গদ্যের কথা, সৃজনশীল রচনায়ও ওই একই ব্যাপার। কবিতা কিংবা গল্পেও লেখকের সমস্ত আয়োজন, শৈলীর লক্ষ্য ওই ‘একটি কথা’ই, সেটা অনেক পঙক্তি বা পৃষ্ঠার রচনাই হোক্, বিশাল পরিসরের উপন্যাসই হোক্, বা হোক্ না তিন অঙ্কের নাটক বা একটি সঞ্চারী-দুই অন্তরা বিশিষ্ট তিন তুকের একটি গান।
লেখা শুরু করার আগে নিজেই নিজেকে আরেকটি প্রশ্ন করে নেবেন- আমি কি ভেতরের কোনও অনুপ্রেরণায় কাজে নামছি, না এটা সাময়িক উচ্ছ্বাস? তাৎক্ষণিক বা সাময়িক উচ্ছ্বাস হলে অবশ্য লেখা বেশি দূর এগোবে না, আর এগোলেও নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছোতে পারবে না। মনের ভাব এবং ভেতরের তাগিদটি যদি আন্তরিক হয়, লেখা আপনা থেকেই হয়ে উঠবে।
লিখনকর্মের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর হল পরিমার্জন। লেখাটি যে-ভাবেই হোক্ না কেন খাড়া হয়ে গেলে এটাকে বার কয়েক পড়ে নিয়ে, কাউকে পড়িয়ে বা শুনিয়ে আপনি সংশোধিত দ্বিতীয় খসড়া তৈরি করতে বসেই আবিষ্কার করবেন লেখাটি আগের জায়গায় থাকেনি, এগিয়ে গেছে। তৃতীয়বার যদি প্রেস্-কপি অর্থাৎ মুদ্রণ-উপযোগী পাণ্ডুলিপি বানাতে বসেন দেখবেন আরও একপ্রস্থ পরিবর্তন, পরিবর্ধন, সংশোধন হয়ে গেছে। এখন সম্পাদকের টেবিলে গেলে ফার্স্ট, সেকেন্ড এবং থার্ড প্রুফ হয়ে আরও কয়েক দফা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাবে লেখাটি। এত সব প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গেলে লেখাটির সমস্ত দুর্বলতা ঝরে পড়বে এবং বাহুল্যবর্জিত, শুদ্ধ বানানে, পরিমিত কথনে লেখাটি পাঠকের সামনে উপস্থিত হবে- আপনি নিজেই অনুভব করবেন কীভাবে লেখাটি পূর্ণতার দিকে এগোল এবং এতে হল প্রাণ সঞ্চার।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পান্ডুলিপিতে আমরা বিস্তর কাটাকুটি দেখি। সেই বিখ্যাত করিত, ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’- আমরা এখন মুদ্রিতভাবে যে চেহারায় পাচ্ছি, প্রথমেই কি সেভাবে। এসেছিল? নিশ্চয়ই না। প্রথম পাঠ ছিল- ‘আজি এ প্রভাতে প্রভাতবিহগ কী গান গাইল রে...’
অনেক পর সংশোধিত হয়ে কবিতাটি আমাদের কাছে পৌঁছলো এভাবে-আজি এ প্রভাতে রবির কর
কেমনে পশিল প্রাণের পর
কেমনে পশিল গুহার আঁধারে প্রভাতপাখির গান !
না জানি কেন রে এতদিন পরে জাগিয়া উঠিল প্রাণ।
আর, ইংরেজ কবি জন কিটস্-এর ক্ষেত্রে ? দীর্ঘ পরিকল্পনা শেষ করে প্রথম পঙক্তির পর একটি অক্ষরও এগোচ্ছিল না। এ ছিল কবির গভীর মনস্তাপের কারণ। Endymion কাব্যের সেই চরণটি ছিল এরকম- A thing of beauty is a constant joy....। যেন এক জগদ্দল পাথর আটকে রেখে ছিল স্রোতের ধারাকে। হঠাৎ যেদিন সংশোধিত পঙক্তিটি এসে গেল, তখন কবিকে আর আটকায় কে? পঙক্তিটি হল- A thing of beauty is joy forever: Its loveliness increases; it will never pass into nothingness...... এমনি করে কবিতার স্রোত চলতে থাকল।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পান্ডুলিপিতে আমরা বিস্তর কাটাকুটি দেখি। সেই বিখ্যাত করিত, ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’- আমরা এখন মুদ্রিতভাবে যে চেহারায় পাচ্ছি, প্রথমেই কি সেভাবে। এসেছিল? নিশ্চয়ই না। প্রথম পাঠ ছিল- ‘আজি এ প্রভাতে প্রভাতবিহগ কী গান গাইল রে...’
অনেক পর সংশোধিত হয়ে কবিতাটি আমাদের কাছে পৌঁছলো এভাবে-
আজি এ প্রভাতে রবির কর
কেমনে পশিল প্রাণের পর
কেমনে পশিল গুহার আঁধারে প্রভাতপাখির গান !
না জানি কেন রে এতদিন পরে জাগিয়া উঠিল প্রাণ।আর, ইংরেজ কবি জন কিটস্-এর ক্ষেত্রে ? দীর্ঘ পরিকল্পনা শেষ করে প্রথম পঙক্তির পর একটি অক্ষরও এগোচ্ছিল না। এ ছিল কবির গভীর মনস্তাপের কারণ। Endymion কাব্যের সেই চরণটি ছিল এরকম- A thing of beauty is a constant joy....। যেন এক জগদ্দল পাথর আটকে রেখে ছিল স্রোতের ধারাকে। হঠাৎ যেদিন সংশোধিত পঙক্তিটি এসে গেল, তখন কবিকে আর আটকায় কে? পঙক্তিটি হল- A thing of beauty is joy forever: Its loveliness increases; it will never pass into nothingness...... এমনি করে কবিতার স্রোত চলতে থাকল।
কী ক’রে লিখব এ পর্বের শেষ কথাটি হল লেখার ক্ষমতা যদিও প্রকৃতি-প্রদত্ত, জন্মগত, তবুও অনুশীলন, নিরন্তর প্রচেষ্টা এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে লেখার কৌশল রপ্ত করা সম্ভব। কারণ প্রত্যেকের ভেতরেই সুপ্ত থাকে প্রতিভা, তাকে বের করে নিতে হয়।
মনে রাখুন: