rotateআপনার মুঠোফোনটি ল্যান্ডস্কেপে রাখুন।
নীড়   গ্রন্থাগার  বঙ্গভবন গ্রন্থাগারের স্বকীয়তাি
বঙ্গভবন গ্রন্থাগারের স্বকীয়তা
ড৽ পরিতোষ চন্দ্র দত্ত
প্রথম প্রকাশ : সাময়িক প্রসঙ্গ, শিলচর, রবিবার ১১ জুন ২০২৩ খ্রি৽
অষ্টাদশ শতকের জার্মান ভাববাদী দার্শনিক ও বিজ্ঞানী ইমানুয়েল কান্ট বলেছিলেন, ‘এটি পুরোপুরি নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে যে আমদের সমস্ত জ্ঞান অভিজ্ঞতা দিয়ে শুরু হয়’৷ কান্টের মতে, জ্ঞানের উৎপত্তির ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা ও বুদ্ধি দুইয়েরই প্রয়োজন আছে। উভয় মতবাদই আংশিক সত্য, কিন্তু কোনটাই সম্পূর্ণ দোষমুক্ত নয়। কান্ট নিরপেক্ষভাবে ইন্দ্রিয়ানুভব ও বুদ্ধির সামর্থ্য, জ্ঞানের শর্ত, সীমা ও সম্ভাবনা ইত্যাদি সম্পর্কে আলোচনা করে অভিজ্ঞতা ও বুদ্ধির সমন্বয়ে জ্ঞানের উৎপত্তির কথা বলেছেন ৷ কান্টের অভিমত অনুযায়ী জ্ঞানের দুটো দিক রয়েছে, উপাদান এবং আকার৷ অভিজ্ঞতার মাধ্যমে পাওয়া যায় জ্ঞানের উপাদান আর বুদ্ধির মাধ্যমে পাওয়া যায় জ্ঞানের আকার৷ আবার প্রকৃত জ্ঞানের দুটো বৈশিষ্ট রয়েছে, অনিবার্যতা ও নতুনত্ব৷ বিজ্ঞানী কান্টের মতে এই দুটোর একটির অনুপস্থিতিতে প্রকৃত জ্ঞান অসম্ভব৷ তবে এটাও সত্য যে বুদ্ধির জাগরণ বই অধ্যয়ন ছাড়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তাহলে এটা বললে নিশ্চয়ই অত্যুক্তি হবে না যে বই হচ্ছে জ্ঞানের উৎস৷ আর বইয়ের বিভিন্ন উৎস থাকলেও এই নিবন্ধে গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে গ্রন্থাগার বা লাইব্রেরির গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে এবং লাইব্রেরির নানারকম প্রকারভেদ থাকলেও প্রতিষ্ঠানিকভাবে আকাডেমিক গ্রন্থাগার হিসেবে বরাক উপত্যকা বঙ্গ সাহিত্যও সংস্কৃতি সম্মেলনের কাছাড় জেলার তত্ত্বাবধানে থাকা বঙ্গভবনের গ্রন্থাগার নিয়েই কিছু কথা বলার চেষ্টা করা হবে৷ লাইব্রেরী আমাদের সভ্যতার আর্দশটি অক্ষুন্ন রেখে আমাদের আলোক অভিসারী করে তুলতে পারে। তবে এপ্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে প্রাসঙ্গিক কিছু আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে৷
image2
