বরাক উপত্যকা
বঙ্গ সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলন

কাছাড় জেলা সমিতি, শিলচর
বহুজাতিক, বহুভাষিক সমাবেশ
(সোমবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ)
বরাক উপত্যকা বঙ্গ সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলন
কাছাড় জেলা সমিতি, শিলচর
বহুজাতিক, বহুভাষিক সমাবেশ
(সোমবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ)
সমস্যার সারসংক্ষেপ :

লক্ষ্মীপুর সম-জেলার হরিনগর-জয়পুর-রাজাবাজার অঞ্চলের ১৯টি গ্রামকে ষষ্ঠ তহশিলের অন্তর্গত ডিমা হাসাও স্বায়ত্তশাসিত জেলা-পরিষদের অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব প্রত্যাহারের দাবিতে এবং কাছাড়ে শান্তি সম্প্রীতি রক্ষার্থে জনগণের শান্তিপূর্ণ সমাবেশে সমবেত সচেতন জনগণকে স্বাগত।

২৭ এপ্রিল, ২০২৩ কেন্দ্রীয় সরকার, আসাম সরকার এবং দুই ডিমাসা সংগঠনের মধ্যে (DNLA অর্থাৎ Dima National Liberation Army, এবং DPSC অর্থাৎ Dimasa People's Supreme Council) স্বাক্ষরিত একটি চুক্তিকে (MoS) বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে সম্প্রতি প্রশাসনিক তরফে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। এ চুক্তি অনুযায়ী, কাছাড়ের লক্ষীপুর সম-জেলার অন্তর্গত হরিনগর, জয়পুর-রাজাবাজার অঞ্চলের ১৯টি গ্রাম ষষ্ঠ তফশিলভুক্ত ডিমা হাসাও স্বায়ত্তশাসিত জেলা পরিষদে স্থানান্তরের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের সুদূর প্রসারী প্রভাব কেবল ভৌগোলিক সীমানা বদলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, সামগ্রিক ভাবে এর বাস্তবায়ন গোটা অঞ্চলটির জনগণের সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং সাংবিধানিক অধিকারের উপর অবাঞ্ছিত প্রভাব ফেলবে।

এই অঞ্চলে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর ৯৮ শতাংশই অ-ডিমাসা সমতলবাসী, যাদের মধ্যে রয়েছে হিন্দু-মুসলমান বাঙালি কৃষিজীবী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, প্রাক্তন চা-শ্রমিক, মণিপুরি, রাজবংশী, নেপালি, ঝাড়খণ্ডি, ভোজপুরি প্রভৃতি হিন্দিভাষী জনগোষ্ঠী ছাড়াও খাসি, কুকি ইত্যাদি জনজাতি যাঁরা ঐতিহাসিকভাবে কাছাড় জেলার প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামোর সঙ্গে নিবিড় ভাবে জড়িত।

এই ১৯টি গ্রাম ষষ্ঠ তফশিলভুক্ত ডিমা হাসাও জেলার অন্তর্ভুক্ত হলে অ-ডিমাসা সমতলবাসীরা হঠাৎ করেই নিজেদের ‘বহিরাগত’ বা ‘আউটসাইডার' হিসেবে আবিষ্কার করবেন। তারা পুরুষানুক্রমে ভোগ দখল করা জমির মালিকানা ছাড়াও কর্মসংস্থানের অধিকার, এবং সংবিধান-নির্দিষ্ট নাগরিক অধিকারও হারাতে বসবেন । ঐতিহাসিকভাবে সমতল কাছাড়ের বাঙালি সহ অন্যান্য জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সৌভ্রাতৃত্ববন্ধনে আবদ্ধ ডিমাসা জনগোষ্ঠী, যারা এ ভূমির সামাজিক-সাংস্কৃতিক জীবন, স্বাধীনতা আন্দোলন, স্বাধীনতা পরবর্তী কালে কৃষক আন্দোলন, ভাষা-আন্দোলনেও নিজেদের ভূমিকা রেখেছেন, এদের জন্য এ স্থানান্তর কতটুকু স্বস্তিদায়ক হবে কে জানে৷

