আপনার মুঠোফোনটি ল্যান্ডস্কেপে রাখুন।
এ পর্বে বৈচিত্র্যময় উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন ভাষিকগোষ্ঠীর সাহিত্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবার উদ্দেশ্যে তিনটি ভাষার অনুদিত সাহিত্যকৃতির সংস্থান রাখা হল। অনুদিত এ পাঠ সমাপনান্তে আপনি –

| ৪.১ লেখক পরিচিতি | |
| ৪.২ মূলপাঠ | |
| ৪.৩ পাঠসূত্র | |
| ৪.৪ নিবিড় পাঠ | |
| অনুশীলন |

| (ক) | তৃতীয় নেত্র : |
| নিরোদ চৌধুরী | |
| ৪.১ লেখক পরিচিতি | |
| ৪.২২ মূলপাঠ | |
| ৪.৩ পাঠসূত্র | |
| ৪.৪ বিশেষ পাঠ | |
| অনুশীলন |

| (খ) | একটি ইলিশের স্বাদ : |
| নোংথোম্বম কুঞ্জমোহন সিংহ | |
| ৪.১ লেখক পরিচিতি | |
| ৪.২ মূলপাঠ | |
| ৪.৩ পাঠসূত্র | |
| ৪.৪ বিশেষ পাঠ | |
| অনুশীলন |

(গ) | নামাই : |
| জাহিদ আহমেদ তাপাদার | |
| ৪.১ লেখক পরিচিতি | |
| ৪.২২ মূলপাঠ | |
| ৪.৩ পাঠসূত্র | |
| ৪.৪ বিশেষ পাঠ | |
| অনুশীলন |
এ পর্বে বৈচিত্র্যময় উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন ভাষিকগোষ্ঠীর সাহিত্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবার উদ্দেশ্যে তিনটি ভাষার অনুদিত সাহিত্যকৃতির সংস্থান রাখা হল। অনুদিত এ পাঠ সমাপনান্তে আপনি –
নিরোদ চৌধুরী (১৯৩৬ - ২০০১): বিশিষ্ট অসমিয়া সাহিত্য পত্রিকা ‘রামধেনু’র সঙ্গে যুক্ত কথাকার। তাঁর প্রকাশিত গল্পগ্রন্থের সংখ্যা ৩৮। কয়েকটি উল্লেখযোগ্য গল্পের নাম- ‘অঙ্গে অঙ্গে শোভা’, ‘বায়ু বয় পুরবইয়া’, ‘নিশিগন্ধ’, ‘হংস মিথুন’, ‘চামেলি মেমসাহেব’, ‘দেহ দেউল’। তাঁর উপন্যাসগুলোর মধ্যে 'স্তব্ধ বৃন্দাবন', 'কুঁয়লির আঁখর', 'বনহংস' উল্লেখযোগ্য। ‘বুড়িগঙ্গাত জুই’ তাঁর বিখ্যাত প্রতিবেদনধর্মী রচনা। ‘দৈনিক জনমভূমি’ পত্রিকায় প্রকাশিত তার আত্মজীবনীমূলক রচনা, ‘ডুমডুমা, ডুমডুমা’ তিনি ‘সাদিনীয়া অসমবাণী’ পত্রিকার সম্পাদকও ছিলেন।
লোকটা একটু ছোট-খাটো ধরনের। বয়সের ভারে আরো একটু কুঁজোও হয়ে গেছে। হাতে একটা বেতের লাঠি।
লোকটা একটু ছোট-খাটো ধরনের। বয়সের ভারে আরো একটু কুঁজোও হয়ে গেছে। হাতে একটা বেতের লাঠি।
পানবাজার কলেজ হোস্টেল রোডের পার্শ্ববর্তী প্রতিমা তৈরির মৃৎশিল্পীদের সেই জায়গাটা প্রায় সকলেরই চেনা। আমরা ছোটবেলা থেকেই গুয়াহাটির সেই জায়গাটার সঙ্গে পরিচিত। এখন অবশ্য মহানগরীতে রূপান্তরিত হওয়ায় গুয়াহাটিতে এইধরনের দেব-দেবীর মূর্তি গড়া কারিগরদের সংখ্যাও প্রচুর হয়েছে। আগে ততটা ছিল না। তখনই দেখেছিলাম লোকটাকে।
পানবাজার কলেজ হোস্টেল রোডের পার্শ্ববর্তী প্রতিমা তৈরির মৃৎশিল্পীদের সেই জায়গাটা প্রায় সকলেরই চেনা। আমরা ছোটবেলা থেকেই গুয়াহাটির সেই জায়গাটার সঙ্গে পরিচিত। এখন অবশ্য মহানগরীতে রূপান্তরিত হওয়ায় গুয়াহাটিতে এইধরনের দেব-দেবীর মূর্তি গড়া কারিগরদের সংখ্যাও প্রচুর হয়েছে। আগে ততটা ছিল না। তখনই দেখেছিলাম লোকটাকে।
কখনও বা মাটির প্রলেপ লাগাতে, কখনও বা খড়ের মুঠি বাঁধতে, কখনও কখনও রঙের তুলি নিয়ে মুখে রঙ লাগাতেও দেখেছি লোকটাকে। আবার, কখনও বা দেখা গেছে মূর্তিগুলোতে বিভিন্ন রূপে রঙ-বেরঙের কাপড় জড়াতে।
গুয়াহাটিতে সাধারণত প্রতিমাগুলো স্থানীয় মৃৎশিল্পীরই সাজাত। অবশ্য তার মধ্যে ব্যতিক্রম ছিল উজান বাজারের স্বর্গীয় বরদা বিষয়ার সরস্বতীর মূর্তি। উনি সেটা কলকাতার শিল্পীকে দিয়ে গড়িয়েছিলেন। ঠিক তেমন ভাবেই ব্যতিক্রম ছিল তখনকার গুয়াহাটির নদীর পারে প্রতিষ্ঠিত পুরনো খুব সুন্দর মনোহর আকৃতির ওরিয়েন্টেল বিল্ডিঙের দুর্গাপুজোর প্রতিমা। সেটাও মাঝে মাঝে কলকাতা থেকে আসা মৃৎশিল্পীর বানানো। তখনকার গুয়াহাটিতে সেটাও ছিল এক অন্যতম আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। সেটা দেখার জন্য মানুষের ভিড় উপচে পড়ত।
আজ সেগুলো অতীত হয়ে গেছে, এখন নতুন নতুন আকৃতির দেব-দেবী দেখতে পাওয়া যায়। কলকাতাতে তা নিয়ে কত পরীক্ষা-নিরীক্ষাই না করা হচ্ছে। একবার তো একটা দুর্গা প্রতিমা মসুর ডাল দিয়ে বানানো হয়েছিল। আবার, একবার শুধু-মাত্র শোলা দিয়ে।
কলেজ হোস্টেলের সেই জায়গাটা সব সময়ই উৎসবমুখর হয়ে থাকে। স্কুলে যাওয়ার সময়, আমার ছেলেটা একবার আমায় জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘এবার কী পুজো?’ প্লাস্টিক বা ত্রিপলের অস্থায়ী চালের নীচে প্রত্যেক মাসেই কোনো না কোনো দেব-দেবীর মূর্তি থাকে, আর যে মাসে থাকে না বা দেখতে পাওয়া যায় না, সম্ভবত তার মনটা খারাপ হয়ে যায়। জায়গায় জায়গায় বিভিন্ন আকৃতির মূর্তি দেখে স্বভাবতই তার মনটা আনন্দে ভরে ওঠে।
আজকাল সেই বুড়ো লোকটা কিছু করে না, হয়তো তার অধীনে বিদ্যাটা রপ্ত করা কমবয়সী শিল্পীরাই সেই কাজটা চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
লোকটাকে কিন্তু প্রায়ই দেখা যায়। কখনও বা দূর থেকে দাঁড়িয়ে নির্মীয়মান প্রতিমূর্তিগুলো নিরীক্ষণ করতে, কখনও বা রঙ না-করা খড়ের আকৃতিগুলোকে ছুঁয়ে দেখা, আবার কখনও বা প্রতিমূর্তির চোখ দুটোর ওপর হাত বোলাতে। ঠিক যেন নিজের ক্ষীণ হয়ে আসা চোখের জ্যোতির বিফল শক্তি দিয়ে দেব-দেবীর চোখের জ্যোতিকে অনুধাবন করার খানিকটা চেষ্টা।

আবার কখনও দেখি, কটন হোস্টেল চৌহদের গেটের সামনে বসে অবাক দৃষ্টিতে চারদিকটা দেখে নিচ্ছে। কেউই তাকে লক্ষ করে না। শীতকালের রৌদ্রের দিকে অথবা এমনি চারদিকটি মানুষগুলোকে দুর থেকে নীরবে চেয়ে থাকে। কেউ বা ট্রাকে, কেউ কেউ বা ঠেলাগাড়িতে, রিক্সাতে এক একটা প্রতিমা নিয়ে যায়। অনেক ভক্ত সমস্বরে সহর্ষ ধ্বনি তুলে চিৎকার করে, দেব-দেবীর জয় ঘোষণা করে, কেউ বা হয়তো চলতি হিন্দি সিনেমার গানের কলি ভাঁজে।
লোকটা চুপচাপ সব দেখতে থাকে। নিজে কর্মক্ষম থাকা অবস্থায় গড়া মূর্তির যে সজীবতা সেই সময় হয়তো যা দেখতে পেয়েছিলেন, তার স্রোতের ভাটা বা কিছুটা ক্ষীণতা আজ যেন চোখে পড়ে। তথাপি আনন্দ, সহস্রজন সেইসব মূর্তিকেই ভক্তিসহকারে সেবা করবে। আর সেগুলোই তো জীবন্ত ভগবান হয়ে দেখা দিবে। বিশুদ্ধ এক আনন্দে মন ভরে ওঠে।
আবার কখনও দেখি, কটন হোস্টেল চৌহদের গেটের সামনে বসে অবাক দৃষ্টিতে চারদিকটা দেখে নিচ্ছে। কেউই তাকে লক্ষ করে না। শীতকালের রৌদ্রের দিকে অথবা এমনি চারদিকটি মানুষগুলোকে দুর থেকে নীরবে চেয়ে থাকে। কেউ বা ট্রাকে, কেউ কেউ বা ঠেলাগাড়িতে, রিক্সাতে এক একটা প্রতিমা নিয়ে যায়। অনেক ভক্ত সমস্বরে সহর্ষ ধ্বনি তুলে চিৎকার করে, দেব-দেবীর জয় ঘোষণা করে, কেউ বা হয়তো চলতি হিন্দি সিনেমার গানের কলি ভাঁজে।

লোকটা চুপচাপ সব দেখতে থাকে। নিজে কর্মক্ষম থাকা অবস্থায় গড়া মূর্তির যে সজীবতা সেই সময় হয়তো যা দেখতে পেয়েছিলেন, তার স্রোতের ভাটা বা কিছুটা ক্ষীণতা আজ যেন চোখে পড়ে। তথাপি আনন্দ, সহস্রজন সেইসব মূর্তিকেই ভক্তিসহকারে সেবা করবে। আর সেগুলোই তো জীবন্ত ভগবান হয়ে দেখা দিবে। বিশুদ্ধ এক আনন্দে মন ভরে ওঠে।
কতদিন আগে থেকেই লোকটাকে শুধু লক্ষই করে আসছি। কোনো দিনই কথা বলিনি। প্রয়োজনও বোধ করিনি। কিন্তু শৈশব থেকেই দেখে আসা মানুষটার প্রতি একটা মোহ মনের ভেতরটায় পালন করে আসছিলাম।
একদিন সুযোগ এল।
আমি কিছুদিন ধরে লক্ষ করছিলাম যে সবসময় গেটের মুখে বসে মানুষটা একটা ছোটো প্লাস্টিকের আয়না নিয়ে নিজের মুখটা দেখতে থাকে, খুব কাছ থেকে নিরীক্ষণ করার যেন একটা চেষ্টা। প্রথম প্রথম ব্যাপারটা পাত্তা দিইনি।
একদিন দেখলাম খুব যত্ন করে আয়নাটা পকেটের ভেতর ঢুকিয়ে রাখতে। হাসি পাচ্ছিল। এই বুড়ো বয়সে নিজের মুখ দেখার এমন অস্বাভাবিক প্রয়াস।
তারপর থেকে আমার এক নিত্য নৈমিত্তিক অভ্যাস হয়ে গেল ছেলেটাকে স্কুলে দিতে যাওয়ার সময় বুড়ো মানুষটাকে দেখা। আসতে বা যেতে সবসময়ই প্রায়ই তাকে বসে থাকতে দেখা যায়। কখনও বা আয়নাটা হাতে থাকে, আবার কখনও বা থাকে না।
একদিন লক্ষ করলাম, লোকটা মূর্তি গড়ার মাটি হাত দিয়ে গোলাচ্ছে। ভাবলাম, দেব-দেবীর কোনো বিশেষ অঙ্গ হয়তো তিনি গড়ছেন। এতদিনের সাধনা অভ্যাস এত সহজে নিঃশেষ হয়ে যায় কীভাবে?
