rotateআপনার মুঠোফোনটি ল্যান্ডস্কেপে রাখুন।
পাঠ্যপুস্তক ৪র্থ পত্র - অধ্যায় : পাঁচ
বাংলা ভাষা ডিপ্লোমা পাঠক্রম
পাঠ্যপুস্তক
(চতুর্থ পত্র : অধ্যায়-পাঁচ : নাট্য সাহিত্য)
দ্বিতীয় ষাণ্মাসিক - চতুর্থ পত্র
বাংলা সাহিত্যের পাঠকৃতি :
গদ্য ও পদ্য সংকলন
বাংলা সাহিত্যের পাঠকৃতি :
গদ্য ও পদ্য সংকলন
চতুর্থ পত্র   ❐   অধ্যায় -  পাঁচ
নাট্য সাহিত্য
নাট্য সাহিত্য
নাটক
সাজাহান
দ্বিজেন্দ্রলাল রায়
৫.০   প্রস্তাবনা ও উদ্দেশ্য

এ নাট্য দৃশ্যাংশ পাঠে আপনি -

  • বাংলা নাট্য সাহিত্যের জনপ্রিয় নাট্যকার দ্বিজেন্দ্রলাল রায় এবং তাঁর নাট্যকৃতির পরিচয় পাবেন।
  • মুঘল সম্রাট সাজাহানের পিতৃহৃদয়ের অন্তরঙ্গ দিক সম্পর্কে অবহিত হবেন।
  • মুঘল রাজপুত্র দারা শিকোর দার্শনিক সত্তার পরিচয় লাভ করবেন।
  • মুঘল রাজপ্রাসাদ চক্রান্ত এবং এতে রাজকন্যা, রাজবধূ এবং শিশুপুত্রদের বিপন্নতার একটি চিত্রও পাবেন।
৫.১   লেখক পরিচিতি

দ্বিজেন্দ্রলাল রায় (১৮৬৩ - ১৯১৩): একাধারে কবি, গীতিকার, সুরকার এবং নাট্যকার। পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগরে ১৮৬৩ সালে তাঁর জন্ম। পিতার নাম কার্তিকেয় চন্দ্র রায়। তাঁর মাতা প্রসন্নময়ী দেবী ছিলেন শান্তিপুরের অদ্বৈত ঠাকুরের বংশধর। বাল্যকাল থেকেই দ্বিজেন্দ্রলাল সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ মানুষ হয়েছেন।।

তিনি ১৮৭৬ সালে কৃষ্ণনগর কলেজিয়েট স্কুল থেকে এনট্রান্স পরীক্ষায় এবং ১৮৮৩ সালে হুগলি কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে বি.এ পরে ১৮৮৪ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম. এ. পরীক্ষায় দ্বিতীয় শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করেন।

দ্বিজেন্দ্রলাল রায় ঐতিহাসিক, পৌরণিক পারিবারিক ও সামাজিক সব ধরনের নাটকই লিখেছিলেন। তবে ঐতিহাসিক নাটক রচনায় তার কৃতিত্ব সর্বাধিক। তাঁর ‘সাজাহান’, ‘মেবার পতন’, ‘চন্দ্রগুপ্ত’, ‘দুর্গাদাস’, এবং ‘রাণা প্রতাপ’ নাটক বিশেষভাবে উল্লেখ্যযোগ্য। তাঁর নাটকের সংখ্যা মোট ১৪ টি। তাঁর আলোচ্য নাট্যাংশটি ‘সাজাহান’ থেকে গ্রহণ করা হয়েছে।

দ্বিজেন্দ্রলাল রায় (১৮৬৩ - ১৯১৩): একাধারে কবি, গীতিকার, সুরকার এবং নাট্যকার। পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগরে ১৮৬৩ সালে তাঁর জন্ম। পিতার নাম কার্তিকেয় চন্দ্র রায়। তাঁর মাতা প্রসন্নময়ী দেবী ছিলেন শান্তিপুরের অদ্বৈত ঠাকুরের বংশধর। বাল্যকাল থেকেই দ্বিজেন্দ্রলাল সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ মানুষ হয়েছেন।

তিনি ১৮৭৬ সালে কৃষ্ণনগর কলেজিয়েট স্কুল থেকে এনট্রান্স পরীক্ষায় এবং ১৮৮৩ সালে হুগলি কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে বি.এ পরে ১৮৮৪ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম. এ. পরীক্ষায় দ্বিতীয় শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করেন।

দ্বিজেন্দ্রলাল রায় ঐতিহাসিক, পৌরণিক পারিবারিক ও সামাজিক সব ধরনের নাটকই লিখেছিলেন। তবে ঐতিহাসিক নাটক রচনায় তার কৃতিত্ব সর্বাধিক। তাঁর ‘সাজাহান’, ‘মেবার পতন’, ‘চন্দ্রগুপ্ত’, ‘দুর্গাদাস’, এবং ‘রাণা প্রতাপ’ নাটক বিশেষভাবে উল্লেখ্যযোগ্য। তাঁর নাটকের সংখ্যা মোট ১৪ টি। তাঁর আলোচ্য নাট্যাংশটি ‘সাজাহান’ থেকে গ্রহণ করা হয়েছে।

৫.২   মূলপাঠ
নাটক
সাজাহান
দ্বিজেন্দ্রলাল রায়
প্রথম অঙ্ক, প্রথম দৃশ্য

স্থান — আগ্রার দুর্গপ্রাসাদ, সাজাহানের কক্ষ। কাল অপরাহ্ন।

সাজাহান শয্যার উপর অর্ধশায়িত অবস্থায় কর্ণমূল করতলে ন্যস্ত করিয়া অধোমুখে ভাবিতেছিলেন ও মধ্যে মধ্যে একটি আলবোলা টানিতেছিলেন। সম্মুখে দারা দণ্ডায়মান