আমেরিকান লেখক মাইকেল এমব্রি তাঁর অভিজ্ঞতায় লিখেছেন, ধন সম্পদ খুজতে আমাকে খুব দূরে যেতে হয় না, প্রতিদিন যখন আমি লাইব্রেরিতে যাই তখন আমি সেখানে অনন্য সব ধন খুজে পাই। আরিফুল হক আবির তাঁর এক নিবন্ধে আলোচনা করতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন, শিক্ষার প্রসারের জন্য এবং স্বশিক্ষিত হওয়ার জন্য গ্রন্থাগারের প্রয়োজন হাসপাতালের চাইতে কম নয় ৷ গ্রন্থাগারের বিশাল সংগ্রহশালায় নিজের রুচি ও মনের চাহিদা অনুযায়ী গ্রন্থ পাওয়া যায়। এই কারণে জ্ঞানার্জনের জন্য গ্রন্থাগার ব্যবহার অত্যন্ত প্রয়োজন। শিক্ষার বর্তমান অবস্থায় লাইব্রেরি হচ্ছে একপ্রকার মনের হাসপাতাল। এখানে লোক স্বেচ্ছায় স্বাচ্ছন্দ্য চিত্তে স্বশিক্ষিত হবার সুযোগ পায়। নিজের শক্তি ও রুচি অনুসারে নিজের মনকে নিজের চেষ্টায় আত্মার রাজ্যে জ্ঞানের পথে এগিয়ে নিয়ে উদ্বুদ্ধ হয়। একাডেমিক গ্রন্থাগার স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের পাঠ ও গবেষণা প্রয়োজন মেটানোর উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়। এসব গ্রন্থাগারে কেবল পাঠ্য ও পাঠ্য সহায়ক উপকরণই থাকে না, পাশাপাশি বিভিন্ন রেফারেন্স সামগ্রীসহ বিভিন্ন বিষয়ের তথ্য উপকরণও সংগ্রহীত হয়। বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারের অন্যতম উদ্দেশ্য থাকে গবেষকদের প্রয়োজনীয় পাঠ্য উপকরণ সংগ্রহের মাধ্যমে জ্ঞানচর্চায় অগ্রসর পর্যায়ে সহায়তা জোগানো।
image2
গ্রন্থাগারের ইংরেজি প্রতিশব্দ ‘Library’-এর উৎপত্তি ল্যাটিন শব্দ Liber থেকে যার অর্থ হচ্ছে ‘পুস্তক’। আবার Liber শব্দটি এসেছে Libraium শব্দ থেকে যার অর্থ হচ্ছে ‘পুস্তক রাখার স্থান’। এ্যাংলো-ফ্রেঞ্চ শব্দ Librarie অর্থ হচ্ছে পুস্তকের সংগ্রহ। গ্রন্থাগার বা প্রকৃত অর্থে পাঠাগার হচ্ছে বই, পুস্তিকা সহ অন্যান্য তথ্য সামগ্রির একটি সংগ্রহশালা যেখানে পাঠক গ্রন্থপাঠ, গবেষণা ও তথ্যানুসন্ধান করতে পারেন। বাংলা গ্রন্থাগার শব্দটির সন্ধিবিচ্ছেদ করলে ‘গ্রন্থ+আগার’ পাওয়া যায়। অর্থাৎ গ্রন্থাগার হচ্ছে গ্রন্থ সজ্জিত পাঠ করার আগার বা স্থান। গ্রন্থাগার হচ্ছে জ্ঞানের এমন এক সমুদ্র সেখানে বিচরণ করে প্রতিটি মানুষ উন্নত মননের অধিকারী হতে পারেন। তাই গ্রন্থাগারকে তুলনা করা হয় শব্দহীন মহাসমুদ্রের সাথে। এটি অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যতের মাঝে সেতুবন্ধনের এক নীরব সাক্ষী। আধুনিক সভ্যতার যুগে লাইব্রেরির গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করতে গেলে স্বাভাবিকভাবে অনলাইন লাইব্রেরির কথা চলে আসলেও আপাততঃ সেদিকে এগোচ্ছি না৷ এই লাইব্রেরিকে বলা হয়ে থাকে আলোর পথে ডেকে নিয়ে চলা এক নীরব পথপ্রদর্শক৷ ইউনেস্কো এর মতে, ”মুদ্রিত বই, সাময়িকী অথবা অন্য যে কোন চিত্রসমৃদ্ধ বা শ্রবণ-দর্শন সামগ্রীর একটি সংগঠিত সংগ্রহ হল গ্রন্থাগার। যেখানে পাঠকের তথ্য, গবেষণা, শিক্ষা অথবা বিনোদন চাহিদা মেটানোর কাজে সহায়তা করা হয়।”
