আপনার মুঠোফোনটি ল্যান্ডস্কেপে রাখুন।
এ পর্বটিতে যা জানতে পারবেন —
মুদ্রিত অক্ষর আমাদের মনের হাজারটা জানালা খুলে দেয়। আমরা আমাদের নিজস্ব রুচি, অনুভূতি, স্বাভাবিক প্রবণতা, এবং অতি অবশ্যই প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী এক একটি জানালায় চোখ দিই। কিংবা এক সঙ্গে একাধিক ক্ষেত্রেও দৃষ্টি নিক্ষেপ করি। কখনও জানতে চাই আমাদের পরিবেশ, প্রকৃতিকে। কখনও জানতে চাই মনুষ্য সমাজের কথা, হারিয়ে যাওয়া দিনের কথা। কখনও জানতে চাই সৃষ্টিরহস্য, ঈশ্বর বা অলৌকিক বিষয়। আমাদের জানার ক্ষেত্রটি এত বিশাল যে এক জীবনে উন্মুক্ত সব ক'টা জানালার সামনে দাঁড়াবার অবকাশই হয় না। কাব্য, সাহিত্য,ইতিহাস, বিজ্ঞান, দর্শন, ভাষা, শিল্পকলা, সংগীত- এত এত বিষয়ে এত এত কিছু জানার রয়েছে, বিশ্বব্যাপী লক্ষ কোটি মুদ্রিত অক্ষরে ফুটে উঠেছে এত কথা, কাহিনি, তত্ত্ব। এ অরণ্যে পথ হারিয়ে ফেললে তো হবে না; দিশেহারা না হয়ে নিজেকেই ঠিক করে নিতে হবে কোন পথে এগোব, কোন্ বিষয়কে অবলম্বন করব, এবং কতটুকু, আর সে সঙ্গে এটাও স্থির করতে হবে কোন্ পদ্ধতি মেনে চলব। এ কথাটি তো মনে রাখতেই হবে, আমার অভীষ্ট কী, আমি কেন এ বিশেষ পাঠে নিজেকে নিয়োজিত করছি।

পড়াশোনা যে সব সময় কোনও বিশেষ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে করতে হয় তা নয়। এমনও হতে পারে, গ্রন্থপাঠ কর্মটির এক এবং একমাত্র উদ্দেশ্যই গ্রন্থপাঠ, এছাড়া আর কোন উদ্দেশ্যই নেই। এরকম মানুষ আছেন যিনি মনের আনন্দে, কোনও কিছু প্রাপ্তি বা লাভের আশা না করেই পুরো জীবনটি বই পড়ে কাটিয়ে দেন। এদের কাছে বেঁচে থাকার উদ্দেশ্যই যেন পড়া, কিংবা পড়ার উদ্দেশ্যই বেঁচে থাকা।
কিন্তু সবার তো এরকম হওয়া সম্ভব নয়, হওয়া চলেও না। কাজের বই, প্রয়োজনের বই তাঁদের খুঁজে নিতে হয় বই কি। কিন্তু এখানেও সমস্যা, অতীত আর বর্তমানের হাজার হাজার, কোটি কোটি গ্রন্থের কোনটি কাজের আর কোনটি অকাজের এর বিচার কী করে সম্ভব? আজ যে-বইকে কাজের বই হিসেবে চিহ্নিত করছি, আগামীকাল যে এর পাঠমূল্য শূন্য হবে না তা কে বলতে পারে? প্রয়োজনের তাগিদে আজ যে-বই নিয়ে মানুষ বিনিদ্র রজনী যাপন করছে, প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে এর একটি পৃষ্ঠাও উল্টে দেখবে না। তার স্থান হয়তো নির্দিষ্ট হয়ে আছে বিস্মৃতির গর্ভে।

পড়াশোনা যে সব সময় কোনও বিশেষ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে করতে হয় তা নয়। এমনও হতে পারে, গ্রন্থপাঠ কর্মটির এক এবং একমাত্র উদ্দেশ্যই গ্রন্থপাঠ, এছাড়া আর কোন উদ্দেশ্যই নেই। এরকম মানুষ আছেন যিনি মনের আনন্দে, কোনও কিছু প্রাপ্তি বা লাভের আশা না করেই পুরো জীবনটি বই পড়ে কাটিয়ে দেন। এদের কাছে বেঁচে থাকার উদ্দেশ্যই যেন পড়া, কিংবা পড়ার উদ্দেশ্যই বেঁচে থাকা।