সাজাহান
:
তাই ত !  এ বড় দুঃসংবাদ দারা !
দারা
:
সুজা বঙ্গদেশে বিদ্রোহ করেছে বটে কিন্তু সে এখনও সম্রাট নাম নেয়নি; কিন্তু মোরাদ, গুর্জরে সম্রাট নাম নিয়ে বসেছে, আর দাক্ষিণাত্য থেকে ঔরঙ্গজিব তার সঙ্গে যোগ দিয়েছে ।
সাজাহান
:
ঔরঙ্গজিব তার সঙ্গে যোগ দিয়েছে- দেখি, ভেবে দেখি- এরকম কখনও ভাবিনি, অভ্যস্ত নই, তাই ঠিক ধারণা করতে পারছি না- তাই ত ! (ধুমপান)
দারা
:
সুজা বঙ্গদেশে বিদ্রোহ করেছে বটে কিন্তু সে এখনও সম্রাট নাম নেয়নি; কিন্তু মোরাদ, গুর্জরে সম্রাট নাম নিয়ে বসেছে, আর দাক্ষিণাত্য থেকে ঔরঙ্গজিব তার সঙ্গে যোগ দিয়েছে ।
সাজাহান
:
ঔরঙ্গজিব তার সঙ্গে যোগ দিয়েছে- দেখি, ভেবে দেখি- এরকম কখনও ভাবিনি, অভ্যস্ত নই, তাই ঠিক ধারণা করতে পারছি না- তাই ত ! (ধুমপান)
দারা
:
আমি কিছু বুঝতে পারছি না।
সাজাহান
:
আমিও পারছি না। (ধূমপান)
দারা
:
আমি এলাহাবাদে আমার পুত্র সোলেমানকে সুজার বিরুদ্ধে যাত্রা করবার জন্য লিখছি, আর তার সঙ্গে বিকানিরের মহারাজ জয়সিং আর সৈন্যাধ্যক্ষ দিলির খাঁকে পাঠাচ্ছি।
(সাজাহান আনতচক্ষে ধূমপান করিতে লাগিলেন)
দারা
:
আর মোরাদের বিরুদ্ধে আমি মহারাজ যশোবন্ত সিংহকে পাঠাচ্ছি।
সাজাহান
:
পাঠাচ্ছ ! তাই ত ! (ধূমপান)
দারা
:
পিতা, আপনি চিন্তিত হবেন না । এ বিদ্রোহ দমন করতে আমি জানি ।
সাজাহান
:
না, আমি তার জন্য ভাবছি না দারা; তবে এই ভাইয়ে ভাইয়ে যুদ্ধ - তাই ভাবছি (ধুমপান; পরে সহসা) না- দারা কাজ নেই। আমি তাদের বুঝিয়ে বলবো। কাজ নেই। তাদের নির্বিরোধে রাজধানীতে আসতে দাও ।
(বেগে জাহানারার প্রবেশ)
জাহানারা
:
কখনও না। এ হ’তে পারে না পিতা। প্রজা রাজার উপর খড়্গ তুলেছে, সে খড়্গ তার নিজের স্কন্ধে পড়ুক।
সাজাহান
:
সে কি জাহানারা। তারা আমার পুত্র।
জাহানারা
:
হোক পুত্র। কী যায় আসে? পুত্র কি কেবল পিতার স্নেহের অধিকারী? পুত্রকে পিতার শাসনও করতে হবে।
সাজাহান
:
আমার হৃদয় এক শাসন জানে। সে শুধু স্নেহের শাসন। বেচারী মাতৃহারা পুত্রকন্যারা আমার। তাদের শাসন করবো কোন প্রাণে জাহানারা। ঐ চেয়ে দেখ- ঐ স্ফটিকে গঠিত (দীর্ঘনিশ্বাস) - ঐ তাজমহলের দিকে চেয়ে দেখ তারপর বলিস তাদের শাসন কর্তে।
জাহানারা
:
পিতা, এই কি আপনার উপযুক্ত কথা। এই দৌর্বল্য কি ভারতসম্রাট সাজাহানকে সাজে! সাম্রাজ্য কি অন্তঃপুর! একটা ছেলেখেলা! একটা প্রকাণ্ড শাসনের ভার আপনার উপর। প্রজা বিদ্রোহী হ’লে সম্রাট কি তাকে পুত্র বলে ক্ষমা করবেন? স্নেহ কি কর্তব্যকে ছাপিয়ে উঠবে?
সাজাহান
:
তর্ক করিস্ না জাহানারা। আমার কোন যুক্তি নাই। আমার কেবল এক যুক্তি আছে। সে স্নেহ। আমি শুধু ভাবছি দারা যে, এ যুদ্ধে যে পক্ষেরই পরাজয় হয়, আমার সমান ক্ষতি। এ যুদ্ধে তুমি পরাজিত হ’লে আমায় তোমার ম্লান-মুখখানি দেখতে হবে; আবার তা'রা পরাজিত হ'য়ে ফিরে গেলে তাদের স্নান-মুখ কল্পনা করতে হবে। কাজ নেই দারা। তা’রা রাজধানীতে আসুক, আমি তাদের বুঝিয়ে বলবো।
দারা
:
পিতা, তবে তাই হোক।
জাহানারা
:
দারা, তুমি কি এইরকম করে তোমার বৃদ্ধ পিতার প্রতিনিধির কাজ করবে। পিতা যদি স্বয়ং শাসনক্ষম হতেন, তা হলে তোমার হাতে তিনি রাজ্যের রশি ছেড়ে দিতেন না। এই উদ্ধত সুজা, স্বকল্পিত সম্রাট মোরাদ, আর তার সহকারী ঔরঙ্গজিব বিদ্রোহের নিশান উড়িয়ে ডঙ্কা বাজিয়ে আগ্রায় প্রবেশ করবে, আর তুমি পিতার প্রতিনিধি হ'য়ে তাই সহাস্যমুখে দাঁড়িয়ে দেখবে?- উত্তম।
দারা
:
সত্য পিতা, এ কি হতে পারে? আমায় আজ্ঞা দিন পিতা।
সাজাহান
:
ঈশ্বর। পিতাদের এই বুকভরা স্নেহ দিয়েছিলে কেন? কেন তাদের হৃদয়কে লৌহ দিয়ে গড়নি?- ওঃ।