image2
বিশ্বের প্রথম লাইব্রেরির ধারণা শুরু করা হয়েছিল প্রাচীন মিশরে। তখন উপাসনার পাশাপাশি তাত্ত্বিক আলোচনা বা জ্ঞান প্রসারের জন্য পুরোহিতদের নিজেদের প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস বা তথ্য সংরক্ষণের প্রয়োজন হয়ে পড়ে। বিখ্যাত গ্রন্থাগারসমূহের মধ্যে প্রথমেই আসে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ গ্রন্থাগার ‘লাইব্রেরি অব কংগ্রেসে’র নাম৷ আমেরিকার ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থিত এই লাইব্রেরিতে রয়েছে ৩ কোটি ২০ লক্ষ বইয়ের এক বিশাল সমাহার৷ লন্ডনের ব্রিটিশ মিউজিয়ামও পৃথিবীর বিখ্যাত লাইব্রেরির মধ্যে অন্যতম৷ অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বডলিন লাইব্রেরি’তে রয়েছে ১ কোটিরও বেশি গ্রন্থ। এছাড়া পৃথিবীর প্রাচীনতম লাইব্রেরির মধ্যে রয়েছে ‘ভ্যাটিকান লাইব্রেরি’৷ এ ছাড়াও ফ্রান্সের বিবলিওথিক লাইব্রেরি, মস্কোর লেনিন লাইব্রেরি ও কলকাতার ন্যাশনাল লাইব্রেরি উল্লেখযোগ্য৷ মিশরের আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরিও পৃথিবীর প্রাচীন লাইব্রেরির মধ্যে অন্যতম যা এক সময় পৃথিবীর সপ্তাশ্চার্যের মধ্যেও ছিল৷ ১৯০৯ সালে চীনের বেইজিংয়ে স্থাপিত হওয়া ২ লক্ষ ৮০ হাজার বর্গ মিটার জুড়ে অবস্থিত চীনের জাতীয় লাইব্রেরী এশিয়ার বৃহৎ ও বিখ্যাত যার মধ্যে রয়েছে ৪১ মিলিয়নেরও বেশি বিভিন্ন স্বাদের বই এবং প্রায় ১২ লক্ষ সাময়িকী অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে৷ এই ন্যাশনাল লাইব্রেরি হচ্ছে একটি প্রধান গবেষণা এবং পাবলিক লাইব্রেরি, যেখানে ১২৩টি ভাষায় আইটেম রয়েছে এবং বিভিন্ন ফর্ম্যাটে মুদ্রণ এবং ডিজিটাল উভয় মাধ্যমে রয়েছে বই, পাণ্ডুলিপি, জার্নাল, সংবাদপত্র, ম্যাগাজিন, সাউন্ড এবং মিউজিক রেকর্ডিং, ভিডিও, প্লে-স্ক্রিপ্ট, পেটেন্ট, ডাটাবেস, মানচিত্র, স্ট্যাম্প, প্রিন্ট, অঙ্কন।
image2