কিন্তু সবার তো এরকম হওয়া সম্ভব নয়, হওয়া চলেও না। কাজের বই, প্রয়োজনের বই তাঁদের খুঁজে নিতে হয় বই কি। কিন্তু এখানেও সমস্যা, অতীত আর বর্তমানের হাজার হাজার, কোটি কোটি গ্রন্থের কোনটি কাজের আর কোনটি অকাজের এর বিচার কী করে সম্ভব? আজ যে-বইকে কাজের বই হিসেবে চিহ্নিত করছি, আগামীকাল যে এর পাঠমূল্য শূন্য হবে না তা কে বলতে পারে? প্রয়োজনের তাগিদে আজ যে-বই নিয়ে মানুষ বিনিদ্র রজনী যাপন করছে, প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে এর একটি পৃষ্ঠাও উল্টে দেখবে না। তার স্থান হয়তো নির্দিষ্ট হয়ে আছে বিস্মৃতির গর্ভে।
আমাদের প্রথানুগ পাঠক্রমে পাঠতত্ত্ব বা পঠনশাস্ত্রের কোনও সংস্থান যদিও নেই, তবু এ বিষয়ে বিস্তর বইপত্র, নিবন্ধ, প্রবন্ধ রয়েছে। এসব সম্বল করে বর্তমান পাঠক্রমে পাঠপদ্ধতির নানা দিক পর্যালোচনা করে পড়ুয়ারা নিজস্ব মানসিক প্রবণতা, বৃত্তি এবং প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী কীভাবে নিজস্ব পাঠ-পরিকল্পনা তৈরি করবেন এদিকেই আলোকপাত করা হবে।
এটা স্বীকৃত সত্য, প্রাতিষ্ঠানিক পড়ুয়া এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক পড়ুয়া, ইংরেজিতে student এবং non-student- উভয়কেই পড়তে হয়। ছাত্রদের পড়িয়ে নেওয়া হয়। কে’ই বা স্বেচ্ছায় সব সময় এ কাজে ব্রতী হন? জীবন জীবিকার জন্যও আবার কাউকে অবিরাম পড়ে যেতে হয়। অতএব, এ কর্মটিকে একটি পদ্ধতির আওতায় আনা নিশ্চিতই সঙ্গত প্রয়াস। কোনও একটি সুচিন্তিত পদ্ধতি অবলম্বন করলে পাঠক অল্প আয়াসেই বিষয়ের গভীরে যেতে পারবেন, শনাক্ত করতে পারবেন কোন্ জিনিসটি তার প্রয়োজনের- পছন্দের, কোন্ পাঠটি তাঁকে গভীর অভিনিবেশ সহকারে (critically) করা দরকার ইত্যাদি। মনে রাখতে হবে, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই সার্থক ব্যক্তিরা সার্থক পাঠকও। স্বামী বিবেকানন্দ, মার্কিন রাষ্ট্রপতি জন কেনেডি, পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু- এদের পঠনক্ষমতা (লিখন ক্ষমতাও) কিংবদন্তিস্বরূপ।
এখানে এ কথাটি মনে রাখা প্রয়োজন, পঠনপাঠন সম্পর্কে আমাদের কিছু সংস্কার রয়েছে। পড়া মানেই গল্পের বই, উপন্যাস, কবিতা পড়া; লেখক মানেই কবি, ঔপন্যাসিক, কিংবা স্কুলকলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যবইয়ের লেখক। এর বাইরেও এর একটা জগৎ রয়েছে। এ জগতে রয়েছে সমাজ, ভাষা, অর্থনীতি, বিজ্ঞান; রয়েছে ইতিহাস, লোকসংস্কৃতি, নৃতত্ত্ব, রয়েছে বিনোদন জগৎ, সংগীত-নাটক-চলচ্চিত্র, ফ্যাশন এমনকি খেলাধূলাও। পৃথিবীতে এমন সমস্ত বিষয়ের উপর লেখালেখি হচ্ছে যেখানে প্রবেশ করলে পাঠক চমকিত হবেন, আবিষ্কার করবেন তাঁর নজর এড়িয়ে গেছে অসংখ্য ছোট্ট ছোট্ট কিংবা বিশাল বিশাল সব জগৎ শুধু ইংরেজি বা ইউরোপীয় ভাষায় নয়, ভারতীয় ভাষায়, এবং অতি অবশ্যই বাংলায়ও।