তারপর কিছুদিন লোকটাকে আবার নির্বিকার অবস্থায় দেখলাম। মুখে বিমর্ষতার প্রকাশ। দৃষ্টিতে অবাক হওয়ার অজস্র প্রশ্নবোধক চিহ্ন।
তখন পুজোর সময়। ঘরের সামনে রাস্তা-ঘাটে সর্বত্র দুর্গার প্রতিমূর্তি। কোনো জায়গায় অগ্নিশর্মা অসুরের রুদ্র মূর্তি। কোথাও বা রোদে শুকাতে দেওয়া লক্ষ্মীপ্যাঁচা আর ইঁদুর।
উঁচু উঁচু প্রতিমূর্তিগুলোর মাঝখানে ছোটো-খাটো মানুষটা চোখেই পড়ে না।
একদিন সেদিক দিয়ে আসার সময় রাস্তার ধারে রাখা একটা প্রতিমার কাছে লাঠি হাতে মানুষটাকে দেখে রিক্সা থেকে নেমে তাঁর কাছে গিয়ে দাঁড়াই। মানুষটা মূর্তির একদম সামনে গিয়ে কিছু যেন একটা খোঁজার চেষ্টা করছিল।
লোকটা ঘুরে দেখলো। চার চোখের মিলন হল।
আমি নমস্কার জানিয়ে বললাম- ‘আমি আপনার সঙ্গে একটু কথা বলতে চাই।’
ভাবলেশহীন ফ্যাকাসে চোখদুটো। অবাক হয়ে আমার মুখের দিকে চাইল। অন-অসমিয়া লোকটাকে অসমিয়াতে বললাম- ‘আপনি আমাকে চিনবেন না। কিন্তু আমি আপনাকে জানি, আমি ছোটবেলা থেকেই আপনাকে দেখে আসছি।’
লোকটা সম্ভবত নাটকীয় পরিবেশটাকে ঠিক হজম করতে পারছিল না। ব্যাপারটাকে সহজ করার জন্য আমি তখন বললাম- ‘চলুন, ওখানে বসে কথা বলি।’
আমি গেটের দিকে ইশারা করে তাঁর পিঠে হাত রেখে সামনের দিকে এগিয়ে গিয়েছিলাম।
রঙচটা হাওয়াই স্যান্ডলটার অবস্থা নেই। লোকটা লাঠিতে ভর দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলেন।
সুন্দর অসমিয়া ভাষাতে উনি আমার পরিচয় জিজ্ঞাসা করেছিলেন। উত্তর দিয়েছিলাম, এরপর আমি সোজাসুজি প্রশ্ন করেছিলাম- ‘আমি কয়েকদিন ধরেই লক্ষ করছি আপনি একটা আয়না নিয়ে নিজের মুখটাকে দেখতে থাকেন, তারপর আবার কাদা-মাটি দিয়ে কিছু একটা যেন গড়তে থাকেন। কীসের জন্যে?’
পরীক্ষাগৃহে নকল করে ধরা-পড়া পরীক্ষার্থীদের মতো লোকটা সন্ত্রস্ত হয়ে উঠেছিল। প্রথমে কিছু না জানার ভান জুড়ে অস্বীকার করার চেষ্টা করেছিলেন। আমি তখন সমগ্র ঘটনাগুলোর পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দিলাম। অর্থাৎ আমি যে পুরো ব্যাপারটি সম্বন্ধে অবগত সে সম্পর্কে তাঁকে একটা স্পষ্ট ধারণা দিলাম।
কিছুক্ষণ মৌনী থাকার পর উনি মুখ খুললেন। বললেন- ‘যে প্রশ্নটা কেউ কোনোদিনও করেনি, সেটাই তুমি জিজ্ঞাসা করলে। আমি তোমাকে কথাটা বলছি। কিন্তু কাউকে বলবে না।’
সতর্ক দৃষ্টিতে চারদিকটা একবার দেখে নিলেন লোকটা। রাস্তার ধারে শুকোতে দেওয়া রঙ না দেওয়া দুর্গার মূর্তির দীর্ঘ ছায়াটা আমার গায়ে এসে পড়েছিল।
আমার হাতের উপর তাঁর শীর্ণ একটা হাত রেখে বললেন- ‘আমি আসলে আমার মুখটা বানানোর চেষ্টা করছিলাম। জীবনে বহু মূর্তি বানিয়েছি। অনেক মুখের আকৃতি দিয়েছি। এই বয়সে এসে ভাবলাম আমি কত দক্ষ শিল্পী এবার একটু যাচাই করি।’
সাগ্রহে আমি জিজ্ঞাসা করলাম- ‘কী হল?’
একটু থেমে বুকে হাত দিয়ে দুবার কেশে বললেন- ‘হল না, বাবা, হল না।’
‘কী হল না?’
রোগী যেমন ডাক্তারের মুখের দিকে চেয়ে থাকে, ঠিক তেমন একটা সকরুণ দৃষ্টি হেনে মানুষটা বলল- ‘আমার মুখখানা হল না। যতই গড়ি তাতে করে শুধু একটা মুখই হয়। সেটা ত্রিনয়নী দেবী দুর্গার।’
আমি আর কিছু প্রশ্ন করলাম না। লোকটাও আর কিছুই বলল না। উঠে আসার সময় এখানে-ওখানে সাজিয়ে রাখা দুর্গা প্রতিমার মুখগুলোর মধ্যে কিন্তু আমি একটা মুখই দেখতে পেলাম।
লোকটার মুখ। যে নাকি নিজের মুখখানা গড়ে উঠতে পারল না।
এক ভাষার সৃজনকর্ম অন্য ভাষাভাষীর কাছে পৌঁছানোর অন্যতম সোপনানই হল অনুবাদ। অনূদিত সাহিত্যের মাধ্যমে একটি অঞ্চলের সার্বিক সৃজনকর্মের বিস্তার ঘটে, বিকাশও ঘটে। প্রত্যেকটি ভাষারই একটি নিজস্ব বৈশিষ্ট্য আছে যা অন্য ভাষায় জোগাতে পারে বিশেষ অবদান। পাশাপাশি অবস্থানরত বাংলা এবং অসমিয়া ভাষায় পারস্পরিক অনুবাদ খুব কষ্টসাধ্য নয় এবং এ অনুবাদ মূল রচনাকর্মটিকে একেবারে নিখুঁত ভাবেই অপর ভাষায় উপস্থাপন করতে পারে। অনুবাদ হয়ে উঠতে পারে একেবারে অনুসৃষ্টিই।
পাঠ্য গল্পের প্রেক্ষাপট গুয়াহাটি হলেও গল্পটি স্থানিক প্রেক্ষিতকে অতিক্রম করেছে বিষয় এবং প্রকাশভঙ্গির জন্যই। দুর্গাপ্রতিমা গড়তে গড়তে এক মৃৎশিল্পীর প্রতিমার সঙ্গে লীন হয়ে যাওয়ার এ আখ্যানের মধ্যে ঘটেছে গভীর মনস্তত্ব এবং নন্দনচেতনার সংমিশ্রণ। দেবী প্রতিমা নির্মাণ করতে করতে বৃদ্ধ বয়সে পৌঁছে যাওয়া শিল্পী আবিষ্কার করলেন যে অনেক চেষ্টা করেও তিনি মাটি দিয়ে নিজের অবয়ব গড়তে ব্যর্থ হচ্ছেন। নিজের আয়না সামনে রেখে যত করতে চান তা নিজের অবয়ব না হয়ে হয়ে ওঠে দেবী দুর্গার অবয়ব। স্রষ্টা হিসেবে তাঁর নিজস্ব সত্তার বিলোপ ঘটেছে এবং ব্যাক্তিসত্তাটি বিলীন হয়ে গেছে সৃজনকর্মের সঙ্গে।