১৮৩৬ সালের ২১ মার্চ কলকাতা পাবলিক লাইব্রেরি নামে যাত্রা শুরু করলেও সেই সময় সেটি ছিল একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান৷ প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর ছিলেন এই লাইব্রেরির প্রথম মালিক। ভারতের তদনীন্তন গভর্নর জেনারেল লর্ড মেটকাফ ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ লাইব্রেরির ৪ হাজার ৬৭৫টি বই এই গ্রন্থাগারে দান করেছিলেন। এই দানের ফলেই গ্রন্থাগারের গোড়াপত্তন সম্ভব হয়েছিল। কলকাতার ন্যাশনাল লাইব্রেরির সংগ্রহে বর্তমানে প্রায় ২.২ মিলিয়ন পুস্তক এবং ৫ লক্ষ প্রাচীন পাণ্ডুলিপি রয়েছে। এর সুবিশাল এলাকা প্রায় ১৩০ একর জমি নিয়ে বিস্তৃত। বর্তমানে কলকাতার ন্যাশনাল লাইব্রেরি হচ্ছে এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম সরকারি গ্রন্থাগার। স্বাধীন ভারতের এই জাতীয় গ্রন্থাগারটি ১৯৫৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারী মৌলানা আবুল কালাম আজাদ জন সাধারণের জন্য উন্মুক্ত করেছিলেন। কলকাতার এই ন্যাশনাল লাইব্রেরি ১৮ হাজারেরও অধিক পাঠকগণ বই পড়তে যান৷ এই লাইব্রেরিতে বাংলা, পাঞ্জাবি, মারাঠি,গুজরাটি, হিন্দি, কানাড়ী, কাশ্মীরি , মালায়ালম, ওড়িয়া, অসমীয়া , তামিল, তেলুগু, সংস্কৃত, সিন্ধি , উর্দু ইত্যাদি ভারতীয় ভাষার জন্য বইয়ের জন্য স্বতন্ত্র স্থান রয়েছে ৷
মাতৃভাষার দাবীতে ১৫ জন শহিদ হওয়া আমাদের এই বরাক উপত্যকার জেলা প্রেক্ষাগৃহ নির্মানের জন্য জেলা গ্রন্থাগারকে ভেঙে দেওয়া হলো যা আসামের কোনও জেলায় ঘটেনি৷ এই জেলা গ্রন্থাগারকে ধ্বংস করে দেওয়ার ফলে গ্রন্থাগারের সংগ্রহে থাকা অনেক মূল্যবান তথ্য পুনরায় উদ্ধার করা সম্ভব হবে কী না সে তো ভবিষ্যতেই জানা যাবে৷ এপ্রসঙ্গে এমূহূর্তে কিছু মন্তব্য করা উচিৎ নয় জেনেও বলতে হচ্ছে বরাক উপত্যকার অনেকটাই ক্ষতি হয়ে গেল৷ পুরোনো গ্রন্থাগারকে রেখে দিয়েও নতুন ভবন তৈরি করা সম্ভব হলে উপত্যকার সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্র কিছুটা হলেও প্রসারিত হত৷ তাই বলা যেতেই পারে গ্রন্থাগার ভবন ভেঙে দেওয়ায় উপত্যকার অনেক ক্ষতি হয়েছে৷ যাই হোক, ১৯৭৭ সালে জন্ম নেওয়া বরাক উপত্যকা বঙ্গ সাহিত্য ও সংস্কৃত সম্মেলনের কাছাড় জেলা কমিটির তত্ত্বাবধানে থাকা বঙ্গভবনের দোতলায় অবস্থিত গ্রন্থাগারটি আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় উপাচার্য অধ্যাপক দিলীপ চন্দ্র নাথ উদ্বোধন করেন ২০২১ সালের ৭ মার্চ ( ২২ ফাল্গুন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ )৷ বঙ্গভবন গ্রন্থাগারের গ্রন্থাগারিক সহায়িকা হিসেবে রয়েছেন অঙ্কিতা চন্দ ও শর্মিলা পাল৷ এই গ্রন্থাগার উদ্বোধনের ২৬ মাস আগে গ্রন্থাগার সংলগ্ন ভাষা শহিদ স্মৃতি মহাফেজখানা ২০১৮ সালের ২৮ ডিসেম্বর ( ১২ পৌষ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ) উদ্বোধন করেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞানের অধ্যাপক তথা জগদীশ ভট্টাচার্যের সুযোগ্য কনিষ্ঠ পুত্র রঞ্জন ভট্টাচার্য এবং প্রয়াত দেবীপদ ভট্টাচার্যের পুত্র শুভায়ু ভট্টাচার্য৷