আর যদি আন্তর্জালে প্রবেশ করেন তবে তো কথাই নেই। বিশ্বের জ্ঞাতব্য কত কী যে অধরা রয়ে গেছে তাও আবিষ্কার করবেন। তবে অপ-জ্ঞান, ইংরেজিতে বলে junk information (ওই জাঙ্কফুডের মতোই) তথ্যের আবর্জনাও রয়েছে যেখানে পা হড়কে যাবার সম্ভাবনাও বিস্তর যদি না সচেতন পদক্ষেপ ফেলা হয়।
মোটমাট বইয়ের জগৎ কেবলমাত্র সাহিত্যের জগৎ নয়, আরও নির্দিষ্ট করে বললে আর্টস ডিসিপ্লিনের বা কলাবিদ্যার জগৎও নয়, এর বাইরে বিজ্ঞান, কারিগরি, প্রযুক্তি, বাণিজ্য এল বিজ্ঞাপনের জগৎও রয়েছে, এবং এ জগতের পড়ুয়াদের চাহিদা মেটানোর উপাদান রয়েছে আমাদের চারদিকে মুদ্রিত অক্ষরে, তা’কে খুঁজে নিলেই হল।
পাঠতত্ত্ব বিষয়ক কোনও নির্ভরযোগ্য রচনার যদি উল্লেখ করতে হয়, তবে ইউরোপীয় রেনেসাঁ-পুরুষ, ইংরেজ দার্শনিকপ্রবর ফ্রান্সিস বেকন (১৫৬১-১৬২৬) সাহেবের Of Studin শীর্ষক প্রবন্ধটির নাম করতে হয়। কিং জেমস্ ১ম-এর লর্ড চ্যান্সেলর, ‘ইম্পিরিকেল দর্শনে জনক’ এ লেখক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পাঠাগার এবং গ্রন্থ-তালিকা তৈরির কিছু নির্দেশাবলি রেখে যান। তিনি সমস্ত গ্রন্থকে তিনটি শ্রেণিতে বিভাগ করেন- ইতিহাস, কাব্য এবং দর্শন।
আমরা এ কথাগুলো মনে রেখে পরবর্তী পর্যায়ে যাব কী পড়ব, কেন পড়ব, কীভাবে পড়ব - এসব প্রশ্নের উত্তর সন্ধানে।
ইতিপূর্বে ফ্রান্সিস বেকনের প্রসঙ্গ উত্থাপিত হয়েছে। চার শতক পূর্বে ক্ষুদ্র আয়তনে একটি রচনা Of Studies-এ তিনি পঠন সম্পর্কে যা বলেছিলেন তা সর্বকালে, সর্বদেশে প্রাসঙ্গিক। সূত্রাকারে তাঁর বক্তব্যগুলো কী তা দেখে নেওয়া যাক্ :
পাঠের তিনটি উদ্দেশ্য তিনি দেখিয়েছেন। আনন্দলাভ, (কথাবার্তা, চিন্তা চেতনায় নিজেকে অভিজাত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা, আর দক্ষতাবৃদ্ধি করা। এক্ষেত্রে একটি সাবধানবাণীং তিনি শুনিয়েছেন – পাঠে অধিক সময় ব্যয় করাটা এক ধরনের আলসেমি; যখন-তর্ক বিদ্যাপ্রদর্শন এক ধরনের খ্যাপামো; আর সর্বত্র পুথিগত বিদ্যার প্রয়োগ হল পণ্ডিতদের বাড়াবাড়ি ।

তাছাড়াও পাঠ সম্পর্কে তিনি তিন ধরনের মানসিকতা লক্ষ করেছেন। চতুর ব্যক্তি পড়াশোনাকে নস্যাৎ করে দেন ; সাধারণ মানুষের মনে এর প্রতি একটা সম্ভ্রমের ভাব থাকে । কেবল প্রজ্ঞাবানই এর যথোপযুক্ত ব্যবহার করতে জানেন।
তাঁর পরামর্শ হল:
ইতিপূর্বে ফ্রান্সিস বেকনের প্রসঙ্গ উত্থাপিত হয়েছে। চার শতক পূর্বে ক্ষুদ্র আয়তনে একটি রচনা Of Studies-এ তিনি পঠন সম্পর্কে যা বলেছিলেন তা সর্বকালে, সর্বদেশে প্রাসঙ্গিক। সূত্রাকারে তাঁর বক্তব্যগুলো কী তা দেখে নেওয়া যাক্ :

পাঠের তিনটি উদ্দেশ্য তিনি দেখিয়েছেন। আনন্দলাভ, (কথাবার্তা, চিন্তা চেতনায় নিজেকে অভিজাত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা, আর দক্ষতাবৃদ্ধি করা। এক্ষেত্রে একটি সাবধানবাণীং তিনি শুনিয়েছেন – পাঠে অধিক সময় ব্যয় করাটা এক ধরনের আলসেমি; যখন-তর্ক বিদ্যাপ্রদর্শন এক ধরনের খ্যাপামো; আর সর্বত্র পুথিগত বিদ্যার প্রয়োগ হল পণ্ডিতদের বাড়াবাড়ি ।