এ পর্যন্ত গল্পের একটি স্তর, যেখানে কথক একজন প্রতিবেদক মাত্র। কিন্তু দ্বিতীয় স্তরে আমরা দেখি মৃৎশিল্পীর স্বীকারোক্তি শোনার পর কথক যখন তাঁর তৈরি করা মূর্তির সারির দিকে চোখ ফেরালেন, প্রতিটি দেবীমূর্তির মুখাবয়বে দেখা গেল দুর্গা নয়, ওই বৃদ্ধ শিল্পীরই মুখের আদল। গল্পের এই দ্বিতীয় মোচড় বা Twist কথককে আর শুধুমাত্র একজন দর্শকের (প্রতিবেদকের) স্তরে না রেখে এ গল্পটিরই একটি চরিত্রে রূপান্তরিত করে ফেলেছে। স্বল্প পরিসরের গল্পটির ব্যাপ্তি সম্প্রসারিত হয়েছে বিস্তৃত ক্ষেত্রে যেখানে পাঠকের মনে শিল্পের বাস্তবতা, সৃজন রহস্য, শিল্পীসত্তা আর ব্যক্তিসত্তার টানাপোড়েনে উন্মোচিত হল এক বিশাল চিন্তার জগৎ, আমাদের সামনে খুলে গেল আরেকটি ভুবন। প্রতিবেদকের তো বটেই পাঠকেরও আরও একটি দ্রষ্ট চোখ প্রাপ্তি হল।
নিরোদ চৌধুরীর এ গল্পটি প্রকৃতই একটি আধুনিক সৃষ্টি। প্রথম স্তর থেকে দ্বিতীয় স্তরে এসে পাঠকের দেখার Perspective বদলে যাওয়াতে গল্পটিতে যোগ হল নতুন মাত্রা। এখানেই তার চমৎকারিত্ব। ফরাসি গল্পকার মপাশাঁ, ইংরেজ সাকি (HM Munro), কিংবা মার্কিন ও হেনরির গল্পের প্রচ্ছায়া এলেও এ গল্পে নির্মাণ ও সৃষ্টি, স্রষ্টা ও নির্মাণ নিয়ে যে মৌলিক প্রশ্নসংকেত রয়েছে তা নিরোদ চৌধুরীর একেবারে নিজস্ব। বিদেশী আঙ্গিকে দেশীয় ভাবনা, দেশীয় এক মৃৎশিল্পীর উত্তরণ, নিজস্ব সাধনায় চরম সিদ্ধি (যা আবার সে নিজে উপলব্ধি করতে অক্ষম) - এ সত্যটি গল্পের শেষ পর্যায়ে এসে যখন স্পষ্ট হয় তখন পাঠক এ গল্পের কথকের মধ্যেও একটা রূপান্তর বা উত্তরণের সংকেত পান। তৃতীয় নেত্রটি যে কার - মৃৎশিল্পীর না লেখকেরই এ প্রশ্নের মীমাংসা অবশ্য লেখক পাঠকের উপরই ছেড়ে দেন। গল্পটা নিঃসন্দেহেই আসামের কথাসাহিত্যকে একেবারে জাতীয় স্তরে পৌঁছে দিয়েছে।
নোংথোম্বম কুঞ্জমোহন সিংহ (১৯৩৫ - ২০১১) : জন্ম আসামের কাছাড় জেলায়। শিলচরে স্কুল কলেজের পড়াশুনা শেষে গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ সমাপনান্তে মণিপুরে শিক্ষকতা ও শিক্ষাবিভাগে উচ্চ আধিকারিকের দায়িত্ব পালনের সঙ্গে সঙ্গে সাহিত্যচর্চা। মণিপুরি এবং বাংলা উভয় ভাষায়ই দক্ষ। জীবনানন্দ দাশ, সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতার সার্থক অনুবাদক। ‘ইলিশ আমাগী মাহাও’ গল্পসংকলনটি তাঁকে সর্বভারতীয় পরিচিতি দিয়েছে। ১৯৭৪ সালে এ বইটির জন্য তিনি সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন। তাছাড়াও দেশ বিদেশের অনেক পুরস্কারও তিনি পান যার মধ্যে সোভিয়েত রাশিয়ার ‘নেহেরু পুরস্কার’ অন্যতম। ২০০৯ সালে ‘এই না কেঙে কেনবা নাটে’ গল্পসংকলনের জন্য তিনি ‘সংসদ ইন্ডিয়া’ এবং ‘সাহিত্য অকাদেমি’ প্রদত্ত Tagore Literary Awardও লাভ করেন।
আকাশে তারাগুলি মিটমিট করে জ্বলছে। মাঝে মাঝে দু’একটি করে খসে পড়ছে। বরাকের স্রোতের আওয়াজ কানে এসে বাজছে।
আকাশে তারাগুলি মিটমিট করে জ্বলছে। মাঝে মাঝে দু’একটি করে খসে পড়ছে। বরাকের স্রোতের আওয়াজ কানে এসে বাজছে।
কেউ এখনও নদীতে নামেনি। শুধু বাপ-বেটা দু’জনই। ছেলের হাতে বইঠা, বাবা জাল ঠিক করেছে। ছেলের দিকে ফিরে তাকাতেই দেখতে পেল বৈইঠা হাতে ঝিমুচ্ছে। খেঁকিয়ে ওঠে বাপ, ‘এ্যাই মণি। সূর্য ওঠার সময় হয়ে এল, এখনও ঝিমুচ্ছে। চোখে ঠিক গুঁড়া লঙ্কা মাখিয়ে দেব, হ্যাঁ মুখটা ভালো করে ধুয়ে ফেল।’
কেউ এখনও নদীতে নামেনি। শুধু বাপ-বেটা দু’জনই। ছেলের হাতে বইঠা, বাবা জাল ঠিক করেছে। ছেলের দিকে ফিরে তাকাতেই দেখতে পেল বৈইঠা হাতে ঝিমুচ্ছে। খেঁকিয়ে ওঠে বাপ, ‘এ্যাই মণি। সূর্য ওঠার সময় হয়ে এল, এখনও ঝিমুচ্ছে। চোখে ঠিক গুঁড়া লঙ্কা মাখিয়ে দেব, হ্যাঁ মুখটা ভালো করে ধুয়ে ফেল।’
বইঠাটা নৌকায় রেখে বাবার কথা মতো মণি মুখ ধুয়ে নিল। তারপর পরিহিত গামছার প্রান্ত দিয়ে মুখটা মুছে আবার বইঠা তুলে নিল।
ছেলের এই অবস্থা দেখে বাবার করুণা হল। ছেঁড়া জামাটার ডান পকেট থেকে একটা বিড়ি ও দেশলাই বের করে বলল- ‘নাও, বিড়িটা নাও, এই একটাই আছে। ধরাও। দু’একবার টান দিয়ে আমাকে দাও।’
মণি বিড়িটা মুখে গুজে দেশলাই ধরাতে চেষ্টা করে। দু'তিনটা কাঠি ঠুকেও বিড়ি ধরাতে পারল না। বিড় বিড় করে বলল- ‘কী জ্বালা। নদীর জলে দেব এক চুবা।’