দারা
:
ভাববেন না পিতা, যে, আমি এ সিংহাসনের প্রত্যাশী। তার জন্য যুদ্ধ নয়। আমি সাম্রাজ্য চাই না। আমি দর্শনে উপনিষদে এর চেয়ে বড় সাম্রাজ্য পেয়েছি। আমি যাচ্ছি আপনার সিংহাসন রক্ষা করতে।
জাহানারা
:
তুমি যাচ্ছ ন্যায়ের সিংহাসন রক্ষা করতে, দুষ্কৃতকে শাসন করতে, এই দেশের কোটি নিরীহ প্রজাদের অরাজক অত্যাচারের গ্রাস থেকে বাঁচাতে। যদি রাজ্যে এই দুষ্পবৃত্তি শৃঙ্খলিত না হয়, তবে এ মোগল সাম্রাজ্যের পরমায়ু আর কয় দিন?
দারা
:
পিতা, আমি প্রতিজ্ঞা করছি, ভাইদের কাউকে পীড়ন বা বধ করব না, তাদের বেঁধে পিতার পদতলে এনে দেব। পিতা তখন তা'দের ইচ্ছা হয়, ক্ষমা করবেন। তাঁরা জানুক, সম্রাট সাজাহান স্নেহশীল - কিন্তু দুর্বল নয়।
সাজাহান
:
(উঠিয়া) তবে তাই হোক। তাঁরা জানুক যে, সাজাহান শুধু পিতা নয় সাজাহান সম্রাট। যাও দারা! নাও এই পাঞ্জা। আমি আমার সমস্ত ক্ষমতা তোমায় দিলাম। বিদ্রোহীর শাস্তি বিধান কর। (পাঞ্জা প্রদান)
দারা
:
যে আজ্ঞা পিতা।
সাজাহান
:
কিন্তু এ শাস্তি তাদের একার নয়। এ শাস্তি আমারও। পিতা যখন পুত্রকে শাসন করে- পুত্র ভাবে যে পিতা কি নিষ্ঠুর। সে জানে না যে, পিতার উদ্যত বেত্রের অর্ধেকখানি পড়ে সেই পিতারই পৃষ্ঠে।
(প্রস্থান)
জাহানারা
:
তা’দের এই হঠাৎ বিদ্রোহের কারণ কিছু অনুমান করছো দারা?
দারা
:
তা’রা বলে যে, পিতা রুগ্ন এ কথা মিথ্যা; পিতা মৃত আর আমি নিজেরই আজ্ঞায় তাঁর নামে চালাচ্ছি।
জাহানারা
:
তা’তে অপরাধ কী হয়েছে? তুমি সম্রাটের জ্যেষ্ঠ পুত্র-ভাবী সম্রাট।
দারা
:
তা’রা আমাকে সম্রাট বলে মানতে চায় না।
(সিপারের সহিত নাদিয়ার প্রবেশ)
সিপার
:
তা’রা তোমার হুকুম মানতে চায় না বাবা?
জাহানারা
:
দেখ ত আস্পর্ধা! (হাস্য)
দারা
:
কি নাদিরা, তুমি অধোমুখে যে? যেন কিছু বলবে!
নাদিরা
:
শুনবে প্রভু? আমার একটা অনুরোধ রাখবে!
দারা
:
তোমার কোন্ অনুরোধ কবে না রেখেছি নাদিরা!
নাদিরা
:
তা জানি। তাই বলতে সাহস করছি। আমি বলি- তুমি এ যুদ্ধ থেকে বিরত হও।
জাহানারা
:
সে কি নাদিরা!
নাদিরা
:
দিদি-
দারা
:
কী! বলতে বলতে চুপ করলে যে ! কেন তুমি এ অনুরোধ করছ নাদিরা!
নাদিরা
:
কাল রাত্রে আমি একটা দুঃস্বপ্ন দেখেছি।
দারা
:
কী দুঃস্বপ্ন?
নাদিরা
:
আমি এখন তা বলতে পারব না। সে ভয়ানক! না নাথ! এ যুদ্ধে কাজ নেই-
দারা
:
সে কি নাদিরা!
জাহানারা
:
নাদিরা, তুমি পরভেজের কন্যা না? একটা যুদ্ধের ভয়ে এই অশ্রু, এই শঙ্কাকুল দৃষ্টি, এই ভয়বিহ্বল উক্তি তোমার শোভা পায় না।
নাদিরা
:
দিদি, যদি জানতে যে সে কি দুঃস্বপ্ন। সে বড় ভয়ানক।
জাহানারা
:
দারা, এ কি! তুমি ভাবছো! এত তরল তুমি! এত স্ত্রৈণ! পিতার সম্মতি পেয়ে এখন স্ত্রীর সম্মতি নিতে হবে না কি! মনে রেখো দারা, কঠোর কর্তব্য সম্মুখে! আর ভাববার সময় নাই।
দারা
:
সত্য নাদিরা! এ যুদ্ধ অনিবার্য, আমি যাই। যথাযত আজ্ঞা দেই গে যাই!
(প্রস্থান)
নাদিরা
:
এত নিষ্ঠুর তুমি দিদি- এসো সিপার-
(সিপারের সহিত নাদিরার প্রস্থান)
জাহানারা
:
এত ভয়াকুল! কি কারণ বুঝি না।
(সাজাহানের পুনঃপ্রবেশ)
সাজাহান
:
দারা গিয়েছে জাহানারা?
জাহানারা
:
হ্যাঁ বাবা।
সাজাহান
:
(ক্ষণিক নিস্তব্ধ থাকিয়া) জাহানারা-
জাহানারা
:
কী বাবা!
সাজাহান
:
তুইও এর মধ্যে?
জাহানারা
:
কিসের মধ্যে?
সাজাহান
:
এই ভ্রাতৃদ্বন্দ্বের?
জাহানারা
:
না বাবা-
সাজাহান
:
শোন্ জাহানারা। এ বড় নির্মম কাজ। কি করব- আজ তার প্রয়োজন হয়েছে। উপায় নাই। কিন্তু তুইও এর মধ্যে যাস্ নে। তো'র কাজ স্নেহ- ভক্তি- অনুকম্পা। এ আবর্জনায় তুইও নামিস্ নে। তুই অন্ততঃ পবিত্র থাক্।
৫.৩   পাঠসূত্র