তাছাড়াও পাঠ সম্পর্কে তিনি তিন ধরনের মানসিকতা লক্ষ করেছেন। চতুর ব্যক্তি পড়াশোনাকে নস্যাৎ করে দেন ; সাধারণ মানুষের মনে এর প্রতি একটা সম্ভ্রমের ভাব থাকে । কেবল প্রজ্ঞাবানই এর যথোপযুক্ত ব্যবহার করতে জানেন।
তাঁর পরামর্শ হল:
(ক) তর্কাতর্কি করার জন্য পড়ো না;
(খ) কোনও নির্দিষ্ট চিন্তা বা তত্ত্বে স্থিত হবার জন্যও পড়ো না;
(গ) পড়ো নিজের বিচার বিবেচনাকে শাণিত করার জন্য।
এ অবস্থায় কী পড়ব, কতটুকু পড়ব, কীভাবে পড়ব তা স্থির করে নিতে বেকন সাহেবের পরামর্শ একেবারে সুস্পষ্ট: কিছু কিছু বই কেবলই চেখে দেখার জন্য, আর কিছু একেবারে গোগ্রাসে গিলে ফেলার জন্য; আর আছে তৃতীয় এক শ্রেণির বই যা একেবারে চিবিয়ে খেয়ে হজম করে নেবার জন্য।
এ তো গেল কী পড়ব, কী ক'রে পড়ব। এবার দেখা যাক্ ফ্রান্সিস বেকন পঠনক্রিয়াকে অর্থবহ করতে কী পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁর মতে, পড়লে মানুষের পূর্ণতা আসে; আলাপচারিতায় আসে মানসিক প্রস্তুতি; আর লেখালেখি করলে বৃদ্ধি হয় মানসিক উৎকর্ষ। এটা তো ঠিক, সামান্য লেখালেখি করলে স্মৃতিশক্তি বাড়ে, আলোচনা করলে বাড়ে উপস্থিত বুদ্ধি। বেকন বলেছেন, যাঁর পড়াশোনা কম, নিজের অজ্ঞতা ঢেকে রাখার জন্য তাঁকে যথেষ্ট চাতুর্যের আশ্রয় নিতে হয়।
তাছাড়াও তিনি জানিয়েছে, ইতিহাস মানুষকে প্রজ্ঞাবান করে, কাব্য দান করে বৈদগ্ধ্য; গণিত সূক্ষ্ম দৃষ্টিভঙ্গি; দর্শন আনে মনের গভীরতা; আর নীতিশাস্ত্র করে গম্ভীর; তর্কশাস্ত্র ও অলঙ্কারশাস্ত্র দান করে বাকবৈদগ্ধ্য।
মাত্র ৫৪ পঙক্তির ওই গদ্যটিতে পাঠের মাধ্যমে কী কী মানসিক ঘাটতি পূরণ সম্ভব তাও জানিয়েছেন বেকন। অস্থিরচিত্তদের তিনি গণিতে মনোনিবেশ করতে পরামর্শ দিয়েছেন। মন যতই দূরে দূরে বিচরণ করুক না কেন, তাকে সূচনায় ফিরে আসতেই হবে। অস্থিরতাকে সংহত করতে গণিতের দাওয়াই বড় দাওয়াই। বুদ্ধিবৃত্তিতে সামান্য ঘাটতি থাকলে পড়তে হবে দর্শন; যাঁদের বিচার-বিশ্লেষণ ক্ষমতায় ঘাটতি আছে তাদের আদালতের নথি পাঠ করার পরামর্শ রয়েছে দার্শনিকপ্রবরের পক্ষ থেকে।

পড়াশোনার প্রতি আমাদের এক ধরনের সম্ভ্রমবোধ তো সর্বকালের। Utilitarian তত্ত্বের প্রয়োগ দেখেছি আমাদের শিশুপাঠেই- ‘লেখাপড়া করে যে গাড়ি ঘোড়া চড়ে সে।’ আমাদের দেশে বিদ্বান ব্যক্তির স্থান দেওয়া হয়েছে রাজার ঊর্ধ্বে- ‘স্বদেশে পূজ্যতে রাজা বিদ্বান সর্বত্র পূজ্যতে।’ এ বিদ্যা অর্জনের সহজতম এবং একই সঙ্গে কঠিনতম উপায়ই হল পড়াশোনা।
বিশিষ্ট কথাকার, সুরসিক পাঠক সৈয়দ মুজতবা আলী তাঁর একটি নিবন্ধে (‘বই কেনা’, পঞ্চতন্ত্র) ফরাসি সাহিত্যিক আনাতোলে ফ্রাঁসের প্রসঙ্গ টেনে বলেছিলেন আমরা যতই নানা জ্ঞানবিজ্ঞান আয়ত্ত করতে থাকব, ততই এক একটা করে আমাদের ‘মনের চোখ ফুটতে থাকবে’। মনের চোখ বাড়াবার একটি নিদানও তিনি দিয়েছেন- এ ‘চোখ বাড়াবার পন্থা কি? প্রথমত বই পড়া, আর তার জন্য দরকার বই কেনার প্রবৃত্তি।’