image2
গুরুচরণ মহাবিদ্যালয়ের অধ্যাপক অমলেন্দু ভট্টাচার্যকে আহ্বায়ক করে তৈরি করা গ্রন্থাগার কমিটিতে সদস্য হিসেবে রয়েছেন প্রাক্তন জেলা সম্পাদকদ্বয় দীনেন্দ্র নারায়ণ বিশ্বাস এবং তৈমুর রাজা চৌধুরী, অধ্যাপক বিশ্বতোষ চৌধুরী, জেলা সভাপতি সঞ্জীব দেব লস্কর, জেলা সম্পাদক ড০ জয়ন্ত দেব রায় ৷ এছাড়াও জেলার চার মহাবিদ্যালয়ের যে চারজন গ্রন্থাগারিককে উপদেষ্টা হিসেবে অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে তাঁরা হচ্ছেন রাধামাধব মহাবিদ্যালয়ের ড০ সোনালি চৌধুরী বিশ্বাস, গুরুচরণ মহাবিদ্যালয়ের শেহনারা বেগম চৌধুরী, মহিলা মহাবিদ্যালয়ের ড0 সরিতা ভট্টাচার্য এবং কাছাড় মহাবিদ্যালয়ের এল. মঙলেম্বা সিংহ৷ এছাড়া গত ২২মার্চের (বুধবার) সভায় সুপ্রদীপ দত্ত রায়কে কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং আমন্ত্রিত সদস্য হিসেবে দূর শিক্ষা কেন্দ্রের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক হিসেবে কবির হুসেনকে রাখা হয়৷ এখানে জেনে রাখা প্রয়োজন বঙ্গভবনের গ্রন্থাগারিক সহায়িকা দু’জন নীতি নির্ধারনের সাথে যুক্ত না থাকলেও কমিটির সভায় প্রয়োজনবোধে উপস্থিত থাকার জন্য আমন্ত্রন জানানো হয়ে থাকে৷
image2
এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন ২০১৫ সাল থেকেই নবনির্মিত বঙ্গভবনে একটি গ্রন্থাগার স্থাপনের ব্যপারে ভাবনা চিন্তা শুরু হয়৷ কিন্তু তার আগেই এই ভবন নির্মিত হবার সাথে সাথে একটি কোঠা রেখে দেওয়া হয়েছিল ভাষা শহিদ মহাফেজখানার জন্য৷ পরের বছর অর্থাৎ ২০১৬ সালে শহরের চারটি মহাবিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারিকদেরকে নিমন্ত্রণ করে ডেকে এনে একটি সভা আহ্বান করা হয় এবং তাদের সাথে বিশদ আলোচনাক্রমে বঙ্গভবনে গ্রন্থাগার সুন্দরভাবে শুরু করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপসহ পরামর্শ লিখিতভাবে দেওয়ার জন্য অনুরোধ রাখা হয়েছিল৷ এই চার গ্রন্থাগারিকের মূল্যবান লিখিত প্রতিবেদনের উপর ভিত্তি করেই পরবর্তী সময়ে বর্তমানের গ্রন্থাগারটি আস্তে আস্তে গড়ে উঠেছে৷ পরবর্তীতে উক্ত চারজনকেই উপদেষ্টা হিসেবে গ্রন্থাগার কমিটিতে রাখা হয়েছে, যদিও ইতিমধ্যে কাছাড় মহাবিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারিক তার চাকুরিজীবন থেকে অবসর নিয়েছেন৷ ২০১৯ সালে এই কমিটির কার্যকাল বর্দ্ধিত করা হলেও কতদিন পর্যন্ত কমিটির কার্যকাল থাকবে সেটা জানা সম্ভব হয়নি৷ তবে এখানে উল্লেখ করা উচিৎ, ২০১৮ সালের ৯ জুলাই এই গ্রন্থাগার কমিটির প্রথম সভা আহ্বান করা হয়েছিল৷ এই সভার পূর্ববর্তী সময়ের সমস্ত সভা কাছাড় জেলা কমিটিই মূলতঃ যে প্রশ্নটিকে সামনে রেখে আহ্বান করেছিল সেটা ছিল গ্রন্থাগার তৈরি করতে হলে কিভাবে এগোতে হবে৷
image2
এই গ্রন্থাগারে রয়েছে ৩ হাজার ১৩০টি বই যার মধ্যে জগদীশ ভট্টাচার্য ১ হাজার ৯৯২টি এবং বাকি বইগুলো রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য ও প্রাবন্ধিক দেবীপদ ভট্টাচার্যের সংগ্রহ হিসেবে তাঁদের পুত্ররা দান করেছেন৷ সংগৃহীত বইগুলোর মধ্যে বিভিন্ন স্বাদের বই রয়েছে যেমন কাব্যগ্রন্থ, ধর্মগ্রন্থ, নাটক, ছোট গল্প, প্রবন্ধ ও রচনাবলী৷ আবার বিভিন্ন রচনাবলীগুলোর মধ্যে রয়েছে রবীন্দ্র রচনাবলী, বনফুলের গল্প সংগ্রহ, তারাশঙ্কর রচনাবলী, শরৎচন্দ্র রচনাবলী, গিরিশ রচনাবলী, বিভূতি ভূষণ মুখোপাধ্যায় রচনাবলী৷ এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন তারাশঙ্করের নিজস্ব সাক্ষর করা জগদীশ ভট্টাচার্যকে উপহার দেওয়া বইগুলোও এই গ্রন্থাগারে রয়েছে যা পাঠকবর্গের মনে নিশ্চয়ই শিহরণ জাগাবে৷ এই সংগ্রহে বেশ কিছু ইংরেজি সাহিত্য সহ প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশেরও কিছু বই রয়েছে৷ এছাড়াও সংগ্রহে রয়েছে দুষ্প্রাপ্য কবিগুরুর একগুচ্ছ কবিতার মূল পান্ডুলিপির প্রতিলিপি৷ এসমস্ত সংগ্রহের মাধ্যমে বঙ্গভবনের গ্রন্থাগারের স্বকীয়তা প্রমান করলেও প্রয়োজন রয়েছে সঠিকভাবে ব্যবহারের৷ একাজে সদস্যদের বিজ্ঞানসম্মত ভাবনা নিয়ে সুস্থ সংস্কৃতিবোধসম্পন্ন সমাজে গঠনের কাজে এগিয়ে আসা খুবই প্রয়োজন৷ এপ্রসঙ্গে উল্লেখ করে রাখা প্রয়োজন, এই বইগুলো সংগ্রহে অধ্যাপক অমলেন্দু ভট্টাচার্যেরও এক বিশেষ ভূমিকা রয়েছে৷
image2
এছাড়াও মহাফেজখানায় রয়েছে সম্মেলন প্রকাশিত সমস্ত বই, স্মরণিকা, শুভাকাঙ্খী ব্যক্তিবর্গের দান করা তাঁদের নিজস্ব বই বা তাঁদের সংগ্রহে থাকা বিভিন্ন লেখকের বই, দুরশিক্ষা কেন্দ্রের বই ইত্যাদি কয়েক শত বই যেগুলো নানা কারণে এখনও নথিভুক্ত করা সম্ভব হয়নি৷ এছাড়াও এখানে রয়েছে ষাটের দশক থেকে সংগৃহীত আনন্দবাজার পত্রিকা৷ মহাফেজখানার সংগৃহীত বই থেকে বরাক উপত্যকার বহুভাষিক চরিত্রের কিছুটা আভাস পাওয়া যায়৷ তবে এই চরিত্র অক্ষুন্ন রাখতে হলে সকলের আন্তরিক প্রচেষ্টার প্রয়োজন রয়েছে৷ বরাক উপত্যকার সাহিত্য সংস্কৃতি ইত্যাদি বিষয়ক সমস্ত বিরল সংগ্রহের মাধ্যমে গ্রন্থাগারকে উন্নীত করতে হলে কমিটির সমস্ত সদস্যের সক্রিয় এবং ইতিবাচক অংশগ্রহনের প্রয়োজন রয়েছে৷ ইতিমধ্যে কবি সুপ্রদীপ দত্ত রায়ের তত্ত্বাবধানে গ্রন্থাগারকে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে ডিজিটেলাইজড করার প্রাথমিক কাজ শুরু করে অনেকটাই এগিয়ে গেছে৷
বরাক উপত্যকা বঙ্গ সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলনের অধীনে চলতে থাকা দূর শিক্ষা কেন্দ্রের পাঠ্যক্রমে গ্রন্থাগারের ব্যবহারের মাধ্যমে প্রকল্প জমা দেওয়ার বিষয়টি অন্তর্ভূক্ত করায় গ্রন্থাগারের ব্যবহার বাধ্যতামূলক হয়ে পড়েছে৷ ফলস্বরূপ দূর শিক্ষা কেন্দ্রের ছাত্র ছাত্রীদেরকে গ্রন্থাগারের সদস্য পদ নিয়ে গ্রন্থাগারের বই পত্র নাড়া চাড়া করে বাধ্যতামূলকভাবে প্রকল্প জমা দিতে হচ্ছে যার জন্য পরীক্ষায় কিছু নম্বর বরাদ্দ করা রয়েছে৷ এই মূহূর্তে এইরকম সদস্যের সংখ্যা হচ্ছে ২০৭ জন৷ এছাড়া এই সম্মেলনের কোনোরকম সদস্য না হয়েও গ্রন্থাগার ব্যবহারের উদ্দেশ্যে ১৬ জন গ্রন্থাগারের সদস্যপদ গ্রহন করেছেন৷ কিন্তু উল্লেখনীয় বিষয় হচ্ছে সম্মেলনের যারা সদস্য রয়েছেন তাদের মধ্যে গ্রন্থগারের সদস্যপদ গ্রহন করেছেন মাত্র ১৮ জন৷ এই গ্রন্থাগারের সদস্য সংখ্যা বাড়াতে সম্মেলনের সদস্যদের আন্তরিক প্রচেষ্টা একান্তভাবে জরুরি৷ কারণ সম্মেলনের তথ্য অনুযায়ী শিলচর শহর আঞ্চলিক সমিতির সদস্য সংখ্যা ৩৫৭ যার মধ্যে কর্মকর্তার সংখ্যা ১৭ জন৷ এছাড়াও শিলচর শহরে থাকা জেলা কমিটির কর্মকর্তা রয়েছেন মোটামুটি ১২ জন এবং কেন্দ্রীয় কমিটির কর্মকর্তার সংখ্যা আরও ৬ জন৷ এখানে বলে রাখা ভালো গ্রন্থাগারের নতুন সদস্যভুক্তি হিসেবে প্রথম বছর ১০০ টাকা জমা দিতে হয় এবং পরবর্তী বছরগুলোতে পুনর্নবীকরণের জন্য মাত্র ৫০ টাকা ধার্য করা হয়েছে৷ তাই এই উপত্যকার স্বার্থে তথা বরাক উপত্যকার সাহিত্যচর্চার উন্নতিকল্পে গ্রন্থাগারকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে সম্মেলনের সদস্যদেরকে অবশ্যই আন্তরিকতার সাথে স্বতস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসতে হবে৷   পূর্ববর্তী পৃষ্ঠা : গ্রন্থাগার ।