ভারত সম্রাট সাজাহান বৃদ্ধ। তিনি পক্ষাঘাতে আক্রান্ত। আগ্রার রাজপ্রাসাদে একমাত্র কন্যা জাহানারার তত্ত্বাবধানাধীন। তাঁর চারপুত্র দারা, সুজা, মোরাদ ও ঔরঙ্গজিব। দারা জ্যেষ্ঠ পুত্র। পিতার নাম রাজ্যে পরিচালনা করেছেন তিনি। সম্রাটের দ্বিতীয় পুত্র সুজা বাংলার নবাব কিন্তু উদ্ধত স্বভাবের মানুষ। তৃতীয় পুত্র নিজে স্বকল্পিত সম্রাট। কনিষ্ঠ পুত্র ঔরঙ্গজিব মোরাদের সহকারী হয়ে আগ্রায় প্রবেশ করার সুযোগ সন্ধানে তৎপর। হঠাৎ সম্রাটের ভিত্তিহীন মৃত্যু সংবাদ ভারতের চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ায়, দারা জ্যেষ্ঠ পুত্র ভারত-সম্রাট হবে ভেবে সুজা, মোরাদ, এবং ঔরঙ্গজিব দারার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়। সকলে একই সঙ্গে যুদ্ধ ঘোষণা করে। খবরটি দারার কাছে পৌঁছলে দারা বিদ্রোহী ভ্রাতাদের সমুচিত শাস্তি দেবার জন্য কৃতসংকল্প হন। ভগ্নী জাহানারাকে দারার পক্ষে মতপোষণ করায় সম্রাট সাজাহান মেয়েকে এ ব্যাপারে চুপ থাকতে বলেন। জাহানারা এতে রাজি নন।