পড়াশোনার প্রতি আমাদের এক ধরনের সম্ভ্রমবোধ তো সর্বকালের। Utilitarian তত্ত্বের প্রয়োগ দেখেছি আমাদের শিশুপাঠেই- ‘লেখাপড়া করে যে গাড়ি ঘোড়া চড়ে সে।’ আমাদের দেশে বিদ্বান ব্যক্তির স্থান দেওয়া হয়েছে রাজার ঊর্ধ্বে- ‘স্বদেশে পূজ্যতে রাজা বিদ্বান সর্বত্র পূজ্যতে।’ এ বিদ্যা অর্জনের সহজতম এবং একই সঙ্গে কঠিনতম উপায়ই হল পড়াশোনা।
বিশিষ্ট কথাকার, সুরসিক পাঠক সৈয়দ মুজতবা আলী তাঁর একটি নিবন্ধে (‘বই কেনা’, পঞ্চতন্ত্র) ফরাসি সাহিত্যিক আনাতোলে ফ্রাঁসের প্রসঙ্গ টেনে বলেছিলেন আমরা যতই নানা জ্ঞানবিজ্ঞান আয়ত্ত করতে থাকব, ততই এক একটা করে আমাদের ‘মনের চোখ ফুটতে থাকবে’। মনের চোখ বাড়াবার একটি নিদানও তিনি দিয়েছেন- এ ‘চোখ বাড়াবার পন্থা কি? প্রথমত বই পড়া, আর তার জন্য দরকার বই কেনার প্রবৃত্তি।’
এই যে বই পড়ে মনের চোখ ফোটানোর ব্যাপার, এর সঙ্গে সম্পর্কিত আরও একটি বিষয় সম্বন্ধে মুজতবা আলী বাট্রান্ড রাসেল সাহেবের বরাত দিয়ে বলেন, ‘সংসারে জ্বালা-যন্ত্রণা এড়াবার প্রধান উপায় হচ্ছে মনের ভিতর আপন ভুবন সৃষ্টি করে নেওয়া এবং বিপদকালে এর ভিতর ডুব দেওয়া। যে যত বেশি ভুবন সৃষ্টি করতে পারে, যন্ত্রণা এড়াবার ক্ষমতা তার ততই বেশি হয়’ । মুজতবা আলী বলেন, সাহিত্য থেকে আপনি বিচরণ করতে পারেন দর্শনে, ‘দর্শনে কুলিয়ে উঠতে না পারলে ইতিহাস, ইতিহাস হার মানলে ভূগোল- আরো কত কি।’ বই পড়ার পক্ষে সাফাই গাইতে গিয়ে মুজতবা আলী ওমর খৈয়ামের বেহেস্তের অন্যতম উপাচার হিসেবে ‘কেতাব’ এর উল্লেখের কথা বলেন। সে সঙ্গে তিনি কোরানের উদ্ধৃতিও দেন- ‘আল্লামা বিল কলমি’ অর্থাৎ আল্লা কলমের (এ সূত্রে পুস্তকের) মাধ্যমে জ্ঞান দান করেছেন। খ্রিস্টীয় গ্রন্থ ‘বাইবেল’-এর আক্ষরিক অর্থই হল Book per excellence, সর্বশ্রেষ্ঠ পুস্তক। বইয়ের মাহাত্ম্য কীর্তনে তিনি সর্ববিঘ্ন বিনাশায় দেবতা-লেখক গণপতিকে টেনে এনেছেন যিনি আমাদের বৃহত্তম গ্রন্থ স্বহস্তে লেখার দায়িত্ব আপন স্কন্ধে তুলে নিয়েছিলেন। এ অবস্থায় সৈয়দ সাহেবের সাবধান বাণী- ‘জনগণ যদি পুস্তকের সম্মান করতে না শেখে তবে তারা দেবভ্রষ্ট হবে।’
এ কথাগুলো ভাবের কথা। এবার কিছু কাজের কথা সূত্রাকারে শোনা যাক্ :
সবার জন্য সব বইয়ের পেছনে ছোটার প্রয়োজন নেই। কলা বা বিজ্ঞান বা বাণিজ্য বিষয়ের পড়ুয়ারা তাঁদের বৃত্তির জন্য নিজ নিজ বিষয়ের বই পড়বেন। অন্য বিষয়ে যেতে পারেন, তবে সেটা প্রত্যক্ষভাবে তাদের বৃত্তির সঙ্গে সম্পর্কিত নাও হতে পারে। এ বইয়ের মধ্যে আবার আছে Basic Books অর্থাৎ কোনও বিশেষ বিষয়ের আকরগ্রন্থ, যে বইকে ভিত্তি করে তৈরি হয় অপরাপর বই, Secondary books, সাময়িক প্রয়োজন মেটানোর জন্য টেক্সট বুক ইত্যাদিও। তবে এখানেও সমস্যা আছে, গুরুগম্ভীর বেসিক বই পড়ে হজম করা এবং এরপর কাজে লাগানো খুব সহজ ব্যাপার নয় যদি না এজন্য একটু প্রাথমিক প্রস্তুতি থাকে। নইলে বিষয়টির প্রতি ভীতি জাগতে পারে, বই পড়ার মূল উদ্দেশ্যই বিঘ্নিত হবে।