‘আমায় দাও দেখি। এখনকার দেশলাইগুলি শুধু একদিকেই বারুদ দেওয়া, খালি পয়সা নেওয়ার ধান্দা।’ একথা বলে বাবা কাছে এসে দেশলাইটা ধরাল।
মণি বিড়িটাতে কষে এক লম্বা টান দিয়ে শেষ করতেই ওপাড়ের জটাধারী সাধুটার আওয়াজ শোনা গেল, ‘বোম্ ভোলানাথ। জয় শিব শম্ভু।’
সাধুবাবা উঠল যখন আর দেরী নেই, এখনই ভোর হবে। আরও লোক নদীতে নামবে।
লোঙ্গোর বাবার দিকে বাপ-বেটায় নৌকাটাকে ঠেলে দিল। অনেকেই ওদিকটায় যেতে সাহস করে না, তবে ওখানে বেশ মাছ পাওয়া যায়। একটু জল বাড়লেই শুশুকে ভরে যায়। ঘড়িয়ালও ভেসে ওঠে। গতবার এখানেই একটি ঘড়িয়ালকে গুলি করে মারা হয়েছিল। জালে একটা হ্যাঁচকা টান পড়ার মতো মনে হওয়ায় বাপে বেটায় জালটা টেনে তুলল।
কিন্তু কিছুই উঠল না। তাকে যেন বিদ্রুপ করার ঢঙে নৌকাটার খুব কাছেই একটি শুশুক হঠাৎই লাফিয়ে উঠল।
বার দুয়েক জাল ফেলেও কাজ না হওয়ায় বাপ-বেটায় নৌকাটাকে স্রোতের দিক ভাসিয়ে দিল।
এরই মধ্যে চার-পাঁচটা নৌকা নদীতে নেমে পড়েছে। এখন চারদিক বেশ পরিষ্কার।
আর একটু এগিয়ে গিয়ে নাউরেম-এর ঘাটের কাছে এসে তাদের ভাগ্য ফিরল। ধবধবে সাদা একটি বড়ো ইলিশ মাছ তাদের জালে আটকা পড়ল। বাপ-বেটা দু’জনের মুখ খুশিতে ভরে উঠল।
ছেলেমানুষ, তাই মণি মুখ ফসকে হঠাৎই বলে উঠল, ‘ইস্ কত্তো বড়ো। খেতে খুব স্বাদ হবে তাই না বাবা।’
‘চুপ, ও ভাবে বলতে নেই।’ বাবা ছেলেকে বকুনি দিল। ঘাটে লোক নামছে টের পেয়ে ফিরে তাকাতেই দেখতে পেল নাউরেম-এর সেই মেদবহুল বুড়ো লোকটা স্থির দৃষ্টিতে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। ডাক দিল, ‘মণির বাপ, ও মণির বাপ।’
মণির বাবা শুনেও না শোনার ভান করে রইল। লোকটার সঙ্গে তার তেমন ভাব নেই। মাছটা কেনার জন্যে যে ডাকছে তা সে বুঝতে পারছে। কিন্তু সবাই যে দামে কেনে লোকটা কিছুতেই সে দাম দেবে না। পয়সা থাকলে কী হবে দাম বাড়াতেই চায় না। আনা সিকির দর কষাকষি করে শুধু সময় নষ্ট করে।
একটানা ডেকে যাওয়ায় জবাব না দিয়েও পারল না- ‘কী ব্যাপার বলুন?’
‘কেমন ধরেছে? আমি একটা কিনতে চাই। পাকিস্তান থেকে মাছ না আসায়, কি আর বলব, জিহ্বাটাই তেঁতো হয়ে গেছে। শরীর শুকিয়ে যাচ্ছে।’
মণির বাবা আপন মনে বিড় বিড় করে বলে গেল, ‘রাস্তায় কাকের বিষ্ঠা পর্যন্ত কুড়ানো তোমার মতো লোকের জিহ্বা তেঁতো হবে না তো কার হবে।' তারপর তাকে শুনিয়ে বলল, 'ধরতে পারলাম কই, এই একটাই যা।’
‘ওটাই আমাকে দিয়ে যাও।’
‘না খুড়ো, আজ থাক। ধরলাম তো মাত্র একটাই।’
রাজি হবে না বুঝে লোকটা আর কথা বাড়াল না।
‘এই বুড়োটার সঙ্গে যখন দেখা হয়ে গেল মনে হয় আজ আর সুবিধে হবে না।' বিড় বিড় করে বাবাকে বলতে দেখে মণিও যোগ করল, ‘সত্যি, আমি ও বুড়োটাকে এক্কেবারে দেখতে পারি না। গত পরশু তাদের তমাল আমাকে মেরেছে। আমিও...।’
মণি কথা শেষ করতে পারল না। রহিমুদ্দিনের জালে একটা ইলিশ ধরা পড়তে দেখেই চাউবা আবার বিড়বিড় করে বলতে লাগল, 'অন্যদের দেখ, নামতে না নামতেই ধরতে শুরু...।। রহিমুদ্দিন মাছটা রেখে ডাক দিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘ও চাউবাদা। কেমন ধরলে?’
‘ধরিনি, মাত্র একটাই’
‘তাহলেও তো পেয়েছ। গতকাল আমি তিনটে ধরেছিলাম। চার টাকা করে বিক্রি করেছি।’
‘তা ঠিক বিক্রি করলে কিছু পয়সা পাওয়া যেত, তবে আজ বিক্রি করব না। বড়ো মেয়ে সনারৈকে বাড়িতে নিমন্ত্রণ করে এনে খাওয়াব, দু'দিন পরেই সে মা হতে চলেছে। সত্যিই, বললে লজ্জার কথা, ধান্দায় ইলিশ মাছের স্বাদ যে ভুলতে বসেছি। আজ তা খাইগে।’
বাপ-বেটায় যখন ঘরে ফিরে এল রোদ তখন বেশ চড়েছে। মেজো মেয়ে তম্ফার বানানো দুধ-ছাড়া গুড়োর চা দাওয়ায় বসে খাচ্ছিল চাউবা। এমন সময় কোনসম কাহ্নাই রাস্তা থেকেই গলা চড়িয়ে ডাক দিয়ে উঠল, ‘চাউবা, একটা ইলিশ মাছ নাকি ধরেছ, শুনলাম। ঠিক নাকি?’ কাহ্নাই এর আওয়াজ শুনেই চাউবার বুকটা ধক করে উঠল। কাহ্নাই-এর কাছে তার দু'টাকা পঁচিশ পয়সা দেনা।
বাপে উত্তর দেওয়ার আগেই মুখে সবে কথা ফোটা ছোট্ট ছেলে মুক্তা বলে উঠল, ‘হ্যাঁ একদা খুউব বলো দলে এনেছে।’
ছেলেটার কথা কাহ্নাই শুনল কি শুনল না বোঝা গেল না। চাউবা ছেলেকে ধমক দিয়ে বলল, ‘চুউপ, মিছে বল কেন? তোর কী দরকার?’ তারপর রাস্তার দিকে মুখ ফিরিয়ে জবাব দিল, ‘না দাদা, একটাও পাইনি। কে বলল?’
‘আচ্ছা, না ধরলে কি আর করব।’ এই বলে রাস্তা থেকেই কাহ্নাই ফিরে গেল।
‘মুক্তা ইলিচ খাব। এত্তো বলো, নদী থেকে দলেছে। তুমলা কি খেতে পাও?’
মেয়ে তম্ফা তামাক সাজিয়ে এনে বাবাকে বলল, ‘বাবা, এখন রান্নার চাল নেই? কী করি?’