এ কাজে অথর্ব পিতা সাজাহান প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেন। তাঁর ধারণা পরিণত বয়স্ক পুত্রেরা তাঁর নিকট অল্প-বয়স্ক নির্বোধ শিশু মাত্র। তিনি চান তাঁর পুত্রদের আগ্রায় এনে মৃদু ভর্ৎসনায় সম্রাট বিরোধী কার্যকলাপ থেকে নিবৃত্ত করবেন, কারণ তিনি এখনও জীবিত আছেন।

সম্রাট দারার প্রতি স্নেহশীল হলেও অন্যান্য পুত্রদের প্রতিও তাঁর একই পরিমাণ স্নেহ-মমতা-মায়া আছে। রাজার নির্দেশ দারা যেন তাঁর ভাইদের প্রতি খড়্গহস্ত না হন। নিরুৎসাহ দারা পিতার প্রতি শ্রদ্ধাবশত তাঁর বাক্য লঙ্ঘন করতে পারেন না। কন্যা জাহানারা এমতাবস্থায় পিতার নিকট জানতে চায় যে এটা কি সম্রাট সাজাহানের উপযুক্ত কথা? এ দৌর্বল্য কি তাঁর সাজে? পিতা জানান যে তারা তাঁর পুত্র, তিনি শুধু জানেন স্নেহের শাসন। মাতৃহারা সন্তানেরা সম্রাটের হৃদয়ের এক শাসনই জানবে। তাঁর কাছে স্নেহ ছাড়া আর কোনও যুক্তি নেই। দারার স্ত্রী নাদিরা দারাকে শুধু একটি অনুরোধ জানায় যে এই যুদ্ধ আর নয়। দারা শেষবার জানায় যে এ যুদ্ধ অনিবার্য। তিনি সৈন্যদের যুদ্ধে যাবার আজ্ঞা দিতে চান। সম্রাট সাজাহান জাহানারাকে জানান যে সে যেন এ আবর্জনায় পা না দেয়। অন্তত সে পবিত্র থাকুক।