পড়াশোনার জগৎ কোনও ওয়াটার-টাইট কম্পার্টমেন্ট নয়। সাহিত্যের ছাত্র বা শিক্ষক বিজ্ঞানের বই পড়তে পারেন, অর্থনীতির ছাত্রের ভাষাতত্ত্ব পড়তে কোন বাধা নেই। ভূগোলের মাস্টারমশাই জীবনানন্দের কবিতায় নিমগ্ন হতে পারেন, প্রতিষ্ঠিত ইঞ্জিনিয়ার সংগীতশাস্ত্রের পাঠক হতেই পারেন। আর যে-কথাটি আরও বেশি মনে রাখা প্রয়োজন তা হল ইংরেজিতে বটেই বাংলা ভাষায়ও ইতিহাস-সমাজ-বিজ্ঞান-দর্শন-অর্থনীতি-রাজনীতি ছাড়া আরও বিচিত্র সব বিষয়ে বইপত্র রয়েছে - এগুলো খুঁজে নিলেই হল। একবার খোঁজ শুরু করলে এরা নিজেই পাঠকের কাছে ধরা দেবে।
কেন পড়ব- এর সহজ উত্তর হল পড়াশোনা করতে হবে নিজেকে আপ-ডেটেড করার জন্য। মানুষের ভাবনাচিন্তা, ভাষা সব কিছুই পরিবর্তনশীল, এবং যিনি এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারেন তিনিই তাঁর পেশাতেও সফল। তাঁর কাছে তখন নিজের অবশ্যকৃত্য কর্মটিও আর ভারবাহী কিছু মনে হবে না, হয়ে উঠবে একটি সৃজনশীল কর্ম। একেবারে পাঠশালার শিক্ষক থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, কনিষ্টতম করণিক থেকে কোম্পানি- এক্সিকিউটিভ- সবার ক্ষেত্রেই এটা প্রযোজ্য। তাই -
সবাইকেই পড়তে হবে এবং পড়তে হবে একটি পদ্ধতি অবলম্বন করে; বইয়ের জগতে পথ না হারিয়ে, কিংবা তাৎক্ষণিকভাবে সহজপন্থায় কোনো উদ্দেশ্য সিদ্ধ করার পথে না গিয়েই।
আমরা প্রথমেই উল্লেখ করেছি বিদ্যার্জনের পথ একই সঙ্গে বড়ো কঠিন পথ, আবার সহজও বটে। কঠিন ভেবে এড়িয়ে গেলে নিজের প্রতি অবিচার করা হবে, আর সহজ ভেবে অবহেলা করে, অসাবধানে এ পথে এগোলে হোঁচট খেতে হবে।
প্রশ্ন জাগতেই পারে, পড়ার কি কোনও পদ্ধতি থাকতে পারে? হ্যাঁ, পড়ার পদ্ধতি আছে, আবার নেইও। ট্রেনে, বাসে, বইয়ের স্টলে দাঁড়িয়ে ভিড়ের মধ্যিখানেও গভীর মনোযোগ দিয়ে পাঠরত মানুষ আমরা মাঝে মাঝে দেখি। এরকম নিবিষ্ট পাঠকের সাক্ষাৎ পাওয়া যায় কেবল নির্জন পাঠাগারে বা মহাফেজখানায়ই নয়, কোলাহলমুখর ঘরে, স্কুল-কলেজের কমনরুমে, রেলস্টেশন-ওয়েটিংরুমেও। আসলে বইয়ের ভেতর একবার ঢুকে গেলে বাইরের জগতের কোন কোলাহলই আর স্পর্শ করতে পারে না। এ শ্রেণীর পাঠককে নিয়ে আমাদের কিছুই বলার নেই। এরা পড়ার জন্যই বুঝি বেঁচে থাকেন, কিংবা বেঁচে থাকার জন্যই পড়েন। এদের পাঠপদ্ধতি কী এ নিয়ে গবেষণার আপাতত প্রয়োজন নেই, আমরা দেখব যাঁদের সময় স্বল্প, অথচ নিজস্ব বৃত্তির জন্য যাঁদের বেশ কিছু পড়াশোনা করতেই হয়, এদের তো একটা পদ্ধতি অবলম্বন করতেই হয়। পদ্ধতি থাকলে কাজটি সহজ হয়, এবং গ্রন্থপাঠ, তা সে প্রয়োজন-ভিত্তিক পাঠ হলেও হয়ে ওঠে একটি আনন্দময় অভিজ্ঞতা।