খবরটা শুনে চাউবা মেয়ের মুখের দিকে বোকার মতো এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তামাক খাবার কথা যেন ভুলেই গেল। ঠিক সেই মুহূর্তে সারা শরীরের লোম খসে পড়া কঙ্কালসার বুড়ো কুকুরটা কোথেকে উঠোনের মাঝখানে এসে দাঁড়াল। চালের ভাঁড়ার শূন্য হয়ে যাওয়ার সব রাগ কুকুরটার উপর গিয়ে পড়ল। একে দেখে রাগের মাথায় চাউবা যে পিঁড়িটায় বসে ছিল সেটিই তুলে কুকুরটার দিকে ছুঁড়ে মারল। নিরপরাধ কুকুরটার গায়ে অবশ্য তা পড়ল না। কেই বেই আওয়াজ করে রাস্তার দিকে ছুটে পালাল।
চাউবা রাগে গজ গজ করতে করতে হুঁকোটা হাতে নিয়ে ঘরে ঢুকল। ক্ষয় রোগে শয্যাশায়ী ওম্ফার মাও ঠিক তখনই এদিকে পাশ ফেরার সময় চাউবার চোখাচোখি হয়ে গেল। এই কতক্ষণ আগে যে একটা লঙ্কাকাণ্ড ঘটে গেল মনে হয় সে তা কিছুই টের পায়নি। তাই চাউবাকে শুনিয়ে বলে উঠল, ‘মেয়েটা যে বলেছে, চাল নেই- শুনেছ। কী করবে এখন?’

মেয়ে তম্ফা তামাক সাজিয়ে এনে বাবাকে বলল, ‘বাবা, এখন রান্নার চাল নেই? কী করি?’
খবরটা শুনে চাউবা মেয়ের মুখের দিকে বোকার মতো এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তামাক খাবার কথা যেন ভুলেই গেল। ঠিক সেই মুহূর্তে সারা শরীরের লোম খসে পড়া কঙ্কালসার বুড়ো কুকুরটা কোথেকে উঠোনের মাঝখানে এসে দাঁড়াল। চালের ভাঁড়ার শূন্য হয়ে যাওয়ার সব রাগ কুকুরটার উপর গিয়ে পড়ল। একে দেখে রাগের মাথায় চাউবা যে পিঁড়িটায় বসে ছিল সেটিই তুলে কুকুরটার দিকে ছুঁড়ে মারল। নিরপরাধ কুকুরটার গায়ে অবশ্য তা পড়ল না। কেই বেই আওয়াজ করে রাস্তার দিকে ছুটে পালাল।
চাউবা রাগে গজ গজ করতে করতে হুঁকোটা হাতে নিয়ে ঘরে ঢুকল। ক্ষয় রোগে শয্যাশায়ী ওম্ফার মাও ঠিক তখনই এদিকে পাশ ফেরার সময় চাউবার চোখাচোখি হয়ে গেল। এই কতক্ষণ আগে যে একটা লঙ্কাকাণ্ড ঘটে গেল মনে হয় সে তা কিছুই টের পায়নি। তাই চাউবাকে শুনিয়ে বলে উঠল, ‘মেয়েটা যে বলেছে, চাল নেই- শুনেছ। কী করবে এখন?’

নিভে আসা আগুনটা আবার ধপ করে জ্বলে উঠল। ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ আর পারি না একা একা। মানুষকে জ্বালিয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে মর না কেন।’
সে আরও কত কিছু বলে ফেলত। ঠিক তখনই আবার কে যেন তার নাম ধরে ডাকতে লাগল।
কে ডাকছে তা দেখতে চাউবা বাইরে এসে থানিনজাউকে দেখেই তার মুখটা কালো হয়ে গেল। জানতে চাইল, ‘কি ব্যাপার?’
‘আমাদের থাবল্লৈ এসেছে। সারা গাঁয়ে একটা মাছও খুঁজে পেলাম না। শুনলাম তুমি নাকি কয়েকটা ইলিশ মাছ ধরে এনেছ? তাই ছুটে এলাম।’ থানিনজাউ উত্তরে বলল।
‘মাত্র একটিই, ভেতরে এসো, দেখে যাও।’ এ কথা বলে থানিনজাউকে ডেকে এসে চাউবা মাছটা দেখাল।
‘কত নেবে?’ থানিনজাউ জানতে চাইল।
‘চার টাকা। বরাকের ইলিশেরও বেশ স্বাদ, কিন্তু-
‘সাড়ে তিন টাকা দেব।’- বলে থানিনজাউ মাছটা হাতে তুলে নিল।
‘পয়সা কিন্তু এখনই দিতে হবে। চাল কিনতে হবে যে।'
‘ঠিক আছে, ঠিক আছে। পয়সা চাইলে পয়সা, চাল চাইলে চালও নিতে পার।’ একথা বলে মাছটা হাতে নিয়ে থানিনজাউ ঘর থেকে বেরিয়ে এল।
সে উঠোনে এসে দাঁড়াতেই মুক্তা চিৎকার করে উঠল, ‘বাবা, ও বাবা, আমাদের মাছ নিয়ে গেল। মাছ নিয়ে গেল। মাছ নিয়ে গেল।’
‘মাগনা নিচ্ছি না? পয়সা দেব।’ থানিনজাউ একটু বিদ্রুপের সুরে বলল।
ছেলেটা আর কথা বাড়াল না। ছিনিয়ে নিয়ে যাওয়া মাছটার দিকে এক দৃষ্টিতে করুণভাবে তাকিয়ে রইল।
বরাক নদীর তীরে একটি দরিদ্র পরিবারের পিতাপুত্র মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে। নদীর স্রোতে ভেসে ভেসে প্রাণের ঝুকি নিয়ে যে-মাছ ওরা তুলে আনে এর আস্বাদন অবশ্য তাদের ভাগ্যে হয় না। চাওবা এমনই এক দুর্ভাগা জেলে যার জালে ওঠা বিরাট আকারের একটা মাছ দেখে মনে সাদ জাগে বাড়িতে নিয়ে যাবে, অসুস্থ স্ত্রী, সন্তান সন্ততি এবং সন্তান সম্ভবা বিবাহিত কন্যাটিকেও এনে মাছ খাওয়াবে। কিন্তু নদীর ঘাট থেকেই এ মাছের দিকে নানা জনের দৃষ্টি- কেউ কৃপন খদ্দের, কেউ পাওনাদার, কেউ প্রভাবশালী বিত্তবান। সাদা ধপধপে ইলিশটা দেখে শিশুদের উচ্ছ্বাস হঠাৎ করে মিইয়ে যায় একের পর এক ঘটনাপ্রবাহে- ঘরে চাল নেই, অন্যান্য জিনিসও ধারে আনতে হবে তবেই না ইলিশের স্বাদ। মাছের বার্তা অবশ্য ইতিমধ্যেই যথাস্থানে পৌঁছে গেছে। ক্রেতা হিসেবে আসা বিত্তবান থানিনজাউয়ের হাতে অবশেষে শিশুদের চোখের সামনেই মাছটি তুলে দিতে হল সামান্য ক’দানা চাল কিংবা টাকার বিনিময়ে। ইলিশকে কেন্দ্র করে সুখের একটা মুহূর্ত তৈরি হতে না হতেই এ ঘোর বিপত্তি। বরাকের তীরের এ করুণ চিত্র খুব অন্তরঙ্গ ভাবে ফুটে উঠেছে লেখকের বর্ণনায়, যা পাঠকের বুকে বড়ো বেদনার মতো বেজে ওঠে। বারবার কানে ধ্বনিত হয়, ‘বাবা, আমাদের মাছ নিয়ে গেল।’
মণিপুরি ভাষার বিস্তৃতি ‘মণিপুর’ নামে কথিত রাজ্যের সীমানা পেরিয়ে আসামের বরাক উপত্যকা সহ অপরাপর অঞ্চল পর্যন্ত ঘটেছে ঐতিহাসিক কাল থেকেই, এবং মণিপুরের বাইরেও মণিপুরি জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যের এ বিস্তার যে সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটিয়েছে কুঞ্জমোহন সিংহের এ গল্পটিতে এর পরিচয় নিহিত। এ গল্প যেন সমস্ত উত্তরপূর্বাঞ্চলের প্রান্তিকায়িত অন্তেবাসীর মর্মবেদনার প্রকাশ। অনূদিত হয়ে গল্পটি যে-ভাষায় প্রকাশিত হবে এ ভাষা এবং ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর সাহিত্যে তা বিশেষ অবদান রাখতে সক্ষম হবে এতে কোনও দ্বিমত নেই। বরাক নদীর মাঝি আর গঙ্গাপদ্মা সুরমা কিংবা লুইতের মাঝির বুকের ভেতর সঞ্চিত যন্ত্রণা এক হয়ে যায় লেখকের নিপুণ তুলির টানে।
জাহিদ আহমেদ তাপাদার (জন্ম : ১৯৬৯): বরাক উপত্যকার সন্তান। দীর্ঘদিন উত্তর কাছাড়ে সরকারি আধিকারিকের দায়িত্ব পালনের সঙ্গে সঙ্গে ডিমাসা ইতিহাস, ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে গবেষণামূলক কাজ করেছেন। 'ডিমাসা অন্বেষা' (১৯৯৬) ছাড়াও ইংরেজি এবং বাংলায় তিনি উত্তর কাছাড়, ডিমাসা সংস্কৃতি এবং বিভিন্ন জনজাতীয় সংস্কৃতির উপর অনেকগুলো বই লিখেছেন। এর মধ্যে North Cachar Hills : The Paradise on Exploration (2007), ডিমাসা লোককথা (১৯৯৬), ডিমাসা রাজসভাশ্রিত বাংলা সাহিত্য (২০০৪) প্রধান। বর্তমানে গৌহাটিতে আসাম তথ্য ও জনসংযোগ বিভাগে উচ্চ আধিকারিক।
কোন এক সময় এক গ্রামে একজন অলস জুমিয়া বাস করতো। বাড়িতে বসে বসে সে দিন কাটাতো। তার দুটি পোষা প্রাণী ছিল। একটি রোগা কুকুর ও একটি বেশ নাদুসনুদুস শূকরছানা। দুজনের মধ্যে খুব বন্ধুত্ব ছিল। একমাত্র রাত ছাড়া দুজন আলাদা হতো না।
কোন এক সময় এক গ্রামে একজন অলস জুমিয়া বাস করতো। বাড়িতে বসে বসে সে দিন কাটাতো। তার দুটি পোষা প্রাণী ছিল। একটি রোগা কুকুর ও একটি বেশ নাদুসনুদুস শূকরছানা। দুজনের মধ্যে খুব বন্ধুত্ব ছিল। একমাত্র রাত ছাড়া দুজন আলাদা হতো না।
কুকুরটি সবসময় তার প্রভুকে অনুসরণ করে। সারাদিন মালিকের পিছু পিছু ঘোরে আর রাতে সে সামনের বারান্দায় শুয়ে মালিকের ঘর পাহারা দেয়, মাঝেমধ্যেই ঘেউ ঘেউ শব্দ করে। শূকরছানা তখন মালিকের ঘরের পেছনে তার খোঁয়াড়ে হু-হু আওয়াজ তুলে ঘুমোয়।
কুকুরটি সবসময় তার প্রভুকে অনুসরণ করে। সারাদিন মালিকের পিছু পিছু ঘোরে আর রাতে সে সামনের বারান্দায় শুয়ে মালিকের ঘর পাহারা দেয়, মাঝেমধ্যেই ঘেউ ঘেউ শব্দ করে। শূকরছানা তখন মালিকের ঘরের পেছনে তার খোঁয়াড়ে হু-হু আওয়াজ তুলে ঘুমোয়।
এদিকে জুমচাষ অনেক আগেই শুরু হয়েছে। কিন্তু অলস জুমিয়ার ক্ষেত্রে কাজ করার মোটেই ইচ্ছে নেই। সে যে অনেক পরিশ্রম। অনেক ভেবেচিন্তে একদিন বিকেলে জুমিয়া তার কুকুর আর শূকরছানাকে ডেকে পাঠালো। দুজন গুটি গুটি পায়ে প্রভুর সামনে এসে উপস্থিত হল। জুমিয়া বলল- দেখো, জুমচাষের সময়মতো প্রায় শেষ হয়ে এল। তোমরা দুজন কাল সকাল থেকে জুমক্ষেতে গিয়ে মাটিটা তৈরি করবে। দুজনে মিলেই কাজটি করবে। কেউ ফাঁকি দিলে শাস্তি পেতে হবে।
পরদিন ভোরবেলা দুই বন্ধু জুমক্ষেতে গিয়ে উপস্থিত। কুকুর শূকরছানাকে বলল, বন্ধু তুমি কাজ শুরু কর। আমি ততক্ষণ একটু বিশ্রাম করি। পরে তুমি বিশ্রাম নেবে আর আমি কাজ করব। শূকরছানা হাসিমুখে এই প্রস্তাব মেনে নিল। শূকরছানা সারাটা দিন একাই জমিটাতে মই দিল। কুকুরের আর বিশ্রাম শেষ হয় না। শূকরছানা ভাবলো বন্ধু কুকুরের হয়তো বা শরীর খারাপ। তাই সে একবারও কুকুরকে জমি মই দেবার কথা বলল না। কুকুর বড় আরামে গাছের ছায়ায় ঘুমিয়ে কাটাল। বিকেলে ঘরে ফেরার সময় হলে কুকুর শূকরছানাকে সরে আসতে বলল এবং সমস্ত মই দেওয়া জমিতে সে ঘুরে তার পায়ের ছাপ রেখে চলে এল।
বাড়িতে পৌঁছে কুকুরটি মালিকের পা চাটা শুরু করল। মুখ হা করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বারান্দায় লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ল, যেন সে ভীষণ ক্লান্ত। অপরদিকে শূকরছানা সোজা তার খোঁয়াড়ে চলে গেল এবং হু হু শব্দ তুলে খাবার চাইল। মালিক কুকুরকে সামনে পেয়ে জানতে চাইল, আজ কতটুকু কাজ হল? কুকুর দীর্ঘশ্বাস ফেলে জবাব দিল ‘বেশি নয় মালিক। শূকরছানাটি ভীষণ কুঁড়ে। সে কিছুই করতে চায় না। আমি একা কীভাবে এতো কাজ করি।’
প্রতিদিন জুমক্ষেতে একই ব্যাপার ঘটতো। কুকুর বিশ্রাম নিত আর বেচারা শূকরছানা কাজ করতে করতে হাঁপিয়ে উঠতো। কিন্তু মুখে কিছুই বলতো না। অথচ কুকুর বাড়ি ফিরে এসে এমন ভাব করতো যে সে একাই দিনের পর দিন কাজ করে যাচ্ছে। মালিকও কুকুরের কথায় যথারীতি বিশ্বাস করতো।
সপ্তাহখানেক পর মালিক একদিন দুজনকে ডেকে বলল কালকের মধ্যেই জমিতে মই দেবার কাজ শেষ করতে হবে। কারণ জমিতে বীজ বোনার সময় পেরিয়ে যাচ্ছে।
পরদিন কুকুর ও শূকরছানা খুব ভোরে জুম ক্ষেত্রে গেল। সন্ধ্যা পর্যন্ত বিশ্রাম না করে এক নাগাড়ে খেটে শূকরছানা সমস্ত জমিতে মই দেবার কাজ শেষ করল। কুকুর সেদিনও কোনো কাজ করল না। সমস্ত দিন শুয়ে বসে, এদিক ওদিক ঘুরে কাটাল। শূকরছানা যখন কাজ শেষ করলো তখন যথারীতি প্রতিদিনের মতো ভালো করে সমস্ত জমিতে ঘুরে ঘুরে নিজের পায়ের ছাপ রেখে বাড়ি ফিরল। বাড়ি ফিরে কুকুর মালিককে জানাল জমিতে মই দেবার কাজ শেষ। এবার নিশ্চিন্তে বীজ বোনা যাবে।
অলস জুমিয়া এত তাড়াতাড়ি কাজ শেষ হওয়ায় ভীষণ খুশি। জানতে চাইল আজ কে বেশি কাজ করেছে? কুকুর দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধীরে ধীরে বললো- ‘আমি। ছাড়া কাজ আর কেই বা করবে। শূকরছানা তো বরাবরের মতো আজও ঘুমিয়ে কাটালো।’ জুমিয়া বললো- ‘তার মানে শূকরছানা আজও কোনো কাজ করেনি। কিন্তু কী প্রমাণ আছে যে তুমিই সব কাজ করেছ?’
বুদ্ধিমান কুকুর তো সে ব্যবস্থা আগেই করে রেখেছে। তাই বলল- আপনি খুব সহজেই সেটা বুঝতে পারবেন। যে কাজ করেছে সমস্ত মাঠ জুড়ে তো তারই পায়ের চিহ্ন পাওয়া যাবে।
জুমিয়া চিন্তা করে দেখল কুকুরের কথা ঠিক। তবে সে ঠিক করল একবার নিজেই সবকিছু দেখে আসা ভালো। তারপর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত যাবে। তাই কুকুরকে বললো- খুব ভালো কথা। আমি কাল সবকিছু নিজে দেখে আসব। আর তোমাদের দুজনের মধ্যে যেই দোষী হওনা কেন, তাকে অবশ্যই আমি শাস্তি দেব। সে কথা মনে রেখো। এই বলে কুকুরের গলায় শেকল দিয়ে দরজার পাশে ভালো করে বেঁধে রেখে জুমিয়া বিশ্রাম নিতে গেল।
পরদিন ভোরবেলা অলস জুমিয়া ক্ষেত দেখতে গেল। সমস্ত মই দেওয়া জমি দেখে তার বেশ আনন্দ হল। এতো সুন্দর মই দেওয়া হয়েছে যে জমিতে ফসল খুব ভালো হবে, মনে মনে ভাবল। কিন্তু সমস্ত জমিতে কোথাও শূকরছানার পায়ের কোনো ছাপই তার চোখে পড়ল না। সব জাগায়ই কুকুরের পায়ের ছাপ রয়েছে। অর্থাৎ কুকুরই সব কাজ একা করেছে। কুকুরের প্রভুভক্তিতে জুমিয়ার মন ভরে উঠল। একই সঙ্গে শূকরছানার উপর জুমিয়া ভীষণ রেগে গেল। দিনের পর দিন শুধু বসে বসে খাবার গিলছে আর কাজের বেলা ফাঁকিবাজ। নাহ। শূকরছানাকে অবশ্যই শাস্তি দিতে হবে এই ভেবে জুমিয়া বাড়ি ফিরে এল।
রাগে গজগজ করতে জুমিয়া শূকরছানার মাথা লম্বা দা দিয়ে দু-টুকরো করে ফেললো। কুকুর জুমিয়ার চারপাশে ঘুর ঘুর করতে লাগলো। রান্না শেষে দু-জান মিলে অতি আনন্দে শূকরছানার মাংস দিয়ে রাতের ভোজনপর্ব শেষ করল।
আসামের অন্যতম প্রাচীন জনগোষ্ঠী ডিমাসাদের লোকসাহিত্য ও লোককথার ঐতিহ্য থাকলেও আধুনিক পর্বে ডিমাসা কাব্য, সাহিত্য এখনও আঞ্চলিক এবং জাতীয় স্তরে পরিচিতি লাভ করেনি। রবীন্দ্রনাথ, কাজি নজরুল ইসলামের কবিতা ও গান বাংলা থেকে ডিমাসা ভাষার অনূদিত হয়েছে, অষ্টাদশ ঊনবিংশ শতকে মাইবং এবং খাসপুর কেন্দ্রিক ডিমাসা রাজসভায় বাংলা কাব্য, সংগীত এবং বাংলা গদ্যের বিকাশ ঘটেছে মহারাজ সুরদর্প নারায়ণ থেকে মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র, গোবিন্দ্রচন্দ্রের পৃষ্ঠপোষকতায়। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে ডিমাসা ভাষার সেরকম বিকাশ আমরা দেখিনি; যা হয়েছে অনুবাদের মাধ্যমে তাও আমাদের কাছে এসে পৌঁছোয়নি। মণিচরণ বর্মন, নিরূপমা হাগজের, যতীন্দ্রলাল থাউসেন, ঐতিহাসিক নলিনেন্দ্রকুমার বর্মন এদের ডিমাসা ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস নিয়ে বাংলা ও ইংরেজিতে রচনার সঙ্গে আমাদের পরিচিতি ঘটলেও ডিমাসা সৃজনশীল সাহিত্য আমাদের কাছে এখনও অধরা রয়ে গেছে। তবে তুষারকান্তি নাথ, তন্ময় ভট্টাচার্য এবং জাহিদ আহমেদ তপাদারের প্রয়াসে ডিমাসা লোককথা ও সামাজিক ইতিহাস, সংস্কার ও সংস্কৃতি সম্পর্কে আমরা অনেক কিছু জেনেছি। বর্তমান পাঠক্রমে অন্তর্ভুক্ত অলস জুমিয়া (জুমচাষী, Shifting cultivator) এবং তাঁর দুই পালিত প্রাণীর গল্প ‘নামাই’ এদিকে আরও আগ্রহ সৃষ্টি করবে নিশ্চয়।
লোককথা, ইংরেজিতে যাকে বলে Folk tale এসব কোন লিখিত বয়ান নয়। লোকমুখে, স্মৃতিবাহিত হয়ে (Oral tradition-এ) প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এর বিস্তার। পশু-পক্ষীদের নিয়ে এসব কাহিনী সর্বত্রই বিশেষ জনপ্রিয়। ডিমা হাসাও থেকে সংগৃহীত রোগা কুকুর এবং নাদুসনুদুস শূকরছানার এ কাহিনীর সঙ্গে দেশবিদেশের অপরাপর স্থানে প্রচলিত কাহিনীর মিল ডিমাসা সংস্কৃতির একটি গৌরবজনক পরম্পরার সাক্ষ্য বহন করে। রূপকের মাধ্যম কথিত এ গল্পে মনুষ্য জীবনের কথাই বলা হয়েছে। পশুরা এখানে উপলক্ষ মাত্র।