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট :
ডিমাসা ও বাঙালির সম্পর্ক শতাব্দী-প্রাচীন ঐতিহ্যের উপর দাঁড়িয়ে আছে।
১)
অষ্টাদশ শতকে ডিমাসা রাজসভা মাইবং থেকে কোনও ধরনের সংঘাত, যুদ্ধ, রক্তপাত ছাড়াই শান্তিপূর্ণভাবে খাসপুরে স্থানান্তরিত করার প্রক্রিয়ায় বাঙালি সমাজ সহযোগিতা ও প্রশাসনিক সহায়তা প্রদান করেছিল। খাসপুরে অধিষ্ঠানের পর প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ক্ষেত্র ছাড়াও সাংস্কৃতিক, অধ্যাত্মিক ক্ষেত্রেও ডিমাসা রাজত্বে এক নবজাগরণের অধ্যায় সূচিত হয়, যার ধারাবাহিকতা আজও বহমান।
২)
কাছাড়ে পূর্বাপর প্রচলিত বাংলাভাষাই রাজদরবারে সরকারি ভাষা হিসেবে গৃহীত হয়, রাজকীয় দলিল, দানপত্র, অভয়পত্র, মুদ্রা, প্রস্তরলিপি ছাড়াও জৈন্তা রাজসভা, আহোম রাজদরবার এমন-কি কাছাড়ে কোম্পানি রাজত্ব সম্প্রসারণে প্রয়াসী ঔপনিবেশিক ইংরেজ প্রশাসকদের কাছে প্রেরিত চিঠিপত্রে বাংলাভাষার প্রয়োগ দেখা যায় । বাংলায় ‘হেড়ম্ব দণ্ডবিধি’, ‘ঋণাদান বিধি’ ছাড়াও রাজসভাশ্রিত সাহিত্য সমস্তকিছুতেই বাংলাভাষা ব্যবহৃত হয়। মহারাণী চন্দ্রপ্রভার পৃষ্টপোষকতায় ‘নারদীয় রসামৃত’, কৃষ্ণচন্দ্রের ‘রণচণ্ডি' উদ্দেশে গীত, মালসি, গোবিন্দচন্দ্রের ‘রাসোৎসব গীতামৃত’, আর চন্দ্রমোহন বর্মনের আখ্যানকাব্যে এ ভূমির গৌরব ধরা আছে। এই সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করে হঠাৎ এ ভূমির সঙ্গে বিচ্ছেদ সবার কাছেই অসহনীয়।
৩)
রাজদরবার নিয়োজিত উজির, ভাণ্ডারি, খেল-মোক্তার, সভাপণ্ডিত ইত্যাদি বাঙালি পদাধিকারির সহায়তায় রাজ্যের প্রশাসনিক কাঠামো সুদৃঢ় হয়, এবং অর্থনীতি ও কৃষিনির্ভর সমৃদ্ধি সমস্তকিছুই এ সমতলবাসীর সহযোগিতায়ই বাস্তবায়িত হয়। এই পারস্পরিক নির্ভরতা, শ্রদ্ধা, বিশ্বাস ও সহাবস্থানের ঐতিহ্যই আজকের কাছাড়ের মূল ভিত্তি।
বর্তমান চুক্তির সম্ভাব্য পরিণতি :

এই চুক্তি মূলত দুই গোষ্ঠীর পরামর্শে ও ইচ্ছাপুরণেই সম্পাদিত হয়েছে, যারা দীর্ঘ তিন দশক ধরে ডিমা হাসাও পাহাড়ে সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল। এ নেতৃত্বের পেছনে কোনও জাতীয় ঐতিহ্য, স্বাধীনতা আন্দোলনের ধারাবাহিকতার স্বাক্ষর নেই। জনবিচ্ছিন্ন অস্ত্রধারী এ নেতৃত্বের হাতে গণতান্ত্রিক জনগণের প্রতিনিধিত্ব কতটুকু নির্ভরযোগ্য তা বিচারের ভার শান্তিপূর্ণ জনগণের উপরই।

কাছাড়ের এই অঙ্গচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে অঞ্চলের জনগণ, স্থানীয় স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাবিদ, বুদ্ধিজীবী বা বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মতামত ছাড়াই।

এর ফলে প্রবল আশঙ্কা জাগছে :
১)
বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক বিঘ্নিত হতে পারে।
২)
আঞ্চলিক সম্প্রীতি ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ব্যাহত হতে পারে।
৩)
কাছাড় জেলার রাজস্ব-কাঠামো দুর্বল হবে, জীববৈচিত্র্যপূর্ণ সংরক্ষিত বনাঞ্চল, পুঞ্জি, আনারস, কমলা বাগান, ছাড়াও বাঁশ, কাঠ, পাথর, বালি, চা, মাছ অঞ্চলটির এই জেলার অন্যতম আয়-উৎপাদনকারী ক্ষেত্র। এ অঞ্চলটি সরিয়ে নেওয়া দুর্ভাগ্যজনকই হবে।
৪)
পাহাড় সংলগ্ন অঞ্চলটির প্রশাসনিক কর্তৃত্ব অন্যত্র সরে যাওয়ার ভিন্নতর সমস্যা শান্তিপূর্ণ এলাকার পক্ষে ক্ষতিকর।
সমাবেশের উদ্দেশ্য :
১)
হরিনগর, জয়পুর এলাকার ১৯টি গ্রামের জনগণের অধিকার রক্ষার প্রশ্নে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা।
২)
ডিমাসা ও বাঙালি উভয় সম্প্রদায়ের শান্তিপ্রিয় জনগণকে একত্রিত করে ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্যের বাতাবরণ বজায় রাখা।
৩)
কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের কাছে দাবি জানানো যে, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এ সিদ্ধান্ত বাতিল করা, সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের জনগণের মতামত ও সম্মতি ব্যতীত জেলার সীমানা পরিবর্তন কার্যকর করা থেকে বিরত থাকা।
৪)
সমতল, পাহাড় দ্বন্দ্ব নয়, সহ-অস্তিত্ব ও ন্যায়বিচারের নীতি প্রতিষ্ঠার পক্ষে একটি সর্বদলীয়, বহুজনগোষ্ঠীর একতামঞ্চ গঠন করা।
এর ফলে প্রবল আশঙ্কা জাগছে :
১)
বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক বিঘ্নিত হতে পারে।
২)
আঞ্চলিক সম্প্রীতি ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ব্যাহত হতে পারে।
৩)
কাছাড় জেলার রাজস্ব-কাঠামো দুর্বল হবে, জীববৈচিত্র্যপূর্ণ সংরক্ষিত বনাঞ্চল, পুঞ্জি, আনারস, কমলা বাগান, ছাড়াও বাঁশ, কাঠ, পাথর, বালি, চা, মাছ ও কৃষিজ সম্পদে ভরপুর অঞ্চলটি, এই জেলার অন্যতম আয়-উৎপাদনকারী ক্ষেত্র। এ অঞ্চলটি সরিয়ে নেওয়া দুর্ভাগ্যজনকই হবে।
৪)
পাহাড় সংলগ্ন অঞ্চলটির প্রশাসনিক কর্তৃত্ব অন্যত্র সরে যাওয়ার ভিন্নতর সমস্যা শান্তিপূর্ণ এলাকার পক্ষে ক্ষতিকর।
স্মর্তব্য :
কাছাড়ের ইতিহাস আমাদের শেখায় : -
১)
বিভিন্ন ভাষা, জাতি ও সংস্কৃতির মানুষ সহাবস্থানের মধ্য দিয়েই এই ভূখণ্ডের সমাজ সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে।
২)
আজ যখন সেই ঐক্যের ভিত্তি বিপন্ন, তখন একমাত্র জনগণের ঐক্যবদ্ধ কণ্ঠস্বরই পারে এই অন্যায় সিদ্ধান্তকে প্রতিহত করতে।
৩)
কাছাড় বাঁচলে পাহাড়ও বাঁচবে; পাহাড় বাঁচলে সমতলও নিরাপদ থাকবে।

আমাদের সর্বান্তকরণ আহ্বান – সীমানা বিভাজন নয়, সহাবস্থানই হোক আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য।

 
নিবেদক

১৩ অক্টোবর ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ
সঞ্জীব দেবলস্কর
সভাপতি, কাছাড় জেলা সমিতি,
বরাক উপত্যকা বঙ্গ সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলন, শিলচর
 
নিবেদক

১৩ অক্টোবর ২০২৫
সঞ্জীব দেবলস্কর
সভাপতি, কাছাড় জেলা সমিতি,
বরাক উপত্যকা বঙ্গ সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলন, শিলচর