সাধারণত মানুষ গড়ে প্রতি মিনিটে ২০০-৩০০ শব্দ পড়তে পারেন। অবশ্য দ্রুত পঠন-অভিজ্ঞ ব্যক্তি এর চাইতে অনেক বেশি শব্দও পড়ে নিতে পারেন। আমরা স্বামী বিবেকানন্দের কথা জানি যিনি অবিশ্বাস্য রকম দ্রুত গতিতে কঠিন বই শুধু পড়ে নিতেই নয়, হৃদয়ঙ্গমও করে নিতে পারতেন। পাঠপদ্ধতিকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যাঁরা সরব-পাঠ করেন, যেমন শিশুরা পড়া শেখে, এদের চাইতে অনেক দ্রুত পড়া যায় নীরব-পঠনে (silent- reading)। অবশ্য, পড়াশোনায় চোখের দেখার সঙ্গে কানে শোনার ব্যাপারটিও জড়িত, তাই তো ‘পড়াশোনা’ শব্দগুচ্ছটির উদ্ভব। একটা স্তরে loud reading বা সরব পাঠের প্রয়োজনীয়তা তো পড়ারটিকে হৃদয়ঙ্গম করা এবং মুখস্ত করার জন্য, যদিও এতে পাঠের গতি ব্যাহত হতে বাধ্য। নীরব-পঠনে চোখের গতি ঠোঁটে উচ্চারিত শব্দের চাইতে অনেক বেশি।
অবশ্য দ্রুত-পঠন ক্ষমতা অনুশীলনের মাধ্যমে অর্জন করতে হয়। আবার পাঠের গতি নির্ভর করে কী পড়া হচ্ছে, কেন পড়া হচ্ছে এর উপরও। চটপট পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা শেষ করে যদি দেখা যায় মূল বিষয়টি কী, রচনাটির কি-ওয়ার্ড অর্থাৎ মুখ্য শব্দগুলো কী তা মনে নেই তবে এ পঠন নিরর্থক পণ্ডশ্রম।
প্রাত্যহিক পঠন অভ্যাসে এসে যাওয়া দৈনিক পত্রিকাগুলো যে গতিতে পাঠ করা যায় এ গতিতে অমর্ত্য সেনের অর্থনীতি বিষয়ক বই, বঙ্কিমচন্দ্রের সামাজিক প্রবন্ধ পড়া সম্ভব নাও হতে পারে। যে-গতিতে বাজারচলতি উপন্যাস বা সংগীত-সমালোচনার কলাম পড়া যাবে সে-গতিতে ইতিহাস, সাহিত্যতত্ত্ব বিষয়ক একটি বই পড়া যাবে না। তাই পঠন বিষয়ে কোনও প্রশিক্ষণ নয়, একটু সচেতনতা না থাকার ফলে অনেকসময়ই পঠন-কর্মটি সুখকর না হয়ে নিতান্তই কষ্টকর হয়ে ওঠে।
কাজের কথা হল কী করে পঠনক্ষমতা বাড়ানো যায়। দুটো ইংরেজি শব্দ আছে reading এবং skimming। প্রথমটির অর্থ অবশ্য আমাদের কাছে স্পষ্ট, দ্বিতীয়টি একটু অস্পষ্ট। দুটোই পড়া, তবে দুটোর মধ্যে একটা পার্থক্যও আছে। তবে স্কিমিং কর্মটি অবশ্যই রিডিং, কিন্তু রিডিং তো স্কিমিং নয়। পদ্ধতিগতভাবে দুটো কর্মের ধারাটি দুই রকম। যখন আমরা একটি মুদ্রিত পৃষ্ঠায় বাঁ-দিক থেকে ডানদিকে চোখ বুলিয়ে যাই, তখন হয় রিডিং; আর যখন উপর থেকে নিচে চোখ নামিয়ে যাই তখন হল স্কিমিং। অর্থাৎ রিডিং হল আনুভূমিক প্রক্রিয়া (horizontal process), আর স্কিমিং হল উল্লম্ব প্রক্রিয়া (vertical process)। আমরা ইতিমধ্যেই বলেছি সব বই পঠনে সমান মনোযোগ দাবি করে না। অর্থাৎ সব বইয়ের সব সময়ে রিডিং-এর প্রয়োজন হয় না, স্কিমিংয়েই কাজ হয়ে যায়। এই স্কিমিংকে বলা হয় পঠনের Sub-skill। যে-পাঠক বলেন তিনি ঘন্টায় পাঁচ কিংবা দশ হাজার শব্দ পড়ে নেন, তিনি আসলে স্কিমিং করেন। এটা হল মুদ্রিত পৃষ্ঠায় চটজলদি চোখ বুলিয়ে মূল বিষয় সম্পর্কে মোটামুটি একটা ধারণা করে নেওয়া। এটা কেন করতে হয়?