৫.৪   বিশেষ পাঠ

রঙ্গমঞ্চে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘সাজাহান’ একটি জনপ্রিয় নাটক। আসলে এ মুঘল সম্রাট স্থাপত্য ভাস্কর্য শিল্পে দেশে যে অবদান রেখেছেন তা আমাদের নন্দন ভাবনাকে সততই উজ্জীবিত রাখছে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ একটি দীর্ঘ কবিতায় এ সম্রাটকে অমর করে রেখেছেন। ফার্সি কবি ফিরদৌস তাজমহলের সৌন্দর্য দেখে দুটো অমর কলি উপহার রেখে গেছেন- ‘স্বর্গ যদি থাকে কোথাও ধরার মাঝে, এইখানে তা, এইখানে তা, এইখানে তা রাজে’। দিল্লিশ্বরের রাজনৈতিক কার্যকলাপের চেয়ে তাঁর সৌন্দর্যচেতনা বিশ্ববাসীর কৌতূহলের বিষয় হয়ে রয়েছে। এ নাটকে সম্রাটের মানবিক সত্তা, পিতৃহৃদয়ের অন্তদ্বন্দ্বের প্রকাশই মুখ্য। নির্বাচিত পাঠ্যাংশে কেবল ওই দিকই প্রতিফলিত হয়েছে। এখানে দিল্লির সিংহাসনকে কেন্দ্র করে যে একটি ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধের সূচনা হচ্ছে এবং জ্যেষ্ঠপুত্র দারা যে এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্বিধাগ্রস্থ, স্বয়ং সম্রাট নিজেও দ্বিধাগ্রস্থ- এ থেকেই নাট্যমুহূর্ত তৈরি হয়েছে। নাটকের পরিভাষায় যাকে বলে Exposition - এটা প্রথম অঙ্কের প্রথম দৃশ্যে সঠিকভাবেই সংঘটিত হয়েছে। পাঠকদের বা দর্শকদের মনে আগামী পর্বে কী হতে চলেছে এ নিয়ে কৌতূহল তৈরি হয়ে গেছে, যে কৌতূহল পরবর্তী দুইঘণ্টা দর্শকদের আসনে স্থির হয়ে বসে থাকতে বাধ্য করবে নিশ্চিত।

অনুশীলন
 ১।
অতি সংক্ষিপ্ত উত্তর দিন -
  
 ক)
সাজাহান নাটকের নাট্যকার কে?
  
 খ)
সম্রাটের জ্যেষ্ঠ পুত্রের নাম কী?
  
 গ)
সুজা কোথাকার নবাব ছিলেন?
  
 ঘ)
নাটকে স্বকল্পিত রাজাটি কে?
  
 ঙ)
যশোবন্ত সিংহ কে ছিলেন?
  
 চ)
জাহানারা কে?
  
 ছ)
দারার পুত্রের নাম কী?
  
 জ)
মোরাদ কোথায় রাজত্ব করতেন?
  
 ঝ)
দিলির খাঁ কে?
 ২।
সংক্ষিপ্ত উত্তর দিন -
  
 ক)
জাহানারা কে? তার পরিচয় দিন।
  
 খ)
‘আমি যাচ্ছি আপনার সিংহাসন রক্ষা কর্তে’ উক্তিটি কার? কখন কাকে লক্ষ্য করে বলা হয়েছে, এর কারণ কী?
  
 গ)
‘কিন্তু তুইও এর মধ্যে যাসনে’ উক্তিটি কার? কখন কাকে, কেন করা হয়েছে? তাঁর প্রকৃত কাজ কী হওয়া উচিত ছিল?
  
 ঘ)
‘সাজাহান শুধু পিতা নয়- সম্রাট।’ কথাটির তাৎপর্য লিখুন।
  
 ঙ)
এ পাঠটি কোন্ নাটকের কোন্ অঙ্কের কোন দৃশ্য থেকে গ্রহণ করা হয়েছে?
 ৩।
রচনাধর্মী উত্তর লিখুন -
  
 ক)
সাজাহানের পিতৃস্নেহের যথাযথ বর্ণনা দিন।
  
 খ)
দারার চরিত্র বর্ণনা করুন।
 ৪।
বিশেষ পাঠ -
  
 ক)
তাজমহল সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ এবং নজরুল ইসলাম যে উজ্জ্বল কয়েকটি পঙক্তি লিখেছেন সেগুলো সংগ্রহ করুন।
  
 খ)
প্রথম দৃশ্যটিতে মঞ্চসজ্জায় কী কী উপাদান লাগবে এগুলোর একটা তালিকা দিন।
  
 গ)
সাজাহান, দারা এবং জাহানারার পোশাক কী হবে লিখুন।

চতুর্থ পত্র
অধ্যায় - পাঁচ
নাট্য সাহিত্য