প্রথমত, সময় স্বল্পতার জন্য। যখন অতি অল্প সময়ে কোনও কিছু বুঝে নেওয়া নিতান্তই জরুরি হয়ে যায়, যখন অক্ষরে অক্ষরে পড়ার অবকাশই নেই তখন প্রয়োজন এ পদ্ধতির। আপনার পঠিতব্য পৃষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ শব্দগুলোতে চোখ বুলিয়ে যান, দেখবেন কয়েকটি বিশেষ শব্দের মধ্যেই মূল কথাগুলো নিহিত, বাকিগুলো তো সহযোগী শব্দ। আপনি যা জানতে চান সেটা যদি ওই প্রথম স্কিমিং-এ স্পষ্ট না হয়, দ্বিতীয়টিতে স্পষ্ট হবেই। আপনি তো প্রকাশভঙ্গি, তার শৈল্পিক দিক এসব চাইছেন না, আপনি একটা বা দুটো তথ্য চাইছেন যা এই স্কিমি-এ পাওয়া সম্ভব।
স্কিমিং কর্মটিকে আরও একটু অর্থবহ করতে টেক্সটিকে pre-view করুন। প্রথম প্যারাটি পড়েই নিন পুরোপুরি, এরপর দ্বিতীয়, তৃতীয় প্যারার প্রথম পঙক্তি পড়ে চলে যান শেষ লাইনে এবং এরপর প্রধান শব্দগুলোতে চোখ বুলিয়ে নিন, লিখিত বিষয়ের content আপনার কাছে ধরা দেবেই। যাদের হাতে সময় কম, পড়তে হয় বিস্তর এবং বুঝতেও হয়, মনেও রাখতে হয় অনেক কিছু, তাদের স্কিমিং ছাড়া উপায় নেই। কিন্তু মনে রাখতে হবে, একজন রিডারের স্থান স্কিমারের চাইতে অনেক উপরে। স্কিমিং হচ্ছে একেবারে কেজো পঠন, প্রকৃত পঠন তো রিডিংই। স্কিমিং-এ কিছু অতিরিক্ত সচেতনতারও প্রয়োজন। সৃজনশীল সাহিত্য স্কিমিং করলে পাঠসুখ শূন্য। গল্প, উপন্যাসে কাহিনির সঙ্গে বর্ণনা, বিশ্লেষণ, অলঙ্করণ অবিচ্ছিন্ন। এখানে প্রকাশশৈলী বাদ দিলে যে অনেক কিছুই হারিয়ে যাবে। তবে তথ্যপূর্ণ বই- ইতিহাস, দর্শন, বিজ্ঞান, অর্থনীতি- এসব স্কিমিং করে পাঠ করা সম্ভব।
রিডিং পদ্ধতি:
পঠনশৈলীকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়:
মনে মনে পাঠ (Sub-vocalization): এখানে পাঠক অক্ষরগুলো মনের ভেতর উচ্চারণ করেন; অর্থাৎ নিজেই নিজেকে শোনান গুনগুন করে। ইংরেজিতে একে Auditory reassurance ও বলে। এ হল ধীর পদ্ধতি। মিনিটে ২৫০টি শব্দ পড়া যায় এ পদ্ধতিতে।
সরব পাঠ (Auditory): এ পাঠে উচ্চারিত শব্দ নিজের কানে আসে। তুলনামূলকভাবে এতে গতি বেশি। মিনিটে ৪৫০টি শব্দ পড়া যায় এ পদ্ধতিতে।
চোখে পড়া (Visual): এতে কোনও শব্দ উচ্চারণ না করে একমনে পড়ে যাওয়া। মিনিটে ৭০০টি শব্দ পড়া যায় এই পদ্ধতিতে।
এ তিনটি পদ্ধতির কোনটি কখন, কেন গ্রহণ করা হবে সেটা পাঠককেই স্থির করতে হবে। পাঠে গতি আনার জন্য অনুশীলন খুব প্রয়োজন। এ অনুশীলনের জন্য আজকাল speed- reading, অর্থাৎ দ্রুত-পঠন সফ্ট-ওয়ার প্রোগ্রামও তৈরি হয়ে গেছে। তবে এটা ইংরেজিতে। এখন প্রয়োজন হল এ প্রোগ্রামকে বাংলায় রূপান্তরিত করা।
তাছাড়াও, বিষয়সন্ধানী, অর্থাৎ গবেষকদের পড়তে হয় অনেক বেশি, পঠিতব্য বিষয় খুঁজতে গিয়ে বা বিষয়ের কাছে পৌঁছোতে গিয়েও পড়তে হয় আরও বেশি। এবং এতে অনেক সময় কাজের কাজ কিছুই হয় না। এ ক্ষেত্রেও কিছু সহজ উপায় আছে। আপনার কাঙ্ক্ষিত বিষয়ে সরাসরি পৌঁছোতে হলে যেতে হবে বইয়ের নির্ঘণ্টতে (Glossery)। এখানে বর্ণানুক্রমে বইয়ের তথ্যসংকেত দেওয়া থাকে - কোন্ পৃষ্ঠায় কোন্ প্রসঙ্গ, কোন ব্যক্তিনাম বা ঘটনার জন্য সঠিক কত নম্বর পাতা ওল্টাতে হবে এসব। হাজার পৃষ্ঠার বই খুঁজে রবীন্দ্রনাথ কবে সিলেটে এসেছিলেন এ তথ্যটি বের করা নিশ্চিতই কঠিন। কিন্তু একাধিক খণ্ডে প্রশান্তকুমার পালের ‘রবীন্দ্রজীবনী’র নির্ঘণ্ট দেখে সহজেই এই প্রসঙ্গে আসা যায়।
তাছাড়া, গবেষণামূলক বইতে দেওয়া পাদটীকা (References and footnotes) যা আমরা সাধারণত এড়িয়ে যাই, এগুলোকে অবলম্বন করেও ব্যস্ততম মুহূর্তে কেউ বিষয় থেকে বিষয়ান্তত্তে বিচরণ করতে পারেন।
পাঠকদের আশ্বস্ত করা যেতে পারে, জ্ঞানার্জন এমন কিছু কঠিন ব্যাপার নয়। যে-কোনও পাঠকই এক বিষয়ের বই হাতে নিয়ে বহু বিষয়ে বিচরণ করতে পারেন, এক-পাঠে বহু গ্রন্থপাঠের অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারেন।